আহমদ ছফার বর্ণনায় হুমায়ুন আজাদের চৌর্যবৃত্তি

হুমায়ুন আজাদ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সহ অনেকেই। এই তালিকায় আছেন আহমদ ছফাও। আজাদ রবীন্দ্রনাথকে বড় মানের কবি বলে মনে করতেন না। নজরুলকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন। তার বচন বাচন দেখে মনে হতো বাংলা সাহিত্যে তার চেয়ে শক্তিশালী লেখকের জন্ম গত এক হাজার বছরে ঘটে নাই এবং আগামী এক হাজার বছরেও ঘটবে না। কিন্তু আহমদ ছফা গুমুর ফাঁক করে দিয়েছেন তার একটি লেখায়। নিজের মৌলিক রচনা বলে হুমায়ুন আজাদ যেগুলো দাবি করেছেন তার অধিকাংশই তার চৌর্যবৃত্তির ফল। বাইরের লেখকদের বঙ্গীয় সংস্করণ। আহমদ ছফার এ সংক্রান্ত লেখাটি ছাপা হয় ১৯৯৮ সালের ১ ডিসেম্বর, মানবজমিন পত্রিকায়।
লেখাটি নিম্নরুপঃ

‘২১ ফেব্রুয়ারি এগিয়ে আসছে বোঝা গেল। হুমায়ুন আজাদ ‘মানবজমিন’ এ একটা উত্তেজক সাক্ষাৎকার দিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারির বাংলা একাডেমীর বইমেলায় যে আসল কনসার্ট শুরু হবে, এ সাক্ষাৎকারে তার শিক্রিনিধ্বনি শোনা গেল মাত্র। এটাও একরকম অবধারিত, মেলায় আজাদ সাহেবের একটা কিংবা একাধিক বই প্রকাশিত হবে। এ সাক্ষাৎকারটি সে অনাগত গ্রন্থ বা গ্রন্থাদির শুভ জন্মবার্তা যদি ঘোষণা করে, তাতে অবাক বা বিস্মিত হওয়ার খুব বেশি কিছু থাকবে না। মোটামুটি বিগত ৮/১০ বছর ধরে তিনি দিগ্বিজয়ের যে কলাকৌশলগুলো ব্যবহার করে আসছেন, সেগুলো সকলের কাছে সুপরিচিত।

প্রাচীনকালে রাজারা অশ্বমেধযজ্ঞের মাধ্যমে নিজেদের একচ্ছত্র প্রতাপ ঘোষণা করতেন। আমাদের কারে যাঁরা রাজা হয়ে থাকেন, তাঁদের ভূখা-নাঙ্গা মানুষের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হয়। আমাদের যুগে রাজা নেই, কিন্তু হুমায়ুন আজাদ রয়েছেন। বাক্যের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব হত্যার যে অভিনব কৌশলটি তিনি বেশ কিছুদিন ধরে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে আসছেন, যা তাকে এমন একট উদ্ধত্যের অধিকারী তুলেছে, তাঁর সামনে সাহিত্য ব্যবসায়ী সমস্ত মানুষকে থরহরি বলির পাঁঠার মতো কম্পমান থাকতে হয়। এ সাক্ষাৎকারটিতেও হুমায়ুন আজাদ অনেক নামিদামী মানুষের উষ্ণীষ বাক্যের খড়-খড়গাঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছেন।

যাঁরা হুমায়ুন আজাদের আক্রমনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, এক সময়ে তাঁদের অনেককে তিনি ওপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। উপকার করলে অপকারটি পেতে হয়- এই আপ্তবাক্যটি হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল। শুয়োরের বাচ্চার যখন নতুন দাঁত গজায়, বাপের পাছায় কামড় দিযে শক্তি পরীক্ষা করে। হুমায়ুন আজাদের কোন উপকার আমি কোনদিন করিনি, তথাপি কেন তিনি অনুগ্রহটা করলেন, সেটা ভেবে ঠিক করতে পারছিনে। সত্য বটে, একবার তাঁকে আমি সজারুর সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। সেটা একটুও নিন্দার্থে নয়। আসলেই হুমায়ুন আজাদ একটা সজারু। বাঘ, সিংহ কিংবা অন্যকোন হিংস্র প্রাণী নয়।

লেখক হিসেবে আমি যে কত সামান্য সেটা অনেকের চাইতেই আমি অনেক বেশি ভাল জানি। অনেকে আমার নাম উল্লেখই করেন না। অন্তত হুমায়ুন আজাদ গাল দেয়ার জন্য হলেও আমার অস্তিত্বটা অস্বীকার করেননি, সেজন্য হুমায়ুন আজাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আর এটা একটুও মিথ্যে নয় যে, আমি জন্তু-জানোয়ার নিয়ে কাটাই। আমার জন্তু-জানোয়ারের সংগ্রহশালাটি যদি আরো বড় হত, সেখানে আজাদের জন্যও একটা স্থান সংরক্ষণ করতাম।

হুমায়ুন আজাদ এ সাক্ষাৎকারে নিজের অনেক পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি একজন কবি, ভাষাবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, উপন্যাস লেখক, প্রবন্ধকার, সমালোচক ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি তাঁর অনেকগুলো পরিচয় ঢেকেও রেখেছেন। সেগুলো হল- হুমায়ুন আজাদ হলেন একজন স্ট্যান্ডবাজ, পরশ্রীকাতর এবং অত্যন্ত রুচিহীন নির্লজ্জ একজন মানুষ। হুমায়ুন আজাদ কী পরিমাণ নির্লজ্জ সে সম্পর্কে তাঁর নিজের কোন ধারণা নেই। আমি কয়েকটা দৃষ্টান্ত দেব।

একবার হুমায়ুন আজাদ ভাষাবিজ্ঞানের ওপর থান ইটের মত প্রকান্ড একখানা কেতাব লিখে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশ করলেন এবং যত্রতত্র বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াতে লাগলেন যে, আমার সমান ভাষাবিজ্ঞানী বাংলাভাষায় কস্মিনকালেও আর একজন জন্মাননি। তার অনতিকাল পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মিলন কান্তি নাথ নামে আর একজন অধ্যাপক প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ লিখে অকাট্য প্রমাণ হাজির করে দেখালেন যে, হুমায়ুন আজাদের এ ঢাউস বইটা আগাগোড়াই চৌর্যবৃত্তির ফসল। ওই রচনা যাঁরা পড়েছেন, বাংলা একাডেমীর কাছে কৈফিয়ৎ চেয়ে বসলেন, আপনারা এমন একটা বই কেন প্রকাশ করলেন, যার আগাগোড়া চৌর্যবৃত্তিতে ঠাসা? বাংলা একাডেমী হুমায়ুন আজাদের বই বাজার থেকে পত্যাহার করে নিলেন এবং বিক্রয় বন্ধ করলেন আর হুমায়ুন আজাদের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করলেন, আপনি দায়িত্বশীল ব্যক্তি হয়েও কেন আগাগোড়া একটি নকল গ্রন্থ একাডেমীকে দিয়ে প্রকাশ করিয়ে একাডেমীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন?

হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বহুল আলোচিত গ্রন্থ। আমি নিজেও এক কপি কিনেছিলাম। কিন্তু কিনে মুশকিলে পড়ে গেলাম। বইটি এতই জীবন্ত যে, মাসে মাসে রক্তশ্রাব হয়। অগত্যা আমাকে বইটি শেলফ থেকে সরিয়ে রাখতে হল। হুমায়ুন আজাদ দাবি করেছেন, এটা তাঁর মৌলিকগ্রন্থ। আমার একটুখানি সংশয় জন্ম নিয়েছিল তাহলে সিমোন দ্যা বোভেয়ার কী করছিলেন? পরবর্তী গ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ প্রকাশিত হওয়ার পরে আমার সব সংশয় ঘুচে গেল। হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত বিশ্বস্ততারসহকারে সিমোন দ্যা বোভেয়ারের বই বাংলাভাষায় নিজে লিখেন। সমস্ত মাল-মসলা সিমোন দ্যা বোভেয়ারের। হুমায়ুন আজাদ এই বিদূষী দার্শনিক মহিলার পরিচ্ছন্ন রুচি এবং দার্শনিক নির্লিপ্ততা কোথায় পাবেন? কুরুচি এবং অশ্লীলতাটুকুই এই গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ।

এ বিষয়ে আরো একটা কথা উল্লেখ করতে চাই। ‘নারী’ গ্রন্থটি যখন বাজেয়াপ্ত করা হল আমরা লেখকরা মিলে প্রস্তাব করলাম এ ধরসের গ্রন্থ নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে মিছিল করে প্রতিবাদ জানাব। আদালতে মামলা করব। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ পিছিয়ে গেলেন। তখন ধরে নিয়েছিলাম হুমায়ুন আজাদের সৎসাহসের অভাব আছে। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ প্রকাশিত হওয়ার পর আসল রহস্য বুঝতে পারলাম। মামলায় লড়ে ‘নারী’ গ্রন্থটি বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলেও আর্থিকভাবে হুমায়ুন আজাদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অল্প। কারণ এই লেখার যতটুকু চমক প্রথম বছরেই তা নিঃশেষ হয়েছিল। নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হলেও পাঠকের বিশেষ চাহিদা থাকবে না। ‘নারী’ গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে হুমায়ুন আজাদ নতুন একটা জালিয়াতি করলেন। সে একই বই ভিন্ন নামে ভিন্ন মোড়কে প্রকাশ করলেন। বাংলাদেশে মহাজ্ঞানী-মনীষী হতে হলে এই ধরনের কত রকম ফন্দি-ফিকির করতে হয়! কত রকম ফন্দি-ফিকির শিখতে হয়!

হুমায়ুন আজাদ একটা দাবি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে করে আসছেন, তিনি পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত। এতদঞ্চলের নকলবাজ, অনুকরণসর্বস্ব পল্লবগ্রাহী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর এই দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হল। প্রয়াত বৃটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ঊনত্রিশ বছর বয়সে যে গ্রন্থটি ‘Why I am not a christian’ লিখেছিলেন, তার বঙ্গীয় সংস্করণ প্রকাশ করে সর্বত্র আস্ফালন করে বেড়াতে লাগলেন এটা তার মৌলিক কীর্তি। কী করে পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত হতে হয়, এ সময়ের মধ্যে হুমায়ুন আজাদ তার এক সহজ ফর্মুলা উদ্ভাবন করে ফেলেছেন। স্বর্গত পশ্চিমা লেখকদের লেখা আপনার মাতৃজবানে অনুবাদ করবেন এবং তার সঙ্গে খিস্তি-খেউর মিশিয়ে দেবেন। তাহলেই আপনি পশ্চিমা ঘরানার পন্ডিত বনে যাবেন।

হুমায়ুন আজাদ উপন্যাস, কবিতা অনেক কিছু লিখেছেন। সেগুলো সবটা একেবারে খারাপ সেকথাও আমি বলব না। মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করে দেখেছি, চিবানোর যোগ্য পদার্থ তাতে অধিক খুঁজে পাইনি। তথাপি হুমায়ুন আজাদ একজন সুপরিচিত লেখক। ভ্যালু তৈরি করতে না-পারুন, ন্যুইসেন্স ভ্যালু তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর অপরিসীম। আমাদের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে যে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস এবং দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে, হুমায়ুন আজাদের লেখার মধ্যদিয়ে সেগুলোরই অভিব্যক্তি ঘটেছে। এক কথায় হুমায়ুন আজাদকে আমি এভাবেই সংজ্ঞায়িত করতে চাই-
‘স্বভাবে কবিতা লেখে, পেশায় জল্লাদ,
খিটিমিটি মানবক হুমায়ুন আজাদ।’

##মানবজমিন
১ ডিসেম্বর, ১৯৯৮

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment

Leave a Reply to মিকাইল ইমরোজ Cancel reply