আপনার পড়া সেরা ১০টি বই কী কী?

নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে একবার এক লোক জিজ্ঞেস করল, হোজ্জা ,আপনার বয়স কত? হোজ্জা উত্তর দিলেন, আমার বয়স ৬০ বছর ।

বেশ কয়েক বছর পরে সেই লোকের সাথে আবার হোজ্জার দেখা । তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা আপনার বয়স কত হল বলুন তো। নাসিরুদ্দিন উত্তর দিলেন, আমার বয়স ৬০ বছর।

লোকটি বলল,সে কি কথা ? ৫ বছর আগেও তো আপনি ৬০ বছরের কথাই বলেছিলেন। উত্তরে হোজ্জা গম্ভীর মুখ করে বললেন, আমি এক কথার মানুষ। এক মুখে ২ কথা বলতে পারব না ।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মত করে বয়স ধরে রাখা সম্ভব না । সময়ের সাথে সাথে আমাদের বয়স পাল্টায়, পাল্টায় আমাদের মেন্টালিটি; চারপাশের জগতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে পরিবর্তন। নতুন বাড়তি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আমরা পৃথিবীকে আরো ভালভাবে বুঝতে শিখি। সেই কারনে আজ আমাদের যা ভাল লাগছে, যেটাকে অতি প্রয়োজনীয় বই বলে মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পরে সেটাকে হয়তো রাবিশ ছাড়া আর কিছুই মনে হবেনা । বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’ নামক ছোটগল্পে ঠিক এইরকম একটা সিনারিও বর্ননা করা হয়েছে। গল্পের নায়ক ট্রেন স্টেশনে বসে সহযাত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে একটি বই পড়া শুরু করলেন । বইটা তার এতই ভাল লেগেছিল যে নিজের ট্রেন ফেইল করেও তিনি কয়েক ঘন্টা ধরে বইটা পড়া চালিয়ে যেতে লাগলেন। শেষ পর্যায়ে এসে আবিষ্কার করলেন, বইয়ের লাস্টের কয়েকটি পৃষ্ঠা ছেড়া। বইটা তার আর কমপ্লিট করা হলনা। প্রায় ১০ বছর পরে সেই বই আবার তার হাতে আসল। তিনি পড়তে গিয়ে দেখলেন, বইটা খুবই খারাপ। সময় নষ্ট করে এ বই পড়ার কোনো মানে হয়না । (পাঠকের মৃত্যু নামক গল্পটা পড়তে পারেন এই লিংক থেকে https://www.facebook.com/FanClub.Humayun.Ahmed/posts/608924179149368)

বনফুল নামক পাঠক ১০ বছরের ব্যবধানে যেভাবে সম্পূর্ন চেঞ্জড হয়ে গিয়েছিলেন , আমাদের প্রত্যেকের সাথেই সেটা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আজ আমাদের কাছে যেটা সেরা বই মনে হচ্ছে , কিছুদিন পরে সেটা হয়তো অশ্লীল চটি বইয়ের সমতুল্য বলে গন্য হবে।বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম এর সেরা নির্বাচনের ইভেন্টে আজ সেরা ১০টি বয়ের তালিকা যদি করতে বসি ,তাহলে সেটা All time universal best 10 হবেনা , সেটা হবে কেবলমাত্র ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ বসে তৈরি করা একটা লিস্ট।

বিডিএসএফ এর ইভেন্টকে সামনে রেখে সচেতন পাঠকদের উদ্দেশ্যে ভয়ে ভয়ে আমার এখনকার লিস্টটা পেশ করছি ।

১। গল্পে গল্পে জেনেটিক্স (চমক হাসান)
এই আধুনিক যুগে এসেও আমরা পত্রিকার পাতায় দেখতে পাই, গর্ভের সন্তান ছেলে না হয়ে মেয়ে হবার কারনে স্ত্রীকে তালাক দিলেন স্বামী। নবজাতক দেখতে কার মত হল ?–বাবা নাকি মা ? বাবা মা দুইজনেই ফর্সা, বাচ্চা যেহেতু কালো হয়েছে তার মানে ডাল মে কুছ কালা হে ? —এইরকম অসংখ্য কুসংস্কার বা অজ্ঞানতা এখনো আমাদের মাঝে রয়েছে । গল্পে জল্পে জেনেটিক্স বইটা এইধরনের সকল কনফিউশন দূর করে জেনেটিক্স বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে । বাইবেলে বর্নিত ইয়াকুব (আ) এর ভেড়ার পালের কৌশলী প্রজনন থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের মেন্ডেলের সূত্র কিংবা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং — বইতে সবকিছুই বর্ননা করা হয়েছে । বইয়ের ভাষা খুবই প্রাঞ্জল ।যাদের ব্যাকগ্রাউন্ড সায়েন্স নয়, তারাও এই বই পড়ে সহজেই বুঝতে পারবেন আশা করা যায় ।

Image may contain: text

আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, বইটা লেখা হয়েছে কার্টুন এর ফরম্যাটে । পাতায় পাতায় ছবি, ছবির নায়ক নায়িকাদের সংলাপের মধ্য দিয়ে বই এর থিওরি এগিয়ে যাচ্ছে । যে কোনো বয়সের পাঠকই এই বই পড়ে উপকৃত হবেন।

বইটি পড়লে আপনি জানতে পারবেন এ্যামাইটোসিস বা মাইটোসিস (নন সেক্সুয়াল) কোষ বিভাজনের চেয়ে মিয়োসিস (সেক্সুয়ায়াল) কোষ বিভাজনে কি কি সুবিধা পাওয়া যায়। বইটি পড়লে আপনি আরো জানতে পারবেন , অস্ট্রিয়ার গির্জার পাদ্রি গ্রেগর জোহান মেন্ডেল তার বাগানে লাগানো মটরশুটির ফুল পর্যবেক্ষন করে কোন যুগান্তকারী ফর্মূলা আবিষ্কার করেছিলেন। এই বইটিতে আপনি আরো পাবেন সন্তানের ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা লিথাল জিন (বা থ্যালাসেমিয়ার মত অন্যান্য জেনেটিক রোগ) এর ক্ষতিকর প্রভাব। বইটি পড়লে আপনি আরো জানতে পারবেন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে বানানো গরুর মাংসের গাছ বা জোনাকি পোকার মত আলোকিত খরগোশের খবর। তাই আসুন আমাদের গাড়ির নিকট, দেখুন আমাদের বইগুলি । মানে , আসুন নিকটস্থ বইয়ের দোকানে/লাইব্রেরিতে/অনলাইনে, পড়ুন এই বইটি।

২। স্যাপিয়েন্স -মানুষের গল্প , (ইউভাল নোয়া হারারি -আশফাক আহমেদ)
অন্স আপ অন এ টাইম , মেনি ডেইজ এগো, এক দেশে ছিল এক রাজা । একদিন রাজা তার সকল মন্ত্রী,সচিব এবং দেশের গন্য মান্য বুদ্ধিজীবিদের ডেকে আনলেন । সবাইকে মিটিং এ ডেকে বললেন, , পৃথিবীতে এই পর্যন্ত যত জাতি এসেছে, তাদের উত্থান -পতন এবং তাদের অবদান গুলো সম্পর্কে আমি জানতে চাই । তোমরা সবাই মিলে চেষ্টা করো ,পৃথিবীর সকল জাতির ইতিহাস লেখার জন্য । এই ইতিহাস পড়ে আমি বুঝতে পারব, আমার নিজের সাম্রাজ্যের জন্য আমার করনীয় কি । আচ্ছা, কতদিন লাগবে তোমাদের এই ইতিহাস লেখার জন্য ?

সবাই আলোচনা করে রাজাকে বলল, আমাদের ৫ বছর সময় দিলে আমরা আপনাকে পূর্নাংগ ইতিহাস লিখে এনে দিতে পারব । রাজা বললে, ঠিক আছে । ৫ বছর পরে ঠিক এই দিনে আমরা এখানে আবার মিটিং এ বসব ।

No automatic alt text available.

৫ বছর পরের কথা । রাজা সবাইকে নিয়ে আবার মিটিং এ বসেছেন । কারো হাতে কোনো বই নেই । রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় সেই ইতিহাস গ্রন্থ ? তোমরা কি লিখে এনেছো আমাকে দেখাও ।

প্রধান লেখক উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলেন । জানালা দিয়ে দেখা গেল, প্রাসাদের সামনে সার দিয়ে ৩০ টা উট দাড়িয়ে আছে । প্রতিটা উঠের পিঠে ২ বস্তা করে বই ।

প্রধান লেখক কুর্নিশ করে বললেন, মহারাজ-এই হচ্ছে আমাদের ৫ বছরের পরিশ্রমের ফসল ।এখানে পৃথিবীর প্রতিটা জাতির ইতিহাস রয়েছে ।

রাজা বললেন, এত বই আমি পড়ব কখন ? তোমরা এক কাজ করো। আমার জন্য সংক্ষিপ্ত করে ইতিহাস লিখো । কতদিন লাগবে তোমাদের এই কাজে ?

সবাই আলোচনা করে বলল, ১ বছর সময় দিলে আমরা একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখে আনতে পারব ।

১ বছর পরের সকাল । রাজা আসলেন মিটিং এ । প্রধান লেখক জানালার পর্দা সরিয়ে দিল । দেখা গেল, এবার উটের লাইনে মোট উট এর সংখ্যা ৫ । প্রতিটা উঠের পিঠে ২ বস্তা বই ।

রাজা এবার খেপে গেলেন । আরে –এত বই আমি কিভাবে পড়ব ? আপনারা দেশের সেরা সেরা বিদ্বান ব্যক্তি । আপনারা কি আমার জন্য এমন কোনো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখতে পারেন নাই যেখানে পৃথিবীতে জন্মানো প্রতিটা জাতির ইতিহাস লেখা থাকবে ?
প্রধান লেখক বললেন , জি জাহাপনা , আমরা পারব ।
-কতদিন লাগবে আপনাদের ?
-১ দিন লাগবে । আগামীকালই আপনার ইতিহাসের বই পেয়ে যাবেন ।
-ওকে ঠিক আছে । কাল যদি বইটা দিতে না পারো , তোমার ফাসি দিব আমি । তোমাদের সবার মৃত্যুদন্ড হবে ।

পরেরদিন সকাল । রাজা এসেছেন । মহা ধূমধাম করে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে প্রধান লেখক রাজার হাতে মখমলের কাপড়ে মোড়ানো একটি বই তুলে দিল । মোড়ক উন্মোচনের পরে রাজা বইটা খুললেন । বই এর ভিতরে মাত্র একটি পৃষ্ঠা । সেই পৃষ্ঠায় মাত্র একটা লাইন । সেখানে লেখা রয়েছে ,”তারা জন্মেছিল, তারা বেচেছিল, এবং তারা মারা গিয়েছিল।”

পৃথিবীতে জন্মানো প্রতিটা মানুষ কিংবা প্রতিটা জাতির ইতিহাস খুজে বের করে একজায়গায় কম্পাইল করা খুব কঠিন কাজ । অনেকেই নিজেদের সাধ্যমতো সেই চেষ্টা করেছেন । তবে এসব ইতিহাসের অধিকাংশই খন্ডিত ইতিহাস । প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা একই ছকে ফেলে বিশ্লেশন করা খুব কঠিন কাজ । সেই কাজটাই করেছেন ইজরায়েলের ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি ।২০১৪ সালে তিনি Sapiens: A Brief History of Humankind নামে একটি বই লিখেন । বইটাতে প্রায় ৪০ লাখ বছর ধরে ঘটে যাওয়া মানুষের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন পর্যায় বর্ননা করা হয়েছে । সেই সাথে জেনেটিকাল কিংবা বিবর্তনগত কারনে বর্তমান সময়ে হোমো স্যাপিয়েন্সের ভিতরে রয়ে যাওয়া বিভিন্ন কার্যকলাপের ব্যাখ্যা দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে ।

বিষয়বস্তুকে তুলনা করলে এই বইএর সাইজ ৩০ টা উট বোঝাই বই এর বস্তার সমান । কিন্তু পৃষ্ঠা সংখ্যা হিসাব করলে এই বইটা একপাতার পুস্তিকার সাথে তুলনীয় । আশফাক আহমেদ নামের এক বাংলাদেশী বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এই বইটাকে ভাবানুবাদ করেছেন । নাম দিয়েছেন ‘মানুষের গল্প’। মূল বইয়ের চেয়ে বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে আসফাক আহমেদ আরো এগিয়ে গিয়েছেন।

৩। জাপান কাহিনী (আশির আহমেদ)
বাঙ্গালীদের মধ্যে, বিশেষ করে বাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্যে একটা কুসংস্কার প্রচলিত ছিল । কুসংস্কারটা হচ্ছে- সাগর পাড়ি দিয়ে কেউ অন্য দেশে গেলে অমঙ্গল হবে । এই কারনে বাংগালীরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইতো না । ১৮৩১ সালে রাজা রামমোহন রায় এই কুসংস্কার ভেঙ্গে ইংল্যান্ডে যান । তার দেখানো পথ ধরে অনেক বাংগালী পরে জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে গেছেন । অনেকে তাদের বিদেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতা লিখে গেছেন,যেটা বাংলা ভ্রমন কাহিনীকে সমৃদ্ধ করেছে ।

Image may contain: text

১৮৭৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আইন বিষয়ে লেখাপড়া করার জন্য ইংল্যান্ডে যান । পরবর্তী সময়ে তিনি আরো অনেক দেশ ভ্রমন করেছেন । এই ভ্রমনের অভিজ্ঞতা তিনি লিখে গেছেন য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র (১৮৮১), য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি (১৮৯১, ১৮৯৩), জাপান-যাত্রী (১৯১৯), যাত্রী (পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি ও জাভা-যাত্রীর পত্র, ১৯২৯), রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১), পারস্যে (১৯৩৬) ও পথের সঞ্চয় (১৯৩৯) নামক বই গুলাতে ।

ব্রিটিশ সরকার সকল আইসিএস অফিসারকে (সেই সময়কার বিসিএস ক্যাডার) ইংল্যান্ডে পাঠাতো ট্রেনিং এর জন্য । অন্য অফিসাররা জাস্ট ট্রেনিং নিয়েই ফিরে আসতো । কিন্তু ১৯২৭ ব্যাচের আইসিএস অফিসার অন্নদাশংকর রায় তার অভিজ্ঞতা লিখে রাখলেন পথে প্রবাসে নামক বইটায় । এই বই এর একটি প্রবন্ধ ‘পারী’ আমাদের এসএসসি পর্যায়ের বাংলা বইতে ছিল ।

বাংলা ভ্রমন কাহিনী সবচেয়ে বেশী সমৃদ্ধ করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী । ১৯২৬ সালে দর্শন পড়ার জন্য গিয়েছিলেন জার্মানিতে । ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সালে আফগানিস্তানে কাবুল কাবুলের শিক্ষাদপ্তরে অধ্যাপনা করেন । ১৯৩৪ -১৯৩৫ সালে তিনি মিশরে কায়রোর আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেন । প্রতিটা দেশ নিয়েই তার ভ্রমন কাহিনী রয়েছে । সবচেয়ে পপুলার বই এর নাম দেশে বিদেশে ।

বর্তমানের জনপ্রিয় ২ কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এবং তার ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল–২ জনেই আমেরিকায় লেখাপড়া করেছেন , এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমেরিকা ঘুরতে গেছেন । আমেরিকা ভ্রমন নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ লিখেছেন মে ফ্লাওয়ার , হোটেল গ্রেভার ইন ,নক্ষত্রের রাত(উপন্যাস), নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ,ইত্যাদি । মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন , আমেরিকা এবং দেশের বাইরে দেশ ।

তবে এই সকল সাহিত্যিকের দৃষ্টি ছিল পশ্চিমে । ইউরোপ (ইংল্যান্ড ,জার্মানি,ফ্রান্স,রাশিয়া অন্যান্য) আমেরিকা,আফ্রিকা (মিশর) আফগানিস্তান–সব দেশই আমাদের পশ্চিমে । সবার ঝোক ছিল পশ্চিমে যাওয়ার । পূর্ব দিকে ,চীন জাপান মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে কেউ বোধ হয় যেতে চাইতো না ,অথবা গেলেও সেটা নিয়ে ভ্রমন কাহিনী লিখতো না । রবীন্দ্রনাথ জাপান ডায়েরী লিখেছেন , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মায়ানমার যাওয়ার অভিজ্ঞতা লিখেছেন শ্রীকান্ত নামক বইতে । কিন্তু এগুলো উল্লেখ করার মত কিছু নয় ।

বাংলা সাহিত্যের এই শূন্যতা বোধ হয় পূরন হতে চলেছে । আশির আহমেদ ১৯৮৮ সালে জাপান সরকারের স্কলারশিপ পান । তখন বুয়েটের লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই জাপানে পাড়ি জমান তিনি । লেখাপড়া শেষে তিনি জাপানেই সেটেল করেন । বর্তমানে তিনি জাপানের কিয়ুশু ইউনিভার্সিটির প্রফেসর । গত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন জাপান কাহিনী ১,২,৩ এবং ৪ । বই এর চ্যাপ্টারগুলো অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে । (https://www.facebook.com/japan.kahini)

৪। ইনসাইড র (অশোক রায়না)
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা Research & Analysis wing (RAW) কে নিয়ে সাংবাদিক অশোক রায়নার অনুসন্ধানী বই -ইনসাইড র। ক্লাসিকাল গোয়েন্দাবৃত্তির অনেক তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে বইয়ের শুরুতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার গঠন ও কার্যাবলি আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৪৭ এর পরে ভারতে র এর প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত বিবরন দেওয়া হয়েছে । সবশেষে র এর কয়েকটি সফল অপারেশনের বর্ননা দেওয়া হয়েছে (যেমন-১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালে স্বাধীন সিকিমকে ভারতের রাজ্যে পরিনত করা, ভারতের পারমানবিক বোমার সফল পরীক্ষা ইত্যাদি)।

No automatic alt text available.

তবে যেসব অপারেশন র ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে গিয়েছেন লেখক এখানে। শ্রীলংকার তামিল-সিংহল গৃহযুদ্ধের কোনো উল্লেখ এখানে করা হয়নি (অনুমান করা হয়, র তামিল গেরিলা যোদ্ধা ভিলুপিল্লাই প্রভাকরনকে সাপোর্ট দিত শ্রীলংকা থেকে বের হয়ে তামিলদের জন্য আরেকটা স্বাধীন দেশ বানাতে) । খুলনা,বরিশাল,ফরিদপুর নিয়ে স্বাধীন ‘বঙ্গভূমি’ নামক দেশ গঠন করা, পাহাড়ে আদিবাসীদের সাথে যোগাযোগ করে সেভেন সিস্টার্স এর জঙ্গীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকী এবং মুক্তিযুদ্ধে মুক্তি বাহিনীর ভূমিকা–ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে খুব কম।

টপ টেনে এই বইটাকে জায়গা দেওয়ার সময় প্রায় একই ধরনের আরেকটি বই জোর প্রতিযোগিতা করেছিল। সেই বইটা হচ্ছে সাবেক রাশিয়ান গুপ্তচর স্তানিস্লাভ লেভচেংকোর ‘ On the wrong side-My life in KGB (আমি ছিলাম কেজিবির লোক নামে বাংলায় অনুদিত হয়েছে)

৫। মুজিববাহিনী থেকে গনবাহিনী-ইতিহাসের পুনর্পাঠ (আলতাফ পারভেজ)

আলতাফ পারভেজের লেখার বড় সুবিধা হচ্ছে, তিনি প্রচুর তথ্য ইন্টারনেট থেকে কালেক্ট করেন। অন্যান্য লেখকের বইয়ের ফুটনোটে যেখানে অনেক বই/জার্নালের রেফারেন্স থাকে, সেখানে আলতাফ পারভেজের বইয়ের ফুটনোটে কাগজে্র বইয়ের পাশাপাশি উইকিপিডিয়া,ইউটিউব বা অন্যান্য ওয়েবসাইটের লিংক থাকে , যে লিংক মোবাইলে টাইপ করে পাঠক ইন্সটান্টলি সেই তথ্যটা চেক করে নিতে পারে।

এই বইয়ে লেখক একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন । ৬০ এর দশকের শুরুতে এই গোষ্ঠী ছাত্রলীগের অভ্যন্তর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করার জন্য এক ধরনের মুভমেন্ট শুরু করে। কালক্রমে এদের ভেতর থেকেই যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিবাহিনী তৈরি হয় । রেগুলার মুক্তিবাহিনীর বাইরে লং টার্ম যুদ্ধের প্রিপারেশনের জন্য মুজিববাহিনীও তৈরি হয় এদের ভেতর থেকে । স্বাধীনতার পরে ছাত্রলীগ,যুবলীগ , জাসদ ছাত্রলীগ,জাসদ কিংবা জাসদ এর সশস্ত্র গনবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়েও দেখা যায় এদের কর্তৃত্ব । ওই সময়ে সেনাবাহিনী,মুক্তিবাহিনী আর আওয়ামী লীগের কর্মীদের নিয়ে একটি বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল , যাদের দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের বিভিন্নভাবে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি রক্ষা করা । (আল্টিমেটলি দেখা গেল, এই বাহিনী বিরোধি দলের কর্মীদের নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে) এই রক্ষীবাহিনীর নের্তৃত্বেও দেখা গেল পুরনো মুজিববাহিনীর লোকেরাই।

No automatic alt text available.

লেখক একটি বিশাল ক্যানভাসে পরস্পরের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ১৯৬০ আর ১৯৭০ এর দশক বইয়ের মূল বিষয়বস্তু হলেও ২০০২ এর জাপান ওয়ার্ল্ড কাপ পর্যন্ত বইয়ের আলোচনায় প্রাসংগিকভাবে এসেছে ।

৬। স্পার্টাকাস (হাওয়ার্ড ফাস্ট)
খৃষ্টপূর্ব ৭১ সাল । রোমান সাম্রাজ্যে গ্লাডিয়েটর দের দিয়ে কুস্তি খেলাটা বেশ জনপ্রিয় । খেলার নিয়ম খুব সিম্পল। ২ জন গ্লাডিয়েটর (যোদ্ধা/খেলোয়াড়) রিং এ নামবেন যুদ্ধ করতে । যে বেচে থাকবে সে বিজয়ী,যে মারা যাবে সে পরাজিত। ভাল গ্লাডিয়েটরদের খেলা দর্শক দেখতে চায়,কিন্তু প্রতিটা খেলায় যেহেতু একজন মারা যাবে সেহেতু এই খেলায় দক্ষ খেলোয়াড় কমে যাচ্ছিল খুব দ্রুত। কয়েকটা ক্লাবের কোচ তখন নিয়মকানুন চেঞ্জ করল। দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য গ্লাডিয়েটরদের দিয়ে পাতানো খেলার ব্যবস্থা করল ।( সমসাময়িক কালের রেসলিং এর কথা তুলনা করুন। ইউএফসি রেসলিং এ সবাই সত্যিকারের মাইরপিট করে, ফলে খেলোয়াড়রা অনেক বেশি আহত হয়। একারনে মাসে ১টা/২টা ম্যাচের বেশি করা যায়না। অন্যদিকে WWE রেসলিং পাতানো খেলা। খেলোয়াড়রা স্টেজ ড্রামা স্টাইলে দর্শকদের সামনে মাইরপিটের অভিনয় করেন । এ কারনে তারা আহত হয় অনেক কম। মাসে বা সপ্তাহে অনেক বেশি ম্যাচ খেলতে পারেন তারা)।

Image may contain: one or more people and text

ক্লাব মালিকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করত ম্যাচের জয় পরাজয় এমনকি গ্লাডিয়েটরদের জীবন মরন । স্পার্টাকাস নামক একজন ক্রীতদাস গ্লাডিয়েটর এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল । তার ক্লাবের সকল গ্লাডিয়েটর দের নিয়ে তিনি নিজের ক্লাবের মালিকদেরকে খুন করে রাস্তায় বেরিয়ে আসলেন । তার বিদ্রোহে ইন্সপায়ার্ড হয়ে অন্যান্য ক্লাব থেকেও গ্লাডিয়েটররা বিদ্রহ করল । এক সময় পুরা রোমান সাম্রাজ্যের অধিকাংশ ক্রীতদাস এই ‘ক্রীতদাস বিদ্রোহে’ যোগ দিল । (এই থিমকে কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে WWE Wrestling এ ৭ জন রেসলার বিদ্রোহ করেছিল । তারা রেসলিং এর ম্যানেজমেন্ট এবং প্রধান রেসলারদের উপর আক্রমন করত । এই বিদ্রোহী রেসলারদের দলের নাম ছিল Nexus,ক্যাপ্টেনের নাম ছিল wade barret)

রোমান সাম্রাজ্য এই বিদ্রোহ শক্ত হাতে দমন করল । হাজার হাজার বিদ্রহীকে ক্রুসিফাই করা হল। (তখন ফাসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড না দিয়ে ক্রুসবিদ্ধ করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হত । যীশুকেও এইভাবে ক্রুসবিদ্ধ করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল) বিদ্রোহীদের ক্রুসিফাইড বডি মাসের পর মাস রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল মানুষদের মনে ভয় তৈরি করার জন্য। কয়েক বছর ধরে এই বিদ্রোহ চলার পরে খৃষ্টপূর্ব ৭১ সালে বিদ্রোহিদের নেতা স্পার্তাকাস কে ক্রুসিফাই করার মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান ঘটে।

স্পার্টাকাস নামে সিনেমা এবং টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছে । তবে সেখানে সেক্স এবং ভায়োলেন্সের পরিমান অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশে মোস্তফা সারয়ার ফারুকী ‘স্পার্টাকাস ৭১’ নামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি শর্টফিল্ম বানিয়েছেন।

৭। মাই লাইফ ইন মাফিয়া ( ভিনসেন্ট তেরেসা )
ইটালির কিছু ছিচকে চোরের দল (নাম-মাফিয়া) এর প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বেড়েছিল । সরকারী আইন কানুনের কোন তোয়াক্কা তারা করত না । স্বৈরশাসক মুসোলিনি এদের ব্যাপারে কঠোর হলেন। ফলস্বরুপ অনেক মাফিয়া গডফাদার ফ্যামিলি এবং চ্যালাচামুন্ডা (মাফিয়া ফ্যামিলি) নিয়ে জাহাজে করে পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। আমেরিকার অপরাধ জগতে জাকিয়ে বসলেন। ইটালির চেয়ে আমেরিকায় তাদের নতুন সাম্রাজ্যটা হল আরো বড়।

সেনাবাহিনী,পুলিশ প্রশাসন,বিচার বিভাগ,ইউনিভার্সিটি,মিডিয়া–সব জায়গায় তারা নিজেদের লোক ঢুকালো। কাউকে ঢুকানো হল টাকা দিয়ে । অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েকে ছোটবেলা থেকে স্কলারশিপ দিয়ে বা অন্যান্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে মাফিয়া ফ্যামিলি নিজেদের অনুগত করেছিল । এই বাচ্চাগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে গেলে মাফিয়া ফ্যামিলি এদেরকে ব্যবহার করবে । এভাবে বিভিন্ন স্ট্রাটেজিকাল পয়েন্টে নিজেদের লোক থাকার কারনে খুব কম সময়েই এরা ধরা পড়তো কিংবা বিচার হত । নিজেদের অদ্ভূত লাইফস্টাইল এবং দর্শনের কারনে বাইরের কারো পক্ষে সংগঠনের ভিতরের কথা জানা খুব একটা সম্ভব হত না ।

Image may contain: text

ভিনসেন্ট তেরেসা নিউইয়র্ক ভিত্তিক একজন গডফাদারের অধীনে কাজ করতেন । দীর্ঘদিন অপরাধ জগতে থাকার পরে এক শুভদিনে তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। মাফিয়াদের কালচার (ওমের্তা) অনুযায়ী ধরা পড়ার পরে কখনোই কোনো ইনফর্মেশন পুলিশকে দেওয়া যাবেনা । কিন্তু ভিনসেন্ট ওমের্তা ভংগ করে পুলিশকে এবং বিশ্ববাসীকে মাফিয়া সাম্রাজ্যের স্বরুপ বর্ননা করেছেন।

মারিয়ো পুজোর গডফাদার এর সাথে এই বইয়ের একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে– গডফাদার নামক ফিকশনে ঘুরেফিরে অল্প কয়েকটা ক্যারেক্টার রয়েছে । অথচ মাই লাইফ ইন মাফিয়াতে দেখা যায় শত শত (কিংবা হাজারের উপরে) ক্যারেক্টার। অলমোস্ট প্রতিটা ক্রাইমের জন্যই আলাদা আলাদা সেটআপ । ফিকশনের চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি মানুশজ জড়িত থাকে একেকটা অপারেশনে।

৮। বিবাহ ও নৈতিকতা-বার্ট্রান্ড রাসেল
বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ছেলেদের নাম রেখেছিলেন ততকালীন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ফিগারদের নাম অনুসারে । যেমন শেখ কামাল এর নাম রেখেছিলেন তুরস্কের জাতীয় বীর মোস্তফা কামাল পাশা আতাতুর্ক এর নাম অনুসারে। শেখ জামাল এর নাম রেখেছিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসের এর নামে । শেখ রাসেল এর নাম রেখেছিলেন আমেরিকান দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এর নাম অনুসারে। অনুমান করা যায়, এই দার্শনিকের লেখা বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

বিডিএসএফ এর স্লোগান হচ্ছে–বাংলাদেশের চোখে বিশ্ব দেখি। এই দেখার পয়েন্ট অফ ভিউ যত বেশি হবে, জিনিসটা সম্পর্কে তত বেশি আমরা জানতে পারব। ইতিহাস,দর্শন,সমাজ,সংস্কৃতি,ধর্ম,রাজনীতি –ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা যত তথ্যই গ্যাদার করিনা কেন,সেগুলা একজন পুরুষ যেভাবে এনালাইসিস করবে , একজন নারীর এনালাইসিস তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। আল্টিমেটলি একজন পুরুষ এবং নারীর আলাদা আলাদা পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে চিন্তা করলেই আমরা কমপ্লিট এনালাইসিস পাব। এ কারনে রাসেল প্রেম করার ( অথবা বিপরীত লিংগের কারো সাথে মানসিকভাবে ক্লোজ হওয়ার) উপরে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন ।

Image may contain: text

সমাজ বা রাষ্ট্রেও নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে তার কিছু আনকমন আইডিয়া ছিল । যেমন তিনি বলেছেন,রাষ্ট্রের দরকার সন্তান। যে কাপল কোনো সন্তান দিতে পারছে না, তাদের ডিভোর্স করা উচিত। সন্তানবিহীন পরিবার কন্টিনিউ করার চেয়ে নতুন কারো সাথে সংসার করে সন্তান উতপাদন করা উচিত।

সন্তান লালনপালনকে তিনি একটি প্রফেশন হিসেবে দেখেছেন । একারনে যেসব মেয়ে চাকরি না করে সংসারে সন্তানকে দেখাশোনা করছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদেরকে তিনি বেতন দেওয়ার দাবি করেছেন । রেগুলার চাকরির পরেও কোন মা যতদিন মার্তৃত্বকালীন ছুটি নিচ্ছে, ততদিন সরকারীভাবে তাকে সাপোর্ট দেওয়ার দাবি করেছেন তিনি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমসাময়িক দার্শনিক হয়েও তার চিন্তাভাবনা ছিল সেই যুগের চেয়ে অনেক এডভান্সড । অনেক দেশই এখন তার গাইডলাইন অনুসরন করে বাচ্চাদেরকে স্কুলে সেক্স এডুকেশন দিচ্ছে, ম্যাটার্নিটি লিভ এর ক্ষেত্রে অনেক রকম সাপোর্ট দিচ্ছে কিংবা নিম্ন জনসংখ্যার দেশগুলোতে কাপলদেরকে বেশি বেশি সন্তান নিতে উতসাহিত করছে।

৯। মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি+মেন এগেইন্সট দ্য সি+ পিটকেয়ার্ন্স আইল্যান্ড (চার্লস নর্ডহফ+জেমস নরমান হিল)
ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লেখা এই ৩টা বই বাউন্টি ট্রিলজি নামে পরিচিত । ১৭৮৭ সালে বাউন্টি নামে একটি জাহাজ ইংল্যান্ড থেক যাত্রা শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ তাহিতির উদ্দেশ্যে । জাহাজের ক্যাপ্টেনের নাম ছিল উইলিয়াম ব্লিগ। তাহিতি থেকে ফিরতি যাত্রায় ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার কিছুদিন পরেই জাহাজের খালাসি ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান এবং অন্যান্য কয়েকজন ক্রু ক্যাপ্টেন ব্লিগ এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ব্লিগ এবং তার সমর্থকদের একটি ছোট নৌকায় নামিয়ে খোলা সাগরে ছেড়ে দেওয়া হয় । ক্রিশ্চিয়ানরা জাহাজ নিয়ে তাহিতিতে ফিরে যায়, সেখানেই তারা সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার প্লান করে।

এদিকে ক্যাপ্টেন ব্লিগ ছোট নৌকা নিয়ে বিশাল সমুদ্রের সাথে সংগ্রাম করে অদম্য মনোবল নিয়ে সাগর জয় করে ফেললেন । ১৭৯০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে পৌছুলেন। সবকিছু জানার পরে ইংল্যান্ডের নৌবাহিনী বিদ্রোহীদের এরেস্ট করার জন্য তাহিতি রওনা হল ।

Image may contain: 1 person, smiling, text

এদিকে ক্রিশ্চিয়ানের দলের ভিতরেও গ্যাঞ্জাম লেগে গেছে। ইংল্যান্ড থেকে পুলিশ আসতে পারে–এই ধারনা থেকে অনেকে তাহিতি দ্বীপে থাকতে চাইছিল না । অনেকেই আশেপাশের দ্বীপে পালিয়ে গিয়েছিল । সবচেয়ে বড় অংশটা পালিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের পাশে ছোট একটা দ্বীপ- পিটকেয়ার্নস আইল্যান্ড এ। পুলিশ এসে তাহিতি দ্বীপ থেকে ১৪ জন বিদ্রোহীকে গ্রেফতার করল,কিন্তু পিটকেয়ার্ন্স আইল্যান্ড তারা খুজে পেলনা ।

পিটকেয়ার্ন্স এ অন্যরকম এক সমাজ গড়ে উঠেছিল। ইংলিশ ছেলেদের সাথে তাহিতি থেকে স্থানীয় পলিনেশিয়ান ছেলে এবং কিছু পলিনেশিয়ান মেয়েও এসেছিল নতুন দ্বীপে। এর বাইরে পিটকেয়ার্ন্স আইল্যান্ড ছিল একেবারেই জনশূন্য । দ্বীপের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই মনোরম, উর্বর মাটিতে খাওয়া দাওয়ারও অভাব নেই ; কিন্তু ছেলেদের তুলনায় দ্বীপে মেয়েদের সংখ্যা ছিল কম। ফলে বাসিন্দাদের পক্ষে সূস্থ স্বাভাবিক যৌন জীবন চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। ১৭৯৩ সালে দ্বীপের বাসিন্দারা এক দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। প্রচুর রক্তপাতের পর দেখা যায়, জন এডামস এবং নেড ইয়ং নামের দুই ছেলে এবং প্রচুর মেয়ে বেচে আছে । দ্বীপের বংশবৃদ্ধির জন্য তখন প্রচলিত সামাজিক সব নিয়ম নীতি শিথিল করতে হয়েছিল । ১৭৯৯ সালে নেড ইয়ং মারা যায় যক্ষায়। তারপর থেকে জন এডামস তার ‘হারেম’ নিয়ে দ্বীপে একাই বেচে ছিল । ১৮০৮ সালে আমেরিকান একটি জাহাজ পিটকেয়ার্ন্স আইল্যান্ড আবিষ্কার করে । জন আইল্যান্ড এর গল্প তখন মানুষ জানতে পারে।

ইংল্যান্ডের আদালত জন এডামস এর বিদ্রোহ এবং পিটকেয়ার্ন দ্বীপে তার অস্বাভাবিক সারভাইভাল ইতিহাস জানার পরে তাকে সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করে।

এই ঘটনা নিয়ে ট্রিলজি উপন্যাস লিখেছেন চার্লস নর্ডহফ আর জেমস নরমান হিল। মিউটিনি ইন বাউন্টি বইটিতে বিদ্রোহ ,তাহিতিতে অবস্থান এবং ১৭৯৩ সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে বিচারের ঘটনা বর্নিত হয়েছে। মেন এগেইন্সট দ্য সি বইটায় ক্যাপ্টেন ব্লিগ এর সাগর পাড়ি দেওয়ার গল্প বর্নিত হয়েছে । আর পিটকেয়ার্ন্স আইল্যান্ড বইয়ে জন এডামস এর দ্বীপের গল্প বর্নিত হয়েছে।

পিটকেয়ার্ন আইল্যান্ড বর্তমানে ব্রিটিশ শাসনের অধিনে। দ্বীপের জনসংখ্যা ৫০,যাদের অধিকাংশই জন এডামস এর উত্তরসূরি।

১০। মিসির আলি (হুমায়ুন আহমেদ)
হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টি করা একটি কাল্পনিক চরিত্র মিসির আলি। ঢাকা ভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর হচ্ছেন মিসির আলি। তার কাছে অনেক জটিল রহস্যময় সমস্যা আসে। তিনি নিজের অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে সেগুলো সল্ভ করেন। অধিকাংশ সমস্যাই রোগীর মানসিক , তবে এর সাথে মাঝে মাঝে ক্রাইম এর ও কিছু সংযোগ থাকে।

No automatic alt text available.

মিসির আলিকে নিয়ে মোট ২২টা উপন্যাস লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ। তবে এগুলার মাঝে কোন কোন বইতে তিনি অবৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। টেলিপ্যাথি,হিপনোটিজম,প্যারালাল ওয়ার্ল্ড,ইএসপি পাওয়ার —ইত্যাদি ফেনোমেনন দেখা যায় তার অনেকগুলো বইতে,যেগুলো বিজ্ঞান দ্বারা প্রমানিত নয়। বৃহন্নলা ,মিসির আলির অমীমাংসীত রহস্য , আমি এবং আমরা, তন্দ্রাবিলাস,আমি ই মিসির আলি,কহেন কবি কালিদাস,হরতন ইস্কাপন,মিসির আলির চশমা, যখন নামিবে আধার–এই ৯টা বই বিজ্ঞানের সব সূত্র মেনে চলে। এছাড়া ভয় এবং মিসির আলি আনসল্ভড নামে মিসির আলির আরো ২ টা ছোট গল্পের কালেকশন আছে। এই ২ টা বইয়ে কিছু গল্প বিজ্ঞানসম্মত আর কিছু গল্প ভুয়া।

Related Posts

About The Author

Add Comment