অঞ্চল পর্যালোচনা : হাওরাঞ্চলের ইতিহাস (৩য় পর্ব)

জীবন ও জীবিকা

হাওরাঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত ভাঙ্গা গড়া এবং অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। এখানকার জনসাধারণের মধ্যে কেউ দিন মজুর, কেউ মাছ শিকার করে, কেউ বা কুলি-মজুরের কাজ করে দিন আনে দিন খায়। আর স্বল্প সংখ্যক লোক বিভিন্ন ব্যবসা ও উচ্চতর চাকরি করে থাকেন। তবে এ শ্রেণীর বেশির ভাগ মানুষ শহরে বসবাস করেন। গুটিকয়েক মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। এ এলাকার প্রায় ৮৫ ভাগ লোক কৃষির ওপর নির্ভরশীল হলেও অনেক কৃষকের কাঁধে রয়েছে ঋণের বোঝা। পাহাড়ি ঢল, অকাল ঝড়, বন্যা, খরার মতো দুর্যোগ একটার পর একটা এখানে লেগেই থাকে। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেটে উঠতে না উঠতেই আরেকটি এসে হাজির হয়। ফলে কৃষকেরা আশাতীত ফসলের অর্ধেকও ঘরে তুলতে পারে না। উৎপাদিত ফসল দিয়ে সারা বছর চলতে পারে না। এ কারণেই কৃষকদের ঋণের দুঃসহ বোঝা কাঁধে নিয়ে চলতে হয় প্রতিনিয়ত। তাছাড়া অধিকাংশ কৃষকের ঘরে রয়েছে বিবাহ উপযুক্তা মেয়ে। অর্থাভাবে বিয়ে দিতে পারছে না। এ জনপদের করুণচিত্র নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় প্রতিটি মানব শিশুই পাঁচটি মৌলিক অধিকারকে সাথে নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে।

এ পাঁচটি অধিকার হলো, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। এ পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা, প্রাণ ধারণ করা ও জীবনযাপন করার জন্য পাঁচটি প্রয়োজনকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ পাঁচটি বিষয় একদিকে যেমন মানুষের প্রয়োজন অন্যদিকে তা জন্মগত অধিকার। জন্মগ্রহণের সাথে সাথে এ পৃথিবীর মানব গোষ্ঠীর কাছে এ সকল অধিকারের দাবি নিয়েই একটি শিশু পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে। সমাজ সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে বহু কষ্টকর ও ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে আজ একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার সর্বনিম্ন প্রয়োজনগুলো মেটাবার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি মানুষের। কাজ পাবার, খাদ্য পাবার, বাসস্থান পাবার, চিকিৎসা পাবার অধিকারগুলো সবাই মুখে মুখে স্বীকার করলেও এবং কাগজ কলমে সেই অধিকার বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে হাওর কবলিত মানুষের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই?

এ অঞ্চলে যে বছর পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি কারণে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে যায় সে বছর ঐসব কৃষকেরা খেতে পায় না। অনাহারে জীবন যাপন করতে হয়। এদের পরনে কাপড় থাকে না। অসুখ বিসুখে ওষুধ পায় না। শিক্ষার অধিকার থেকে হয় বঞ্চিত। মানুষের সর্বনিম্ন যে প্রয়োজন তা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এমন হওয়ার কথা ছিল না। কেননা খুব ভালো করে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে, এসব ন্যূনতম অধিকার থেকে যারা বঞ্চিত, সেই সব মানুষেরাই আমাদের সমাজের চালিকাশক্তি। কৃষি প্রধান গ্রাম নির্ভর হাওরকবলিত মানুষ কাজ করে ক্ষেতে, উৎপাদন করে সকলের খাবার, কিছু সংখ্যক মানুষ মৎস্যসহ অন্যান্য কাজ করে- আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে বহুবিধ সামগ্রী উৎপাদন করে। এদের শ্রমের বিনিময়েই উৎপাদিত পণ্য দিয়ে আমাদের দিন চলে। এদের পরিশ্রমের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সমাজ। এরা ধান এবং মাছ উৎপাদন করে নিজেরা চলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মুখের অন্ন যোগাড় করতে রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। অথচ যে বছর ফসল তলিয়ে যাচ্ছে সে বছর আমরা তাদের খবর রাখি না।

প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উপায় মৎস্য শিকার। কৈবর্ত, বর্মণ, নমশূদ্র শ্রেণীর লোকদের সংখ্যাধিক্যের কারণে এ ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। হাওর, নদ-নদী, বিল প্রভৃতির অধিক হওয়ায় এবং বর্ষার দিনে পুরো ছয় মাস সমগ্র এলাকা জলমগ্ন থাকায় সার্বক্ষণিক মৎস্যজীবী ছাড়াও বিত্তহীন অথবা স্বল্প আয়ের কৃষি শ্রমিক উপপেশা হিসাবে মৎস্য শিকার করে থাকে। নদীতে, হাওরের বিলে কিংবা বর্ষায় প্লাবিত অথৈ পানিতে বন্যা কিংবা ঢেউকে উপেক্ষা করে জেলেদের ডিঙ্গি নৌকা এবং বিচিত্র ধরনের মাছ ধরার জাল সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঢেউয়ের সংগে ছোট ডিঙ্গি নৌকাটি লাফাচ্ছে। এর মধ্যে শক্ত হয়ে বসে থেকে দু’তিনজন জেলের জাল দিয়ে মৎস্য শিকার প্রায়ই চোখে পড়ে।

চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ প্রভৃতি পেশার পাশাপাশি জীবিকার ক্ষেত্রে দৃষ্টির অন্তরালে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে সাধারণ মানুষ কিছু ভিন্ন উপায় অবলম্বন করে। একশ্রেণীর মানুষ মৃৎ শিল্প, শীতলপাটি, হাতপাখা, জাল বানানো, কুড়া শিকার, বালি-পাথর উত্তোলন করে আবার আরেক শ্রেণীর মানুষ ঝিনুক কুড়িয়ে এনে তা থেকে মুক্তা বের করে বিক্রি করা, কেউ কেউ শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করে। আবার কেউ বা ভাতের বিকল্প হিসাবে ঢ্যাপের খই, কুঁই মাখনা, শালুক, সিংরা প্রভৃতি জলজ ফলমূল খেয়ে জীবন যাপন করে থাকে। কুঁই থেকে প্রাপ্ত আটা সাদৃশ সাদা খাদ্য উপাদান ব্যাপকভাবে রুটি বানিয়ে খাওয়ার অভ্যাস প্রচলিত আছে কিছু এলাকায়।

হাওরাঞ্চলের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এ এলাকায় রয়েছে বিশাল খাস জমি। যে জমি পাওয়ার কথা ভূমিহীনদের সেই জমি নিয়ে চলছে এখন রামরাজত্ব। প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাচ্ছে অনেক জমি। প্রকৃত ভূমিহীন জমি পাচ্ছে না। হাওর এলাকায় নারীদের কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই। কাজ নেই, নেই যোগাযোগের ব্যবস্থা। তাদের মধ্যে আছে শুধু অভাব আর অভাব।

আবার হাওরাঞ্চলের আবাসনের সমস্যা প্রকট। সেখানকার মানুষের ঘর-বাড়ির থাকার নিশ্চয়তা নেই। রাতে যারা ঘরে ঘুমিয়েছে সকালে তাদের ঘরবাড়ি পাহাড়ী ঢলে নিয়ে গেছে, এমন এক অনিশ্চিত জীবন নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত জীবন যাপন করছে। বিগত সময়গুলোতে অনেক এলাকা পাহাড়ী ঢলে এবং নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।

Related Posts

About The Author

Add Comment