অন্যের অনুকরণ নয়, আত্মশক্তির বিকাশ করুন

ছোটবেলা থেকেই আমাদেরকে শেখানো হয় তোমাকে অমুকের মত জ্ঞানী হতে হবে (এখন অবশ্য শেখানো হয় অমুকের মত তোতাপাখি হতে হবে, তমুকের মত ক্যাডার হতে হবে !), তমুকের মত বিত্তশালী অথবা ক্ষমতাবান হতে হবে। আর আমরাও স্বপ্ন দেখি অমুকের বা তমুকের মত হতে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অনুকরণ করে কেউ বিখ্যাত কিছু হতে পারেনি। বরং নিজের ব্যক্তিসত্তাকে বিকশিত করার মাধ্যমেই মানুষ বিখ্যাত হতে পারে।

কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। যেমন-

অনেকে স্বপ্ন দেখেন বারাক ওবামা মত বিখ্যাত বক্তা হতে । লক্ষণীয় বিষয় হলো বারাক ওবামা কিন্তু আব্রাহাম লিঙ্কনের মত বিখ্যাত বক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তিনি তাঁর নিজের মত হতে চেয়েছেন। বক্তৃতার একান্ত নিজস্ব স্টাইল বা ঢঙ তৈরী করেছেন। আর এজন্যই তিনি বারাক ওবামা হতে পেরেছেন।

অনেকে স্বপ্ন দেখেন বিল গেটস এর মত ধনী হতে। বিল গেটস কিন্তু রকফেলারের মত ধনী হতে চাননি। রকফেলারকে অনুকরণ করলে বিল গেটস হতে পারতেন না। তাকে তেলের ব্যবসা করতে হতো।

আবার অনেকে স্বপ্ন দেখেন জাকারবার্গের মত হতে। জাকারবার্গ কিন্তু বিল গেটসকে অনুকরণ করেননি। বিল গেটস তার সময়ের চ্যালেঞ্জ বা প্রয়োজনীয়তা মোকাবেলা করেছেন আর জাকারবার্গ তার সময়ের। সময়ের ব্যবধান কিন্তু খুব বেশী নয়।

bill-gates-mark-zuckerberg-clean-energy-

অনেকে স্বপ্ন দেখে হুমায়ুন আহমেদ এর মত লেখক হতে। হুমায়ুন আহমেদ কিন্তু বরীন্দ্রনাথের মত লেখক হতে চাননি। রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করলে তিনি এত জনপ্রিয় লেখক হতে পারতেন না। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সময়কে ধরতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি এতো জনপ্রিয় হতে পেরেছেন।

অনেকে স্বপ্ন দেখেন ডাঃ জাকির নায়েকের মত ধর্মের স্কলার হতে। ডঃ জাকির নায়েক কিন্তু ইবনে তাইমিয়া বা ইমাম গাজ্জালীর মত হতে চাননি। সময়ের অাবেদন ভিন্ন। তিনি তাঁর সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার চেষ্টা করছেন। তিনি ইসলাম প্রচারে লেটেস্ট টেকনোলজির সাহায্য নিয়েছেন এবং যুক্তি ও বিজ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনে তাইমিয়া জীবিত থাকলে হয়তো তিনিও তাই করতেন।

কেউ কেউ বার্ট্রান্ড রাসেলের মত দার্শনিক হতে চায়। বার্ট্রান্ড রাসেল কিন্তু জন স্টুয়ার্ট মিলের মত দার্শনিক হতে চাননি। মিলের মত হতে চাইলে তিনি বিংশ শতাব্দীর বিবেক হতে পারতেন না।

অনেকে স্বপ্ন দেখেন চে’গুয়েভারার মত বিপ্লবী হতে। চে কিন্তু লেনিনকে অনুকরণ করেননি। চে তাঁর সময়ের ডাকে সাঁড়া দিয়েছিলেন, তাই তিনি আজো তরুণদের কাছে বিপ্লবের প্রতীক হয়ে রয়েছেন।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে, অনুকরণ করে কেউ কখনো মহান হতে পারে না। যে কথাগুলো বলার জন্য এত কথা বললাম তা হল, আমরা প্রত্যেকে একজন অন্যজন থেকে আলাদা। আমাদের কিউরোসিটিও আলাদা। একইভাবে আমাদের ক্রিয়েটিভির জায়গাও আলাদা। তাছাড়া আমরা যে সময়ে বসবাস বসবাস করছি তাও আলাদা। যেসকল সমস্যা মোকাবেলা করছি বা সম্মুখীণ হচ্ছি তাও আলাদা।

সুতারাং অন্যের অনুকরণ না করে নিজের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে কেউ কাউকে অনুকরণ করে বিখ্যাত হতে পারেনি। চিন্তা এবং কর্মে পূর্ববর্তীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই বিখ্যাত হয়েছে। বৃত্ত ভেঙে নতুন বৃত্ত তৈরী করার নামই সৃজনশীলতা। সেটা কখনোই অনুকরন করে সম্ভব নয়।

হ্যাঁ। আমরা অন্যের ভালো গুনগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারি। অন্যের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও পারি। কিন্তু অন্যের মত হতে পারি না। এই অন্যের মত হতে গিয়েই আমরা আমাদের ব্যক্তিসত্তাকে হত্যা করে ফেলি।

এজন্যই আমেরিকার বিখ্যাত দার্শনিক ইমার্সন তাঁর “সেলফ রিলায়েন্স” প্রবন্ধে বলেছেন, “Imitation is Suicide ” অর্থাৎ অনুকরণ আত্মহত্যার শামিল।

jobs

Related Posts

About The Author

Add Comment