আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর: বাঙালির আত্মপরিচয়ের অসামান্য দলিল

ইমরান মাহফুজ

আবুল মনসুর আহমদ বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের অকুতোভয় এক যোদ্ধার নাম।  উপমহাদেশে অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে এই নামটি। তাঁর স্বাতন্ত্র আমাদের কাছে এসেছে নানাভাবে। কখনো রাজনীতির মঞ্চে, কখনো সংবাদপত্রে, কখনো সাহিত্যে-স্যাটায়ারিস্ট ও প্রবন্ধের চিন্তানায়ক হিসেবে। আইনজীবী হিসেবেও নামটি সুপ্রিয়। তাঁর জীবনের শুরুতে বাঙালি মুসলমানের চেতনায় উন্মেষযুগকে দেখেছেন, যৌবনে উপমহাদেশের স্মরণীয় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকেছেন, পরিণত জীবনে সংবাদপত্রের সঙ্গে থেকে নানা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বোপরি একজন জীবন শিল্পীর চোখে চারপাশ গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।

আবুল মনসুর আহমদের জীবনকাল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে অনেক শিক্ষিত মুসলমানের মতোই বাংলার আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যময় পটভূমির সন্তান তিনি। স্বভাবতই দুই স্রোতে অবগাহন তাঁর জন্য ভবিতব্যই হয়ে ওঠে। মেধার বিকাশ ঘটান প্রধানত সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির ত্রিধারায়। তবে সাহিত্য ছিল তাঁর রক্তে। হয়তো তাই এর প্রকাশ পায় কৈশোরে-তারুণ্যে।

আমরা দেখি আবুল মনসুর আহমদ জন্মেছিলেন পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতে, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহের ত্রিশাল অন্তর্গত ধানীখোলা গ্রামে, কৃষি-নির্ভর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৭৯-তে, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। সে হিসেবে তিনি ত্রিকালদর্শী পুরুষ; ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-এ তিন আমলের দ্রষ্টা। বিশ শতকের শুরুতে তিনি দুবছরের শিশু, আর তাঁর কৈশোর যৌবন বার্ধক্য গড়িয়েছে এই শতকের আশির দশক পর্যন্ত। এ উপমহাদেশের বাঙালি মুসলমানদের জীবনে এই সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত বিশ শতকের প্রথমার্ধ। আর্থ-সামাজিক-রাজনীতিক ক্ষেত্রে তো বটে, সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমানদের আত্মসচেনতার নব-পর্যায় শুরু হয় প্রধানত এই শতকের প্রথমার্ধে। রাজনৈতিক স্বাধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও শিল্প-সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা সম্পর্কে আত্মসচেতনতার নানা অভিব্যক্তিও প্রকাশ পেতে শুরু করে প্রধানত এই সময়ে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬-এ মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, স্বদেশী আন্দোলন ও ১৯১১-তে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১-১৯২০-এর খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন, ১৯১৬-তে কংগ্রেসের লখনৌ লক্ষ্ণৌ অধিবেশন, ১৯২৩-এর বেঙ্গল ফ্যাক্ট, ১৯২৯-এর নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি, ১৯৩২-এ সিরাজগঞ্জ প্রজা সম্মিলনী, ১৯৩৫-এ সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ, ১৯৩৬-এর কৃষক-প্রজা পার্টি, ১৯৩৭-এর নির্বাচন, ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব, পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও সাধারণ নির্বাচন, ১৯৪৭-এর শরৎ বসুর ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা’, ’৪৭-এর দেশ বিভাগ: পাকিস্তানের জন্ম ও এর পূর্বাঞ্চলের প্রতি বৈষম্য, ১৯৪৯-এ আওয়ামী মুসলিম লীগ তথা ১৯৫৫-এর আওয়ামী লীগ গঠন, ১৯৪৭-১৯৫২এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ইত্যাদি বাঙলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয় এই সময়-কালে। এমনকি, ঘটনার ক্রমপরিণতিতে ৫২’র রক্তঝরা সংগ্রাম, ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাও এই বিশ শতকেরই ঘটনা। যার পূর্বাপর ঘনিষ্ঠ অংশীদার কিংবা পর্যবেক্ষক আবুল মনসুর আহমদ। এই বিশ শতকের শুরু থেকেই তিনি যে উপর্যুক্ত আন্দোলন ঘটনা ও সংগঠনের সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে জড়িত, তা ১৯৬৮তে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে; কিঞ্চিৎ তাঁর ‘আত্মকথা’য়ও রয়েছে। সে-সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার পর্যালোচনা কিংবা রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার বিশ্লেষণ রয়েছে প্রধানত তাঁর ‘শেরে বাংলা হইতে বংগবন্ধু’ (১৯৭৩),‘End of a Betrayal and Restoration of Lahore Resolution’ (1975) ও ‘বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ (১৯৮২) গ্রন্থে এবং গৌণত ‘পাক বাংলার কালচার’ (১৯৬৬) তথা ‘বাংলাদেশের কালচার’ (১৯৭৬) গ্রন্থে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে এবং তৎপরবর্তী দুই দশক জুড়ে পূর্ব বাংলার জনসাধারণ, বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে-রাজনৈতিক চেতনার সূত্রপাত ও বিকাশ ঘটতে দেখা যায়, তার অনুরণন আবুল মনসুর আহমদের রাজনৈতিক জীবনেও শোনা যায়। এই জন্য তাঁর অন্য কোনো জীবন-ক্রিয়া, এমনকি সাহিত্যকর্মও তাঁর রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অধিকন্তু বলা যায়, আবুল মনসুর আহমদের রাজনৈতিক প্রতিবেশই তাঁকে সাহিত্যচর্চার প্রধান উপকরণ জুগিয়েছে। এ-রকম হওয়াই স্বাভাবিক, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের সমাজসচেতন একজন লেখকের পক্ষে। ( ইমরান মাহফুজ সম্পাদিত : জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ, নুরুল আমিনের প্রবন্ধ)

আর কালের বিচারে সম্ভবত অন্য সব পরিচিয় ডিঙিয়ে একমাত্র সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদই যেন সর্বোপরি অধিষ্ঠিত নাম, আজকের যেমন তেমনি অনাগত কালের জন্যেও। মননশীলতার বিচারে আবুল মনসুর আহমদ নামের যে বটবৃক্ষ- সময়ের মধ্যে থেকে সব সহজযোগ নাগালে থাকা স্বত্ত্বেও, সময়ের অনাচারের বিরুদ্ধে, অবিচল বটের মতো স্থির ছিলেন। সম্প্রদায়ের প্রতি; প্রত্যক্ষ ও উচ্চকিত হৃদ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছেন।

জীবন বিশ্লেষণে দেখা যায় নন্দিত এই লেখক, নেতাজী সুভাষ বসুর অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তিনি কংগ্রেস আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হন। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবেও কাজ করেন। মূলত তিনি কৃষক-প্রজা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জনাব আতাউর রহমান খাঁর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিক্ষামন্ত্রী  হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি ছয়দিন উক্ত দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতিতে অল্প কিছু দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্থলাভিষিক্তও ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দল থেকে শুরু করে সুভাষ বসুর আকর্ষণে কংগ্রেস, পাকিস্তান আন্দোলন, কৃষক প্রজা পার্টি, মুসলিম লীগ এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। প্রসঙ্গে উল্লেখ করি আবদুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্য: দীর্ঘদিন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। এক সময় কেন্দ্রের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। পরিণত বয়সে নিজের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিকথা লিখেছেন, ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’। এই বইটির অনেক তথ্য অনেক ঘটনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, মতভেদ রয়েছে নতুন ব্যাখ্যাও রয়েছে। কিন্তু কেউ একথা অস্বীকার করেন না যে এই বইটি পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সাহিত্যের বহুদিনের অভাব ভালোভাবে পূরণ করেছে।

আবুল মনসুর আহমদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও হাস্যরসাত্মক লেখক হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। সাহিত্যের সেই দিকটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন যেটা ছিল সবচেয়ে কঠিন-ব্যঙ্গ সাহিত্য। সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিনায়ও স্বচ্ছন্দে পদচারণা করেছেন তিনি। যে অঙ্গনেই তিনি কাজ করেছেন, সেখানেই শীর্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ব্যঙ্গ সাহিত্যে বলতে গেলে উভয় বঙ্গে তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রতিটি স্যাটায়ারই কালোত্তীর্ণ। সমাজপতি, ধর্মগুরু, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী যেখানেই তিনি কোন দুর্নীতির সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই তাঁর লেখনীর মাধ্যমে কষাঘাত করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গ বিদ্রুপের রসাঘাত কশাঘাতে পরিণত হয়ে সমাজকে পরিশোধিত করতো। এ আঘাত ক্ষয়িষ্ণু সমাজের অবক্ষয়িত মূল্যবোধ আচার অনুষ্ঠানকেই আক্রমণ করেনি- যারা এসব প্রসঙ্গ নিয়ে মিথ্যার জাল বুনে বেসাতি করতেন, তাদেরকেও তিনি নাস্তানাবুদ করেছেন। এসব রচনার পাঠকদের মনে হবে চরিত্রগুলি সবই চেনা-এদের কার্যকলাপও ছিল জানা।

আবুল মনসুর আহমদ ময়মনসিংহের আঞ্চলিক বুলিকে সাহিত্যের ভাষা করতে চেয়েছেন। এটা তাঁর আঞ্চলিক প্রীতির নমুনা হতে পারে কিন্তু আঞ্চলিক বুলিই ভাষা শৈলীর অন্যতম উপাদান একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আংশিক হলেও সত্য। আবুল মনসুর  রচনায় দূরবর্তী দিগন্তে আঙ্গুল নির্দেশ করেছেন। অর্থাৎ গতানুগতিক দেয়াল টপকে বাইরে যেতে চেয়েছেন বরাবরই। আবুল মনসুর আহমদ মাতৃভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ ও গতানুগতিক চিন্তা থেকে কিশোর বয়সেই স্কুলে বাংলায় মিলাদ পড়ানোর নিয়ম চালু করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে  ড. রফিকুল ইসলামের একটি বক্তব্য উল্লেখ করা যতে পারে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারিকে আবুল মনসুর আহমদ একুশ দফাতে পরিণত করেছিলেন’। তাঁর সৃষ্টিশীল প্রয়াস স্বাধীনতা আন্দোলনের দানা বেঁধে ওঠার পেছনে অবদান রেখেছে। আমরা জাতীয়তাবাদের একটা মহান চেতনা তাঁহার কাছ থেকে পেয়েছি। সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক হিসেবে মরহুমের লেখনীকে আমাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে পেতে হবে।’

সত্যি আবুল মনসুর আহমদ তাই ছিলেন। ‘আয়না’, ‘হুযুর কেবলা’, ‘নায়েবে নবী’র মতো রম্য গল্পের জন্যই লেখক হিসেবে তিনি আমার মতো অনেকের কাছে নমস্য। বর্তমান সময়ে মৌলবাদের থাবায় যখন আতংকিত মুক্তচিন্তার মানুষ; তখন থেকে বহু বছর আগে তিনি এই ধরণের গল্প লিখে  সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। আজকের দিনে ধর্মের ব্যপার নিয়ে এভাবে কল্পনা করাও অসম্ভব। কবি নজরুল তার বহু আগেই তথাকথিত আলেমদের দ্বারা কাফের আখ্যায় চিহিৃত হয়েছেন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর বলেন: ‘আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশের স্যাটায়ার রচনার ক্ষেত্রে তিনি যে পূর্ব বাংলার পরশুরাম এ সম্পর্কেও বোধ করি কেউ দ্বিমত হবেন না।’

অন্যদিকে রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ চিত্রশিল্পের বিরোধিতা করলেও সে সময়ে অনেক প্রগতিপন্থি বুদ্ধিজীবী এ শিল্প মাধ্যমের সমর্থন জানান দৃঢ়ভাবে। কাজী নজরুল ইসলাম গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজপতিদের উদ্দেশ্যে লেখেন-

‘আজ বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে একজনও চিত্রশিল্পী নাই, ভাস্কর নাই, সঙ্গীতজ্ঞ নাই, বৈজ্ঞানিক নাই, ইহা অপেক্ষা লজ্জার আর কি আছে? এই সবে যাহারা জগৎ প্রেরণা লইয়া আসিয়াছিল, আমাদের গোঁড়া সমাজ তাহাদের টুটি চাপিয়া মারিয়া ফেলিয়াছে ও ফেলিতেছে। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের সমস্ত শক্তি লইয়া যুঝিতে হইবে’।

কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল চিত্রশিল্পের পক্ষে নিজের সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর চৌচির (১৯৩৪) উপন্যাসের নায়ক তসলীমের যে ভাবনা সেখানে আছে চিত্রশিল্পের প্রতি সমর্থন। এ বিষয়ে আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্য-মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও ভাবধারা প্রকাশের চিত্রশিল্প এমন উত্তম বাহন, তাহা কি মানুষের ধর্ম ইসলাম হারাম করিতে পারে? মানুষের ভাবধারার ইতিহাসে মানব-চিত্তের অভিযানের এ অখণ্ড বিকাশ, ইহার চর্চা ইসলাম নিষেধ করিতে পারে, এই কথা সে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না। তাহার যেন কেন মনে হইতেছিল, এ আমাদের ইসলামকে বুঝিবার ও বুঝাইবার ভুল।

শুদ্ধ চিন্তার আবুল মনসুর আহমদ সাংবাদিকতা করেছেন, রাজনীতি করেছেন, ওকালতি করেছেন এবং সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো এমন  একজন মানুষ আবার সাহিত্য চর্চাও করেছেন। এজন্য তাঁকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আলাদা আলাদাভাবে অন্তত তিনটি জীবনী লেখা দরকার বলে অনেকে মনে করছেন। যার একটি হবে সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে, একটি সাহিত্যিক হিসেবে এবং অপরটি রাজনীতিবিদ হিসেবে। পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখা সম্পর্কে একটা মজার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলে গেছেন। আমাদের এখনকার সম্পাদকদের এই কথাগুলো কাজে লাগতে পারে। তাঁর মতে:

‘সম্পাদকীয় লিখিতে হইলে সম্পাদকদিগকে সব বিষয়ে ‘পণ্ডিত’ হইতে হয়। এঁরা সব-ব্যাপারে সকলের স্বনিয়োজিত উপদেষ্টা। এঁরা জিন্না সাহেবকে রাজনীতি সম্বন্ধে, গান্ধীজীকে অহিংসা সম্বন্ধে, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রকে রসায়ন সম্বন্ধে, ডা. আনসারীকে চিকিৎসা সম্বন্ধে, হক সাহেবকে (এ কে ফজলুল হক) ওজারতি সম্বন্ধে, শহীদ সাহেবকে (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি) দলীয় রাজনীতি সম্বন্ধে, মাওলানা আযাদকে ধর্ম সম্বন্ধে, এমনকি জেনারেল দ্য গলকে যুদ্ধ-নীতি ও স্টালিনকে কমিউনিজম সম্বন্ধে উপদেশ দিয়া থাকেন। সেই উপদেশ না মানিলে কষিয়া গালও তাঁদের দিয়া থাকেন। উপদেশ দেওয়া এঁদের কর্তব্য ও ডিউটি। ঐ জন্যই তাঁরা সম্পাদক। ঐ জন্যই ওঁদেরে বেতন দেওয়া হয়’।

প্রতিভার দিক দিয়ে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। যা আজো আমাদের জন্য গ্রহনীয়।

দুঃসময়ে মানুষ চেনা যায় বটে, কিন্তু নিজের মাথাটা ঠিক রাখা দায় হয়ে ওঠে। তারপরও কেউ যদি হয় একজন ছাপোষা মানুষ, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো সাহিত্যের ভূত কাঁধে সওয়ার হয়, তাকে যুদ্ধটা করতে হয় নিজের সাথেই। বিশ শতকের সবার জন্যই একথা সত্যি। দুটো কাঠি এগিয়ে আবুল মনসুর আহমদ একজন ভিশনারি বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতিকে যেমন পথ দেখিয়েছেন তেমনি আবার প্রকৃত রাজনীতিবিদ হিসেবে একুশ দফা, যুক্তফ্রন্ট সংগঠন, ছয় দফার প্রচারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাঁর বন্ধু আতাউর রহমানের মতে- পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের ‘রাজনৈতিক হরিঠাকুর হয়েছিলেন আমৃত্যু। ভুল তো তার হতেই পারে, আর দোলন যে তার প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য!

আবুল মনসুর আহমদের জীবন থেকে দেখি দেশপ্রেম বুকে নিয়ে সারাজীবন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর দেখা সমাজের প্রতিটি অসঙ্গতি নিয়েই কলম ধরেছেন। সময়ের বুকে পা রেখে কুয়াশা ভেদ করে দেখেছেন আলো। সর্বত্র বিচরণে দিনে দিনে তার কলম হয়ে উঠছে দুর্ধর্ষ। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রেরণা যুগিয়ে, সবার মাঝে দিয়েছে শুদ্ধচিন্তার খোরাক। স্বতন্ত্র কালচারের স্বপ্ন দেখে একাধিক গ্রন্থও রচনা করেন। এমারসন বলেন, ‘স্বকীয়তা ধরো, অনুসরণ ছাড়। অনুসরণ আত্মহত্যার শামিল’। এক্ষেত্রে আবুল মনসুর আহমদের দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ার মতো। প্রকৃত দেশপ্রেম কী তার লেখা না পড়ে উপলব্ধি করা অসম্ভব।

আবুল মনসুর আহমদ এ যুগের এক গভীর চিন্তাবিদ হিসাবে ব্যঙ্গ সাহিত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন সকল অনাচারের বিরুদ্ধে হাতিয়ার রূপে। পশ্চাদমুখী জীবনবিমুখ দৃষ্টিকোণ দেখে তিনি প্রতিবাদ করেছেন লেখায়। বহুমুখী এই প্রতিভার কারণে নানান জায়গার নানা মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। দেখেছিলেন জীবনকে খুব কাছ থেকে। অন্তঃসারশূন্য মুসলমান সমাজের পশ্চাৎমুখী দৃষ্টিকোণ, জনসেবার নামে দেশবাসীকে বঞ্চনার প্রচেষ্টা তিনি অতি গভীর ও নিবিড়ভাবে দেখতে ও বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ব্যঙ্গ সাহিত্যকে তাঁর দেশসেবার আদর্শ বাহন হিসেবে নিয়েছেন। রচনাগুলি আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হাসির সৃষ্টি করলেও লেখকের মর্মভেদী কান্না, কখনো স্পষ্ট, কখনও প্রচ্ছন্ন থেকে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তিনি হেসেছেন, হাসিয়েছেন, কিন্তু হৃদয় নিংড়ানো কান্নাও কেঁদেছেন প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার চরণের সাথে সাথে তাঁর অনুভূতির কিছুটা মিল তাঁর রচনায় দেখা যায়। ‘বাইরে যবে হাসির ছটা, ভিতরে থাকে আঁখির জল’।

সৃষ্টিশীলদের কলম বা তুলিতে সব সময় সময়ের করুণ চিত্র ফুটে উঠে। শিল্পী জয়নুল আবেদিন তাঁর অমর স্কেচে একেঁছেন দুর্ভিক্ষের চিত্র, কবি ফররুখ আহমদ তাঁর বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতায়, আবুল মনসুর আহমদ ব্যঙ্গ গল্পে। তার প্রায় লেখায়, দুর্ভিক্ষের চিত্রের সাথে দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ীদের চিত্র, মৃত মানবতা ও চেতনার চিত্র যথাযথ তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি কথা বলেছেন স্বদেশ চেতনায় সাহসী কণ্ঠে। বিষয়টা আর একটু পরিষ্কার করি, খোন্দকার আবদুল হামিদের (স্পষ্টভাষী) ভাষায়, ‘আবুল মনসুর আহমদ সাহেব দশ বছর আগে যাহা বলিয়া বা লিখিয়া গিয়াছেন তাহাই আজ বর্ণে বর্ণে সত্য হইতেছে। বিস্ময়বিষ্ট হইয়া ভাবি, এতো আগাম সত্য তিনি কি করিয়া বলিয়া গিয়েছেন। সত্য প্রকাশে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়স্বার্থেও ক্ষমতাসীন মহলকে সাবধান করিতে তাহার ন্যায় মহান প্রতিভাধর প্রবীণ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকেও কখনো কখনো হুমকির সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। কিন্তু তিনি সেসব হুমকির জবাব তাঁর অননুকরণীয় মিছরির ছুরিতে ও ভঙ্গিতে এমনিভাবে দিয়াছেন যাহার মোকাবেলায় ক্ষমতামত্তরাও স্তব্ধ হইয়া পরাভব মানিয়েছেন। এক কথায়, জাতির বিবেকের সদা জাগ্রত প্রহরী।’

আবুল মনসুর আহমদ বাংলাসাহিত্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর লেখায় সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক আবহকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে যে নবচেতনায় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, তা থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি চারপাশ। দেদারসে চলছে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, পীরফকিরের দৌরাত্ম, রাজনীতির নামে ভণ্ডামি ও প্রতারণা। কিন্তু কেউ যেন নেই! পরজীবীরা কুণ্ডলি পাকিয়ে বসে আছে আবাদ মাধ্যমে। ধারাবাহিক সিরিজ দেখেই চলছে দর্শক। যেন কিছুই করার নেই, সবাই পাথর। তাই-সময়ের মোকাবেলা বা প্রতিধ্বনি তোলার জন্য আবুল মনসুর আহমদকে পুনরায় আলোচনা, মূল্যায়ণ ও বিশ্লেষণ জরুরি। এ প্রসঙ্গে ড. নুরুল আমিন বলেন: ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও ঐতিহ্যিক বিভাজন  রেখা নিয়ে আমরা অনেকেই একমত পোষন করি না, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রশ্নে আমরা নির্দ্বিধায় একমত। আবুল মনসুর আহমদ এক সময় সচেতনভাবে সে সব কথা চিন্তা করেছেন এবং বাস্তবে তাঁর চিন্তার যথার্থ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। সময়ের অভিঘাতে তাঁর চিন্তার মূল্যায়ণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে, মার্কিন জাতির মতো যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ ততই বেশী করে ‘বাঙালি ইমার্সন’ আবুল মনসুর আহমদকে জানবার চেষ্টা করছেন। তাঁকে নিয়ে কেউ কেউ পৃথক সমাজ-দর্শনের যুক্তিতে রাজনৈতিক স্বাতন্ত্রের প্রচ্ছন্ন চেহারাও উম্মোচনেও সচেষ্ট হচ্ছেন।’

এমনি গুণিমানুষের লেখা ও জীবনচিন্তা আধুনিক সমাজে আজো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁকে নিয়ে ব্যাপক গবেষনার প্রয়োজন আছে।

ইমরান মাহফুজ: কবি ও সম্পাদক: কালের ধ্বনি।

(বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম এর ৯৩ তম পাবলিক লেকচারে দেওয়ার বক্তৃতার লেকচার নোট। বাংলাদেশ পাঠ উৎসব এর আওতায় আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইটির উপর আলোচনা রাখেন ইমরান মাহফুজ।)

Related Posts

About The Author

Add Comment