আমাদের উচ্চশিক্ষা ও মাতৃভাষা || সত্যেন্দ্রনাথ বসু

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

সে আজ একশ বছরেরও আগের কথা। রাজা রামমোহন রায় এদেশে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান প্রবর্তন কররবার জন্য লর্ড আমহার্স্টকে অনুরোধ করেছিলেন। কয়েক বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু প্রথম পঞ্চাশ বছর পাঠ্যতালিকায় ইংরেজি শিক্ষার উপরেই প্রধানত জোর দেওয়া হল। কলেজ ও ইংরেজি স্কুলগুলোতে কলা ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেবার বাহনরূপে বহাল রইল ইংরেজি। দেশে জ্ঞান-বিস্তারে তাই শ্রেষ্ঠ উপায় বলে বিবেচিত হল।

আমাদের বিদেশী শাসকরা রাজ্য চালনায় এদেশের বুদ্ধিমানদের সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁদের অফিসগুলো যাতে অল্পব্যয়ে চালানো যায় তাও ছিল তাঁদের কাম্য। এ অবস্থায় শহরবাসী অভিভাবকেরা দেখলেন, তাঁদের সন্তান সন্তুতিদের সহজে চাকরি পেয়ে আরামে জীবনযাপন করবার প্রশস্ত পথ গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদর দরজার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এটি যে জ্ঞানবিস্তারের প্রশস্ত পথ নয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় দেশে শিক্ষিতের হার বিগত এক শতাব্দী যাবত কি হারে বেড়েছে তার হিসাব নিলে।

এর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পূর্বে শ্রীরামপুরে মিশনারি সাহেবরা শিক্ষাবিস্তারের জন্য এর চেয়ে অনেক ভালো ব্যবস্থা কল্পনা করেছিলেন। তাঁরা বাংলা হরফ তৈরি করে নিজেদের ছাপাখানায় অনেক বই ছেপে জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের পথ সহজ করেছিলেন। প্রাথমিক শ্রেণীর ছাত্রদের জন্য বাংলায় বিজ্ঞান ও গণিতের বই প্রকাশ করেছিল শ্রীরামপুর মিশন।

শীঘ্রই এদেশের শিক্ষাবিদেরা জ্ঞান প্রচারের কাজে প্রবৃত্ত হলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের কাছ থেকে আমরা পেলাম সংস্কৃতি শিক্ষার বই; অক্ষয়কুমার দত্ত সৃষ্টির লীলাবৈচিত্র্য প্রকাশ করে সমৃদ্ধ করলেন মাতৃভাষাকে এবং কয়েক বছর পরেই দেখা গের, প্রায় সকল বিষয়ের উপরেই বাংলা ভাষায় বই পাওয়া যাচ্ছে। বাংলায় লেখা ডাক্তারি বই ছাত্রেরা ব্যবহার করতেন তত দিন যত দিন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রবর্তিত হয়েছিলে।

বিদেশী ভাষায় সৃষ্টিধর্মী সাহিত্য রচনায় কিছুদিন ব্যর্থ চেষ্টা করবার পর মধুসুদন ও বঙ্কিমচন্দ্র উপলব্ধি করলেন যে জনসাধারণের সমর্থন এবং তাদের হৃদয়ে স্থান পেতে হলে হৃদয়নিঃসৃত রক্ত দিয়েই তা হবে; শিখতে হবে মাতৃভাষায় অন্তরের অন্তস্থলে যার উৎস, যা আমাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও কর্মের পরিপোষক। মাতৃভাষায় শিক্ষাপ্রদানের নীতি যদি তখন বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করতেন, তবে এই প্রাচীন দেশে নবযুগ অভ্যুদয়ের স্বপ্ন অনেক আগেই সফল হত।

মাতৃভাষায় এই শুভ সূচনা দেখা দিলেও শিক্ষা পরিচালনায় দায়িত্ব যাঁদের উপর ছিল তাঁরা এর সুযোগ গ্রহণ করবার জন্য এগিয়ে আসেননি। শিক্ষাদানের প্রধান দায়িত্ব রইল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিদর্শন এবং পরীক্ষা গ্রহণই হল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য কর্তব্য এবং উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রগুলোতে অটল রইল ইংরেজি আসন। ১৯০৫ সনে জাতীয় আন্দোলনের তীব্র সংঘাতে আর্থিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি লাভের জন্য জনগণের মনে আকাক্সক্ষা জাগল। নষ্ট বাণিজ্যের পুনরুদ্ধার করতে হবে, শুু করতে হবে নতুন নতুন শিক্ষা। কিন্তু এই আকাক্সক্ষা পূরণের অনুকূল ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতি। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ মানুষের তখন যে চাহিদা হল তা মেটাবার সাধ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধ্যতীত। কিন্তু দেশের লোক ক্রমাগত দাবি করতে লাগল তাদের আকাক্সক্ষার অনুবর্তী নতুন শিক্ষার জন্য। এ দাবি পূরণ করতে না পারায় জনসভায় বিশ্ববিদ্যালয়কে গোলাম তৈরির কারখানা বলে নিন্দা করা হতে লাগল। নতুন শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য সরকারি আওতার বাইরে প্রতিষ্ঠিত হল জাতীয় শিক্ষা পর্ষদ। স্থির হল, কলা ও বিজ্ঞান উভয়ই বাংলা ভাষায় পড়ানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার জন্য দেশের লোকের এই প্রথম প্রচেষ্টা।জাতীয়তার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ দাতাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া গেল; কিন্তু কারিগরি শিক্ষার জন্য একটি কলেজ করা ছাড়া জাতীয় শিক্ষা পর্ষদ আর বিশেষ কিছু করতে পারেনি।

ক্রমে ক্রমে জাতীয় আন্দোলনের ধারা, শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে গেল। পুরনো শিক্ষা পদ্ধতির বিরূপ সমালোচনা অব্যাহত থাকল। সরকারি আওতার বাইরে শিক্ষা সংস্কারের কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেল।বহুনিন্দিত শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার হয়ে আসবার পর শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূত্রপাত হল। তিনি প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে অবিলম্বে সন্তোষজনক পরিবর্তন আনতে হবে। তাঁর অসামান্য প্রতিভা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা তিনি জনসাধারণের শিক্ষা সংস্কারের দাবি অনেকটা পূরণ করতে পেরেছিলেন। সিলেবাস ও পঠনের ক্রম নতুন করে লেখা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই হাতে কলমে বিজ্ঞানশিক্ষাকে একটি বিশিষ্ট স্থান দেওয়া হল।

১৯০৮ সনের আগে অল্প কয়েকটি কলেজে বিজ্ঞান পড়ানো হত। নতুন সংস্কারের ফলে শহরে ও মফঃস্বলে বহু কলেজে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগার খোলা হল। এইভাবে তাঁরা বিজ্ঞানের হাতে কলমে শিক্ষা দেবার জন্য তহবিলও সংগ্রহ করলেন। অস্নাতকদের পড়াশুনার দায় কলেজগুলো নিলেন; আর বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের উচ্চতর কলা, বিজ্ঞান ও আইন পড়াবার দায় নিজেই গ্রহণ করলেন।পরীক্ষকের সংস্থা হতে এমনকি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাপ্রদান ও গবেষণার একটি উদ্যোগী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল। এই নতুন আন্দোলনে স্যার আশুতোষ হলেন প্রধান ব্যবস্থাপক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।কিছুদিন বেশ চলল। গভর্নমেন্ট তাঁর কার্যক্রম অনুমোদন করলেন এবং তাঁর বিচারশক্তি ও দূরদৃষ্টির প্রতি দেশের জনগণের আস্থা হল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজের সংস্কার করা হল। নানা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ সৃষ্টির জন্য দান পাওয়া গেল, অংক, অর্থনীতি, ইতিহাস ও দর্শন। এই কয় বৎসরে যা সৃষ্টি হল তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি জনসাধারণের সম্ভ্রম হল। দুইজন বাঙালি আইনজীবী – স্যার তারকনাথ পালিত ও স্যার রাসবিহারী ঘোষের কাছ হতে মস্ত দান এল – জমি, বাড়ি ও নগদ টাকা। স্যার আশুতোষ যখন অনেকখানি এগিয়ে গেলেন; কলিকাতা বিজ্ঞান কলেজ-এর ভিত্তিক প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু ঘোষ ও পালিতের দানের সঙ্গে এক বিচিত্র শর্ত ছিল। অধ্যাপকদের হতে হবে ভারতীয় বিজ্ঞানী।

বিজ্ঞান কলেজের সব বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের আসনে বসবার মতো উপযুক্ত ব্যক্তি তখনই পাওয়া গেল না। পদার্থবিজ্ঞানের পালিত অধ্যাপক পদের জন্য সি. ভি. রমন নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তখন ভারত সরকারের অর্থব্যবস্থা বিভাগের কর্মচারি ছিলেন। তিনি মনস্থির করার জন্য সময় চাইলেন, অধ্যাপনার ঝঞ্ঝাট তিনি চাচ্ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছা ছিল অবসর মত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েসনে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া। ১৯১৫ সনে স্যার পি. সি. রায়ের অবসর নেবার কথা। তারপর তিনি রসায়নের পালিত অধ্যাপক হয়ে রসায়ন পরীক্ষাগারগুলোর দায়িত্ব নিতে রাজী হলেন।

অধ্যাপক ডি. এম. বসু ও আগরকার যথাক্রমে পদার্থবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার ঘোষ অধ্যাপক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেদের গবেষণার জন্য জার্মানিতে প্রেরিত হবার অনুরোধ জানালেন। এ অবস্থায় বিজ্ঞান শিক্ষা দেবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিপ্রায় বিলম্বিত হল।

এদিকে প্রথম পৃথিবী যুদ্ধ ১৯১৪ সনে শুরু হয়েছিল। তারই ফলে অধ্যাপক বসু ও আগরকার জার্মানিতে অন্তরীণ হলেন। দেশের স্কুলের পরিচালনা কে করবেন, গভর্নমেন্ট না বিশ্ববিদ্যালয়-তাই নিয়ে বিতন্ডা শুরু হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ব্যাপারে হস্তক্ষেপে স্যার আশুতোষ এক নির্ভীক প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়ালেন। ১৯১৫ সনে তিনি ভাইস-চ্যান্সেলার রইলেন না বটে কিন্তু পালিত ও ঘোষের দানের অছিসভার সভাপতি রইলেন।

জাতীয়তার এই আন্দোলন বহু আদর্শবাদীকে দুঃসাহসী করেছিল। কয়েকজন তরুণ স্নাতক তখন বিজ্ঞানের চর্চায়ই আত্মনিয়োগ করবেন বলে স্থির করেছিলেন। ১৯১৫ সনের এমএসসি পরীক্ষার পরই তাঁরা উপদেশের জন্য স্যার আশুতোষের কাছে গেলেন। ভিন্ন প্রদেশের এক সরকারি কলেজের লেকচারারের পদের জন্য তাঁদের মধ্যে একজনের নাম প্রেরিত হয়েছিল। কিন্তু তিনি অত্যাধিক গুণসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়েছিলেন এবং সে জন্যই তিনি নিযুক্ত হলেন না। তিনি ভাবছিলেন, তাঁর বিজ্ঞানসম্বন্ধীয় জ্ঞান বৃদ্ধির কি উপায় হবে।

তাঁদের মধ্যে একজন সাহস করে প্রস্তাব করলেন যে, বিজ্ঞানের বিবিধ শাখায় পড়বার জন্য যে সিলেবাস রচিত হয়েছে তার অনেকগুলো গভর্নমেন্ট কলেজেও পড়ানো হয় না। সেই বিষয়গুলো যদি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানোর ভার নেন তবে বেশ হয়। এই প্রস্তাব শক্তিমান আশুতোষ কিভাবে নেবেন তা এই তরুণদের কল্পনায় ছিল না। কিন্তু দেখা গেল, কয়েকজন বিশেষ বৃত্তি পেলেন এবং তাঁদের বলা হল যে, স¤প্রতি বিজ্ঞানের যে কয়টি বিভাগ অধিকতর উন্নত হয়েছে সেগুলো যেন আয়ত্ত করা হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের কথা বিবেচনা করে একজনকে ভার দেওয়া হল তিনি যেন বিশেষ অনুসন্ধান করে রিপোর্ট দেন, এদেশেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া যাবে কি-না। তাঁকেই বলা হল যে বিশ্ববিদ্যালয় যদি পদার্থ বিদ্যার বিভিন্ন বিভাগে ক্লাশ খোলার ইচ্ছা করেন তবে ল্যাবরেটরির সরঞ্জামের জন্য প্রথম বৎসরেই কত টাকা লাগবে তার রিপোর্ট যেন দেওয়া হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল যে বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানের বিবিধ বিষয় পড়াবেন। স্যার আশুতোষ সমর্থন পেয়েছিলেন অনেকের কাছ থেকে। তবে কারও কারও মনে তখনও সংশয় ছিল। এত বড় কাজে সবদিক না ভেবে হাত দেওয়া হয়ত হঠকারিতা হবে। তরুণ বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন আগে সি. ভি. রমন যোগ দিন; যে অধ্যাপকরা বিদেশে অন্তরীণ আছেন তাঁরা ফিরে আসুন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাঁদের সংশয় দূর হল; তাঁরা এসে দাঁড়ালেন। স্যার আশুতোষের পাশে। স্যাডলার কমিশনের রিপোর্ট পেশ হবার আগেই রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও গণিতের স্নাতকোত্তর বিভাগ খোলা হল। কমিশনের সভ্যরা বিভিন্ন বিভাগের কাজকর্ম দেখে খুশিই হয়েছেন মনে হল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ স্নাতকোত্তর পক্ষে এটা ছিল দুঃসাহসের কাজ। তাঁরা নতুন পরিকল্পনা সপল করবার জন্য গুরুতর পরিশ্রম করেছিলেন। এঁরাই স্থির করেছিলেন পদার্থবিদ্যার পাঠ্যসূচি। কয়েক মাস পরে সি.ভি. রমন অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করে দেখলেন পড়ানোর কাজ নিয়ম অনুসারে বেশ চলেছে।তিনি ক্লাশে অল্প কয়েকটি বক্তৃতা দিতেন; তাঁর অধিকাংশ সময়ই কাটত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কালটিভেশন অব সায়েন্সে। এখানে তাঁর গবেষণা চলত, পালিতের দান ব্যয় হত এখানেই। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকজন লেকচারার অ্যাসোসিয়েশনের পরীক্ষাগারে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন।

আমার ব্যক্তিগত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ বিবরণের খানিকটা মাত্র বললাম। কলা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, তা সে বালিগঞ্জেই হোক বা দ্বারভাঙ্গা ভবনেই হোক, উচ্চশিক্ষার আরম্ভ এভাবেই হয়েছিল। স্নাতকোত্তর বিভাগ খোলা হলে নতুন কাজের আসল দায়িত্ব এই সব তরুণ অধ্যাপকেরাই নিয়েছিলেন। নায়ক দেখলেন, শুভদিন সমাগত। এই নতুন জ্ঞানান্বেষীদের উপর তাঁর আস্থা ছিল যে, এই গুরুদায়িত্বের ব্যাপারে আবশ্যকীয় নব নব পন্থা আবিষ্কারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেও এঁরা কুণ্ঠিত হবেন না। স্যার আশুতোষের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণ শিক্ষাব্রতীরা দুঃসাহসিক কার্যক্রমকে সফলতার পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষা বিস্তারের এই উদ্যমকে সরকারি সাহায্য পাওয়া গেল না। ছাত্রদের বেতনের উপরেই বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্ভর করতে হল। অবশ্য তখন সদাশয় ব্যক্তিদের দান কাজের সহায়ক হয়েছে। উপযুক্ত সরকারি সাহায্য ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয় যে শিক্ষাপ্রসারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল তা জাতির আত্মনির্ভরতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে ক্রমশ ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেল। শিক্ষা লাভ করবার পর ছাত্ররা নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যোগ দিল। অনেকে নতুন শিল্পের প্রবর্তন করল। মৌলিক গবেষণাও পিছিয়ে রইলো না।ঈড়হফঁপঃরারঃু ড়ভ ঊষবপঃৎড়ষুঃবং সম্বন্ধে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হল ১৯১৯ সনে। ঞবসঢ়বৎধঃঁৎব ষড়হরংধঃরড়হ ড়ভ ঝঃধৎং সম্বন্ধে মেঘনাদ সাহার বিখ্যাত তত্ত্ব ১৯২২ সালের মধ্যেই প্রাচরিত হল। তারপর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে বহু তত্ত্ব ও তথ্য একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের  পরীক্ষাগার থেকে বিশ্বের পণ্ডিতমণ্ডলীর মধ্যে প্রচারিত হয়েছে।

সফল হল স্যার আশুতোষের আশা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিজ্ঞান জগতে শীঘ্রই শ্রদ্ধার আসন লাভ করল। এই শ্রদ্ধা অক্ষুণœ আছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত নবাগত বিদ্যার্থীরা অনেক ভালো কাজ করছেন। কিন্তু একাজ সহজ ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় শিক্ষার স্থান ছিল অনেক কিছুর পর। দরকার হলেই ছাত্রদের ডাক আসত, আর তাঁরা স্কুল-কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেন। শিক্ষকদের আর বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক বলে গণ্য করা হত না; ছাত্ররা জাতীয় আন্দোলনের নেতাদেরই অনুসরণ করা সঙ্গত মনে করলেন। নেতারা তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, একবার স্বাধীনতা এলেই সব অসুবিধা দূর হবে এবং আর কোনও সমস্যাই থাকবে না।

স্বাধীনতার পর দেশে নতুন যুগ এসেছে। কিন্তু বাংলা আনন্দের পরিবর্তে পেয়েছে দুঃখ ও তিক্ততা।সংস্কৃতি ও শিক্ষা-দীক্ষায় যে দেশ ছিল এক, তা এখন বিভক্ত হয়ে গেছে। তার ফলে বহু লোক ভিটামাটি ছেড়ে চলে এসেছে। এদের পুনর্বাসনের বিপুল কাজ দেশের শাসনকর্তাদের কর্মক্ষমতা ও সঙ্গতির উপর গুরুতর চাপ দিচ্ছে। আর সঙ্গে সঙ্গে এসেছে কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার মস্ত দাবি।

মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে নেই। মাধ্যমিক শিক্ষারও আমূল সংস্কারের পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা সুষ্ঠুরূপে কার্যকর করতে হলে চাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক।বিশ্ববিদ্যালয়কেই সেরূপ শিক্ষক স্কুলগুলোকে যোগাতে হবে। তাছাড়া বহু স্নাতক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য উৎসুক। এই উচ্চশিক্ষার সঙ্গে নানা জটিল প্রশ্ন জড়িত আছে। স্থানাভাবের জন্য অনেক ছাত্রকে ফিরিয়ে দিতে হয়। প্রতি বৎসর আমরা পরীক্ষার হলে হাঙ্গামার কথা শুনতে পাই।

সহানুভূতিহীন কোনও পরীক্ষক হয়ত খুব কঠিন প্রশ্ন করেছেন; অথবা, হয়ত সিলেবাসের বহির্ভূত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছেন। কেন এমন হয় সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সযতেœ অনুসন্ধান করা দরকার। শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে স¤প্রীতি থাকা একান্ত আবশ্যক।

ত্রিশটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশে উচ্চশিক্ষা দান করেছে। শীঘ্রই আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। উচ্চশিক্ষা যখন কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব, তখন অনেকে ভাবছেন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এক হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁরা একটি গ্রহণযোগ্য নীতি গ্রহণের পক্ষপাতী।এক মান ও এক নীতি রক্ষা করতে হলে এক ভাষা শিক্ষার বাহন হিসাবে গ্রহণ করা আবশ্যক। এই মতের সমর্থকরা কার্যত ইংরেজিকেই অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের ভাষা হিসাবে রাখতে চান।

আমি চিরদিনই গতানুগতিক পথে চলার মনোভাবকে অবিবেচনার কাজ বলে প্রতিবাদ করে থাকি।বিদেশী ভাষাই আমাদের দেশে সাক্ষরের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্তরায়। বিদেশী ভাষা শিক্ষার বাহন হলে মুখস্থ করবার প্ররোচনা দেয় ছাত্রদের এবং এর ফলে তাঁদের মৌলিক চিন্তার প্রসার ঘটতে বাধার সৃষ্টি হয়।

এখন সময় এসেছে। আর বিলম্ব না করে আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষা দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শ্রেণীতে। পঞ্চাশ বছরেরও আগে আমাদের চিন্তানায়কদের নিকট এটি সম্ভবপর প্রস্তাব বলে মনে হয়েছিল। এখন মাতৃভাষাকে শিক্ষার ক্ষেত্রে উপযুক্ত মর্যাদা দেবার প্রশ্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সভ্যগণ ও আইনসভার সভ্যগণকে বিশেষরূপে বিবেচনা করে দেখতে হবে।

আমি প্রায় সারা জীবন শিক্ষা নিয়ে কাটিয়েছি। যখন আমরা ছাত্র ছিলাম তখন মনের মধ্যে একটা উন্মাদনা ছিল যে, – যে বিজ্ঞানের চর্চা করে প্রতীচ্য এত উন্নতি করেছে, আমাদের দেশে সেটা শীঘ্র চালু হবে, এবং আমরা জীবন উৎসর্গ করব সে সব জিনিস দেশের মধ্যে আনতে।

প্রায় ষাট বছর আগে যখন দেশে স্বদেশী আন্দোলন হয় তখন দেশের মনীষীরা এবং যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন সেইসব নায়করা মনে করেছিলেন যে জাতীয় বিদ্যালয়ের মাধ্যমে অন্তত বাংলাদেশের মধ্যে স্বদেশী শিক্ষাব্যবস্থা স্থাপন করবেন। বহু বৎসর চলে গিয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে শিক্ষাবিস্তার অনেক সংকীর্ণ হয়ে রয়েছে।

অন্য দেশে গেলে একটা জিনিস চোখে পড়ে। সব দেশেই চেষ্টা চলছে মাতৃভাষার মাধ্যমে, যে ভাষা সবাই বোঝে তার উপর বুনিয়াদ করে, শিক্ষার ব্যবস্থা করবার। সব জায়গায় এই নীতি চালু রয়েছে।মধ্যযুগে অবশ্য অন্য ভাষা অবলম্বন করে শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা ছিল; জ্ঞানী-গুণী লোকরাই তার সুযোগ পেতেন। এর অসুবিধা ছিল এই যে, সাধারণ লোকে বুঝতে পারত না। তার জন্য অন্য লোকের দরকার হত। তারা যেমন বুঝত সেই রকম সাধারণ লোককে বুঝিয়ে দিত।

এইভাবে কিন্তু দেশের মধ্যে জ্ঞানের বিস্তার বড় আস্তে আস্তে হত। আজকের যুগে একদিকে যেমন লোকে চেষ্টা করছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে দেশকে বড় করতে, মানুষকে নানা রকম সুখ-সুবিধা দিতে, তেমনি আবার এটাও বুঝেছে যে কেবল একটা শ্রেণীর মধ্যে জ্ঞান যদি আবদ্ধ থাকে তাহলে উন্নতি দ্রুত হয় না। কাজেই আজ যখন আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তখন আমাদের ভালো করে ভেবে দেখতে হবে কি করে দেশের ভিতর তাড়াতাড়ি শিক্ষার বিস্তার হবে। যদি চেষ্টা করা যায় তবে এ দেশের মধ্যে থেকে অজ্ঞতা এবং নিরক্ষরতা দূর করা যেতে পারে – এটা যাঁরা ইতিহাস চর্চা করেন, তাঁরাই জানেন।

আমার জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। সে অভিজ্ঞতার কথা সংক্ষেপে আপনাদের বলব।

প্রায় একশ বছর হল পাশ্চাত্য জাতের হাতে ঘা খেয়ে জাপান ঠিক করল, যে বিদ্যা ও জ্ঞানের জন্য প্রতীচ্য এত শক্তিমান হয়েছে সে জ্ঞান ও সে সমস্ত বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে। এখনও একশ বছর হয়নি।এরই মধ্যে জাপানের কীর্তি-কলাপের কথা সকলেই জানেন। বিশ বছর আগে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যখন জাপানের হার হল তখন জাপানের দুরবস্থার শেষ ছিল না, আজ কিন্তু জাপানে গেলে মনে হবে না যে এরকম কোনও অবস্থার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে-এত অল্প সময়ে দেশের সেই দুরবস্থা থেকে বর্তমান এই অতি সম্পদের মধ্যে কি করে জাপান আবার উঠে দাঁড়াল। শিক্ষা ও উন্নতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি তাই চেষ্টা করেছিলাম জানতে যে, সেখানে শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা কিরকম ভাবে হয়েছে। জাপানে কম করে নয় বৎসর শিক্ষার জন্য প্রত্যেক ছেলে ও মেয়েকে স্কুলে পাঠানো হয়। প্রায় সকলেরই স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। এরজন্য কারুর পয়সা লাগে না। নিচের দিকে খরচ যোগায় দেশের মিউনিসিপ্যালিটি কিংবা আমাদের দেশের মতই জেলা অথবা রাজ্যসরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তারাই খরচার বেশির ভাগ দিয়ে থাকে। শিল্পকলা শিক্ষার বন্দোবস্ত আছে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে, সেগুলোর ভার নিয়েছেন সরকার। তাছাড়া উপরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগ সরকারি পয়সায় চলছে।

আমার প্রথমে ধারণা ছিল যে হয়ত কোনও একটা বিদেশী ভাষার উপর নির্ভর করে জাপানে বিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলা শেখানো হয়। কিন্তু সেখান গিয়ে দেখলাম যে আমার ধারণা ভুল। আমি অনেক বই জোগাড় করেছিলাম। তার অধিকাংশই জাপানীতে লেখা। তাই পাঠোদ্ধার হয়নি। অবশ্য দু-চারখানা ইংরেজি বইও তার সঙ্গে পেয়েছি।

একটি সম্মেলন আহবান করেছিলেন জাপানিরা। সেখানে শিক্ষিত লোকেরা – যাঁরা দার্শনিক, বিজ্ঞানী কিংবা শিক্ষক, তাঁরা সকলে একত্র হয়েছিলেন আলোচনা করতে যে আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে মানুষের কি করা উচিত এবং মানুষের ভবিষ্যতই বা কি হবে। সম্মেলনে আমি এবং আর দু-একজন বিদেশী ছিলেন কিন্তু বেশির ভাগই জাপানের লোক এবং আলোচনা যা হয়েছিল তা সমস্তই জাপানিতে। তাঁদের দু-একজন ইংরেজি ভাষাতে কিছু কথা বললেও পরে আলোচনা যা হল সবই জাপানি ভাষায়। এটা বললে ভুল হবে যে, তাঁরা ইংরেজি জানেন না। কেননা, আমরা যখন ইংরেজি বলি তখন তাঁরা প্রায় সকলেই বোঝেন। তবে তাঁদের মনে এমন বিশ্বাস ছিল না যে, ইংরেজি বললে নিজের মনের ভাব স্পষ্ট করে বোঝাতে পারবেন।  সেইজন্য যেসব বিজ্ঞানী ও দার্শনিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা সকলেই জাপানি ভাষাতেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। দেখা গেল শুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব কিংবা বর্তমান বিজ্ঞানের উচ্চস্তরের কথা সবই জাপানি ভাষায় বলা সম্ভব এবং জাপানি কথায় তা বলবার জন্য লোকে ব্যগ্র।

আমাদের ভারতীয় ভাষাগুলোর তুলনায় জাপানি ভাষার কতগুলো অসুবিধা আছে। যাঁরা একটু খবর রাখেন তাঁরাই তা জানেন। একটা অসুবিধা হল এই যে, আমাদের যেমন অল্পসংখ্যক অক্ষর দ্বারাই সব বাক্য লেখাও যায়, বইতেও ছাপানো যায়, জাপানি ভাষাতে সে ব্যবস্থা নেই। আছে নিজেদের অক্ষর এবং চৈনিক অক্ষর প্রায় হাজার তিনেক। যাঁরা উচ্চশিক্ষায় ইচ্ছুক তাঁদের এ সবকটাকেই শিখতে হয়। এর জন্য আমাদের দেশের যেখানে মাতৃভাষা বছরখানেক বা বছর দুয়েকের মধ্যে চলনসই আয়ত্তের মধ্যে এসে যায়, ছেলেমেয়েদের সেখানে জাপানি ভাষা শিখতে গড়ে লাগে প্রায় ছয় বছর। এত অসুবিধা সত্ত্বেও এমন অবস্থা জাপানি ভাষার যে প্রত্যেক জাপানি বিজ্ঞানী, জাপানি দার্শনিক নিজেদের মনের প্রত্যেকটি কথা জাপানিতে প্রকাশ করতে পারেন। এতে সুবিধা হয়েছে এই যে, দেশের মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা যখন চালু হয়েছিল তখন তার জন্য শিক্ষক পাবার কোনও অসুবিধা হয়নি, -এমন শিক্ষক যিনি জাপানি ভাষায় বিজ্ঞান কিংবা দর্শন কিংবা অন্যান্য কলাবিদ্যা আয়ত্ত করে নিয়েছেন ও পড়াতে পারেন।

এইজন্য জাপানে তাড়াতাড়ি শিক্ষাবিস্তার হয়েছে। ফলে জাপান অতি সহজেই সমস্ত জ্ঞান আয়ত্তের মধ্যে আনতে পেরেছে। যদি আমরা জাপানি ও জার্মান জাত দু’টিকে দেখি-পৃথিবীতে যে দু’টি জাত তাড়াতাড়ি জ্ঞানে স্বল্পাবস্থা থেকে আজ একেবারে শীর্ষস্থানে চলে গিয়েছে – তাদের মধ্যে শিক্ষিত অথবা অক্ষর পরিচয় আছে এরকম লোকের সংখ্যা শতকরা নব্বইয়ের উপরে।

এটা ঠিক যে দেশ বলতে যদি দেশের সাধারণ লোকই দেশ, তবে এরা শিক্ষিত হলেই তো দেশকে উন্নত বলা যাবে, এবং দেশকে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করবার জন্য সমূহ শক্তিই তাদের হাতে থাকবে।আমাদের দেশে অনেক ভাষা অছে। কিন্তু প্রতিটি ভাষায় – বিশেষ করে সেগুলো সংবিধানে গণ্য হয়েছে মুখ্য ভাষ বলে – শিক্ষিতের সংখ্যা সর্বমোট জাপানিদের কিছু কম বা বেশি।

আমার মনে হয় যে প্রথমেই আমরা সারা দেশের কথা না ভেবে যদি আমাদের নিজেদের ঘর তৈরি করি, অর্থাৎ আমরা যে প্রদেশে থাকি সেই প্রদেশের লোকের শিক্ষা এমনভাবেই বন্দোবস্ত করি যাতে বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রত্যেক শিশুর কাছে পৌঁছায়, তাহলে আমাদের সামনে নতুন যে সমস্ত অসুবিধা দেখা যাচ্ছে সেটা সহজেই চলে যায়।

আজকের দিনে পৃথিীতে একথা চলছে যে, মানবজাতি একত্র হয়ে একটা মহামানব সমাজ গড়ে তুলবে।কিন্তু এটা কেউ ভাবেন না যে, তার জন্য নিজ নিজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটা বিশেষ কোনও ভাষায় চালাতে হবে। কারণ মনে যদি থাকে ভালোবাসা, তাহলে ভাষার অসুবিধা থাকলেও মানসিক যে মিল সেটা রাখতে অসুবিধা হয় না।

অনেক সময় এই কথাটাই বলা হয় যে, ইংরেজি ভাষা না হলে আমাদের দেশে একথা থাকবে না। বলা হয়, আমরা যাখন পরাধীনতার শৃঙ্খল দিয়ে একত্র বাঁধা ছিলাম তখনই আমাদের মনে ছিল যে, আমরা একই জাতি। অতএব বর্তমানে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই সেই যোগসূত্র বজায় রাখা হোক। কিন্তু একথা বললে ভুল হবে যে, ওই শৃঙ্খল পরবার আগে আমাদের জাতীয়তাবোধ ছিল না।

আমাদের দেশের মধ্যে যাঁরা নেতৃস্থানে আছেন দেশের ঐক্য তাঁরা নিজেদের মনের মধ্যে ততটা হয়ত অনুভব করেন না। আমাদের নেতারা সবসময় অবহিত নন যে সত্যিই পরস্পরের মধ্যে ঐক্যসূত্র কত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দেশ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের লোকেরা যখন বিদেশে গিয়ে একত্র হন তখন তাঁদের চোখে ঠেকে তাঁদের মনের গঠন এবং আচার-ব্যবহার কত এক অথচ বিদেশী থেকে কত তফাত। সেইজন্য আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, প্রাদেশিক ভাষায় নিজ নিজ প্রদেশে যদি শিক্ষা শতকরা পুরোপুরি চালানো যায় তাহলে দেশের ঐক্য ভেঙে যাবে না।

দেশের সা¤প্রতিক ইতিহাসের মধ্যে যেমন অনেক গৌরবময় কথা আছে, তেমনি অনেক কলঙ্কের কথাও আছে। এই কলঙ্কের ইতিহাস যদি আলোচনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে, যাঁদের সূত্রে এই কলঙ্ক ছড়িয়েছে তাঁরা সকলেই ইংরেজি শিক্ষিত। আমি এইটুকু বলতে চাইছি যে, দেশের সা¤প্রতিক ইতিহাসে আমাদের যেমন গর্ব করবার অনেক কথা আছে তেমনি আমাদের দুঃখ করবার, লজ্জিত হবার কথাও আছে। কিন্তু সেই সকলের মূল যদি অনুসন্ধান করা যায় তাহলে এই সমস্ত শোচনীয় ঘটনার মূলে অনেক সময় দেখা যাবে ইংরেজি শিক্ষিত গর্বিত ও স্বার্থপর লোকের কীর্তিকলাপ।

অতএব আমার মনে হয়, ইংরেজি যে দেশের ঐক্যের কারণ তা নয়। একতার কারণ আমাদের নিজেদের মনের মিল। আমরা যদি দরদী হই তাহলে বিদেশী ভাষাভাষীদেরও আমরা আপন করে নিতে পারি, অপরপক্ষে আমাদের মনের মধ্যে যদি ভ্রাতৃবোধ না থাকে তাহলে পাকিস্তান হতে বেশি দেরি হয় না। আবার এই দুই দেশ যাঁরা গড়ে তুলেছেন তাঁরা দুজন একই প্রদেশবাসী, এবং দুজনেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। ইংরেজি ভাষার দ্বারা বহুদিন চেষ্টা করলেও আমাদের দেশে জনজাগরণ হয়নি। তারপর আমাদের জাতীয়তার পিতা যখন দেশের কাছে এসে দাঁড়ালেন-যদিও তিনি ইংরেজি অনেকের থেকে ভালো বলতে ও লিখতে পারতেন – তিনি চেয়েছিলেন এমন ভাষায় কথা বলতে যা সকলেই বুঝতে পারে।স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে একটা নতুন দায়িত্ব আমরা লাভ করেছি। এই স্বাধীনতিার যা কিছু সুফল তা যেন শুধু অল্পসংখ্যক ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিতের আয়ত্তেÍ মধ্যে না থাকে, সেগুলো যেন দেশের সকল লোকের কাছে পৌঁছে যায়।

যাঁরা বলেন, ইংরেজি যদি কম শেখানো হয় তাহলে আমাদের দেমের জানালা বন্ধ করে দেওয়া হবে- যার মধ্যে দিয়ে আসে জ্ঞানের আলোক ও স্বাধীনতার বাতাস, তাঁরা ভুল ধারণা করেছেন যে, চিরকাল ভারতবর্ষের চতুর্দিকে কারাগারের উঁচু পাঁচিল থাকবে এবং আলো আসবে উপর থেকে যেটা কেবল মাত্র উপরতলার শিক্ষিত লোকের কাছে পৌঁছবে এবং সেটা তাঁরা যেমন বুঝবেন সেই রকম নিচের অজ্ঞ লোকদের কাছে পৌঁছে দেবেন। এইভাবে দেশের উন্নতি করা কষ্টদায়ক। তাছাড়া সকলের দায়িত্ব অল্পসংখ্যক লোকের একটি শ্রেণীর উপর চিরকালের জন্য চাপানো উচিত নয়। দেশের লোকের উচিত নিজেদের বোঝা নিজেদের বওয়া। আমরা পনেরো বছরেও একাজে বিশেষ এগোতে পারিনি।

তাই আমার মনে হয় আজকে যে আপনারা বলছেন, ইংরেজি যে প্রধান স্থান অধিকার করে আছে সেখান থেকে তাকে হঠানো হোক – এই কথাটা ভালো করে বিচার করে দেখুন। ভেবে দেখুন বিভিন্ন প্রদেশে কিভাবে এটা কার্যে পরিণত করা যায়। আমি এই হঠানোর জন্য যা বলেছি সেটা শুধু আমাদের আত্মরক্ষার তাগিদেই। কেননা, আমি মনে করি যে ইংরেজির উপর এত বেশি জোর দিলে দেশে শিক্ষাবিস্তারের অন্তরায় সৃষ্টি হবে। যাঁরা শিক্ষকের বৃত্তি গ্রহণ করবেন তাঁদের সারাজীবন চেষ্টা করা দরকার মনের সমস্ত কথা কি করে মাতৃভাষায় প্রকাশ করা যায়।

আমাদের দাবি হল শিক্ষিতদের উপর। তাঁরা চেষ্টা করুন দেশে নতুন যুগ যাতে আসে। শিক্ষার নতুন বাহন তাঁরা স্থির করুন। প্রদেশে প্রদেশে এমন ধরনের ব্যবস্থা চালু করুন যাতে তাড়াতাড়ি আমাদের দেশ থেকে অশিক্ষা অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। এই সূত্রে ভাবোন্মাদীদের একটু সাবধান করে দিচ্ছি যে, শুধু একটা নাম খারিজ করে, একটা নাম কেটে দিয়ে আর একটা নাম চালালেই আমাদের নতুন যুগের আহবান সার্থক হয়ে উঠবে না।

আমাদের প্রয়োজন দেশের লোকদের শিক্ষিত করা, যে সমস্ত বস্তু-জ্ঞান তাদের কাজে লাগে, তাদের নীরোগ রাখে, বিত্তশালী করে, তাদের মুখের খাবার যোগায়- সেই জ্ঞান দেশের সর্বত্র স্বল্প আয়াসেই যেন পাওয়া যায়, এটাই আমি চাই।

এরজন্য বহুদিন চেষ্টা করতে হবে। শুধু একত্র হয়ে আলোচনা করলেই কাজ শেষ হবে না। আমার আশা আছে আপনাদের এই সম্মেলন থেকে বিভিন্ন ভাষা-ভাষীরা দেশে গিয়ে এই কথাটা মনে রাখবেন।এই সম্মেলন সার্থক হবে যদি আমরা সকলের সঙ্গে আলোচনা করে দুটি কথা উপলব্ধি করতে পারি।সে দুটি কথা এই : এক, মাতৃভাষা শিক্ষা রবাহন হলে তাড়াতাড়ি কাজ হাসিল হবে; দুই, আমাদের আঞ্চলিক প্রেম ভাষার উপর নির্ভর করে না, সেটা আমাদের মনের কথা। এই দুটি কথা যদি আপনারা নিয়ে যান তাহলেই মনে করব আপনাদের আয়োজন সফল হল। পারস্পরিক আলোচনার দ্বারা আরও দুটি বিষয়ে সচেতন হব বলে আশা করি। প্রথমত, আমাদের একতা অনেকটা নিচুতে, কেবলমাত্র ওপরে ওপরে, -এক ভাষা বলছি বলেই একতার বন্ধন আসেনি। দ্বিতীয়ত, এমন কোনও সমস্যা নেই যা সমবেত ঐকান্তিক চেষ্টা দ্বারা সমাধান করা যায় না।

আমি পূর্বে বলেছি যে, জাতির ঐক্যবর্ধন হবে কোনও এক বিশেষ ভাষার পন্থায় নয়। মানুষের মনের মিলের উপর যে, জাতির একতা প্রতিষ্ঠিত একথা বিশদভাবে বলবার প্রয়োজন আছে। আমরা যদি কিছু গড়ে তুলতে চাই তাহলে কর্মীদের পরস্পরের মানসিক মিল থাকা একান্ত দরকার। তা না হলে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ থেকে আমরা যে চেষ্টা করব, সেটা যে ইমারতের অংশবিশেষ, তা বোধ হয় সব সময় একভাবে জুড়বে না।

একটি বিদেশী ভাষা, একটি বিদেশী শাসন, আমরা অনেকদিন সহ্য করেছি। যদি এর দ্বারাই ঐক্যসাধন হত, সে ঐক্যসাধন এতদিনে হওয়া উচিত ছিল। তা হয়নি বলেই সংবিধানের স্বীকৃতি ও নির্দেশের বিরুদ্ধে আজ নানা রকম কথা উঠেছে।

আমাদের দেশের ঐতিহ্য বহু শত বৎসরের সাধনার ফল এবং তা যত পুরনোই হোক না কেন, সে সবই আমরা জীবনের মধ্যে আকড়ে রাখতে চাই। ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিস্বরূপ।আমি অন্তত নিজের মন থেকে অনুভব করেছি যে রাজনীতির ক্ষেত্রে যদি ঐক্য নাও থেকে থাকে, মনের ঐক্য যে ছিল সেটা নিজের স্বার্থবোধ কিছুটা দমিয়ে রেখে দেশের মধ্যে কেউ ভ্রমণ করলেই বুঝতে পারবেন। আমাদের দেশের সন্যাসীরা, আমাদের তীর্থযাত্রীরা, আমাদের সাধারণ হিন্দু ছেলেমেয়েরা, এমন কি গ্রামের ভিন্ন ধর্মের লোকেরা যারা এক সঙ্গে থাকেন তাঁরা সকলেই অনুভব করেছেন যে, আমাদের পরস্পরের মধ্যে যে বন্ধন আছে সেটা সহজে ছিন্ন হবার নয়। তবে স্বার্থের সংঘাত কখনও ঐক্যবোধকে আছন্ন করে রাখে। ঐক্যানুভূতিকে জাগিয়ে রাখা সাধনা বিশেষ। মুখের কথায় ঐক্য হবে না।

এই সাধনার পথ কি? আমার মনে হয়, ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের লোকের নিজেদের ভাষার মধ্যে দিয়ে বুঝতে হবে আমাদের ঐতিহ্য কি এবং কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের লোকের সঙ্গে আমাদের মিলন ছিল।পৃথিবীর এই বৈচিত্র্য যে, প্রতি মুহূর্তে মানুষের কাছে দাবি আসে সে একটা নতুন কিছু করুক। তাই আমাদের দেশের ঐক্য আছে যেভাবে অনুভূত হত তার তুলনায় আজকের দিনে যা আমরা গড়ে তুলব সেটা আরও বিশেষ বৈচিত্র্যসম্পন্ন হবে; আরও গভীর এবং তার মধ্যে শক্তি হবে আরও বেশি। এটা আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের কাছে ডাক এসেছে – এবার নিজেকে চিনতে হবে। বিভিন্ন প্রদেশের অধিবাসীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সমস্ত লোককে আঁকড়ে নিয়ে জানতে শিখুক যে, স্বাধীনতার স্বাদ কি, কি আমরা হারিয়েছিলাম এবং আজকের দিনে কি আমরা পেয়েছি।

আমাদের সেই সব রাস্তা দিযে যেতে হবে, যে রাস্তা অনুসরণ করে অন্যান্য জাতিরা উন্নতির চরম শিখরে উঠেছে। এই রাস্তায় আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে। এইজন্য দেশের লোকের সকলের মনের মধ্যে বর্তমান যুগের যে প্রধান কথা তা পৌঁছে দিতে হবে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মনোভাব এখন আর রাখলে চলবে না। মানুষ যে শক্তি অর্জন করেছে প্রকৃতির উপর, তার যে প্রভাব হয়েছে নানা দেশে, সেটা অনুভব করতে হবে শুধু আজকে আমরা যাঁদের শিক্ষাভিমানী বলি তাঁদের নয়, দেশের প্রত্যেককে।

এ না হলে অন্যান্য দেশ যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে তার সঙ্গে তাল রাখতে পারব না। আর সত্যি ভারতবর্ষ বলতে যদি আমাদের মনের মধ্যে একটা বিশেষ ধ্বনি ওঠে, যদি আমাদের প্রাণ কাঁদে স্বদেশবাসীর জন্য, তাহলে একটি বিদেশী ভাষার দরকার হবে না পরস্পরের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করবার জন্য। যে ইংরেজি শিক্ষিত ব্যক্তিরা বিদেশী শক্তিকে দেশ থেকে বের করবার জন্য সংগ্রাম করেছিল তারা যখন নিজেরা ক্ষমতা হাতে পেল তখন তাদের মধ্যে পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবার একটা প্রবণতা দেখা দিতে লাগল।

বিচ্ছিন্ন মনোভাবকে দূর করে সংহতি সৃষ্টির কাজ, মাতৃভাষার মাধ্যমে সহজেই হতে পারে। কেবলমাত্র রজাকীয় মঞ্চ থেকে একতার কথা বললে চলবে না। আমাদের বলতে হবে, প্রত্যেক ঘরের কোণ থেকে এই একতার বাণী। কেবল বললে চলবে না যে, আমরা শিক্ষার বিধান করেছি। সত্যি করে সকলকে মনে করতে হবে যে এটা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এই জন্যই মাতৃভাষার দরকার, সাধনার দরকার এবং মনকে শুদ্ধ করবার দরকার। তাই পরস্পরের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি না করে পরস্পরের মধ্যে প্রেমের আলোচনা করা উচিত।

আপনারা যাঁরা এটা অনুধাবন করেন তাঁরা ধৈর্য ধরে আপনার সীমার মধ্যে কাজ চালিয়ে যান। আমরা ছেলেবেলায় বলতাম, এগিয়ে চল, কেননা উপরের ভগবান আছেন এবং আমাদের ভয় করবার কিছু নেই। আপনাদের মনের মধ্যে যদি একতার ছবি ফুটে ওঠে থাকে তাহলে আপনাদের ভয় করবার কিছু নেই। আপনারা সকলে মিলে যে আন্দোলন শুরু করেছেন তা ক্রমশ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হোক, আমাদের লোকেরা জানুক আমাদের উপর কতটা দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যেন অল্পদিনের মধ্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি – যার ফলে প্রত্যেক শিশু, প্রত্যেক যুবক-যুবতী মানুষ হয়ে উঠতে পারে।আমরা যেন বুঝতে পারি যে, এই বর্তমান যুগে যেখানে আমরা জন্মেছি সেখানে অল্পশিক্ষায় ভীষণ বিপদ আছে।

আর আমার বিশেষ কিছু বলবার নেই। কারণ, কথা বলে যে সব সময় আমরা মনকে স্পর্শ করতে পারি তা ঠিক নয়। একজন লেখক বলেছিলেন যে, ভাষার কাজই হচ্ছে লোকের মনের ভাব গোপন রাখা।আমাদের দেশে একটা বিশ্বাস আছে যে, পরস্পরের বিষয়ে যদি মনোযোগ সহকারে ভাবি তাহলে নিজের মন থেকে যে উত্তর নির্ভুল ইঙ্গিত দেয় তা আপনিই খুঁজে পাব। আমি তাই আশা করি আপনাদের শেষ পর্যন্ত সর্বতোভাবে সাফল্য লাভ করবে।

লেখক পরিচিতি (বাংলা উইকিপেডিয়া থেকে গৃহীত)

সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১ জানুয়ারি ১৮৯৪ – ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক পদার্থবিদ্যা। সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রদান করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে বিবেচিত হয়। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী সত্যেন্দ্রনাথ কর্মজীবনে সম্পৃক্ত ছিলেন বৃহত্তর বাংলার তিন শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন কলকাতা, ঢাকা ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। সান্নিধ্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মাদাম কুরী প্রমুখ মণীষীর। আবার অনুশীলন সমিতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগও রাখতেন দেশব্রতী সত্যেন্দ্রনাথ। কলকাতায় জাত সত্যেন্দ্রনাথ শুধুমাত্র বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রবল সমর্থকই ছিলেন না, সারা জীবন ধরে তিনি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ধারাটিকেও পুষ্ট করে গেছেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর অমর উক্তি, “যাঁরা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা হয় না, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।” বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান পরিচয় নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন নিরলস, কর্মঠ ও মানবদরদী মণীষী। বিজ্ঞানের পাশাপাশি সঙ্গীত ও সাহিত্যেও ছিল তাঁর আন্তরিক আগ্রহ ও বিশেষ প্রীতি। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিজের বিশ্বপরিচয় বিজ্ঞানগ্রন্থ, অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর জাপানে ভ্রমণরচনা ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর অর্কেস্ট্রা কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন।”

Related Posts

About The Author

Add Comment