আখতার হামিদ খান: পল্লী উন্নয়নের কারিগর

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) এবং ডা. আখতার হামিদ খান নাম দু’টো একে অপরের সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িত। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তান এবং একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নকল্পে বার্ড এর অবদান না বললেই নয়। সেক্ষেত্রে আমাদের আগে জানতে হবে আখতার হামিদ খান-কে। ড. আখতার হামিদ খানের জন্ম ১৯১৪ সালের ১৫ই জুলাই, ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত বেরিলি (আগ্রা) নামক স্থানে। ইংরেজ শাসনামলে একটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া আখতার হামিদ খানের পারিবারিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাঁর পিতামহ স্যার সৈয়দ আহম্মদ খান তৎকালীন বৃটিশ ভারতের একজন সাব ইনসপেক্টর। যিনি ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কলেজ (যা পরবর্তিতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়) স্থাপন করেন এবং মুসলমানদেরকে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার বিনষ্ট না করে কীভাবে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের উন্নয়ন সাধন করা যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন। একজন সংস্কারবাদী ও সমন্বয়সাধনকারী দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন সৈয়দ আহম্মদ খানের মৃত্যুর ষোল বছর পরে জন্ম নেওয়া ড. আখতার হামিদ খানও একই চিন্তা ভাবনার অনুসারী ছিলেন।

একজন সৎ পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা ও পর্দানশীন শিক্ষিতা মা বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান আখতার হামিদ খান। পিতার ন্যায়পরায়ণতা ও মাতার আধুনিক সমন্বয়বাদী চিন্তাধারার এ সম্মিলন ঘটে আখতার হামিদ খানের জীবনে। তাঁর পরিবার শুধু স্বচ্ছল ও মধ্যবিত্ত ছিলনা, ছিল শিক্ষিত চিন্তাশীল, সমসাময়িক পৃথিবীর প্রতি অনুসন্ধিৎসু এবং সর্বোপরি স্যার সৈয়দ আহম্মদ খানের সংস্কার আন্দোলন ও ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রায় প্রতি পরীক্ষায় প্রথম সারির পদ দখল করা আখতার হামিদ খান দর্শন ও ইতিহাসে বি.এ পাশ করেন। এবং পরবর্তীতে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একুশ বছর বয়সে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ পাশ করেন। দর্শন পাঠকালে তিনি জার্মান দার্শনিক নীটশের ভক্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দার্শনিক ইকবাল এর প্রতিভা এবং চিন্তাধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। নীটশের ভক্ত হওয়ার কারণেই যৌবনে তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছিলেন তা নয়, বরং পাঠান রক্তের অধিকারী হয়ে বিরাট কিছু করার তাড়না অনুভব করেন তিনি।

পিতা পুলিশ অফিসার হওয়ার সুবাদে কাছ থেকেই আখতার হামিদ খান বৃটিশদের সততা, শৃঙ্খলা, ন্যায়পরায়ণতায় মুগ্ধ হন এবং পিতার ইচ্ছায় ১৯৩৪ সালে তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, মর্যাদাপূর্ণ আইসিএস পরীক্ষায় পাশ করে চাকরি লাভ করেন। এরপরে ১৯৩৬ সালে একদিন আইসিএস প্রবেশনার হিসেবে বিলাতে চলে যান। সেখানে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজের আন্ডারগ্র‍্যাজুয়েট ছাত্রদের সাথে একত্রে পড়াশোনা শুরু করেন। এবং তাঁর ‘মাই ট্রাবল্‌ড লাইফ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি সমসাময়িক পৃথিবী ও পৃথিবীব্যাপি সমস্যা এবং বিশেষ করে ইংরেজদের সমস্যা এবং সমাধান বিভিন্ন পত্রপত্রিকার আলোচনা ও সভার মাধ্যমে জেনে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রবাদের উত্থান ও বিশ্ব পরিস্থিতি কাছ থেকে অবলোকন করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বিয়ে করেন তারই দীক্ষাগুরু আল্লামা মাশরেকীর মেয়েকে। পরবর্তীতে তিনি তাঁর স্ত্রীর আধুনিক চিন্তাচেতনা এবং সংস্কারবাদী মননের পরিচয় পান। পঞ্চাশের মন্বন্তর চলাকালে ১৯৪৩ সালে নেত্রকোনায় তিনি দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেন এবং ঔপনিবেশিক শক্তির আসল রূপ কাছ থেকে দেখেন। এই সময় সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে তাঁর মধ্যে একটি প্রতিবাদী মন গড়ে ওঠে, যার প্রকাশ মেলে পরবর্তী কালে তাঁর নয় বছরের আইসিএস চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। প্রসঙ্গক্রমে এ কথা বলা যায়, ড.আখতার হামিদ খান তাঁর জীবনে দুই বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন এবং যুদ্ধের ফলেই সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে, যা আখতার হামিদ খানের সচেতন চোখে ধরা পড়ে। কর্মক্ষেত্রে তিনি তখন ছিলেন একজন বড় বুরোক্রেট কিন্তু মনেপ্রাণে একজন আধ্যাত্মবাদী দার্শনিক, সর্বোপরি একজন সমাজবিজ্ঞানী।

ইম্পিরিয়াল এডমিনিস্ট্রেশন এর এমন সম্মানজনক চাকরি কি কেউ এমনি করে ছেড়ে দেয়? বিশেষ করে মুসলমানদের কেউ? উল্লেখ্য, তৎকালীন ভারতবর্ষে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের সন্দেহ ও বিদ্বেষ পরায়ণনীতির দরুণ খুব কম সংখ্যক মুসলমান সিভিল সার্ভিসে চাকরি পেতো। চিফ সেক্রেটারির অনুরোধকে রীতিমতো উপেক্ষা করে স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেলেন ভারতবর্ষের আলীগড়ের কাছে অজপাড়াগাঁ মামুল-এ। ঘর ভাড়া নিয়ে চাষের জন্য বর্গা নিলেন একখণ্ড জমি। গাভী, মহিষ, আর পরিচারিকা সহযোগে কৃষকের জীবন ধারণ করলেন তিনি। আখতার হামিদ খান নিজেই একে টলস্টিয়ান পরীক্ষা বলে আখ্যায়িত করেছেন। চাষাবাদের জীবনে ন্যুনতম আয় দিয়ে জীবন যাপনের অসহায়ত্ব আখতার হামিদ-কে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেনি, তবে কৃষক হিসেবে বুঝতে পারলেন ভারতবর্ষের কৃষকদের অগণিত সমস্যা। তাঁর মাথায় কৃষকদের সমস্যা সমাধানের জন্য আসে গ্রামভিত্তিক সমবায় তৈরি করে পুঁজি গড়ার মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানো, যা কৃষকদের অনাকাঙ্ক্ষিত শোষণ থেকে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

এরপর, কৃষক জীবনে ব্যর্থ আখতার হামিদ ছাপাখানার শ্রমিক হয়েছিলেন, হয়েছিলেন তালা চাবির কারিগর। দুই বছরের এই কঠোর জীবনে অসফল হওয়া আখতার হামিদ খান দমে যান নি। একদিন এসব ছেড়ে দিল্লীতে জামিয়া মিলিয়া নামের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে, ভারতবর্ষ থেকে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিদায় সূচিত হতে চলা পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে ও ভারতীয় মুসলমানদেরকে ভিন্ন পরিবেশে আবিষ্কার করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজার হাজার মুসলমান পাকিস্তানের দিকে ছুটতে থাকে। দাঙ্গার ধাক্কা সয়েও টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করা আখতার হামিদ বাধ্য হয়ে ১৯৫০-এ পাকিস্তানে চলে আসেন সামান্য শরণার্থী হিসেবে। ১৯৪৭-১৯৫০, এই তিন বছরের সময়টুকুতে তিনি ছাত্রাবস্থায় অর্জিত স্বাধীন শঙ্কাহীনতাকে কাজে লাগাতে পারেননি। অবিশ্বাস আর আশঙ্কা তাকে বাধ্য করেছিল তার চিরপরিচিত পরিবেশ ত্যাগ করতে। ‘মাই ট্রাবল্‌ড লাইফ’ নামক প্রবন্ধে তিনি দুঃখ করেই লিখেছেন, ‘জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিই আমাকে একটা গড়িয়ে পড়া পাথরের মতো চলমান করে দিয়েছিলো। এগুলো আমাকে এক ভৌগলিক অঞ্চল থেকে অন্য এক ভৌগলিক অঞ্চলে নিয়ে গেছে শক্ত চারা গাছের মতো মূলসহ তুলে। একবার নয় ,অনেকবার অন্যত্র রোপন করে গেছে’

একসময়কার ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করা আখতার হামিদ খান কুমিল্লায় আবার ফিরে এলেন। দিল্লীর জামিয়া মিলিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োজিত হন তিনি। ভিক্টোরিয়া কলেজের দীর্ঘ আট বছরের কর্মজীবন কঠোর তপস্যায় ব্যয় করেন তিনি। এ সময় আল গাজ্জালী ও শাহ ওয়ালী উল্লাহর লেখা পড়ে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন আখতার হামিদ খান। তাঁর কাছে মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্ব মনে হওয়া এসব পাঠ পরবর্তীতে তিনি অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের মধ্যে নিজস্ব চিন্তাধারা সম্পৃক্ত করতে ক্যাপিটালিজম, সোশ্যালিজম, নিউ ক্যাপিটালিজম বিষয়ক মতবাদ সম্পর্কিত বই পড়তে শুরু করেন।

প্রিন্সিপালের চাকরি করে ধর্মতত্ত্ব ও অর্থনীতি পড়তে থাকা ও সমুদয় জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়াতে ছড়াতে নিজেকে ভিন্ন এক পরিবেশে আবিষ্কার করেন তিনি। ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী তাকে সিভিল সার্ভেন্টদের শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব দেন। আগে ‘ভিলেজ এইড’ নামক প্রকল্পে কাজ করেছিলেন বিধায় সানন্দে এই চাকরি লুফে নেন আখতার হামিদ খান। এরপরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাছাই করা এগারজন ইন্সট্রাক্টর নিয়ে চলে গেলেন আমেরিকার মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে। উদ্দেশ্য গ্রামের হতদরিদ্রদের জীবন মান উন্নয়নে আধুনিক উপায় বের করা। তিনি লক্ষ্য করেন পৃথিবীব্যাপী গ্রামগুলোর সমস্যার ধরণ একই এবং সেজন্য সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পড়াশোনা করেন এবং দেড় বছর পরে ১৯৫৯ সালে দেশে ফিরে কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে যোগ দেন। কাজ শুরু করেন কোতয়ালী থানায়।

প্রথমেই আখতার হামিদ খান একাডেমীর চারপাশের প্রায় তিনশ’টি গ্রাম সহ এক’শ বর্গমাইল বিশিষ্ট কোতয়ালী থানাকে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে ব্যবহার শুরু করেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর সমাধানের লক্ষ্যে চালু করেন ‘ওয়ার্কস প্রোগ্রাম’। এই প্রকল্পের আওতায় মানুষ প্রথম দেখে কিভাবে ঠিকাদারি প্রথা হটিয়ে স্বল্প বাজেটে গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন বাড়ানো যায়। এবারে রোষানলে পড়েন ঠিকাদার ও সুদখোর মহাজনদের। তাকে কুমিল্লা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। ওয়ার্কার্স প্রোগ্রামের ফলে সাড়া পড়ে যায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। গ্রামবাসীদের নিয়ে অনবরত আলোচনা পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল স্বরূপ বেরিয়ে আসে নানান সমস্যা। সেসবের সমাধানের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন সমবায় সমিতি। সর্বস্তরের কৃষকদের উন্নয়নের পথ অনেকটাই সুগম হতে শুরু করে। সাফল্য পায় আমাদের আখতার হামিদের প্রচেষ্টা। হার্ভার্ড উপদেষ্টাগণ আখতার হামিদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারকে কুমিল্লা পদ্ধতি অন্যান্য থানায় পুনরাবৃত্তি ঘটাতে রাজি করায়। যার ফলে ১৯৬১ সালে ‘থানা ট্রেইনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট ও ওয়ার্কস প্রোগ্রাম’ ৪১৭ টি থানায় শুরু হয়। পরের বছর ২৫০টি থানায় থানা কো-অপারেটিভ ও সেচ প্রোগ্রাম শুরু হয়। আর এভাবেই সাফল্য পায় ওয়ার্কস প্রোগ্রাম, এবং সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রোগ্রাম আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।

আমরা হয়ত অনেকেই জানিনা কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর আদলে নির্মিত হয়েছিল বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী। আখতার হামিদ খান ও পল্লী উন্নয়ন যেন একে অপরের সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িত। যদি কুমিল্লায় তাঁর অবদান গুলোকে একে একে জড়ো করা হয়, তবে যে বিষয়গুলো উঠে আসে তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয়, পল্লীর মানুষের জন্য পল্লী উন্নয়ন একাডেমী প্রতিষ্ঠা, দ্বিতীয় অবদান যদি বলি তাহলে তা, গ্রামের মানুষের সমস্যা ও তার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য গবেষণা প্রবর্তন করা। সম্ভবত গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়েও যে গবেষণা হতে পারে এমন চিন্তা তিনিই প্রথম করেছিলেন। তৃতীয়ত আসে থানাভিত্তিক ট্রেনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা। সমগ্র সার্কেল অফিসার, থানা শিক্ষা অফিসার, কৃষি অফিসারসহ অন্যান্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অফিস এবং অফিস কর্মকর্তাদের এক ছাদনাতলায় এনে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কাজটা আখতার হামিদের হাত ধরেই হয়েছিল।

তাঁর চতুর্থ অবদান- রাস্তা তৈরি ও খাল খননের ওয়ার্কস প্রোগ্রাম, যার উদ্দেশ্য সমগ্র এলাকাজুড়ে রাস্তা ও খালের একটি নেটওয়ার্ক গড়া। পঞ্চম অবদান- সেচ কাজের ওয়ার্কস প্রোগ্রাম। এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম বসানো হয় গভীর নলকূপ, লিফট পাম্প, যা শুকনা মৌসুমে কৃষকপ্রাণে স্বস্তি দেয়। ষষ্ঠ অবদানের ক্ষেত্রে বলতে হয়- গ্রাম ও থানা ভিত্তিক কো-অপারেটিভ। পুঁজি গঠন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের সংগঠিত করেছে এই প্রকল্প। আগে কেবল ইউনিয়ন ও জেলা বোর্ড ছিল। আখতার হামিদ খান প্রথম থানা কাউন্সিল নামের স্থানীয় সরকারের স্তর গঠন করেন। একে রাখব সপ্তম অবদানে। অষ্টম অবদান, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেড়ি বাঁধ প্রচলন, যা নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত।

নবম অবদানের কথা যদি বলি, তবে তা থানা ভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা অফিস স্থাপন ও পরিবার পরিকল্পনার আংশিকভাবে আধুনিকায়ন। এরপরে ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার সপরিবারে তুলে নিয়ে যায়। পাকিস্তানে গিয়ে তিনি দু’বছর ফয়সলাবাদ ও করাচি ইউনিভার্সিটি তে কাজ করেন। পরবর্তীতে আমেরিকার মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে চলে যান, তবে এবার আর ছাত্র নয় শিক্ষকরূপে। কিছুদিন শিক্ষকতার পরে করাচিতে আসেন। এরপরে পাকিস্তানের ওরাংগিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করেন একক প্রচেষ্টায়, যা ‘ওরাংগি পাইলট প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত ছিল। এখানেও সাফল্যের মুখ দেখেন তিনি। একাত্তরের পর তিনি আর বাংলাদেশে আসেননি। ১৯৯৯ সালে ৯ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সুতরাং, আমরা বলতেই পারি একটি সফল জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর অবদান কতটুকু টেকসই এবং তাঁর পদচারণার সাফল্যগুলো জন মানুষকে জানাতে প্রয়োজন বিস্তৃত গবেষণা।

তথ্যসূত্র:

১.আখতার হামিদ খান, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, কুমিল্লা। একটি স্মৃতিচারণ -মোঃ আখতার হোসেন খান

২.আখতার হামিদ খান/বাংলাপিডিয়া

 

মাহের রাহাত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।

Related Posts

About The Author

Add Comment