আইরিশ ইতিহাস পাল্টে দেয়া পাঁচটি প্রেমের গল্প

আয়ারল্যান্ডের সাথে আমাদের দূরবর্তী যোগাযোগ  আছে বৈকি। ইংরেজদের শাসন ও শোষনের বিরোধিতার দিক থেকে আমরা আত্মীয়। আবার আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক মিল আছে। সাহিত্যের দিক থেকেও তাদের সাথে রয়েছে আমাদের আত্মীয়তা। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে গেলে যে কবি রবীন্দ্রনাথকে তৎকালীন সাহিত্য সমাজে পরিচিত করিয়ে দেন তিনি আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস্। রবীন্দ্রনাথের ‘সংস অব অফারিংস’ এ ভূমিকা ও লিখে দিয়েছিলেন বিশ শতকের অন্যতম সেরা সেই কবি।

দীর্ঘ সময় ইংরেজদের অধীনে থাকা আয়ারল্যান্ডের রয়েছে রাজনৈতিক স্বাধীকার আদায়ের জন্য গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় মাঝে মাঝে আটকে গিয়েছে সে সংগ্রামের পথ চলা। সেই কঠিন সময়েও প্রেমের ফুল ফুটেছে বিভিন্ন আইরিশ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে। তাদের প্রেম যেমন তাদের জীবনকে ছুঁয়ে গেছে তেমনি ছুঁয়ে গেছে তাদের দেশটির ইতিহাসকেও। এমন পাঁচটি প্রেমের গল্প নিয়ে আমাদের আজকের পোস্ট:

১. চার্লস স্টুয়ার্ট পার্নেল ও কিটি ও’শেয়া

Parnell-Kitty-OShea

১৮৮০’র দশকে চার্লস পার্নেল এর পায়ের তলায় লুটোপুটি খাচ্ছিল পুরো বিশ্ব। আয়ারল্যান্ডের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতার আসনে পার্নেল। আয়ারল্যান্ডের হোম রুল প্রায় অর্জন করে ফেলছিলেন। কিন্তু তখনই কিটি ও’শেয়ার প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকেন পার্নেল। কিটি ছিলেন একজন সহকারী পার্লামেন্ট সদস্যের স্ত্রী। পার্নেল বিবাহিত ছিলেন না। কিটি ও পার্নেলের প্রণয়ের কথা জানাজানি হয়ে গেলে কিটির স্বামী তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠে এবং স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়। দেশজুড়ে পার্নেল এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। হঠাৎ পার্নেল নিজেকে আবিষ্কার করে ক্ষমতার পাদপ্রদীপ থেকে অন্ধকারে। ব্যাপক সমালোচনার ভার সহ্য করতে না পেরে মারা যান পার্নেল।

২. অস্কার ওয়াইল্ড ও লর্ড আলফ্রেড ডগলাস

Oscar+Wilde+

অস্কার ওয়াইল্ড একজন লেখক ও নাট্যকার হিসেবে জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। দুজন বাচ্চা সহ সুখী দাম্পত্য জীবনও ছিল বলা যায়। কিন্তু তখনই তিনি সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন লর্ড আলফ্রেড ডগলাসের সাথে। আলফ্রেড ডগলাস ছিল মার্কুইস অব কুইনসবারি’র ছেলে যিনি বক্সিংয়ের নিয়ম কানুন আবিষ্কার করার কারণে পরিচিত। এই যুগল ১৮৯১ সালে পরিচিত হন এবং এর চারবছর পর ওয়াইল্ডের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে মামলা করা হয়। কোর্টের পকেটে পাওয়া বিভিন্ন পুরুষ দেহব্যবসায়ীর কাছে দেয়া ডগলাসের চিঠির ভিত্তিতে ঐ মামলা এগিয়ে চলে। ওয়াইল্ডের অপরাধ সাব্যস্ত হয় এবং তাকে শাস্তি দেয়া হয়। একজন দুখী ও ব্যর্থ মানুষ হিসেবে অস্কার ওয়াইল্ড মারা যান।

৩. ডব্লিউ বি ইয়েটস ও মদ গন

Yeats+Maud+Gonne

আয়ারল্যান্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস এক একপেশে প্রেমে আটকা পড়ে ছিলেন সারাজীবন। মদ গন তার জীবনের বিভিন্ন সময় লেখা কবিতাতে বারবার ফিরে এসেছে। এবং তার সব অসাধারণ কবিতার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে মদ গনের প্রতি তার তীব্র ও একপেশে প্রেম। ইয়েটস্ এর প্রেমে যে মদ গন নামে ঐ সুন্দরী সাড়া দেয় নাই তার বড় প্রমাণ তিনি অন্য একজনকে বিয়ে করে ছিলেন। সেনাবাহিনীর একজন মধ্যম সাড়ির অফিসারকে বিয়ে করেছিলেন মদ গন এবং ইয়েটস্ এর প্রেমে সাড়া দেবার তার অবসর ছিলনা।

মদ গন একজন আইরিশ বিপ্লবীও ছিলেন। ১৯১৬ সালের বিপ্লবে রাজপথ কাপিয়েছিলেন ঐ সাহসী নারী। ইয়েটস্ অনেকগুলো কালজয়ী কবিতাও লিখেছেন ঐ বিপ্লবকে কেন্দ্র করে। আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে এ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯১৬ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণের অভিযোগে মদ গনের স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

ইয়েটস্ আর মদ গনের প্রথম সাক্ষাত হয়েছিল ১৮৮৯ সালে। প্রত্যেকবারই ইয়েটস্ এর বিবাহের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মদ গন। ১৯১৬ সালে মদ গনের স্বামীর মৃত্যুর পর ইয়েটস্ আবার প্রস্তাব দেন। তখনো মন গলেনি মদ গনের।

এ সম্পর্কের মজার দিক হল ৫২ বছর বয়সে ইয়েটস্ মদ গনের মেয়ে ইসেওল্ট গনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখন মেয়ের বয়স ছিল ২৩। মায়ের মত মেয়েও ইয়েটস্ এর আহ্বানে অস্বীকৃতি জানান।

৪. মাইকেল কলিন্স ও কিটি কিরনান

Michael+Collins+Kitty+Kiernan

আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কিটি কিরনান ছিল আয়ারল্যান্ডের মহানায়কের বাগদত্তা। ১৯১৭ সালে হোটেল লংফোর্ড এ তাদের দেখা হয়। এবং তাদের মধ্যে ৩০০ এর ও বেশি চিঠি আদান প্রদান হয়। এর কারণ ছিল মাইকেল বেশিরভাগ সময়ই দৌড়ের উপর থাকতেন।

তাদের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা ছিল। কিন্তু ১৯২২ সালের গৃহযুদ্ধে দু:খজনকভাবে মারা যান মাইকেল কলিন্স! কিটি পরে আরেকজনকে বিয়ে করেন এবং তার সন্তানও হয়। তবে ছেলের নাম রেখেছিলেন মাইকেল। তিনি ১৯৪৫ সালে মারা যান এবং ডাবলিনে গ্লাসনেভিন সিমেটারিতে তাকে দাফন করা হয়। মাইকেলের কফিনটিও ছিল খুব কাছাকাছি।

৫. জোসেফ ম্যারি প্লাংকেট ও গ্রেস গিফোর্ড

Joseph+Plunkett+Grace+Gifford

প্লাংকেট ছিলেন ১৯১৬ বিদ্রোহের নেতা এবং আইরিশ রিপাবলিকান ব্রাদারহুডের প্রথম সাড়ির নেতা। গ্রেস গিফোর্ড ছিলেন তার প্রেমিকা।

বিদ্রোহে প্লাংকেট ধরা পড়েন এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে তারা কারা প্রকোষ্ঠেই বিয়ে করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই এই আইরিশ বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটেছিল। প্লাংকেট এর মৃত্যুর পর বিধবার পোষাক পড়তেন গ্রেস গিফোর্ড।

(আইরিশ সেন্ট্রাল সাময়িকীতে প্রকাশিত প্যাট্রিক কুপারের লেখা অবলম্বনে সাবিদিন ইব্রাহিম)

Related Posts

About The Author

Add Comment