আল মাহমুদের ‘কবির মুখ’

আল মাহমুদের ‘কবির মুখ’: কবির মুখে কবির কথা, কবি হয়ে ওঠার কথা, কবিতার কথা

আল মাহমুদের ‘কবির মুখ’: কবির মুখে কবির কথা, কবি হয়ে ওঠার কথা, কবিতার কথা

আল মাহমুদ বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি কিনা এ নিয়ে মত ও মতান্তর রয়েছে।আল মাহমুদের ব্যক্তি অবস্থান নিয়ে সমালোচক ও কবিতার পাঠকেরা কয়েকটা বড় দাগে বিভক্ত। তবে আল মাহমুদ যে বাংলা কবিতার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা এ নিয়ে সন্দেহ করার লোক খুবই কম। তার রাজনৈতিক অবস্থান, মতামত নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে কিন্তু কবি হিসেবে তাকে বেশ উঁচুতে না রাখলে আপনি খুব নীচতার পরিচয়ই দিবেন। মোটামুটি দীর্ঘ জীবনের অধিকারী আল মাহমুদের কবিতা লেখালেখি ছয় দশক পার হয়েছে।

কবি পরিচয়ে তার গল্পকার পরিচয়টা হারিয়ে যাওয়ার মতো নয়। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকারও। তার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ বাংলা সাহিত্যে একটি সোনালী সংযোজন। আর গদ্যকার হিসেবেও তিনি কম যান না। তার প্রবন্ধ পড়লে, আত্মজীবনী পড়লে আমরা আল মাহমুদের গদ্যশৈলীর সাথে ভালোভাবে পরিচিত হতে পারি।

‘কবির মুখ’ আল মাহমুদের আত্মজৈবনিক লেখা। আল মাহমুদের কথাশৈলী একেবারে হৃদয়স্পর্শী। সহজ ভাষায়, আলাপচারিতার ঢঙে কোন ধরণের স্কলারলি কচকচানি বাদ দিয়ে নিজের জীবনকে পাঠকের সামনে নাঙা করেছেন! এটা মনে রাখার বিষয়, কবিদের একটা বড় গুণ হচ্ছে সত্য কথা বলা, তা যদিও নিজের বিপক্ষে যায়। আল মাহমুদ নিজেকে নিয়ে কোন ধরণের ভনিতা করেন না। যা বিশ্বাস করেন, যা মনে মগজে ও হৃদয়ে ধারণ করেন তা প্রকাশ করেন। তার মধ্যে কোন প্রতারণা নাই, অসত্যের অপলাপ নাই, ভণ্ডামী নাই, নীচতা নাই। তিনি যখন কমিউনিস্ট বিপ্লবী ছিলেন তিনি তার আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন, বিশ্বস্ত ছিলেন। এখন যেমন ডানপন্থী মতাদর্শ ধারণ করেন ও বিশ্বাস করেন তা নিয়ে লুকোছাপা করেন না। আল মাহমুদের এই শীরদাড়া সোজা মনোভাবকে আপনি বোকামি বলতে পারেন, ভুল বলতে পারেন কিন্তু তার আদর্শের প্রতি দৃঢ়তাকে অবহেলা করতে পারেন না। আমরা তার আত্মজীবনী ‘কবির মুখ’ এ তার সে রূপটাই দেখতে পাবো যেমনটা তিনি ছিলেন তার দীর্ঘ কবিজীবনে ও ব্যক্তিজীবনে।

আল মাহমুদকে নিয়ে যে কথাটা বলতে হয় তার ব্যক্তিজীবন, রাজনীতি ও কবিজীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তিনি কোনদিন এ দেয়াল দেননি। আমরা ‘কবির মুখ’ এ একজন কবির প্রতিমূর্তিই দেখতে পাবো। তিনি কবিতার খাতায় যেমন কবি, জীবনের পাতাতেও তেমন কবি। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে যদি বলি তার জীবনের কবিতার রং বইয়ের কবিতার রংয়ের চেয়ে কম রঙিন বা বৈচিত্রময় নয়। এজন্য তার আত্মজীবনী পড়া তার কবিতার মতই মনোহর।

চলুন তার জীবন সমুদ্র থেকে কয়েক চামুচ পান/পাঠ করে আসি!

প্রথম প্রেম, প্লাটনিক প্রেম

প্রথম প্রেমটা বেশিরভাগ বালকেরই তার চেয়ে বয়সীর প্রতি হয়। কারণ হৃদয়ের ফ্রেমে যে প্রেয়সীর মুখ আকা হয় তার সমবয়সী বলয়ে পাওয়া যায়না অনেক সময়। পুষ্ঠ ও পরিপূর্ণ বয়সের বড় কোন মেয়েকেই মন দিয়েই প্রেমে পতন শুরু হয় ছেলেদের। আল মাহমুদও তার চেয়ে বয়সে বড় একজনের প্রেমে পড়েছেন। সেটা বেশ মজার গল্প!

সাদু বুবু বা সাদেকা নামে ৫ বছরের বড় ফুফাতো বোনের প্রেমে/বন্ধুত্বের টানে পড়েছিলেন বালক আল মাহমুদ। আল মাহমুদদের বাড়িতে ওই ফুফাতো বোনের কিছুদিন অবস্থানকালে এক নির্ভরশীলতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন আল মাহমুদ। তার ছন্নছাড়া জীবন সুশৃঙ্খলে নিয়ে আসার আদি মানবী এই সাদু বুবু। তাই অন্য জায়গায় সাদু বুবুর বিয়ের সংবাদ শুনে তাকে হারানোর ভয় চেপে বসলে নিজেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন।মুহূর্তের তাৎক্ষণিকতায় হতবিহ্বল হয়ে আবার সাদু বুবু ভুল বুঝেন কিনা সেজন্য তার কাছে মাফ চাইতে চাইতে অস্থির।মেয়েরা খুব অল্প বয়সেই সংসার ধর্ম সম্পর্কে পরিপক্বতা অর্জন করে ফেলে, সংসার পরিচালনা করার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা অর্জন করে। তো, সাদু বুবু বা সাদেকা বাচ্চা ছেলে মাহমুদের এ কাণ্ড দেখে হেসেই কূল পান না আবার রাগ করবেন কি?

নূর আলী ফকির

আল মাহমুদের শৈশবের সবচেয়ে উজ্জল কয়েকটা চরিত্রের মধ্যে এটা অন্যতম। কবির সংবেদনশীল মন গড়ে উঠার পেছনে বৈচিত্র্যময় নূর আলী ফকিরের জীবনের অনেক প্রভাব রয়েছে বৈকি।গাছের সাথে কথা বলার দৃশ্য প্রথম দেখেছিলেন নূর আলী ফকিরের মাঝেই।এবং নৈশবিহার, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালির সাথে আত্মীয়তা করার ক্ষেত্রে অন্যতম অনুপ্রেরণা নূর আলী ফকির। তার নির্মম মৃত্যু আল মাহমুদের মত সব পাঠকই ছুঁয়ে যাবে।

একজন পাঠকের গল্প, এগিয়ে যাওয়ার গল্প

বইয়ের প্রতি, অক্ষরের প্রতি, শব্দের প্রতি, গল্পের প্রতি, রহস্য ও রহস্যময়তার প্রতি প্রেম দেখে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। ‘কবির মুখ’ শুধু একজন কবির আত্মজীবনীই নয়, একজন পাঠকের আত্মজীবনীও বটে। পুরো আত্মজীবনীরই পরতে পরতে আপনি আল মাহমুদের অনেকগুলো বাতিকের মধ্যে যেটা স্পষ্ট হয়ে উঠে সেটা হলো বই পড়ার বাতিক। ইংরেজিতে ‘বিবলিওফিল’ শব্দটি আল মাহমুদের জন্য পুরোপুরি মানানসই।

সব বইপোকাদের মত খুব আজব আজব জায়গা থেকে বই সংগ্রহ থেকে শুরু করে পড়ার গল্প আল মাহমুদে প্রচুর। আমাদের ভাগ্য খুব ভালো যে আল মাহমুদ তার প্রস্তুতিকাল নিয়ে কোন লুকোচুরি বা রহস্যময়তার আশ্রয় নেননি। তার বিস্তর পাঠের ফিরিস্তি এবং বই প্রেমের গল্প আমাদের অপাঠের ঐতিহ্যে একটু ধাক্কা দিবে আশা করি।

আল মাহমুদ পুরো বিশ্বকে সত্যিকার বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে নিয়েছিলেন, গাছ, লতা-পাতা, নদী, পশু-পাখিকে তার শিক্ষক ও বন্ধু বানিয়েছেন। এজন্যই তো তিনি পাখির কথা, ফুলের কথা, নদীর কথা, নদীপাড়ের মানুষের কথা বলতে পেরেছেন অন্য অনেকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।আল মাহমুদ কোন স্কুলঘরে কতটুকু পড়েছেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না হলেও তিনি যে পুরো জীবনটাকে একটি স্কুলঘর এবং নিজেকে তার অনুগত ছাত্র বানিয়েছেন এ নিয়ে সন্দেহ করার জো নেই।এই বইয়ের সাথে প্রেম করতে গিয়ে আল মাহমুদ তার বয়সী ছেলে-মেয়েদের চেয়ে হয়ে গেলেন অনেক আলাদা।

সব ব্যাপারেই কেমন যেন উদাসীন। সংসারের কোন তোয়াক্কা করেন না, খেলাধূলার ধার ধারেন না, বাবার কাছে কোন বায়না ধরেন না, কোন জিনিস চেয়ে আবদার করেন না এমন অ-শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য ভর করেছিল আল মাহমুদে। এটা নিয়ে মায়ের নালিশ ছিল বেশ। একবার বাসায় আশ্রয় নেয়া এক আগন্তুক মহিলার কাছে ছেলের এ দোষকীর্তন করার পর ঐ ভদ্রমহিলা ব্যাপারটা অনুধাবন করে বলেছিলেন-

ভালো তো! জ্ঞানে যারা তৃপ্তি পায় তাদের নাকি ক্ষুধাতৃষ্ণার বোধ থাকে না…..  (পৃষ্ঠা, ৭২)

সুবোধ ভাল ছাত্র নয়, বড় মানুষ হয়ে উঠার গল্প

তথাকথিত ভাল ছাত্র হওয়ার খায়েশ কখনো ছিল না আল মাহমুদের মধ্যে। বরং টিপিক্যাল পুঁথিপোকা ভালো ছাত্ররা যে জীবন সম্পর্কে গভীর পাঠ দিতে পারে না সেটা নিয়ে মৃদু টিপ্পনী কেটেছেন।

ক্লাসের সবচেয়ে নীরস গোমরামুখ ছেলেটি ছিল সবচেয়ে ভালো ছাত্র সে হাসত না দিনরাত তার একমাত্র কাজ ছিল উবু হয়ে অঙ্ক নিয়ে পড়ে থাকা কিম্বা পড়া মুখস্ত করা তাকে সবাই ভালবাসত শিক্ষকগণ সকলেই ছিলেন তার প্রতিই যত্নবান তাকে সবাই ঠেলত বেশি নম্বরের দিকে পড়তে পড়তে তার চোখ দুটি ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল বড় হয়ে সে নিশ্চয়ই মানুষ হয়েছিল আমরা কেউ জানি না সে কতবড় মানুষ হতে পেরেছিল শুধু এটুকু আন্দাজ করি অনেক মানুষের ভিড়ে সে হারিয়ে গিয়েছে

আমরা একই ক্লাসের আরো কয়েকজন হতভাগ্য ঠিকমতো মানুষ হতে পারিনি বলে সত্যিকার মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করিনি মানুষ হওয়ার জন্য যেহেতু কোনো পরিকল্পনাই ছিল না, সে কারণে বখাটেরা যেভাবে বেড়ে ওঠে তেমনি আমরাও আমাদের ইচ্ছামতো গাছের মতো আকাশের দিকে মাথা তুলতে চেয়েছি এতে যে খুব একটা খারাপ জীবন কাটিয়েছি এটাও ঠিক নয় মানি আমাদের জীবন নিরবচ্ছিন্ন সুখে কেটে যায়নি তবে নিঃসীম দারিদ্র্যের মধ্যেও মোটামুটি স্বপ্নের মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে যেসব শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আমাদের মানুষ করতে পারেননি বলে একদা অনুতপ্ত ছিলেন, কেন জানি মনে হয়, আমরা সেই গুরুজনদের চেয়ে মন্দ জীবন কাটাইনি আজো যখন মাঝেমধ্যে কোনো শিক্ষকের সাথে কালেভদ্রে কিম্বা দৈবাৎ দেখা হয়ে যায়, নত হয়ে কদমবুসি করে দাঁড়ালে তিনি মাথায় হাত রেখে যে কথা বলেন তাতে মনে হয় না একেবারে বয়ে গেছি

(পৃষ্ঠা ৫৩৫৪)

সমবয়সীদের পড়ালেখার ফিরিস্তি তুলে ধরার সাথে সাথে নিজে কেমনে বড় হয়েছেন, কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন তার আলেখ্যও বর্ণনা করেছেন।

আমি যথেচ্ছ পড়াশোনার মধ্যে যেমন কল্পনার খোরাক পেতাম, তেমনি শব্দের অন্তর্গত সৌরভও টের পেতাম আমার অজ্ঞাতেই আমি কিশোর বয়সেই বাংলাভাষায় লিখিত যে কোনো পুস্তকের অন্তর্বস্তুকে অধ্যয়নের দ্বারা অন্তত উপলব্ধি করতে পারতাম কেউ কেউ বলেন ভাষাই নাকি মানব সন্তানের ব্যক্ত হওয়ার একমাত্র উপায়যে উপায় ধীরে ধীরে অসচেতনভাবে আমার নাম মাত্র আয়ত্তে এল শক্তি নিয়ে আমি কী করব ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে দিনরাত এর চর্চায় মেতে থাকলাম শুধু বই আর বই পড়ার টেবিল অপাঠ্য বইপত্রে ভরে গেল খেলাধূলা বা সাধারণ আমোদআহলাদ পরিত্যক্ত হল যেখানে বই পাওয়া যায় সেসব বইয়ের দোকানে বা সাধারণ গ্রন্থাগার ছাড়া আর কোথাও যাতায়ত রইল না

(পৃষ্ঠা৫৪)

এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে ভদ্রলোকটি যাচ্ছিলেন তিনি বর্তমান বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিটি নয় বরং একজন ক্লাস সিক্সের ছেলে যে খুব টেনে হিচড়ে নিজেকে ক্লাস সেভেনে নিয়ে যাচ্ছিল!

আজন্ম গ্রাম্যতা

আল মাহমুদ আজন্ম গ্রাম্য ছিলেন এবং থাকার চেষ্টা করেছেন এবং সেটা অকপট স্বীকার করেছেন এবং তার গ্রাম্যতার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন বেশ স্পষ্ট ভাষায়। শহুরে হওয়ার যথেষ্ঠ সুযোগ ছিল এবং তার পরিবার যে কলকাতার সাথে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিল এবং নিজের জন্য শহুরে হওয়ার যে যথেষ্ঠ সুযোগ ছিল সে প্রসঙ্গ টেনেছেন। এখানে তার সরল স্বীকারোক্তি,

এই গ্রাম্যতা আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পাইনি আমার পিতামাতা আমার সাবেক পরিবেশ, যা আমি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় ফেলে চলে এসেছিলাম তা ছিল পরিপূর্ণভাবে নাগরিক স্বভাবের তৎকালীন কলকাতাইয়া চালচলন তাদের মধ্যে প্রকটভাবে ধরা পড়ত আমার পিতা এবং নানার ব্যবসাবাণিজ্য সব কিছুই ছিল কলকাতার সঙ্গে সম্পর্কিত বাড়ির পরিবেশ সেভাবেই তারা গড়ে তুলেছিলেন কিন্তু আমি আশ্বর্যজনকভাবে ছিলাম গ্রামের লোক এই গ্রাম্যতা মূলত এক ধরনের মানবিক সরলতারই নামান্তর মাত্র (পৃষ্ঠা: ২৯২)

এক্ষেত্রে একটি গ্রামের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে একটি বিশেষ অধ্যায় কুমিল্লার সাথে সম্পৃক্ত। তেমনি আল মাহমুদের জীবনে কুমিল্লা বা কুমিল্লার একটি বিশেষ গ্রাম বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তার জবানিতে শুনি:

এখানে স্বীকার করি যে, আমি বাংলার আদি গ্রাম সমাজের পরিচয় পেয়েছিলাম যখন আমি আমার চাচার সঙ্গে দাউদকান্দি এলাকার একটি গ্রামে ছিলাম গ্রামটির নাম ছিল জগৎপুর এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সম্ভবত বাংলাদেশে সহজলভ্য ছিল নাআমার মধ্যে যে মৌলিক গ্রাম্যতা রয়েছে সেটা আমি পেয়েছি এই জগৎপুর গ্রাম থেকে প্রকৃতিকে এমন নিবিড়ভাবে আমি আর কোথাও দেখার সুযোগ পাইনি এখানে আমি কৃষক নরনারীদের ফসল উৎপাদনের অদম্য স্পৃহার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম আমি তাদের মতোই প্রকৃতির ব্যাপারে এমন অভিজ্ঞ হয়েছিলাম যে, মেঘবৃষ্টিঝড়বাদলের ব্যাপারে আমি ভবিষ্যৎ বলতে পারতাম গৃহপালিত পশুপাখিদের অভিব্যক্তি নির্ভুলভাবে বুঝতে পারতাম হয়তো বা পাখির ভাষাও আমার খানিকটা আয়ত্তে এসে থাকবে মোটকথা, আমার ভেতরে এক চিরস্থায়ী গোঁয়ার প্রকৃতির গ্রাম্য লোক বাস করে (পৃষ্ঠা: ২৯২৯৩)

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

তরুণ বয়সে অনেকটা বিদ্রোহী ছিলেন, জেল খেটেছেন, কষ্ট করেছেন মেঘের মত এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু শেষ বয়সে তার উপলব্ধি তিনি বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি বলেন- ইতিহাসের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়, যা সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত তা আমি পাঠ করেছি এবং ধরণের পরিস্থিতির আক্ষেপজনক পরিণতির কথা আমার জানা আছে মূর্খতাকে কোনো অবস্থাতেই আমি আমার জীবনে সম্মান দেখাইনি তবে দায়িত্বজ্ঞানহীন মূর্খতা নেতৃত্বের আসনে থাকলে তাকে মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া আমি কোনো গত্যন্তর দেখি না আমি বিদ্রোহী হতে চাই না আমি গোত্রের শৃঙ্খলা ভেঙে বিপথগামী হতে চাই না (পৃষ্ঠা২৯৫)

তিনি যদিও দার্শনিকতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন কিন্তু তার লেখাতে গভীর জীবনদর্শন উঠে এসেছে।জীবন নিয়ে তার উপলব্ধি:

পৃথিবীকে দেখার দুটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে আমি উপলব্ধি করি একটা হলো বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটা হলো কবির উদাসী স্বপ্ন কল্পনার যুক্তি, অবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি যারা বাস্তবতার মধ্যে হিসাব করে বেঁচে থাকেন তারাই ভালো থাকেনএটা মনে করা হয় কিন্তু আমি অবাস্তব স্বপ্নদ্রষ্টা, অসহায়ের দলে পড়ি বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ কিছু হারালে হাহুতাশ করে কিন্তু আমার শত দিক থেকে হারানোর ভয় থাকলেও আমি হাহুতাশ করি না আর যদি দীর্ঘশ্বাস ধরে না রাখতে পারি তাহলে তা কবিতা হয়ে বের হতে থাকে এটাই আমার অদৃষ্টলিপি  (পৃ.২৯৬)

সত্যিকারের কবিকে ধন-সম্পদ-খ্যাতির মোহ আটকাতে পারে না। কারণ তারা জানে এগুলো কত ক্ষণস্থায়ী। মহাকালের সোনার খাতায় শ্রেষ্ঠ কবিতা-ই টিকবে, ধন-সম্পদ কালের ধূলায় মিশে যাবে।

ধনসম্পদ আগলে কোনো মানুষই তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না মানুষের পরমায়ু আর কত দিনের আমি ব্যাপারে অজ্ঞ না হলেও বিজ্ঞও নই আমি একটি কবিতা রচনা করে জীবনে যে আনন্দ পেয়েছি অন্য কোনো কিছু আমাকে তা দিতে পারেনি  (পৃষ্ঠা: ৩০২)

কবি এবং বেয়াদব তরুণ কবি প্রসঙ্গ

জেমস জয়েস এর বয়স যখন বিশের কোঠায় তখন ইংরেজি কবিতার দিকপাল, মুরব্বি ডব্লিউ বি ইয়েটস্ এর সাথে মোলাকাত হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই ইয়েটস্ আশা করেছিলেন সেই অর্বাচীন তরুণ তার কাছে উপদেশ প্রার্থনা করবেন। তিনি গুরুর মতো শিষ্যের পিঠে গোটাকয়েক পোছা দিয়ে দিবেন। জয়েস সেটাই করেছিলেন যেটা কেউ কল্পনা করে নাই। জয়েস বললেন, ‘আমার বয়স বিশ। তোমার কত? তুমি এত বুড়িয়ে গেছো যে তোমাকে পাল্টাতে পারবো না!’

তখন ইয়েটস এর বয়স চল্লিশের কোটায়। গ্রেট ব্রিটেন সহ ইউরোপের সাহিত্য আকাশে ততদিনে একটি উজ্জল তারকা। সময়টা ১৯০৩ এর দিকে। তো সাহিত্যে একটু-আধটু বেয়াদবি জায়েজ সেটা যদি বার্ধক্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য হয়, বুড়োদের বন্ধ্যাত্মকে অবজ্ঞা করে নতুনত্বের ঝাণ্ডা উড়ানো হয়। কিন্তু এর কোনটা না করে স্রেফ বেয়াদবির জন্য বেয়াদবি বা বয়সের চপলতা প্রদর্শন সাহিত্যে কোন ফল নিয়ে আসে না। আবার বয়স্কদেরকে সবসময় তরুণদের প্রতি স্নেহপরায়ণ হওয়া উচিত এবং তাদেরকে বড় হওয়ার সময় ও সুযোগ করে দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের কাব্যজগতে বয়স্ব ও তরুণ কবি সম্পর্ক এবং এ জগতে বেয়াদবির প্রসঙ্গ টেনে বলেন:

আমি কবি মাত্র দার্শনিক নই দর্শন কবিতা একেঅপরের প্রতিপক্ষযদিও অঙ্গাঙ্গিভাবে এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বয়স্ক কবিরা সব সময় লক্ষ করেছি, তারুণ্যকে দূরে রাখতে চায় তরুণ কবিকে শনাক্ত করার কাজ বয়োবৃদ্ধ কবিরা বাংলাদেশে কখনো নিতে চায়নি আমি সবসময় এর সমালোচনা করে এসেছি আমি তারুণ্যের স্বীকৃতি দিতে কখনো অস্বীকার করিনি তরুণ কবিদের পদ্যের চেয়ে তাদের চেহারা আমার কাছে রহস্যময় বলে ধারণা হয়েছে আমার কাছেঁ সাহস করে কোনো তরুণ কবি এসে কথা বলতে চাইলে তাকে প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করি না তবে কিছু বেয়াদব তরুণ অসঙ্গতভাবে অগ্রজ কবিদের অপমান করতে চাইলে আমি এর জবাব দিতে ছাড়ি না বেয়াদব তো শিল্পের সব ক্ষেত্রেই আত্মগোপন করে আছে এরা সাহিত্য শিল্পের কোনো উপকার করে না তবে অপকার এবং অসংযত আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এরা সাহিত্যে থাকে না কিন্তু এদের দুর্ব্যবহার সাহিত্যের সমালোচকরা বেশ কৌতূহলের সঙ্গে উল্লেখ করেন, যা আমি কোনোভাবেই সঙ্গত বলে মেনে নিতে পারি না  (পৃষ্ঠা: ৩১৬)

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা কবিতা এবং নিজের ভূমিকা

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদদীন ও জীবনানন্দ দাস ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা ভাষার বা বাংলাদেশের খুব কম কবিই জায়গা নিত পেরেছেন। এ বিষয়টি নিয়ে আল মাহমুদের মতামত গুরুত্বের দাবি রাখে।

আমাদের দেশের কবিরা বড় হওয়ার কোনো স্বপ্ন দেখে না। আন্তর্জাতিক মাত্রা অর্জন করার প্রয়াস পায় না। তাদের কাজ হলো ঈর্ষাতাড়িত হয়ে পরস্পরের দুর্নাম রটানো। এতে কী হয়?

শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না।

কবিতা কোনো চমক সৃষ্টির ব্যাপার নয়। কবিতা হলো স্বপ্নের মধ্যেই জীবনযাপনের গৃহস্থালি মাত্র।”

কবিতায় নিজের ভূমিকা কি ছিল সেটাও স্বীকার করেছেন: “আমি বাংলাদেশের আধুনিক কবিতাকে বহমান গতিশীল রাখতে সব সময় প্রয়াসী ছিলাম। সাহিত্য উদ্দেশ্যবিহীন কোনো দিগন্তের দিকে যাত্রা নয়। নিশ্চয় কবিকে তার উদ্দেশ্যের আনন্দবিতানে কোনো না কোনোভাবে পৌঁছাতে হয়। কবি সত্য কথা বলে না, কিন্তু একমাত্র কবিকেই কেউ মিথ্যাবাদী বলে না” (পৃ ৩১৩)

নারী ও প্রকৃতি

নারী ও প্রকৃতি কবির দুটি প্রিয় প্রসঙ্গ এবং এ দুটি বিষয় যে একে অন্যের সাথে সম্পর্কৃত এটা নিজেই স্পষ্ট করেছেন। তার জীবনে এবং কবিতায় এ দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।

কবি যে শুধু মানব সমাজের খুঁটিনাটি বাজিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন এমনও নয়, তাকে পাখি, পতঙ্গ, গাছপালা, লতাগুল্মের দিকেও তাকাতে হয় নারীর প্রতি আগহ সমতুল্য মর্যাদায় উল্লেখ করতে হয় পাখি, পতঙ্গ, গাছপালা কবিকে সাক্ষি মানতে আসে না কিন্তু কবি নিজেই সাক্ষ্য দেয় যে, এরা তার আত্মীয় তবে স্বীকার করতে হবে যে, নারী একাই একশ কারণ তার দেহবল্লবীর মধ্যে প্রকৃতি নিচয়ের প্রতিরূপ বিম্বিত আছে পৃথিবীতে যা কিছু মানুষকে আবিষ্ট করে তার সবই মানবী দেহমানবতার মতো ধরে রেখেছে এজন্য নারীকে বলা হয় প্রকৃতি (পৃ ৩১৩)

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নারীর খুব কাছাকাছি গিয়েও কিভাবে নিজেকে ইউসুফ নবীর মতো বাঁচিয়ে রেখেছেন তার বর্ণনা পাঠকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করতে পারে। তবে ঝানু ঔপন্যাসিকের মতো তিনি যে তার অনেকগুলো আধেক রোমান্সের গল্প নিয়ে এসেছেন তা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই!

শৈশব থেকে বার্ধক্য যে একটা জিনিস আজন্ম সঙ্গী আল মাহমুদের সেটা হলো তার গভীর আত্ম সম্মানবোধ এবং প্রখর ঐতিহ্য সচেতনতা। সেটা নিজের পরিবার থেকে শুরু করে দেশ ও জাতি সচেতনতা পর্যন্ত প্রলম্বিত। তিনি যা বিশ্বাস করেন সেটা খুব দৃঢ়ভাবেই করেন আবার যা কিছু ফেলে দেয়ার সেটা খুব স্পষ্টভাবেই ফেলে দেন।

সমাপনী বক্তব্য

প্রায় তিন শতাধিক পৃষ্ঠা প্রলম্বিত আল মাহমুদের ‘কবির মুখ’। তবে পড়া শেষ করে মনে হলো জীবনের খুব অল্প বা খণ্ডচিত্রই অঙ্কন করেছেন আল মাহমুদ। পড়া শেষ করে কোন তৃপ্তির ঢেকুর উঠার সম্ভাবনা নেই বরং অতৃপ্তির আক্ষেপ আসবে। আর মনে হবে আর কত কিছুই না অজানা থেকে গেল। আর ব্যক্তিগত সেন্সর তাকে অনেক কথা বলতে বাধা দিয়েছে, বেশ কয়েক জায়গায় স্বত:স্ফূর্ত নন তিনি, কিছু গল্প খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে চেয়েছেন। এসব সত্ত্বেও কবি আল মাহমুদকে অসংখ্য ধন্যবাদ দেওয়া উচিত বাংলা সাহিত্যামোদিদের। কারণ তাদের কাছে বেশ আলোচনা ও গবেষণার রসদ দিয়ে কৃতার্থ করেছেন কবি নিজেই। আল মাহমুদের গদ্য ও বর্ণনাভঙ্গি পাণ্ডিত্যপূর্ণ নয় বরং আলাপচারিতার ঢঙ্গে লেখা। এজন্য যে কোন স্তরের পাঠক সেটা হজম করতে পারবে, বুঝতে পারবে।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

১৭৬ ফকিরের পুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

Related Posts

About The Author

Add Comment