অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া: ব্রিটিশ ভারতে শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের স্বরূপ

শাসক এবং শাসিতের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না, যেটি হয় সেটি হল শাসন ও শোষণের সম্পর্ক। বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় ই.এম. ফরস্টারেরঅ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া‘য়। ইংরেজ শাসকদের শাসিতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ব্যর্থ হওয়ায় তাদের শাসনকার্য ভেঙ্গে পড়ে। এক পর্যায়ে এদেশ থেকে তাদের বিদায় নিতে হয়। ভারতীয়রা লাভ করে মহান স্বাধীনতা।

‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ হল ই.এম. ফরস্টারের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ইংরেজদের সাথে ভারতীয়দের সম্পর্ক বিষয়ক একটি ক্লাসিক উপন্যাস। উপন্যাসটিতে উপনিবেশবাদের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এখানে উপনিবেশবাদীদের হঠকারী ও ধ্বংশাত্মক শাসন ও শোষিতদের করুণ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। অসাধারণ চরিত্রের চিত্রায়ন এবং চমৎকার ভারতীয় পরিবেশ ও পরিস্থিতির রূপায়ন ই.এম. ফরস্টারকে করেছে তার উপন্যাসিক জীবনে অনবদ্য। আধুনিক ইংরেজি ফিকশন জগতে তার ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ হল একটি অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম। এর প্রত্যেকটি চরিত্র, স্থান ও গল্প বলার ধরণ যেন বাস্তবিক, এবং উপযুক্ত সিম্বোলিজমের ব্যবহার ও জীবনের অনুসন্ধান, যা পাঠক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ই.এম. ফরস্টার তার ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ উপন্যাসটি লিখে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এ উপন্যাসটি প্রকাশের প্রায় একশত বছর পরেও পাঠকদের নিকট তার আবেদন ধরে রেখেছে। তাই এটি লাভ করেছে ক্লাসিক তথা সর্বযুগের সাহিত্যের মর্যাদা।

‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ (১৯২৪) ইংরেজ লেখক এডওয়ার্ড মরগ্যান ফরস্টার কর্তৃক লিখিত একটি উপন্যাস, যেটি ব্রিটিশ রাজ এবং ১৯২০ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাসটি মডার্ন লাইব্রেরি কর্তৃক বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্যের ১০০ টি বিখ্যাত কর্মের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়, এবং ১৯২৪ সালের জেমস টেইট ব্ল্যাক মেমোরিয়াল প্রাইজ জেতেন। টাইম ম্যাগাজিন উপন্যাসটিকে অন্তর্ভুক্ত করে “১৯২৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইংরেজি ভাষায় লিখিত ১০০ টি উৎকৃষ্ট উপন্যাস” এর একটি হিসেবে। উপন্যাসটি ফরস্টারের ইন্ডিয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত। ফরস্টার তার এই উপন্যাসের শিরোনাম নিয়েছেন ওয়াল্ট হুইটম্যানের Leaves of Grass কাব্যগ্রন্থের Passage to India নামের একটি কবিতা থেকে। উপন্যাসের তিনটি পর্ব রয়েছে- মসজিদ, গুহা ও মন্দির, এবং এর গল্পটি চারটি চরিত্রের মাধ্যমে আবর্তিত হয়: ডাঃ আজিজ, তার ব্রিটিশ বন্ধু সিরিল ফিল্ডিং, মিসেস মুর এবং মিস অ্যাডেলা কোয়েস্টেড। ১৯৮৪ সালে ডেভিড লিন এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন যেটি দুইটি অস্কার এবং অসংখ্য পুরস্কার জেতে।

এডওয়ার্ড মরগ্যান ফরস্টার (১ জানুয়ারি , ১৮৭৯ – ৭ জুন , ১৯৭০) জন্মগ্রহণ করেছিলেন লন্ডন এনডব্লিউ১-এর ৬, মেলকম প্লেস, ডরসেট স্কোয়ারের একটি বাড়িতে। এই বাড়িটির অস্তিত্ব আজ আর নেই। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্থপতি। মাত্র একবছর বয়সে ফরস্টার পিতৃহারা হন। বালক বয়সেই তাঁর বাবা পিসিমা ম্যারিন থর্নটনের থেকে ৮,০০০ পাউন্ড উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হন ফরস্টার। এই অর্থ সাহায্যের ফলে তাঁর জীবনধারণ ও পরবর্তীকালে লেখক রূপে আত্মপ্রকাশ সহজ হয়ে যায়। কেন্টের টনব্রিজ স্কুলে অনাবাসিক ছাত্ররূপে পড়াশোনা করেন ফরস্টার। ১৮৯৭ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কিংস কলেজ, কেমব্রিজ -এ পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর মায়ের সঙ্গে তিনি ইউরোপ মহাদেশ ভ্রমণ করেন। ১৯১৪ সালে ক্লাসিসিস্ট গলসওয়ার্দি লোয়েস ডিকিনসনের সঙ্গে মিশর , জার্মানি ও ভারত ভ্রমণ করেন। ১৯২০-এর দশকের প্রথম দিকে দেওয়াসের মহারাজার ব্যক্তিগত সচিব হয়ে তিনি তাঁর ভারতবাসের দ্বিতীয় পর্ব অতিবাহিত করেন। তাঁর এই সফরের বৃত্তান্ত লিখিত হয়েছে ‘দ্য হিল অফ দেবী’ নামক গদ্যরচনায়। ভারত থেকে ফিরে তিনি তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস “অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া” সমাপ্ত করেন। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ফরস্টার বিবিসি রেডিও -এর এক সফল সম্প্রচারকের ভূমিকা নেন। এই সময় ব্রিটিশ হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক গণচরিত্রও হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৩৭ সালে তিনি সাহিত্যে ‘বেনসন’ মেডেলে ভূষিত হন। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে কিংস কলেজ, কেমব্রিজের সাম্মানিক ফেলো নির্বাচিত হন ফরস্টার। ১৯৪৯ সালে তাঁকে ‘নাইটহুডে’ ভূষিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য কমপ্যানিওন অফ অনার’ সম্মান দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি ‘ব্রিটিশ অর্ডার অফ মেরিট’ সদস্যের মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৭০ সালের ৭ জুন, ৯১ বছর বয়সে কভেন্ট্রিতে তাঁর বাকিংহ্যামসস্থ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও লিবারেটো রচয়িতা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ব্রিটিশ সমাজ ও শ্রেণিবৈষম্য, ভণ্ডামি এবং লিঙ্গ ও সমকামিতার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য ফরস্টারের শ্লেষাত্মক ও সুসংবদ্ধ উপন্যাসগুলি সুপ্রসিদ্ধ। ফরস্টারের রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমসাময়িক সমাজের বাধার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিকল্প অনুসন্ধানই বেশি করে প্রদর্শিত করেছে। ‘হোয়াট আই বিলিভ’ গদ্যরচনাতেও তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণটি ফুটে উঠেছে। ফরস্টারের দুটি বহুখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ ও ‘হাওয়ার্ডস এন্ড‘ অবাস্তব শ্রেণিবৈষম্যের দিকটিকে তুলে ধরেছে।

ই.এম. ফরস্টারের ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া‘র সমগ্র উপন্যাস জুড়ে বন্ধুত্বের সংকট ধ্বনিত হয়েছে। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন চলতে থাকে নোবেলটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। শাসক ও শাসিতের মধ্যে সংঘাত বিদ্যমান সর্বত্র। উপন্যাসের শুরুর দিকে মেজর ক্যালেন্ডার ডা. আজিজকে সাক্ষাত করতে বললে আজিজের দেরি হওয়ায় সে চলে যায়। ক্যালেন্ডারদের মহিলারা আজিজের টোঙ্গা নিয়ে যায়, না জিগ্যেস করেই। আর পরিলক্ষিত হয় শাসিতদের কাছে শাসকদের জবাবদিহিতার প্রয়োজনহীনতার।

মসজিদে ডা. আজিজের সাথে দেখা হয় মিসেস মুরের। তাদের ভাল বোঝাপড়া, একে অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রভাব উপন্যাসটির শেষ পর্যন্ত থাকে। মিসেস মুর মসজিদ থেকে নিজেদের অর্থাৎ ইংরেজদের ক্লাবে ফিরে যান। চন্দ্রপুরে ইংরেজদের ক্লাব শহরের শাসক ও শোষিতের বিভাজনকে তুলে ধরে। যেমন, উপন্যাসটিতে বলা হয়েছে “Indians are not allowed into the Chadrapore club even as guests“। চন্দ্রপুর বিভক্ত রয়েছে ইংরেজদের সিভিল স্টেশন এবং ভারতীয়দের নেটিভ সেকশনের দ্বারা। দুশ্রেণির মধ্যে বিরাজমান রয়েছে অনেক বড় গ্যাপ বা খাদ।

ফরস্টার বৈশ্বিক চিরন্তন শ্রেণি বিভাজনকে তুলে ধরেছেন তার এই উপন্যাসে। এই সমস্যা শুধু ভারতে নয় বরং জাতিগত সংঘাত আমরা লক্ষ করি বিশ্বের সর্বত্র। আফ্রিকান নিগ্রোদেরকে ইউরোপিয়ান শ্বেতরা শাসন ও শোষন করেছে শত শত বছর। কনরার্ডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ বা ডেরেক ওয়ালকটের ‘এ ফার ক্রাই ফরম আফ্রিকা‘য় শোষন ও বঞ্চনার একইরুপ দেখা যায়। স্থান, কাল ও জাতি ভিন্ন হলেও সর্বত্র যেন একই চিত্র। আর ফরস্টার তার ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া‘য় ভারতে ইংরেজ শাসনের এ সকলদিক যথার্থভাবে বর্ণনা করেছেন।

আমরা উপন্যাসটিতে জানতে পারি, মিসেস মুর এবং অ্যাডেলা কোয়েস্টেড ভারতে নতুন আগমন করেছন এবং তারা প্রকৃত বা রিয়াল ইন্ডিয়াকে জানার অভিলাষ পোষণ করেন। তাদের বাসনা পূর্ণ করতে ইংরেজরা আয়োজন করে ব্রিজ পার্টির। সেখানে ভারতীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ আমন্ত্রিত হয়। ব্রিজ পার্টির উদ্দেশ্য ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে গ্যাপ দুর করা হলেও ইংরেজরা শাসিতদের সাথে কোন কথা না বলে অবহেলা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। নবাব বাহাদুরসহ ভারতীয়রা চরম অপমানবোধ করে। ইংরেজরা বলে, “We are out here to do justice and keep the peace. We are not pleasant in India, and we don’t intend to be pleasant. We have something more important to do“. ব্যর্থ হয় ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব স্থাপনের একটি বিরাট সুযোগ। যদিও মিসেস মুর ও অ্যাডেলা কোয়েস্টেড ভারতীয়দের সাথে মিষ্টি ব্যবহার করেন। মনুষ্য সমাজে সব মানুষ যে বিবেকহীন পাশবিক নয়, সেটিও লক্ষ করা যায় এ উপন্যাসে। মিসেস মুর, অ্যাডেলা ও ফিল্ডিং ইংরেজদের কুৎসিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে মানবতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এ ধরনের কিছু আলোকিত মানুষের কারণেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পেরেছে। মানুষে মানুষে শান্তি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তাই এখনো বিরাজমান।

চন্দ্রপুর সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ সিরিল ফিল্ডিং-এর সাথে আজিজের সম্পর্ক বেশ ভাল। আজিজ তাকে তার মৃত স্ত্রীর ছবি পর্যন্ত দেখায় কোনরূপ পর্দাপ্রথার তোয়াক্কা না করেই। এটি তাদের বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, সরকার, আইন ও আদালত ইত্যাদি কি নেই এই উপন্যাসে। পাঠক হৃদয়কে নাড়া দিতে সব কিছুর যেন এক অপূর্ব সমাহার। উপন্যাসের একপর্যায়ে আজিজের সাথে অ্যাডেলার কথা হয় মুঘল শাসন নিয়ে। অ্যাডেলা মত ব্যক্ত করে যে, সম্রাট আকবর মহান শাসক ছিলেন। আজিজ সম্রাট বাবরের প্রশংসা করলেও সম্রাট আকবরের বহু ধর্মের সমন্বয়ে গঠিত এক ধর্ম ‘ধর্মে ইলাহি‘র বিরোধিতা করে। লেখক তার এ রচনায় এদেশের বিশ্বাস ও পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থাকেও তুলে এনেছেন সাবলীলভাবে।

মসজিদ পর্বে কিছু সুখকর বিষয় দেখা গেলেও তা মারাত্মকভাবে ভেঙ্গে পড়ে গুহা পর্বে এসে। ডা. আজিজ মারাবার গুহায় পিকনিকের আয়োজন করে। এতে যোগ দেয় মিসেস মুর ও অ্যাডেলা কোয়েস্টেডসহ অনেকে। অ্যাডেলা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে মিস ডেরেকের সাথে শহরে ফিরে আসলে তাকে হসপিটালাইজ করা হয়। ডা. আজিজকে গ্রেপ্তার করা হয় অ্যাডেলাকে হেনস্তা করার অভিযোগে। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে এটি বিদ্যমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করে। ব্রিটিশরা মনে করে যে, শ্যাম বর্ণের সকল লোকেরই শ্বেত বর্ণের নারীদের প্রতি যৌন লালসা থাকে। এখানে বর্ণবৈষম্য আলোচিত হয়েছে যা শুধুমাত্র একটি জাতীয়ই নয় বরং বৈশ্বিক সমস্যা। ডা. আজিজ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এবং স্বদেশীয়রা তার পক্ষে মাঠে নামে। অপরদিকে ইংরেজরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় যে, যেকোন মূল্যে ডা. আজিজের শাস্তি নিশ্চিত করার। শাসকদের ক্ষমতার দাপট সম্পর্কে বর্ণনাকারী বলেন, “At Chandrapore, the Turtons were litte gods….“। ডা. আজিজের বিচারের মাধ্যমে তারা ভারতীয়দের উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করে। উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার তীব্র উত্তাপ ছড়ায়। যেকোন সময় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

হোমারের দ্যা ইলিয়াডে প্যারিসের হেলেনকে অপহরণের কারণ দেখিয়ে গ্রীকরা ট্রয় নগরী ধ্বংস করে। প্রাচীন কালের এই মহা যুদ্ধের কারণ প্যারিস ও হেলেন হলেও মূল কারণ ছিল ভিন্ন। সেখানে বৈশ্বিক রাজনীতিই মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল। প্যারিস ও হেলেন ছিল গ্রীকদের অভিলাষ পূরণের অজুহাত মাত্র। অনুরূপভাবে ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া‘র অ্যাডেলাকে কেন্দ্র করে আজিজ তথা ভারতীয়দদের একটি চরম শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ইংরেজরা। এ ধরনের কপটতা পৃথিবীর ইতিহাসে বহুবার ঘটেছে। ফরস্টার এ বিষয় তুলে ধরতে তার দক্ষ হাতের ছাপ রেখেছেন।

আজিজের পক্ষে কলকাতা থেকে আইনজীবী ব্যারিস্টার অমিত রাওকে আনা হয় এবং নিরাপক্ষ বিচারের জন্য স্বদেশী বিচারক হিসেবে মি. দাসকে নিয়োগে বাধ্য করা হয়। আদালতে অ্যাডেলার সাক্ষ্য আজিজের পক্ষে গেলে আজিজ নির্দোষ প্রমাণিত হয় ও মুক্তি পায়। ইংরেজদের সাথে স্বদেশীয়দের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আর কোন অবকাশ থাকে না। যদিও ফিল্ডিং তার ক্লাব থেকে পদত্যাগ করে এবং আজিজের মুক্তির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে। সুতরাং আজিজের সাথে ফিল্ডিং এর বন্ধুত্ব তখনো অটুট থাকে। এ পর্যায়ে এসে মনে হয় ফিল্ডিং যেন যীশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি আজিজের উদ্ধার কাজে নেমেছেন। স্বজাতির কাছে বিবেচিত হয়েছেন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। তিনি তার ক্লাবের পদ থেকে পদত্যাগ করে আজিজের মুক্তির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।

ডা. আজিজের বিরুদ্ধে মামলা ও তার সম্মান নষ্ট করায় অ্যাডেলাকে বড় অঙ্কের টাকা জরিমানা করা হয়। ফিল্ডিং অ্যাডেলার জরিমানা মওকুফ করার জন্য আজিজকে অনুরোধ করায় আজিজ তা রক্ষা করলেও তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অর্থ নিয়ে বন্ধুত্বের মধ্যে চিরন্তন বিভেদ লেখক এখানে তুলে এনেছেন। আজিজ ফিল্ডিংকে ভুল বোঝে যে, ফিল্ডিং অ্যাডেলাকে বিয়ে করে তার মওকুফ করা অর্থের মালিক হবে। ফিল্ডিং আর অ্যাডেলা ইংল্যান্ড চলে যায়। পরবর্তিতে আজিজ ফিল্ডিংএর কোন চিঠির উত্তর দেয় না। এখানে তাদের বন্ধুত্বের অবসান ঘটে। সংঘাত ও সংকটের মধ্যদিয়ে ভারতীয়দের সাথে ইংরেজদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সব লক্ষণ বা সম্ভাবনা গুহা পর্বে এসে দূরীভূত হয় এবং অন্ধকারে হারিয়ে যায়। গুহার ভিতরের অন্ধকার যেন মানব জীবনকে আচ্ছন্ন করে।

মন্দির পর্বে এসে আমরা দেখতে পাই যে, ডা. আজিজ ও গড়বোলে মৌতে চাকুরী করে। ফিল্ডিং শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে মৌতে স্ত্রী ও শালকসহ আগমন করে। ডা. আজিজ ও ফিল্ডিং তার পরিবারসহ শ্রী কৃষ্ণের জন্মোৎসবে যোগ দেয় এবং তাদের উভয়ের নৌকা ডুবি ঘটে। ডা. আজিজ ও ফিল্ডিং গঙ্গাজলে ধৌত হওয়ায় তাদের সকল গ্লানি ও কদর্য দূরীভূত হয়। আজিজ জানতে পারে যে ফিল্ডিং অ্যাডেলাকে নয়, স্টেলাকে বিয়ে করেছে। ফিল্ডিং আজিজের নিকট নতুনভাবে বন্ধুত্বের প্রস্তাব করলে আজিজ তা নাকচ করে দেয়। লাস্ট রাইডে তাদের ঘোড়া দু’টোও সে প্রস্তাব অস্বীকার করে, একইভাবে অস্বীকার করে আকাশ, বাতাস ও প্রকৃতি। তারা বলে “No, Not there”. শাসক ও শাসিতের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন ব্যর্থ হয়। এমনকি ইংরেজদের ভারত শাসনের অবসান দৃষ্টিগোচর হয়। ফিল্ডিং আশংকা করে হয়ত জাপানিরা এদেশ শাসন করবে এবং অভিযোগ তোলে যে স্বদেশীরা বহুধাবিভক্ত। আজিজ সেসকল কথা নাকচ করে দেয় এবং স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজদেরকে ঘৃণা করার কথা জানিয়ে দেয়। ডা. আজিজ বলেন, “We may hate one another, but we hate you most“.(Chapter 37)

ই.এম. ফর্স্টার তার এ উপন্যাসে যথেষ্ট সার্থকতার পরিচয় দিলেও তিনি বিখ্যাত গবেষক এডওয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম অনুসারে পুরোপুরিভাবে নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি। ওরিয়েন্টালিজম হল মানুষ তার নিজ অবস্থান থেকে নিজেকে বা তার স্বজাতিকে সেরা ভাবে, আর অন্যকে ভাবে নীচ, হীন, অসভ্য কিংবা বর্বর। নিজেদেরকে উচু শ্রেণীর ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং অন্যদেরকে ‘আদারস ও গণ’ হিসেবে মনে করে। তারা অন্যদেরকে প্রিকন্সেপ্ট দ্বারা সাব্যস্ত করে। ই.এম. ফরস্টার তার এ উপন্যাসে যথেষ্ট নিরপেক্ষতার পরিচয় দিলেও তার বর্ণনার অনেকগুলো কথা উপনিবেশবাদ উত্তর পাঠকদেরকে সামান্য হলেও বিরক্ত করে। তিনি আজিজকে দেখেছেন উদার, আবেগপ্রবণ, উত্তেজিত, অতিরিক্ত বদান্য ও বিচলিত হিসেবে। ফিল্ডিংকে দেখিয়েছেন পারফেক্ট বা উপযুক্ত, বুদ্ধিমান, আলোকিত, রক্ষণশীল, ক্ষমাশীল এবং সাহায্যকারী হিসেবে। মিসেস মুরকে উপস্থাপন করেছেন মানবতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে। আর গড়বোলেকে আধ্যাতিক ও অলস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ভারতীয়দের অলস, নোংরা ও হুজুগে হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইংরেজদের সিভিল স্টেশনকে সভ্য সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার আলোকিত ব্যক্তিত্ব ফিল্ডিংয়ের দ্বারা প্রশ্ন করিয়েছেন যে, ভারতীয়রা নিজেদের শাসন করতে পারবে কিনা, নাকি জাপানিদের ডেকে আনবে এবং আবারো অন্যদের দ্বারা শাসিত হবে। ফিল্ডিং বলেন, “India shall be a nation! No foreigners of any sort! Hindu and Muslem and Sikh and all shall be one! Hurrah!” যেভাবে ইউরোপিয়ানরা নন ইউরোপ তথা ইস্টদেরকে উপস্থাপন করে থাকে তা ই.এম. ফরস্টারের রচনায়ও দেখা যায়। জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেসে’ এভাবেই নেটিভদের দেখানো হয়েছিল যেটির কঠোর সমালোচনা করেন আফ্রিকান স্কলার চিনুয়া এচিভি। সামগ্রিক পর্যালোচনা শেষে বলা যায় ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’য় ই.এম. ফরস্টার তার সামান্য নেতিবাচকতা ছাড়া যথেষ্ট নিরাপেক্ষতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন।

ই.এম. ফরস্টার তার ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ উপন্যাসে মানুষে মানুষে সংঘাত, শত্রুতা, হিংসা, বিদ্বেষ, অসাম্য, বৈষম্যকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিনির্মাণে প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দেখিয়েছেন মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে, জাতি অন্যজাতির বিরুদ্ধে, সংস্কৃতি অন্যসংস্কৃতির বিরুদ্ধে কিভাবে ধ্বংশাত্মক কর্মকান্ড চালিয়ে যায়। শাসক ও শাসিতের মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়া কঠিন হলেও উভয় পক্ষের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকলে সেটি সম্ভব বলেই মনে করেন লেখক। ভারতীয়দের সাথে ইংরেজদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতাকেই ইংরেজদের এদেশ থেকে বিদায়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ই.এম. ফরস্টার। বাস্তব জীবনে বন্ধুত্বতের প্রয়োজনীয়তা অনেক। তাই ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়‘ কথাটি ফলপ্রসূ বলে মনে হয়। শেষ কথায় বলা যায় বন্ধুত্বই মানুষের মাঝে দূরত্ব ঘুচিয়ে নিকটবর্তী করতে পারে এবং মনুষ্য জগতে বয়ে আনতে পারে অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।

মোঃ রহমাতুল্লাহ
ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment