ইনসাইড ‘র’ : ভারতীয় গুপ্তচরদের অজানা অধ্যায়

পৃথিবীতে গুপ্তচরবৃত্তি একটি সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পেশা। এই বিশ্বের ইতিহাসে প্রায় সকল শাসকই নিজের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে নিজস্ব গুপ্তচর নিয়োগ চালু রেখেছেন। অদ্যাবধি আধুনিক রাষ্ট্রসমূহে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সংস্থার মতোই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা থাকা জরুরী। বর্তমান সময়ে বিপ্লব-যুদ্ধ-বিগ্রহের গতিবিধি নিরীক্ষণ, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুদের কার্যাবলীর উপর গোপন পর্যবেক্ষণ, প্রাপ্ত তথ্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের কাজ।

সাধারণত বিশ্বের গুপ্তচর সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন তথ্য সাধারণ মানুষকে জানতে দেয়া হয় না। তবে, সাধারণ মানুষ ক্বদাচিৎ যখন এ বিষয়ে কিছু জানে, তখন গোয়েন্দাদের কাছে তা পুরনো অর্থাৎ, ঘটে যাওয়া সংবাদ বই কিছুই না! ফলে, কোন গোয়েন্দা বা গুপ্তচরদের সম্পর্কে সম্পূর্ণরুপে কোন তথ্য জানা অসম্ভব। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষের গুপ্তচর সংস্থা “Research & Analysis Wing বা RAW”, উপমহাদেশের একটি প্রাচীন ও সফলতম রাষ্ট্রীয় গুপ্তচর সংস্থা। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এশিয়া মহাদেশ বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে বিশেষভাবে প্রভাব রেখে চলেছে এই সংস্থাটি। ফলে, এই অঞ্চলের সচেতন মানুষ তো বটেই, তাবৎ দুনিয়ার মানুষের কাছে ‘র’ সম্পর্কে জানার কৌতুহল দীর্ঘদিনের।

খুশির কথা এই যে, খোদ ভারতীয় সাংবাদিক শ্রীযুক্ত অশোকা রায়ানা মানুষের পরম আকাঙ্ক্ষিত সেই কৌতুহল মিটিয়েছেন। তিনি ‘ইনসাইড র : ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়’ নামক বইটি অত্যন্ত সহজ-সরল, তথ্যবহুল ও সাবলীল বিশ্লেষণের মাধ্যমে লিখেছেন এবং ‘র’ সম্পর্কে অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্যাবলী জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন। এই বইটি-ই ‘র’ সম্পর্কিত প্রথম প্রকাশিত প্রামাণ্য দলিল। বাংলাদেশী বাংলাভাষী মানুষের কাছে অশোকা রায়ানা’র “ইনসাইড র’ বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন জনাব আবু রুশদ। তাঁর সহজতর ও প্রাঞ্জল অনুবাদকর্মের অনবদ্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে বইটি পড়তে গেলেই।

‘ইনসাইড র : ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়’ বইয়ের শুরুতেই লেখক তামাম পৃথিবীর গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস ও প্রয়োজনীয়তা সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। লেখক অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রাচীন যুগে গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস, জগদ্বিখ্যাত সমরবিদ সান জু এবং ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তক কোটিল্য’র দৃষ্টিতে গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করেছেন।

এরপর, ব্রিটিশ শাসনামলের অবসানের পর স্বাধীন ভারতে গুপ্তচর সংস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধিপূর্বক ভারতের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে দুনিয়া কাঁপানো গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ –এর আবির্ভাব ও উত্থান-পতনের সুদীর্ঘ ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। ‘র’ কর্তৃক পরিচালিত সফল ও ব্যর্থ কিছু অপারেশন (যেমন- “অপারেশন বাংলাদেশ”ও “অপারেশন সিকিম” ইত্যাদি) সম্পর্কিত নানা অজানা তথ্যে ভরপুর এই বইটি যেকোন পাঠককেই তৃপ্ত করবে। “র” এর সবচেয়ে সফল অপারেশন ছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি। এছাড়াও সিকিম এর ভারতভূক্তিকরণে ‘র’ –এর অবদান ছিলো অনস্বীকার্য।

উপমহাদেশীয় রাজনীতির ঐতিহ্য যেমন, “সরকার বদল তো নীতি বদল” সিস্টেমের কুচক্রে পড়ে কংগ্রেস সরকারের পতনের সাথে সাথে জনতা সরকার কর্তৃক ‘র’ –এর দুর্বলীকরণের ইতিহাসও খুব সাবলীলভাবে উঠে এসেছে বইটিতে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ ও অনুপ্রবেশের আগমূহুর্তে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রক কর্তৃক ‘র’-কে অপারেশনের অনুমতি না দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বইটিতে।

এছাড়াও ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্পে ‘র’ –এর ভূমিকাও জানা যাবে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ভারতীয় ভাষায় “টাইগার সিদ্দিকী” (বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী)’র বিদ্রোহে ‘র’ –এর প্রতিজ্ঞাভঙ্গের ইতিহাস পাঠককে ভাবাবে।

একজন বাংলাদেশী পাঠক সবচেয়ে আশ্চর্য হবেন ‘ইনসাইড র : ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়’ বইটির শেষদিকে জুড়ে দেয়া কিছু তথ্য-ছবি দেখে! পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন “শান্তিবাহিনী”-কে সার্বিক সহযোগিতার জন্য পরিচালিত “অপারেশন ঈগল”, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে “স্বাধীন বঙ্গভূমি” ও “মোহাজের সংঘ”-এর আন্দোলন ইত্যাদি নানাবিধ স্পর্শকাতর তথ্য জেনে শিউরে উঠবেন –যেকোন বাংলাদেশী পাঠক!

তথ্য ও ছবিসূত্র :

১। “ইনসাইড র : ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়”, লেখক- অশোকা রায়ানা, অনুবাদক- আবু রুশদ।

Related Posts

About The Author

Add Comment