অপরাজেয় বাংলার অজানা ইতিহাস

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার সময় অপরাজেয় বাংলার নির্মান কাজ চলছিল। নৃশংস এই হত্যাকান্ডের পর স্থাপনাটির নির্মান কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা শহরের অলি গলিতে তখন সব সময় বিধ্বংসী ট্যাংকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ লিখেছেন, সেই সামরিক শাসন আমলে একটা ট্যাংকের নল নাকি সবসময় অর্ধনির্মিত ঐ অপরাজেয় বাংলার দিকে তাক করা থাকতো।

পঁচাত্তর পরবর্তী উত্তাল সময়গুলোতে কিছু বিপথগামী উগ্র সাম্প্রদায়িক ছাত্র এই ভাস্কর্য নির্মানকে ধর্মীয় মতে হারাম ঘোষনা করে এটিকে ধ্বংস করার দাবী জানায় এবং সে লক্ষ্যে এটি ভেঙ্গে ফেলার সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও গন সাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি ঘোষনা করে। পরবর্তীতে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা ধাওয়া করে এবং দুজনকে পিটিয়ে চুন কালি মেখে ছেড়ে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক বলা হয় অপরাজেয় বাংলাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে এ ভাস্কর্যটির অবস্থান। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। এর নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ।

অপরাজেয় বাংলার তিনটি মূর্তির সর্বডানে প্রত্যয়ী এক যোদ্ধা নারীর মূর্তি। এর পাশে কাঁধে রাইফেল, ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা এক যুবক যোদ্ধা। অন্যজনের চোখে-মুখে স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনা, হাতে রাইফেল।

১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ এর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু হয়। বর্তমান অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটির জায়গায় তখন অন্য একটি ভাস্কর্য ছিলো যা ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং সে জায়গায় আবারও ভাস্কর্য নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

নির্মান কাজের দায়িত্ব পালন করেন ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। খালিদ নামের মানুষটার মগজে তখন একটাই শব্দ “অপরাজেয় বাংলা”। রাস্তায় মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীরা, বিদেশীরা, রিকশাওয়ালা মামারা কিংবা টোকাইরা আগ্রহ ভরে তাকিয়ে থাকতো। তিনি কাজ থেকে নেমে আসতেন, সবার সাথে আলাপ করতেন। আবার কাজে ফিরে যেতেন।

নির্মান কাজ চলাকালীন ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এর নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় আবার কাজ শুরু হয় এই জীবন্ত ইতিহাসটির। নির্মাণ শেষে একই বছর ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়। ৬ ফুট বেদির ওপরে নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট।
আরও অনেক ইতিহাস বিজড়িত এই অদ্ভুত সুন্দর ভাস্কর্যটি। প্রয়াত মিশুক মুনিরের ক্যামেরার হাতেখড়ি এই অপরাজেয় বাংলার নির্মানাধিন ছবি তোলা ও সল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র “চাক্কি” তৈরীর মাধ্যমে।

অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটিতে যে তিনজন মানুষকে দেখা যায়, তারা হলেন – ফার্স্টএইড বাক্স হাতে একজন সেবিকা, সময়ের প্রয়োজনে রাইফেল কাঁধে তুলে নেয়া গ্রীবা উঁচু করে ঋজু ভঙ্গিমায় গ্রামের টগবগে তরুন এবং দু’হাতে রাইফেল ধরা আরেক শহুরে মুক্তিযোদ্ধা।

ফার্স্ট এইড বাক্স হাতে সেবিকার ভূমিকায় যিনি মডেল হয়েছিলেন, তিনি হলেন হাসিনা আহমেদ। রাইফেল হাতে মূর্তির মডেল সৈয়দ হামিদ মকসুদ। তিনি ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অপরাজেয় বাংলার মাঝের মূর্তিটির মডেল বদরুল আলম বেনু। তিনি শুধু একজন মডেলই ছিলেন না ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের একান্ত সহযোদ্ধা। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত সকল চড়াই উৎরাইতে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদের সাথে যে দুইজন সর্বাত্মক ভাবে জড়িত ছিলেন তার এক জন হলেন তৎকালিন চারুকলার ছাত্র বদরুল আলম বেনু আর অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঢাকসু’র সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ।

শত বাধা, প্রতিকুলতার আর অক্লান্ত নিষ্ঠার পরে নির্মিত এই অপরাজেয় বাংলার গর্বিত মালিক এখন আমরাই। অপরাজেয় বাংলার নিচে দাড়িয়ে যখন একটি ছবি তুলেন কিংবা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্তৃতা দিয়ে সব অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দেন তখন আপনার মনে কি এই ভাস্কর্যের প্রতি কোন দায়বোধ জন্ম নেয়?

Related Posts

About The Author

Add Comment