অমূল্য সময় বিনামূল্যে বিকানোর বিবরণ

seneca2

সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ আমার পড়া সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি। বইটিতে আকারে ছোট কিন্তু গুরুত্বে এত ভারী যে আমি কয়েকদিন পরপরই এটা পড়তে চাই। মানুষের জীবন কেন এত ছোট এ নিয়ে বেশিরভাগ মানুষেরই অভিযোগ আছে। কিন্তু এ স্বল্প জীবনেই যে কামালিয়াত অর্জন করা যায় তার পথ বাতলে দিয়েছেন সেনেকা। বেশিরভাগ মানুষই কিভাবে অন্যের জন্য বাঁচে, অন্যের জীবন যাপন করে এবং সবচেয়ে কম কাছের থেকে যায় নিজের কাছে এর উপলব্ধি হবে বইটি পড়ে।

মানুষের কি বৈচিত্র্যময় জীবন। তারা তাদের মালিকানায় থাকা জায়গা-জমির এক ফুট ও যদি অন্য কেউ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে কেমনে ক্ষেপে যায়, তেড়ে আসে এবং কি জানও তো নিয়ে ফেলে। অথচ একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যদি থাকে সেটা হলো সময়। আমরা সেই মূল্যবান সম্পদ সময়টিতে কিভাবে ভাগ দিয়ে দেই বিভিন্ন মানুষকে। এবং জায়গা-জমি, সম্পদের ক্ষেত্রে বড় কিপটা হলেও সময় সম্পদ বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা অনেক বদান্য। যাকে তাকে মালিকানা দিয়ে দেই এই মহামূল্যবান সময় বা সময়ের বড় অংশটুকু। সেনেকার মতে এটা এমন বড় ডাকাতি যেটা মালিক টের পায় না।

আমরা পৃথিবীতে এমনভাবে জীবনধারণ করি যেন আমরা অমর, মৃত্যু মনে হয় আসবেই না। অথচ যে মুহূর্তটা একবার চলে গেল সেটা আর ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব না। এবং মৃত্যু ও চলে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রাজিক সত্য। এটা ট্রাজিক সত্য কারণ এই সত্যটা সবাই জানলেও ভুলে থাকে বা ভুলে যায়।

সেনেকার মতে-‘তুমি এমনভাবে সময় অপচয় করো যেনো তোমার অফুরান যোগান আছে। কিন্তু ব্যাপারটা হলো কোনদিন কাউকে যে সময়টা দিলে বা যে জন্য দিলে সেটা হয়তো তোমার শেষ সময়। মরণশীল প্রাণীর সব ভয় তোমাদের মধ্যে কিন্তু তোমাদের আকাঙ্খা এত যেন তোমরা মরবে না।’

যারা বিভিন্ন আকামে ব্যস্ত থাকে অথচ ভবিষ্যতে কোন একসময় ভালো কাজ করবে বা ৫০/৬০ বছরের পর অবসরে গিয়ে সকল ভালো কাজ করার পরিকল্পনা করে রাখে তাদেরকে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন কিভাবে তারা নিশ্চিত যে ৫০ বছর বা ৬০ বছর বেঁচে থাকবে? সেনেকার মতে এমন মানুষদের লজ্জা পাওয়া উচিত। যে তার জীবনের সেরা সময়টাতে ভালো কাজ করতে পারে নাই সে শেষ জীবনে গিয়ে করে ফেলবে এটা ভাবা অহেতুক কল্পনাবিলাস নয় কি? সেনেকার কথা হচ্ছে যা কিছু করার আজই শুরু করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার দরকার নেই।

কেমনে জীবন যাপন করতে হয় সেটা অনেক সহজ আবার সারা জীবন চলে যায় সেটা আবিষ্কার করতে। এটা কি কেউ কাউকে শেখাতে পারে? সেনেকার মতে- ‘It takes the whole of life to learn how to live, and—what will perhaps make you wonder more—it takes the whole of life to learn how to die.’

জীবনের অর্থ খুজে পাওয়া বা কিভাবে বাঁচতে হয় এটা শিখতে অনেক কষ্ট হয়, এমনকি জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে অনুধাবন হয় যে আসলে সেরকম বাঁচতেই পারলাম না। অনেকে বেশি মানুষের উপর ক্ষমতাবান হওয়াকে জীবনের সফলতা মনে করে। এর একটা বড় গোলকধাঁধা হচ্ছে এই যে অনেকের কাছে পরিচিত হলেও দেখা যায় সে নিজের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত। এজন্য অনেক খ্যাতিমান লোক দিন শেষে দেখে তার নিজের জন্য সময় বরাদ্ধ কত কম!

সেনেকার মতে-‘All those who summon you to themselves, turn you away from your own self.’ মানে- ‘যারা তোমাকে তাদের দিকে ডেকে নেয় তারা আসলে তোমার কাছ থেকেই সড়িয়ে নেয়।’

সেনেকা তার সিসেরোর একটি চিঠির অংশবিশেষ উল্লেখ করে বলেন কিভাবে সিসেরো নিজেকে ‘আধেক বন্দি’ (হাফ এ প্রিজনার) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বড় দায়িত্ব, বড় অবস্থান কিছু কিছু মানুষকে সেই বড় দায়িত্ব বা অবস্থানের হাতে বন্দি করে ফেলে।

অন্যকে সুখি করতে, অন্যের সামনে সুখি হিসেবে নিজেকে সবসময় তুলে ধরে রাখতে কত মানুষের জীবনের বড় অংশ চলে যায়। জীবনের যোগ বিয়োগ শেষে দেখা যায় আর সবাইকে সুখি করতে পারলেও যাকে সুখি করা হয়নি সেটা হলো নিজেকে! পাবলিক লাইফের প্যাড়া এমনই! এজন্যই আমরা কত রাজা-বাদশা, ধনরাজ, জ্ঞানী-মুনী-ঋষীকে দেখি অর্থ, সম্পদ, প্রাসাদ ছেড়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বের হয়ে পড়েন। তাদের মধ্য থেকেই বের হয়ে আসে গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, সক্রেতিস, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেকার্ত বা লুডবিগ ভিৎগেনস্টেইন প্রমুখ মহামানব।

বেশিরভাগ মানুষের দিন কাটে অতীতের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা নিয়ে। কয়জন পারে আজকের দিনটাকেই শেষদিন মনে করে পূর্ণ করে বাঁচতে? আর অনেকের দিন কাটে ভবিষ্যতের ভালো সময়ের অপেক্ষা করে। সেনেকার প্রশ্ন ভবিষ্যতের কাছে দাবি-দাওয়া বা ভবিষ্যতের ভয় ছাড়া বর্তমানে বাঁচতে পারে কয়জন?

মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকেই সবচেয়ে বেশি হেলা করে। আর সব ব্যাপারে কিপটে হলেও সময়ের ব্যাপারে আমরা বেশ উদার তার কারণ এটা দেখা যায় না। আন্তোনিও দে সেইন্ট এক্সিওপেরি’র ক্লাসিক লেখা ‘দি লিটল প্রিন্স’-এ ও আমরা দেখি জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন সূত্র হচ্ছে- It is only with the heart that one can see rightly; what is essential is invisible to the eye.”  মানে ‘মানুষ কেবল হৃদয় দিয়েই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। আমাদের যা প্রয়োজন তা দৃষ্টিশক্তি দিয়ে ধরা যায় না। (দি লিটল প্রিন্স, পৃষ্ঠা ৪৮)

সময়ের অপচয় সেনেকা মেনে নিতে পারেন না। অন্য তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বেশ সতর্ক হলেও এ ব্যাপারটাতে বেহিসাবী। সময়কে তুচ্ছ করে যারা অপচয় করে, অহেতুক কাজ করে বেড়ায় তারাই আবার যখন গভীর অসুস্থতায় পড়ে বা মৃত্যুমুখে পতিত হয় তারা ডাক্তার কবিরাজদের হাঁটুর নিচে পড়ে থাকে যেন আর কয়টা দিন বাঁচা যায়। বা কাউকে যখন মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় তখন উকিল-মোক্তারদের পেছনে ভাই-বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনদের দৌড়ানো দেখলেই বুঝা যায় একটি দিন বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, একটি দিন কত বড়! আবার এ লোকটিই হয়তো দিনের পর দিন দিন ক্ষয় করে গেছে, অন্যের জীবন যাপন করে গেছে আর নিজের কাছে অচেনা থেকে কাটিয়েছে।

মহাভারতে যুদ্ধমাঠের মাঝে দাড়িয়ে কৃষ্ণকেও একই ধরণের কথা বলতে শুনি। অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে গীতার সেই কালজয়ী বাণীটি হচ্ছে-‘মানুষ বড়ই আশ্চর্যজনক ও বোকা। সে সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য হারায়। তারপর আবার স্বাস্থ্য ফিরে পেতে সম্পদ নষ্ট করে। সে বর্তমানকে ধ্বংস করে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আবার ভবিষ্যতে কাঁদে অতীতের কথা স্মরণ করে। সে এমনবাবে জীবন অতিবাহিত করে যে সে কখনো মরবে না, কিন্তু সে এমনভাবে মরে যেন সে কখনো জন্মায়ই নি।’

সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ মূলত এরকম একটি থিমের উপর ভিত্তি করেই দাড়িয়ে আছে। বর্তমানের গুরুত্ব নিয়ে একার্ট টুলের বিখ্যাত ‘শক্তিমান বর্তমান’ (দ্য পাওয়ার অব নাও) আরেকটি অসাধারণ বই।

অনেক বছর বাঁচলেই কেবল বড় মানুষ হওয়া যায় না। সেনেকা বলেন- কারো ধূসর চুল আর কুচকে যাওয়া চামড়া দেখে ভেবো না সে অনেকদিন বেঁচেছে। সে আসলে অনেকদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

আমার কাছে একটি ভালো বই একটি ভালো সফটওয়ার। সফটওয়ার যেমন কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোনের কাজের প্রকৃতি পাল্টে দেয় তেমনি একটা ভালো বইও মানুষের দেখার দৃষ্টি, ভাবনার পদ্ধতি পাল্টে দেয়। তাই আমার মতে বই মানুষের জন্য সেরা সফটওয়ার। আর একেকটা সেরা বই পড়া হচ্ছে একেকটা সফটওয়ার ইন্সটল করা; তার মানে জগতকে একেকবার একেকটি দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা অর্জন করা।

সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ আমার কাছে তেমন একটি বই। যখন মনে হয় আমি অহেতুক সময় অপচয় করছি, যখন মনে হয় আমি আমার নিজের কাছে কমিটমেন্টের সাথে প্রতারণা করছি, আমার মনের গহীন কোণে হতাশার চাষবাস করছি তখনই এমন কিছু সফটওয়ারের সাহায্য নেই। এগুলো ইনস্টল করার মাধ্যমে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

লেখক ও অনুবাদক

[email protected]

Related Posts

About The Author

Add Comment