আলুর পাঁচালী

আলু। নামটা উচ্চারণ করা অনেক সহজ। কিন্তু এই গোল কিংবা ডিম্বাকৃতি জিনিসটি বহুত ঝামেলার সাক্ষী। বেশিদূর যাওয়া লাগবে না; এটি মাঠ ফসল(এগ্রোনমিক) নাকি উদ্যান ফসল(হর্টিকালচারাল) তা নিয়েই তো চিরকালের দ্বন্দ্ব। আমি কোন পক্ষে যেতে চাই না এখন। যখনই চালের যোগানে টান পড়ে, তখনই বলা হয় “ভাতের বদলে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান”। জনগণ ভাতের বদলে আসলেই আলু খেয়েছে কিনা জানি না। তবে ইতিহাসের বহু বাঁকে এই আলুই যে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে তা পরিষ্কার। আমার আজকের লেখা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আলুর ইতিহাস নিয়ে।

আলু আজকের ফসল না। বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন আজ থেকে প্রায় ১৩০০০ বছর আগে আলুর বুনো জাতের উদ্ভব হয়েছিল । এবং প্রায় ৭০০০ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রথম আলু চাষ  শুরু হয়।

ইনকা সভ্যতা স্মরণীয় হয়ে আছে এই আলুর জন্য। তারা আলুর ভিতরের আর্দ্রতা বের করে এক বিশেষ উপায়ে একে চূর্ণ করে(ভর্তা করেও বলতে পারেন) চুচু নামক এক খাবার তৈরি করতো। প্রায় ১০ বছর সংরক্ষণ করা যেতো সেই খাবার যেটা ছিল তাদের আকালের দিনের রক্ষাকবচ। তারা বিশ্বাস করতো যে, গর্ভবতী মায়েরা বেশি আলু খেলে প্রসব বেদনা কম হয়। আলু দিয়ে অনেক রোগের চিকিৎসাও করা হতো ইনকা সভ্যতায়। সেই ইনকানদের কথা যখন স্পেনিশরা লিখেন, তারা এই ফসলকে নাম দেন বাটাটা  । যদিও ঐ সময় ইন্ডিয়ায় মিষ্টি আলু বাটাটা নামেই পরিচিত ছিল। অর্থাৎ স্পেনিশীয়দের এডিটে(!) ভুল ছিল।

১৫৩২ সালে পেরুতে সোনার খোঁজে এসেছিল স্পেনিশ দখলদাররা। তারা জানতো যে সোনার খনিতে কাজ করা ইনকানরা আলু বা চুচু খেত। যদিও স্পেনিশরা তখন পর্যন্ত সোনার চেয়েও দামী আলুর মর্ম বুঝতে পারেনি কিন্তু যখনই জাহাজে করে তারা বিভিন্ন এলাকায় যেত, সাথে করে খাবার হিসেবে আলু নিয়ে যেত। কিন্তু ঐটা ঐ জাহাজ পর্যন্তই ছিল, ঘরবাড়িতে আলুর প্রবেশ তখনো হয়নি। ১৫৭০ সালে স্পেনে প্রথম আলুর ছোটখাটভাবে চাষ হয়।মজার ব্যাপার হলো এই আলু চাষ করা হয়েছিল গরু ছাগলের খাবারের জন্য। মানুষ তখন আলু খাবে?? কাভি নেহি।

আলু আস্তে ধীরে ইউরোপে ছড়িয়েছে কিন্তু ইতিবাচকভাবে না। আজব হলেও সত্যি যে, মানুষ এটাকে অবিশ্বাস, সন্দেহ আর ভয়ের চোখে দেখত। একেবারে খাওয়ার কিছু না থাকলে একেবারে হতদরিদ্র মানুষ আলু খেত, অন্যথায় ওটা গরু ছাগলই খেত। নেহাৎ নতুন ধরনের গাছ বলে উত্তর ইউরোপে কিছু বোটানিকেল গার্ডেনে লাগানো হয়েছিল আলু গাছ। ইউরোপের মানুষের নাক উঁচু স্বভাব ছিল। আলু সুন্দর কোন সাইজ না হলে তারা খাবে না, আলু দেখতে কেমন যেন, তারা খাবে না, আলু বর্বর সভ্যতার জিনিস বলে তারা আলু খাবে না, আরো কত যে ন্যাকামো। এমনকি কিছু লোক তো রীতিমত ভাবতে শুরু করলো আলু গাছ ডাইনিদের সৃষ্টি। মানুষকে সম্মোহিত করতে নাকি ডাইনি জাদুকররা আলু বানিয়েছে।

আরও প্রায় ১০০ বছর পরেও মাংসপ্রিয় ইউরোপিয়ানদেরকে আলু খাওয়ানো যায়নি। আলু নাকি বিস্বাদ!! ১৬৬২ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি সুপারিশ করে সরকারের প্রতি ও জনগণের প্রতি আলু চাষের জন্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা। অবশ্য আলুর কপাল খুলতে বেশি দেরিও হয়নি। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডে রিভল্যুশনারি যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। জনগণ বাধ্য হয় খাবার টেবিলে আলু রাখতে। তখন ইংল্যান্ডের তৎকালীন বোর্ড অব এগ্রিকালচার আলু চাষ এর নিয়মকানুন নিয়ে প্রচার-প্রচারণা শুরু করে। শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের।

এই ধরনের ঘটনাগুলো শুধু ইংল্যান্ড এই নয়, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সেও ঘটেছিল। মজার ঘটনা হলো, সেই সময়ের সৈন্যরা যখন খাবারের খোঁজে কৃষকের মাঠে লুটতরাজ করতো, মূলত তারা গম, আঙুর ইত্যাদি ফসল যেগুলো সহজেই কেটে ফেলা যায় সেগুলো লুট করে নিয়ে যেত। আলু যেহেতু মাটির নিচে থাকতো, মাটি কেটে আলু লুট করার ঝামেলায় তারা যায়নি। একারণে কৃষকরাও আলু চাষ করে নিরাপদ থাকতো। তবুও ১৭০০ সালের আগ পর্যন্ত আলু চাষে তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। হবে কি করে? জনগণের ধারণা আলু খারাপ, না দেখতে ভালো না খেতে ভালো! খেলে আবার অসুখ বিসুখ হয় কিনা! ১৭৭১ সালে ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা হয়। তবে মানুষের ভুল ধারণার অবসান ঘটানোর জন্য রাজা ষোড়শ লুই জামার বোতামে আলুর ফুল লাগিয়েছিলেন, রাণী মেরি এন্টোনি চুলের খোঁপায় আলুর গোলাপী মুকুল রাখতেন। আলুর কপাল এমনি এমনি খোলে নি।

প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিকও চেষ্টা করেছিলেন তার রাজ্যের লোকদের আলু খাওয়াতে; পারেননি। কারণ? ঐ যে, স্বাদ নাই, গন্ধ নাই, বেসাইজের আলু কে খায়? এদিকে রাজ্যে খাদ্য সংকট চলছে, গমের দাম হু হু করে বেড়ে চলছে। লোকজন না খেয়ে মরবে নাকি? রাজা পড়লেন বিপদে। রাজা ফন্দি আঁটলেন। রাজ্যের লোকজনের ওপর উল্টো সাইকোলজি প্রয়োগ করলেন। তারঁ রাজকীয় বাগানে তিনি আলু চাষ করলেন, কঠিনভাবে ঘোষণা দিলেন এখান থেকে কোন আলু চুরি করা যাবে না। কে না জানে নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে। লোকজন ঐ বাগান থেকেই আলু চুরি করলো। যেটা এত গার্ড দিয়ে রাখা হয়, সেটাই তো চুরির জন্য উপযুক্ত। চুরি করে আলু গাছ নিজেদের বাগানে লাগিয়ে দিলো কৃষকরা। রাজা মিটিমিটি হাসলেন। তিনি তো এটাই চেয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদরা নাকি প্রায়ই বাহাস করেন শিল্পবিপ্লব যুগে ইংল্যান্ড এর জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণ নাকি ছিলো আলু। শিল্প বিপ্লব অনেক নতুন কিছুর আবিষ্কারক। তো যেই শিল্প বিপ্লবের পূর্বে ইংল্যান্ড এর মানুষের খাবার ছিল রুটি, মাংস, মাখন ইত্যাদি, সেই শিল্প বিপ্লবই বাধ্য করেছে তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণও ছিল। ঐসময় প্রচুর মানুষ শহরে ভীড় করেছিলো কাজের জন্য। এত মানুষ তো বাসা বাড়িতে ফ্রিজ কিংবা ওভেন কিনতে পারতো না। তো ১২-১৬ ঘন্টা কাজ করে কার এনার্জি থাকতো বাসায় এসে আবার রুটি বানাবে, মাংস পাকাবে। তার চেয়ে দেখ ভালো আলুর এত ঝামেলা নাই। একটা আলু খেলেই পেট ভরে যায়,এত আয়োজন করে রান্নাও করতে হয় না।

এর মধ্যে অবশ্য ব্যতিক্রম ছিল আইরিশরা। তারা ইনকানদের মতই আলুর মাহাত্ম্য বুঝতে পেরেছিল। আয়ারল্যান্ড মাটি আর আবহাওয়াও অবশ্য অনুকূলে ছিল আলু চাষের। সে কারণে কৃষকরাও একে সহজভাবে নিয়েছে কোন রকম সন্দেহ ছাড়াই। আয়ারল্যান্ডে আলু প্রধান খাবার হিসেবে পরিগণিত হয় ১৮০০ সালের দিকে। জনসংখ্যাও বাড়তে থাকে তখন থেকে। তাহলে কি আলুই জনসংখ্যা বাড়িয়েছে। ঐতিহাসিকরা ঐরকমই মত দিয়েছেন। ১৭৮০ সাল এবং ১৮৪০ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আলুর ব্যাপক চাষ ছাড়া লক্ষণীয় এমন কোন ফ্যাক্টর পাওয়া যায় না যার কারণে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। আয়ারল্যান্ড এর কৃষি ব্যবস্থা তখন এতটা উন্নত ছিল না। কিন্তু ইতিহাস বলে সেখানকার সবচেয়ে গরিব চাষীটিও অনেক স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে পারতো এই আলু চাষের বদৌলতে। এতে তেমন বড় কোন বিনিয়োগ করা লাগতো না কিংবা খুব শ্রমও দেয়া লাগতো না। এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও সহজে আলু রোপণ করতো , মাঠ থেকে আলু সংগ্রহ করতো। কোন মাড়াইয়ের প্রয়োজন হয়নি কিংবা প্রয়োজন হয়নি ফসলোত্তর শ্রমসাধ্য কোন কাজের। এই যে আলু এত প্রাচুর্য দিলো, তাতে করে শিশু মৃত্যুর হার কমে যায়, বেড়ে যায় বাল্যবিবাহের।

এখানেই শেষ করছি, তবে একেবারে না। আলু একটা বড় দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল। পুরো একটা মহাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো এই আলু। সেই গল্প আরেকদিন হবে। দুঃখিত; গল্প নয়, সত্যি।।

সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ

২৬ অক্টোবর,২০১৭

তথ্যসূত্র

  1. Jeff Chapmen (2005). The story of most important vegetable.

2.Spooner, DM (2001).The geographic distribution of wild potato species. American J. Bot          88(11):2101-12

3.Office of international affairs (1989). Lost crops of the Incas: Little-known plants of the Andes with Promise for Worldwide Cultivation.

Related Posts

About The Author

Add Comment