আনিসুল হকের “মা” এবং একজন সাফিয়া বেগম

আনিসুল হক মা

চোখটা এতো পোড়ায় কেন ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও সমুদ্র কী তোমার ছেলে আদর দিয়ে চোখে মাখাও।। প্রয়াত সংগীত শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর এই গানের কলিতে সীমাহীন দুঃখের সমুদ্রের বর্ণনা বিধৃত হয়েছে। দুঃখের সমুদ্রে আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, উদ্যমী হতে শেখায়। সমসাময়িক কালের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক আনিসুল হকের “মা” উপন্যাস পড়ার পর আমরা এক আদর্শবান বাঙালী জেদি কিন্তু ধৈর্যশীলা মায়ের বর্ণনা পাই। আমরা এমন এক মায়ের বর্ণনা পাই যে মা হাসি মুখে দুঃখকে বরণ করে নিতে জানেন, যিনি সাত তলায় বাস করেও গাছতলায় বাস করার যোগ্যতাও রাখেন, যিনি দুঃখের সমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে তীরে পৌঁছানোর উদগ্র বাসনা ব্যক্ত করে তাঁর একমাত্র আদরের ধন আজাদকে নিয়ে ইউনুস চৌধুরীর বাড়ি ছাড়েন। তাঁর স্বামী ইউনুস চৌধুরী দুনিয়ার মোহতে পড়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে অল্পদামে বিকিয়ে দিয়ে যখন দ্বিতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়লেন তখন সাফিয়া বেগম তাঁর ঘর ছাড়েন।

চৌধুরী বাবুর সম্পদ, মোহ, গাম্ভীর্য, শৌর্যবীর্য সবকিছু সাফিয়া বেগমের কাছে মূল্যহীন। দু পয়সা দামও দেন নি সুফিয়া বেগম। নিজের বিয়ের সময়ে বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া সোনার অলংকারগুলি নিয়ে তিনি তাঁর একমাত্র আদরের ধন আজাদকে সাথী নিয়ে চৌধুরী সাহেবের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে আসেন জীবন যুদ্ধের মাঠে। দুঃখ-বেদনায় ভরা জীবনের খেলাঘরে তিনি নিজেকে দাড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টায় বিভোর হয়ে আজাদকে নিয়ে ইস্কাটনের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পাড়ি জমান ফরাশগঞ্জে। একেবারে আকাশের চাঁদ জমিনে পড়ার মত অবস্থা! জীবনযুদ্ধের হাল খুব শক্ত করে ধরলেন সাফিয়া বেগম। ধন-সম্পদের প্রতি মোহ তাঁর মনকে বিন্দুমাত্র হরণ করতে পারেনি বরং আদর্শের সোপানে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়ার মনোবাসনা তাঁর ভিতরের জগৎটিকে নাড়া দিয়েছিল। তাইতো চৌধুরী সাহেবের চৌধুরীপনা তাঁর হৃদয়কে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

চৌধুরী যখন তাদেরকে রাজী করিয়ে তাঁর রাজপ্রাসাদে আনতে ব্যর্থ হলেন তখন একমাত্র পুত্র আজাদকে করাচি পাঠিয়ে দিলেন মায়ের থেকে পৃথক করে দেওয়ার জন্য। একটি পাখিরছানাকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পর মায়ের যে দশা হয় সাফিয়া বেগমের দশা তেমন হল। ছেলে তাঁর দেশের, দশের, সমাজের মুখ রাখবে এই মনোবাঞ্ছনা পূর্ণ করার জন্যই ছেলেকে তিনি করাচি পাঠাতে সম্মত হলেন। তাঁর বড় কষ্টের সংসার। মাতৃহীন আরও কয়েকটি সন্তানের মাও তিনি। নিজের মৃত বোনের সন্তানেরা যেন তাঁরই সন্তান। একজন মা কিভাবে তাঁর ছেলেকে আগলিয়ে রাখেন তার প্রমাণ মেলে সাফিয়া বেগমের মাতৃসুলভ আচরণে। তাঁর নীতি, আদর্শ, কর্মদক্ষতা, সততা, ব্যবহারের অমায়িকতা সব মিলিয়ে এক চলনসই চৌকশ পুত্রের প্রতিমূর্তি আজাদ। করাচির পড়াশুনা শেষ করে আজাদ দেশে ফিরে আসলে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। দেশ মাতৃকার সাহসী সন্তানেরা সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেদিন কোন শক্তি বাঙালিদেরকে থামিয়ে রাখতে সমর্থ হয়নি। আজাদকে যেন তাঁর মা সেদিন দেশের জন্য আজাদ করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন এদেশের দোসরদের সহযোগিতায় আজাদ ও তার বন্ধুদেরকে গ্রেফতার করেছিল সেদিন ও আজাদের মা ভেবেছিলেন বোধকরি তাঁর বুকের ধন ফিরে আসবে। কিন্তু আজাদরা আর কখনও ফিরে আসেনি।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পুত্র রুমীও সেদিন গ্রেফতার হয়েছিল স্বাধীন বাংলার জন্য স্লোগান দিয়েছিল তাই। আজাদ ও রুমী আর কখনও ফিরে আসেনি। জেলের গেটে আজাদের জন্য মা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর প্রিয় সন্তানকে দুমুঠো ভাত তুলে দিবেন বলে। আজাদের সাথে সাফিয়া বেগমের আর কখনও দেখা হয়নি। আজাদদেরকে গুম করে দিতে পারলেই এ দেশকে তাদের দখলে নিতে পারবে বলে কায়েমি স্বার্থবাদীরা ভেবেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে তারা বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

আজাদ আর রুমীর মায়ের মত হাজার হাজার মায়েরা আদরের ধনকে দেশের জন্য আজাদ করে দিয়েছিলেন কিন্তু তারা কখনও অন্যায়ের কাছে তাদেরকে মাথা নত করতে শেখাননি। “এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়” এই নীতিতে বিশ্বাসী তাজা প্রাণের দুর্জয় অকুতোভয় সৈনিকেরা সেদিন নিজের প্রাণকে বিলিয়ে দিয়েছিল এই সোনার বাংলার জন্য। সোনার বাংলার সোনার মানুষ গড়ার যারা কারিগর তাদের পরিচয় কেন গোপন থাকবে?

আজ সময় এসেছে জাতিকে জানিয়ে দেওয়ার। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে একজন সাফিয়া বেগম প্রয়োজন, যিনি শত বাঁধা ডিঙ্গিয়ে একজন আদর্শ পুত্রের যোগ্য মায়ের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। বাংলার ঘরে ঘরে একজন সাফিয়া বেগম যে আজ খুব দরকার! সাফিয়া বেগমদের মত মায়েরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের সন্তানকে জীবন যুদ্ধে লড়াই করার মন্ত্র শিক্ষা দেন। আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর আনিসুল হকের “মা” উপন্যাসের সেই আদর্শ মা সাফিয়া বেগমের কাছে জাতি চিরদিন ঋণী থাকবে।

মেহেদী আরিফ

ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment