আহমদ ছফার “উপলক্ষের লেখা”: এক ঈগল দৃষ্টি!

আহমদ ছফার “উপলক্ষের লেখা” বইটি মোট ৩৪ টি প্রবন্ধের আশ্রয়স্থল। ছফা ছিলেন অভিজ্ঞতায় পরিপক্ব, পঠনপাঠনে ও পর্যবেক্ষণে সিদ্ধহস্ত আর বিচক্ষণতায় তীক্ষ্ন। এ বইটি বিপুল তথ্যের এক দারুণ আধার। জীবনের শেষ দিনগুলির প্রবন্ধগুলি এখানে জায়গা করে নিয়েছে। অভিজ্ঞতার ঝাপি খুলে, ঈগলের দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন সমাজের মানুষকে। তাঁর আতশকাঁচে তাই আমরা দেখি সমাজের চিরচেনা রূপ, তার মানুষ, তাদের জীবনের রেলগাড়ি, সুখ- দুঃখের নিত্য খেলা। এ বইটিতে অনেক বিশেষ চরিত্রকে আলোকিত করেছেন, পাঠককে জুগিয়েছেন তথ্যের খোরাক। জীবন সায়াহ্নে তাঁর অভিব্যক্তি, তাঁর আকুতি, তাঁর প্রার্থনা, তাঁর প্রাপ্তিস্বীকার, তাঁর ক্ষোভ প্রভৃতি বিধৃত হয়েছে অত্যন্ত সূচারুভাবে।

** প্রথমেই তিনি আলোকপাত করেছেন আচার্য আলাউদ্দীন খানের উপরে। কত সংগ্রাম করে অবশেষে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ কিভাবে টিকেছিলেন তা এখানে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। সমাজের মানুষের বিচিত্র চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, মতাদর্শ, দর্শন কিংবা সংস্কৃতি কিভাবে তাঁর চলার পথকে রুদ্ধ করেছিল তা ছফা এখানে তুলে এনেছেন। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে খাঁ সাহেব ছিলেন শ্রেষ্ঠ ভাস্করের মত। ভাস্কর যেমন সুচারূভাবে মাটির পুতুল নির্মাণ করেন তেমনি তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইচ্ছাশক্তির এক সুচারূ কারিগর হিসেবে আমরা তাকে পাই। লালন ফকিরকে নিয়ে রহস্য, রহস্যের জাল উন্মোচন, তাঁর ধর্ম-দর্শনের এক ফিরিস্তি তিনি এখানে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণ পরিবারে লালণের বেড়ে ওঠা, বসন্ত রোগে তাঁর আক্রান্ত হওয়া, তাঁর পরিবার কর্তৃক তাকে নদীর পাড়ে ফেলে যাওয়া, জোলার বাড়িতে লালন-পালন, অতঃপর গুরু সিরাজ শাঁইয়ের সাক্ষাৎ পাওয়া সবকিছু এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসের দুই বিশেষ চরিত্রকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন- একজন মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও অপরজন লালন ফকির। লালনের যে প্রতিকৃতি আজ আমরা হরহামেশাই দেখি তা কিন্তু রবীঠাকুরের ভাই জ্যোতিরীন্দ্রনাথের আঁকা। ছফা লালনকে জাগ্রত প্রতিভা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি মনে করেন যে, লালনের তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে বেশ দখল ছিল। ছফার মতে, “খুব সম্ভবত ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে লালন যে প্রগাঢ় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তার পেছনের কারণ ছিল সুন্নী আলেমদের মারমুখী মনোভাবের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি নির্মাণ করার তাগিদে।” আসলে লালনের পরিচয় ইতিহাসের পেন্ডুলামে দুলছে। যে যেভাবে পারছেন সুবিধামত লালনকে টেনে নিয়েছেন নিজেদের দিকে। তবে লালনের জাত-কূল যাইহোক না কেন সমাজের উঁচুবর্গের মানুষেরা নিজেদের সুবিধার্থে লালনকে নিজেদের দলে ভিড়িয়েছে।

** বিশিষ্ট লেখক বদরুদ্দীন উমরের বাবা আবুল হাশিম বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রাত:স্মরণীয় রাজনীতিবিদ। তিনি মারফতি তরীকার মুসলমান ছিলেন। নামাজ, রোজার বিশেষ ধার ধারতেন না। তিনি খুব উচ্চমার্গের পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। দেশকে নিয়ে অনেক বেশি ভাবতেন তিনি। ছফার ভাষায়, “তিনি দুঃখ করে বলতেন, এই জাতিকে আলোর দিকে, জ্ঞানের দিকে চালিত করার কোন ক্ষমতা তাদের থাকে না। এটাই হচ্ছে এই জাতির দুর্ভাগ্যের মূল কারণ।” আবুল হাশিমের গদ্যরীতি, যুক্তিরশক্তি, পঠন- পাঠনের ব্যাপ্তি ও মননশীলতা ছফার মনে দারুণভাবে রেখাপাত করেছিল। দুই বাংলাকে এক করে রাখার স্বপ্ন তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। যুক্তবঙ্গের প্রস্তাব ব্যর্থ হলে খুব দুঃখ করে হাশিম সাহেব বলেছিলেন, ” বাঙালি হিন্দুর কী শোচনীয় পরিণতি। বাঙালি হিন্দুরা রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, সুভাষচন্দ্র বসু এই সমস্ত বিশ্ববিশ্রুত আকাশ-ছোঁয়া মনীষী পুরুষদের জন্ম দিয়েছেন। আজ দেখ তাদের কি অধঃপতন। অবাঙালি অর্থ এবং অবাঙালি চিন্তার কাছে তারা দাসখৎ লিখে দিয়েছে, মস্তক বেঁচে দিয়েছে।” এ আক্ষেপ শুধু হাশিমের নয় বরং আমাদের সবার। ছফা হাশিম সাহেবকে একজন উচ্চমার্গের পন্ডিত, রাজনীতিক ও বিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবুল হাশিম বেশ মজার মানুষ ছিলেন, ব্যঙ্গ করতেনও নিজস্ব ভঙ্গিমায়। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হাশিম সাহেবের একজন বড় শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। একদিন হাশিম সাহেবের বাড়িতে তিনি বেড়াতে আসলেন। তার পরের ঘটনা ছফার বর্ণনায়ঃ “তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হাশিম সাহেব কী করছেন? হাশিম সাহেব বললেন, আরে ড. সাহেব আসেন, আসেন, বসেন। কী আর করব, ছোড়াকে দিয়ে প্রভাত মুখোপাধ্যায়েরর গল্প পড়াচ্ছি। আপনারা তো আর ভদ্রলোকের পড়ার উপযুক্ত কিছু লিখতে পারলেন না। এইবার শহীদুল্লাহ্ সাহেব সত্যি সত্যি ক্ষেপে গেলেন। হাশিম সাহেব, আপনি খবর রাখেন না আমি অনেক ছোটগল্প লিখেছি। হাশিম সাহেব কৌতুক করে বললেন, আপনি গল্প লিখেছেন? নাম বলুন দেখি, শহীদুল্লাহ্ সাহেব এক ঝোঁকে তাঁর লেখা তিন-চারটি গল্পের নাম বলে গেলেন। হাশিম সাহেব হুঁকোর নলটি মুখ থেকে সরিয়ে বাঁ- হাত দিয়ে একটা ভঙ্গি করে বললেন, ঠিক আছে ড. সাহেব থামেন, আর বলতে হবে না, এখন আমার কথা বলি। আপনি কী মনে করেন এসময়ের মধ্যে আমার রুচির এত অধঃপতন ঘটেছে যে আপনার লেখা গল্প আমাকে পড়তে হবে? অথচ তিনি ড. শহীদুল্লাহ্কে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন”।

** একজন ব্যক্তির লেখক হওয়ার পেছনে কিছু ব্যক্তি থাকেন যারা অনেক ক্ষেত্রে প্রচারবিমূখ থাকেন। যদি প্রতিষ্ঠিত লেখকের দয়া-দাক্ষিণ্যে তার পরিচয় মেলে তবে তা মন্দ হয় না। ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যে তরী ভাসানো লেখক ছফার জীবনে দুর্দিনের যাত্রীর মত এসেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। সাহিত্যিক হিসেবে ছফার প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম চালক শক্তি হিসেবে ছিলেন হাসান হাফিজ, লেখক দ্বিধাহীন চিত্তে তা স্মরণ করে হাফিজের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কৃতজ্ঞতার ঝুলিটাকে হালকা করেছেন। হাসান হাফিজের মত রণেশ দাশগুপ্তও ছফার দুর্দিনের ছায়া ছিলেন। নন্দনতত্ত্বে রণেশ দাশগুপ্তের আগ্রহ ছফাকে অন্যভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করেছিল।

** মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পন্ডিত ড. আহমদ শরীফের মৃত্যুতে ছফা একজন অভিভাবক ও গুরুকে হারিয়েছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বরের মত আহমদ শরীফের শরীর সমর্পনের কথা অনেকের কাছে অজানা নয়। ছফা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে আহমদ শরীফের মত একজন অসাধারণ বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষক যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তনু-মন-প্রাণ ঢেলে ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন অথচ তাকে বিদায় বেলায় কোন সংবর্ধনার আয়োজন করেনি শিক্ষার্থীরা। ছফা আহমদ শরীফের সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন, গুরুর থেকে শিখেছিলেন অনেক কিছু। ছফার ভাষায়,” তিনি আমাদের অন্যায়কে ঘৃণা করতে শিখিয়েছিলেন। চাপের কাছে নতি স্বীকার না করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।” শওকত ওসমানকে লেখক একজন জীবনবাদী লেখক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর সুতীব্র জীবনবোধ ও প্রাণশক্তি ছফাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর “জননী” উপন্যাসকে ছফা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনায় এনেছেন। শওকত ওসমানের সাথে লেখকের অনেকবারই মতামতের পার্থক্য ঘটেছে কিন্তু তাঁর থেকে লেখক স্নেহ বঞ্চিত হন নি কখনও। ছফা মনে করেন শওকত ওসমানের মধ্যে দু ধরনের মানসিকতা বুঁদ হয়েছিল। ছফার ভাষায়,” একটা হচ্ছে তিনি জীবনের প্রথম দিকে মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষার আচার সর্বস্বতা তাঁর মনে এমন একটি স্থায়ী অনপনেয় বিরূপ ছাপ ফেলেছিল, সেই জিনিসটি সারাজীবন তাঁকে তাড়িত করে নিয়ে গেছে। এটা এক ধরনের খন্ডিত মানসিকতা। শওকত ওসমান এই মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেন— সেই কারণে বেহুদা মুসলিম সমাজের উপর আঘাত করার একটা অযৌক্তিক প্রবণতা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। দ্বিতীয়ত, যে জিনিসটি তাঁকে সারাজীবন পীড়িত করেছে, সেটি হল তাঁর উদ্বাস্তু মানসিকতা। তিনি দেশ বিভাগের কারণে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন অথচ অন্তর থেকে পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেননি। জীবনের বিশ্বাস এবং বাস্তবতার মধ্যে যে পার্থক্য সেটুকু ভরাট করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি”।

** “রাজ্জাক সাহেবের স্মরণ-সভায়” প্রবন্ধে শিষ্য ছফা স্মরণ করেছেন গুরু প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে। ছফার জীবনে প্রফেসর রাজ্জাকের অবদানই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। ছফাকে নতুনভাবে ভাবতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, চিন্তার আঙিনায় উদ্ভাসিত হতে শিখিয়েছিলেন রাজ্জাক। ছফার ভাষায়” আমি নিতান্তই সামান্য মানুষ। প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, সেটা একরকম দুর্ঘটনাই বলতে হবে। আমার করার কোন কাজ ছিল না এবং পেশায় ছিলাম সার্বক্ষণিক বেকার। আর রাজ্জাক সাহেবের ছিল অফুরন্ত সময়।” অকৃতদার রাজ্জাকের কাছে একেকটি গ্রন্থ ছিল বুকের পাঁজরের একেকটি হাড়ের মত। তবে একটি কথা স্মর্তব্য, রাজ্জাক কাউকে বই ধার দিতেন না। তবে এক্ষেত্রে ছফা সত্যিকার অর্থে একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যার বই ধার পাওয়ার সুযোগ মঞ্জুর হয়েছিল। রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তিনি অত্যন্ত উঁচু ধারণা পোষণ করতেন। রাজ্জাকও ছফাকে মূল্যায়ন করতেন বেশ এবং তাঁর মেজাজকে সম্মান দিতেন। ছফা রাজ্জাক স্যারকে মনে করতেন ‘চিরনতুনত্বের অফুরন্ত খনি’। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্য ছিল অনেক উচ্চমার্গের। ছফার ভাষায়,” আমাদের দেশে মানুষ যত বুড়ো হয় তত বানর হয়। খুব কম মানুষই সুন্দরভাবে বুড়ো হতে জানে। রাজ্জাক স্যার আমার চোখে একমাত্র মানুষ যিনি সুন্দরভাবে বুড়ো হতে জেনেছিলেন”। লেখকের জীবনে সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয় হল তিনি প্রফেসর রাজ্জাকের ছাত্র ছিলেন। তবে তিনি আক্ষেপ করতেন এই কথা বলে যে, ” আগামী প্রজন্মের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যদি প্রশ্ন করে এখানে নজরুলের কবর আছে, জয়নুল আবেদীনের কবর আছে, শহীদুল্লাহর কবর আছে,আবদুর রাজ্জাকের কবর নেই কেন? আমি জানি সে জবাব দেয়ার ক্ষমতা আপনাদের কারো নেই। আপনারা ক্ষমতার ছোটবড় নানারকম স্তম্ভ হিসেবে নিজেদের অবস্থানে থিতু হয়ে আছেন। আপাতত সেটিই ধরে থাকুন। আমার হা- হা- হা অট্টহাসি দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই”। আসলেই এ জিজ্ঞাসার উত্তর আমাদের থলেতেও নেই।

** সরদার ফজলুল করিমের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন ছফা। সরদার ফজলুল করিম, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত ও আহমদ ছফা মিলে বের করেছিলেন ‘স্বদেশ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক ছফার সামনে বাংলাদেশের যে দুই জন ব্যক্তিকে নিয়ে বেশি আলোচনা করতেন তাদের একজন আনিসুজ্জামান অপরজন সরদার। সরদারের “প্লেটোর সংলাপ” গ্রন্থটি লেখক ছফাকে দারুণভাবে উদ্বেলিত করেছিল। তিনি এই অনুবাদ গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সরদারের সাথে সাক্ষাৎ হলে ছফাকে সরদার তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন যা ছফা পাঠককে মনে করিয়ে দিলেন, ” শরীর কেমন, এখন কি পড়ছেন, তাঁর শেষ কথা— কি লিখছেন?” আসলে মোদ্দাকথা হল লেখকে লেখকে বইয়ের কথা চলবে, পড়াশুনার কথা চলবে: নিশ্চয়ই বাজারের মাছ-মাংসের গল্প চলবেনা এটাই স্বাভাবিক।

** ছফা সাহিত্যিক শাহেদ আলীকে স্মরণ করেছেন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে। ছফার লেখক জীবনে যদি একজন ব্যক্তি দারুণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তাহলে তিনি শাহেদ আলী। পাঠককে জানিয়ে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করছি যে ছফার প্রথম লেখা শাহেদ আলীর দ্বারা প্রকাশিত। একদিন শাহেদ আলীরা হয়তো হারিয়ে যাবেন, টিকে থাকবেন ছফারা। কিন্তু পাঠকেরা এটা জেনে খুশি হবেন যে ছফারা একদিনে হাওয়ায় ভেসে আসেন নি, তাদের জীবনে অনেক মানুষ ছিলেন ছায়ার মত। ছফা মনে করতেন অর্থনীতির সাথে নীতিশাস্ত্রের যে ঘনিষ্ঠ যোগ তা সবার আগে পরিষ্কারভাবে জানান দিয়েছিলেন অমর্ত্য সেন। অমর্ত্য সেনকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলে তা ছফাকে দারুণভাবে পুলকিত করেছিল, যোগ্য পুরস্কার যোগ্যজনের হাতে গেছে এটা তাকে খুব বেশি প্রীত করেছিল।

** আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “খোয়াবনামা” উপন্যাসকে ছফা বাংলাসাহিত্যের হাতে গোনা কয়েকটি সেরা সাহিত্যকর্মের একটি উল্লেখ করেছেন। মূলত আনন্দবাজার পত্রিকা ও এর চাটুকারদেরকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য ইলিয়াস “খোয়াবনামা” লেখেন। এটি যে অসাধারণ সাহিত্যকর্ম এ ব্যাপারে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমার দুঃখ লাগে এ কথা ভেবে যে, ইলিয়াস এই আনন্দগোষ্ঠী থেকেই বিখ্যাত ‘আনন্দ পুরস্কার’ গ্রহণ করেন, অবশ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত ইলিয়াসের তত দিনে একটি পা কাটা হয়েছে। মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা ইলিয়াসের আনন্দ পুরস্কার গ্রহণ ছফাকে খুবই মর্মাহত করেছিল। আসলে এটা আমাদের প্রশাসনের ব্যর্থতা। আমি যতটুকু জেনেছি সরকারী তেমন কোন সাহায্য ইলিয়াসের ভাগ্যে জোটেনি। বাংলাদেশে বিখ্যাত ব্যক্তিরা পঁচে গিয়ে বেশি বিখ্যাত হন।

** ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের সহস্রবর্ষী বটবৃক্ষ ছফাকে আকৃষ্ট করেছিল। এই গাছটিকে তিনি ইউনেস্কো ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন অনেকবার। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। ছফারা জীবিত ছিলেন অন্যদের সময়ে। ছফার বাবা মনে করতেন, “যে গ্রামে বটগাছ নেই সেই গ্রামের জীবন বিকশিত জীবন নয়। সেখানে প্রেম-প্রীতির বদলে হিংসাই প্রধান ভূমিকা পালন করে”। আমি এ কথা বলে শেষ করব যে, যে সমাজে জ্ঞানীকে চেনার মত চোখ নেই সে সমাজ অন্ধ, বন্ধ্যা। এ ধরনের সমাজে মানুষ কেবল দুমুঠো অন্নের প্রত্যাশা করতে পারে, উন্নত হওয়ার মানসিকতা জন্মানোর আগেই এদের বিবেক অন্ধ হয়ে যায়।

Related Posts

About The Author

Add Comment