আহমদ ছফা’র “বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র”

আহমদ ছফার “বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র” নামক পুস্তকখানি ভারতবর্ষে ইংরেজনীতি, ইংরেজদের অাধিপত্য, তাদের কুটকৌশল, স্বার্থ, শোষণ নীতি, বুদ্ধিজীবীপ্রীতি, ভারতের শাসকশ্রেণির হালহকিকত, ঐতিহাসিক পলাশীযুদ্ধ, দেশভাগ, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব, বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রভৃতির এক আলেখ্য।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুনে সংঘটিত ঐতিহাসিক পলাশী যুদ্ধ ভারতবর্ষে ইংরেজদের দীর্ঘ ১৯০ বছরের শাসন ও শোষণের ভিতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। অথচ ভারতবর্ষে ইউরোপীয় দেশ সমূহের মধ্যে প্রথমে পর্তুগাল ও স্পেন উপনিবেশ স্থাপনে মনোযোগী হয়েছিল। কিন্তু বুদ্ধির জোরে শেষ পর্যন্ত উপনিবেশ স্থাপনের প্রতিযোগিতায় সর্বকনিষ্ঠ ইংরেজেরই জয় হয়। ইংরেজ প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভ মাত্র এগার শ সৈন্য নিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে পলাশীর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। নবাবের পঞ্চান্ন হাজার সৈন্যের কাছে এগার শ সৈন্য ছিল যৎসামান্য। শংকিত রবার্ট ক্লাইভ সেদিন আমগাছতলায় সংজ্ঞালুপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। নবাব বাহিনীর মধ্যে ভাঙনের গান যখনই শুরু হল তখনই নবাবের পতন স্পষ্টত রূপ লাভ করলো। বাকীটা পাঠকের কাছে ইতিহাস। মাত্র চার-পাঁচ ঘন্টার একটা যুদ্ধ কৌশলগত বিকলাঙ্গতা, শৃঙ্খলার অভাব ও অদূরদর্শিতার কারণ হেতু নবাব সিরাজের পরাজয়কে নিশ্চিত করে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার সাথে যুক্ত হয় ভারতবাসীর অনৈক্য ও তামাশা।

লর্ড ক্লাইভের ভাষ্য অনুযায়ী, যে সকল মানুষেরা যুদ্ধ খেলার তামাশা দেখতে এসেছিল তারা যদি প্রত্যেকেই একটি করে ঢিলও ছুড়তো তারপরও ক্লাইভ বাহিনীর পরাজয় সুনিশ্চিত ছিল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের অব্যবহিত পরে বিখ্যাত ইংরেজ প্রতিনিধি William Hunter তার “Annals of the Rural Bengal” গ্রন্থে লিখেছিলেন তার এক ভিন্নধর্মী অনুভূতির কথা। তার বয়ান থেকে আমরা জানতে পারি যে, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার বড় বড় দোকানগুলোতে থরে থরে নানারকম উপাদেয় খাবারের ডালি সাজানো ছিল। কাঁচের আলমারি থেকে তা বাইরে দৃশ্যমান। অথচ দোকানের বাইরে শত শত মানুষ না খাইতে পেয়ে মরে পড়ে আছে। Hunter-এর মনে স্পষ্টত প্রশ্ন জেগেছিল, বাঙালি এমন কেন? তাদের কেন সবকিছু এত দ্রুত সহ্য হয়ে যায়? এর নেপথ্যে কারণও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তা হল বাঙালির মাঝে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা জন্ম লাভ করে না। ভারতবর্ষে আগমনের পর ইংরেজ জাতি এখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও জাতের মানুষ দেখে ভিন্ন ভিন্ন ছকে গুটির চাল দিয়েছিল। ইতিহাসে স্পষ্টত দৃশ্যমান যে, বিভিন্ন বর্ণের মানুষের আবাসস্থল ভারতে ইংরেজ প্রতিনিধিরা এক শ্রেণির বৃদ্ধিজীবী ও জমিদার শ্রেণিকে হাত করেছিল। সাধারণ অশিক্ষিত, সহজ-সরল মানুষের উপর শোষণের স্টিমরুলার চালিয়েছিল। বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মাঝে সহাবস্থান সৃষ্টি তাদের মুখ্যত চিন্তা ছিল না বরং তারা এখানে দৃঢ়ভাবে তাদের শোষণের শিকড় বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছিল। বানরের রুটি ভাগ করার মত তারা ১৯০৫ সালে তারা বঙ্গভঙ্গ করে ভারতের বৃহৎ শ্রেণির রোষানলে পড়ে। অত:পর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ নীতি রদ করেন লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১১ সালে। এ ইতিহাস সবার কম-বেশি জানা।

কলকাতায় সৃষ্ট বুদ্ধিজীবীরা ভারত বাঁচাতে সদা তৎপর থেকেছে, বৃটিশ প্রতিনিধিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, তাদের থেকে খেতাব গ্রহণ করে রায় বাহাদুর, স্যার, রাজা প্রভৃতি টাইটেল গ্রহণ করে তাদের অধিনস্ত থেকেই গেছে। তারা কোনো সমাধান বের করতে পারে নি। সুকৌশলী ইংরেজ ঠিকই কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করেছে দিল্লীতে। তারা নিজেদের স্বার্থ দেখেছে। আর এদিকে বুদ্ধিজীবীরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার ব্যাপারে জোরেসোরে মাঠে নেমেছে। কিন্তু ততক্ষণে খেল খতম। আহমদ ছফার ভাষ্য মতে, “প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক মনে করতেন ১৯৪০ সালে শহর কলকাতার প্রথম ভাষা ছিল ইংরেজি, দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি, তৃতীয় ভাষা উর্দু এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক দিয়ে বাংলাভাষার অবস্থান ছিল চতুর্থ স্থানে”। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্ত বৃদ্ধজীবী শ্রেণি শংকিত হয়ে পড়েছিলেন এই ভেবে যে, তাদের একচেটিয়া নেতৃত্বে ভাগ বসানোর জন্য পূর্ববঙ্গ শক্ত একটা ভিত পেতে যাচ্ছে। ছফার মতে, এই ভাবনা থেকে তারা প্রতিষ্ঠা করলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।

বঙ্গভঙ্গ যে ইংরেজের কুটচাল ছিল তা ভারতবাসীকে বুঝতে অনেক সময় লেগেছে। ততদিনে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়েছে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদও হল, বাংলার দুই খন্ডিত অংশ একত্রিত হল, দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত হল, ইংরেজি ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হল। ইংরেজ যা চেয়েছিল, তাই হল, স্বার্থ সিদ্ধি হল। বাংলাভাষা গুরুত্বহীন হয়ে গেল, বাঙালির ঐক্যবদ্ধ থাকা আর সম্ভব হল না। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, মাওলানা আবুল কালাম আজাদরা অখন্ড ভারত দাবি করেছিলেন বটে তবে তা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। পরবর্তী সময়ে আবার সুবিধাবাদী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ধর্মকে পুঁজি করে দ্বিজাতিতত্ত্বের বয়ান নিয়ে হাজির হলেন। তা অবশ্য পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের বুঝতে অনেক বেগ পেতে হয় নি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ ঠিকই হয়েছিল, মুসলিম প্রধান অংশ নিয়ে পাকিস্তান, হিন্দু প্রধান অংশ নিয়ে ভারত সৃষ্ট হল। এরপর রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্নমাত্রা লাভ করলো। আসলো ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব নীতি মূলত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদেরকে শোষণ করার এক আলেখ্য বৈ কিছুই নয়।

ইংরেজদের জাল হতে মুক্ত হয়ে পূর্ব বাংলার মানুষেরা ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের রোষানলে পড়ে। ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানীরা দাবার গুটি চালতে থাকে। পূর্ববঙ্গের শতকরা ৫৬ জন মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হওয়ার পরেও উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার তাগিদে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রাতের ঘুম হারাম হয়। বাংলাভাষী বাঙালিদের মনে দানা বাধে অযাচিত সংশয়। স্বাধীন বাংলায় বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষার আসন অলংকৃত করার নেপথ্যে বাঙালির জাতীয়তাবাদের স্বত্ত্বা দারুণভাবে ভূমিকা পালন করেছিল। কলকাতা মহানগরের বাঙালিরা এক সময় বাংলাভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভোর ছিল কিন্তু তাদের মধ্যে যতটুকু বাঙালি সত্তা জাগ্রত ছিল তা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে নয়। আজ ভারতবর্ষে দলিত শ্রেণির নিরাপত্তাহীনতার নেপথ্যে শাসকগোষ্ঠী বহুলাংশে দায়ী। বাংলার আপামর জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক হতে পেরেছিল এর কারণ হল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যেখানে মুখ্যত ছিল ভাষা, ধর্ম ও অধিকারের সহাবস্থান। শুধু ধর্ম কিংবা শুধু ভাষা একটা দেশ সৃষ্টিতে এককভাবে অাধিপত্য বিস্তার করে না। ইরান ও আফগানের প্রধান ভাষা হল ফার্সি, পাশাপাশি দুটি দেশ, কিন্তু কেউ কি কারোর দখলদারিত্ব গ্রহণ করেছে? করে নি।

কুর্দিদের নেতা ক্রুসেড যুদ্ধের বিজয়ী গাজি সালাহ্উদ্দিনের কথা আমরা সবাই জানি। তাঁর উদারতা, বীরত্ব ও মহানুভবতার কথা তাঁর শত্রুপক্ষের লোকেরাও স্বীকার করতো। এই মহান নেতা কুর্দিদের একটা মহাপরাক্রমশালী জাতিতে পরিণত করেছিলেন। তাই বলে কুর্দিরা কি আজোও কোনো একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? পারেনি। তার কারণ হল, ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও রাশিয়ার সংখ্যালঘুদের সংকট। একটা কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, তা হল ইংরেজ জাতি ভারতবর্ষে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিল, সেটা তারা হাসিলও করেছে, তারা একটা বুর্জোয়া শ্রেণিও প্রতিষ্ঠা করেছিল, যারা স্পষ্টভাবে ইংরেজপ্রীতিতে মত্ত ছিল, যারা কখনও দলিত শ্রেণি নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়নি। ছফা তাঁর “বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র” নামক পুস্তকে অত্যন্ত সুচারুভাবে এই বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

Related Posts

About The Author

Add Comment