আহমদ ছফার দৃষ্টিতে ‘সত্যজিৎ’

উপমহাদেশের কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন,

‘এ পৃথিবীতে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র না দেখা চন্দ্র-সূর্য না দেখার মতই অদ্ভূত’।

কোন বিখ্যাত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য কোন বিখ্যাত ব্যক্তির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে এ ধরনের মন্তব্যের পর এখনও যারা তাঁর চলচ্চিত্র দেখেননি, তাদের নিশ্চয়ই খুব আফসোস হচ্ছে। তবে রায়ের চলচ্চিত্র দেখেনি এমন মানুষ এ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কিছুটা কঠিন বৈকি। যাই হোক আজকের আমার এই লেখাটা হল ছফার দৃষ্টিতে সত্যজিৎ রায়।

আমি ছফা স্যারের লেখার একজন ছোট খাটো একজন ভক্ত। স্যারের কোন লেখা হাতে পেলে না পড়া পর্যন্ত স্বস্তি পাইনে। নির্বাচিত অরাজনৈতিক প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্ত সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে ছফা স্যারের মূল্যায়নটা পড়লাম। বেশ ভাল লাগলো। ধারনা করি, তিনিও সত্যজিৎ রায়ের অনেক বড় ফ্যান ছিলেন। প্রবন্ধটিতে সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিকর্ম এবং একই সাথে ব্যক্তি সত্যজিৎকে আমরা দেখতে পাবো। লেখাটির শুরুটি এভাবে

‘পথের পাঁচালী ছবিটি আমি কমসে-কম বিশ বার দেখেছি। ‘ঘরে-বাইরে’ বার তেরবার। সত্যজিতের নির্মিত সব ছবি আমার দেখা হয়নি, মানে দেখার উপলক্ষ্য ঘটেনি। তবে ধারণা তাঁর উৎকৃষ্ট ছবিগুলো দেখার সুযোগ পেলে আমি বারবার দেখবো।’ তিনি সত্যজিতের ছবির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার দেখা সত্যজিতের ছবিগুলোতে এমন কিছু অনির্বচনীয় জিনিস খুঁজে পেয়েছি, তার আবেদন আমার কাছে কোনদিন ফুরোবে না।’

ছফা স্যার চলচ্চিত্রের বোদ্ধা দর্শক না। তথাপি অবসর সময়ে সংবাদপত্রে প্রশংসা শুনে এবং বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লা পড়ে হলে গিয়ে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি চলচ্চিত্রের বোদ্ধা সমালোচক হতাম, হয়ত সত্যজিতের ছবি দেখার পর ভেতর থেকে ভিজে ওঠার যে অনুভূতিটা অপরের কাছে তুলে ধরতাম। কিন্তু সেটি তো আর হচ্ছে না। কারণ আমার অবস্থান অন্যত্র এবং বিচরণক্ষেত্র আলাদা। তবুও বলবো শিল্প ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হল ভেতর থেকে ভিজিয়ে তোলার ক্ষমতা। আমি বরাবর ভিজে উঠার জন্যই সত্যজিতের ছবির কাছে ফিরে আসি’। সত্যজিৎ রায়ের শারিরিক বর্ণনা দিতে গিয়ে ছফা বলেছেন, ‘হ্রাসকায় খর্বকান্তি বাঙালি মানুষের সমাজে সত্যজিৎ যেন হঠাৎ মানুষ। অনেক উচুঁ-লম্বা। তার ৃদিঘল চেহারার দিকে তাকালে মনে হয়, সত্যজিৎ মেঘেতে মাথা ঠেকিয়ে সব রকমের বাঙালি কুচুটেপনার প্রতিবাদ করার জন্যই মূলত জন্মেছে।’ কোন সমাজকে ভালভাবে বোঝার অন্যতম একটা মাধ্যম হল চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরা শুধু ওই সমাজটাকে বুঝিতেই পারি না, কিছু সময়ের জন্য ওই সমাজের মধ্যে আমরা হারিয়ে যেতে পারি। উপমহাদেশের কিংবদন্তী সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ছবিগুলো আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির এক অখন্ড অংশ। তাই চলুন সত্যজিৎ রায়ের মুভিগুলো দেখি, অতীতের সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানি।

Related Posts

About The Author

Add Comment