ইবনে খালদুনের ইতিহাস দর্শন

ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬) বর্তমান তিউনিসিয়ার একজন সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও ইতিহাসবেত্তা ছিলেন। তিনি তার বিখ্যাত বই ‘আল-মুকাদ্দিমা’র শুরুতে বলেন, “ইতিহাস এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা বিশ্বের সকল জাতি ও গোত্রের নিকট সমাদৃত। সাধারণ মানুষগুলো তা জানতে আগ্রহী এবং রাষ্ট্রপতি ও নেতৃস্থানীয়রা তাতে স্থান পেতে প্রতিযোগিতা করে”

ইতিহাসের মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে,কিভাবে সমাজের পরিবর্তিত অবস্থা তাদের সম্পর্কের জালগুলোতে প্রভাব ফেলে। কিভাবে একটা গোত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করে এবং কিভাবে তার পতন ও বিকাশ হয়। কিভাবে অন্য সাম্রাজ্য এসে পুরাতনদের পতন ঘটায় এবং নব্য সাম্রাজ্যের বিস্তার করে।

ইবনে খালদুন ইতিহাসের দুটি দিক উল্লেখ করেন, ১.জাহেরী রূপ, ২.বাতেনি রূপ। জাহেরী রূপটা মূলত অতীতের রাজা-বাদশা, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রের কাল্পনিক ও গল্পাশ্রিত বিবরণী। এতে অতীতের রাজা-বাদশার স্তুতি ও বিপক্ষ দলের কুৎসা রটনা, রাজাদের বংশ পরস্পরা, সংখ্যা ও সালের আধিক্য থাকে। এতে কোন ঘটনার পেছনে তার সম্ভাব্য সামাজিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণগুলোর উল্লেখ থাকে না।

ইতিহাসের জাহেরি রূপটা সাধারণ মানুষের বিনোদনের খোরাক। এই ইতিহাসগুলো রচিত হয় ক্ষমতাশীল শাসকের গৃহপালিত ইতিহাসবেত্তা দ্বারা। সব যুগের ক্ষমতাশীলরাই তাদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য গৃহপালিত কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, ইতিহাসবিদের লালন-পালন করেন। আর এর মধ্য দিয়েই সাধারণ মানুষের মনকে উদ্দেশ্যহীন ধোয়াটে মরুরে রেখে তাদের কাধেই ভর করে রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী করে জালেম শাসক!

অন্য দিকে বাতেনি রূপ হল ইতিহাসের অন্তর্নিহিত দিক। এ দিকটা উল্লেখ করতে গিয়ে খালদুন ইতিহাসকে দর্শনের একটা মূল শাখা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জ্ঞান চর্চার ইতিহাসে ‘ইতিহাসের দর্শন’ নামক নতুন এক সাগরের সন্ধান দেন। পরবর্তীতে এই সাগর জলে স্নান করতে গিয়ে অনেক উপসাগর, নদী ও শাখা নদীর ধারা তৈরী করেন তারই বাতেনি ভাবশিষ্য ভিকু, হেগেল, মার্কস, ডারউইন, গীবন, ই বি টেইলর, স্পেনসার ও আরো অনেকে।

ইবনে খালদুন ইতিহাসের বাতেনি রূপকে জাহেরি রূপ অপেক্ষা অধিকতর ব্যাপক,গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমন্ডিত মনে করেন,এই ধারা আমাদের সমুখে অতীত ঘটনাবলীর কারণ, বিকাশ ও বিনাশের স্বরূপ উন্মোচন করে। ‘ইতিহাসের দর্শন’ এর মূল কাজ হল কোন ঘটনা কিংবা বিষয়কে ‘কিভাবে’ (How) ও ‘কেন’ (Why) দ্বারা প্রশ্ন করে তার মূলকে জানা। এরিস্টটল তার ‘অধিবিদ্যা'(Metaphysics) নামক বইতে যেভাবে কোন বিষয়ের পেছনে চারটি কারণ (উপাদানগত, আকারগত, কার্যকরী ও উদ্দেশ্যমূলক কারণ) উল্লেখ করেছেন ‘ইতিহাসের দর্শন’ অনেকটা তার কাছাকাছি।

ইবনে খালদুন ইতিহাসের সহীহ চর্চা পদ্ধতির পর্যালোচনা করতে গিয়ে তার পূর্বেকার অনেক ইতিহাসবেত্তার ইতিহাস লিখন পদ্ধতির সমালোচনা করেন এবং ইতিহাস কিভাবে সত্য হতে বিচ্যুত হয়ে আধাঁরের আকর্ষণীয় মিথ্যা মোহের জালে বন্দী হয় তা স্পষ্ট করে দেখান।

খালদুন ইতিহাস রচনায় বেশী গুরুত্ব দেন ইতিহাস সম্পর্কিত নানা মুখী তথ্য-উপাত্ত এবং রচনাকারীর বিস্তর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। যে দুটি গুণ ইতিহাস রচনাকারীকে মিথ্যার মোহনীয় আকর্ষণ অতিক্রম করে সত্যের মানজিলে মাকসুদে পৌছার পথ সুগম করে,তা হলো কান্ডজ্ঞান ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি।

কোন ঐতিহাসিক লব্ধ বিবরণকে মানবজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, রাষ্ট্রনীতির মৌলিক তাৎপর্য এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপাদানগত বৈচিত্র্য এবং অদৃশ্যমান ঘটনাকে দৃশ্যমান ঘটনার আলোকে ও অবিদ্যমানকে বিদ্যমানের মাপকাঠিতে ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই বাছাই করতে হয়। তা না করলে মিথ্যা কল্পনারসে ইতিহাস বিকৃত হতে বাধ্য। আর এরই ফাঁদে পা দিয়েছেন অনেক ইতিহাসবিদ, কোরআনের অনেক তাফসীর কারক, নবী রসুলদের জীবনী লেখক।

ইবনে খালদুন তার বইয়ে পূর্বেকার ইতিহাসবিদ মাসউদী এবং ওয়াকেদীর গ্রন্থসমূহের আপত্তিকর বর্ণনা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ করেন। ইতিহাস বিকৃতির আমাদের সময়কার উদাহরণ হলো, ‘৭১’ নিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানী ইতিহাসবিদদের লেখা বই গুলো। তারা সবাই ঘটনার পূর্বোল্লিখিত পদ্ধতি ভুলে নিজস্ব পক্ষ নিয়ে, নিজেদের সুবিধামত চশমা চোখে লাগিয়ে ঘটনার বিররণ দিয়েছেন।

খালদুনের ভাষায় বললে ‘৪৭,’৫২ ও ‘৭১-এর ঘটনা সংবলিত ইতিহাসের বইগুলো বেশীরভাগই ইতিহাসের জাহেরি রূপ। এই ঘটনাগুলোর ‘বাতেনী রূপ’ ইতিহাস অতি নগন্যই লিখিত হয়েছে। তবে নতুন কেউ যদি এই ঘটনাগুলোর সহীহ ইতিহাস জানতে চায়, তাকে পূর্বোল্লিখিত পদ্ধতি ব্যবহার করে দুই বিপরীত পক্ষের বক্তব্য এবং তৃতীয় পক্ষের বক্তব্য শুনতে হবে। সাথে সাথে নিজের ভেতর কাণ্ডজ্ঞান ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ ঘটাতে হবে। এতে করেই সত্যের স্বর্গীয় পরশ সম্ভব।

“ইতিহাসে কিভাবে মিথ্যাচারের আগমন ঘটে”:

১. ইতিহাস রচয়িতাদের একচোখা নীতি ও অন্ধ আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি।

২. ঘটনা বর্ণনাকারীর উপর রচয়িতার অন্ধ বিশ্বাস।

৩. ঘটনা ও বিবরণকারীর বিবরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইতিহাস লেখকের উদাসীনতা।

৪.  অতীতের ঘটনাকে বর্তমানের দৃশ্যমান কোন ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখতে না পারার অজ্ঞতা।

৫. পূর্বানুমান থেকে ঘটনার ব্যাখ্যা করা।

৬. ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অধিকারী লোকদের নৈকট্য লাভের জন্য প্রশংসা ও স্তুতি প্রয়োগ ঘটনার বিবরণকে অতিরঞ্জিত করে।

৭. মিথ্যা অনুপ্রবেশের অধিকতর ব্যাপক কারণ হল, মানব সভ্যতার অন্তর্গত বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থানের প্রকৃতি সম্পর্কে ইতিহাস রচয়িতার অজ্ঞতা।কারণ, জগতে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনাই অন্যকোন ঘটনার প্রতিক্রিয়া কিংবা ফল।বস্তুজগতের সবকিছুই কার্য-কারণ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল। রচয়িতা যদি জগতের এই আদিম রীতি সম্পর্কে ভাল জ্ঞান না রাখে, তাহলে সে সত্য-মিথ্যার ফারাক করতে অক্ষম হবে। এবং তার ইতিহাসের বিবরণীতে মিথ্যা সহজেই অনুপ্রবেশ করে।

৮. বর্ণনাকারীর সহীহ সূত্র তালাশ অপেক্ষা তার বক্তব্যের বস্তুনিষ্ঠতা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে তাহলে মিথ্যাচার সত্যের উপর আধিপত্য করে।

খালদুনের ইতিহাস লিখন ও পঠন পদ্ধতির সাথে স্বরূপ তত্ত্ব (Phenomenology),নব- নির্মাণ (Deconstruction) ও সমাজ বিজ্ঞানের গবেষণা পদ্ধতির গভীর মিল রয়েছে। এই পদ্ধতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাস গুলোর ত্রুটি বিচ্যুতি ধরে নতুন স্বচ্ছ রূপে সাজাতে পারি নিজেদের। আর এরই মধ্য দিয়ে হবে বাঙালি মুসলিম সমাজের নবজাগরণ।

তথ্য সূত্রঃ
Al-Mukaddimah-Ibn khaldun.
ইংরেজি ভাষান্তর-Franz Rosenthal.
বাংলা ভাষান্তর-গোলাম সামদানী কোরায়শী।

Related Posts

About The Author

Add Comment