ইয়াহিয়ার হলফনামা: ‘পাকিস্তান ভাঙ্গায় মুজিব নয়, ভুট্টো দায়ী’

পাকিস্তানি জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পাকিস্তান ভঙ্গের পর প্রায় নীরবই ছিলেন। ইয়াহিয়াকে হটিয়ে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ইয়াহিয়া ক্ষমতার অন্তরালে চলে যান। পাকিস্তান ভাঙ্গার একজন প্রধান ক্রীড়নক হওয়ার পরও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এর দায় দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলেন ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য সব দায়বার তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নতুন এই দেশের জন্ম দেয়। যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে সেটা ছিল বাঁচা মরার লড়াই সেটা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে হয়ে যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতপন্থীদের বেয়াদবী!

নতুন এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা কিভাবে দেখে এটা আমাদের ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সেই সময়ের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যে গোপন ক্যু করে তার সিনিয়র আইয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেছিল তার মতামত আমাদেরকে সিরিয়াসলি নিতে হবে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের উপর চালিত গণহত্যার পেছনে যাদের হাত ছিল তাদের সাড়িতে প্রথমেই রাখতে হবে ইয়াহিয়া খানকে। বাহাত্তর পরবর্তী সময়ে এই জেনারেল প্রায় নীরবই ছিলেন জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত। শুধু তার একটি উইলই বেঁচে আছে তার ৭২ পরবর্তী মতামতের স্বাক্ষী হিসেবে।

ইয়াহিয়া খান মৃত্যুর আগে ৫৭ পৃষ্ঠার একটি হলফনামা লিখেন। লাহোর হাইকোর্টের আইনজীবি মনজুর আহমেদ রানা এই হলফনামাটি প্রস্তুত করেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭৮ সালের মে মাসে হলফনামার প্রত্যেকটি পৃষ্ঠা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন, কয়েক জায়গায় সংশোধন করেন এবং অবশেষে হলফনামায় স্বাক্ষর করেন। এ হলফনামার সব তথ্য সত্য বলে দাবি করেন ইয়াহিয়া খান।

ইয়াহিয়া খানের হলফনামাটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০০৫ সালে।

হলফনামায় বলা হয়: ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য মুজিব নয়, ভুট্টো দায়ী। ১৯৭১ সালে ভুট্টোর অবস্থান এবং একগুয়েমির কারণে পাকিস্তানের সংহতি ভেঙ্গেছে। মুজিবের ছয় দফার চেয়েও এটা ভয়ংকর ছিল। ভুট্টোর উচ্চাকাঙ্খা (‘হাই এমবিশন’) এবং তার অনঢ় অবস্থানের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। সে বাঙ্গালীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলে এবং পাকিস্তানের সংহতি ভেঙ্গে দেয়। পূর্ব পাকিস্তান ভেঙ্গে যায়।’

বি জেড খসরুর ২০১০ সালে প্রকাশিত বই ‘মিথস এন্ড ফ্যাক্টস্: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’ এ ইয়াহিয়া খানের এই দাবিকে প্রশ্ন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ক্র্যাকডাউন শুরু করার সময় তো প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়াহিয়া, ভুট্টো নয়। তাহলে পাকিস্তান ভঙ্গের জন্য শুধু ভু্ট্টো দায়ী হয় কিভাবে? তবে ইয়াহিয়ার দাবি থেকে এটা পরিস্কার যে ইয়াহিয়া ভুট্টোর পরামর্শে হয়তো কাজ করেছিলেন এবং এর ফলে ঠকেছিলেন। মুজিবের সাথে সব আলোচনাতেই মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বললেও ভু্ট্টোর পরামর্শে হয়তো মত পাল্টান। যার ফলে আর পাকিস্তানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মুজিবকে দেশপ্রেমিক হিসেবেও অভিহিত করেন ইয়াহিয়া খান। তিনি মনে করেন আওয়ামী লীগের মধ্যে কিছু বামপন্থী তাকে উসকে দিয়েছিল। তবে ইয়াহিয়া খানের এই যুক্তিটিও মাঠে মারা যায়। কারণ মুজিবের মত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠি চালিয়েছে এটা দুর্বল যুক্তি। বরং মুজিব তার পেছনে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিল।

নিজের জার্নালে মুজিবকে দেশপ্রেমিক বলে নিজেকেও অস্বীকার করছেন ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় থাকাকালে মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলে অহরহ গালি দিতেন ইয়াহিয়া খান। ১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড ইয়াহিয়া খানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি মুজিবকে ফাসিতে দেখতে চান কিনা। এর জবাবে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন: ‘আমি এই লোকটাকে ফাসিতে দিচ্ছিনা যদিও সে একটা বিশ্বাসঘাতক।’

ইয়াহিয়া ও ফারল্যান্ডের মধ্যে আলোচনার বিষয়টি একটি কেবলে পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে।

পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য দায়ী পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও রাজনীতিবিদরা একে অন্যকে দোষারোপ করে আসছে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই।

 

 

তথ্যসূত্র: মিথস এন্ড ফ্যাক্টস্: বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার- বি জেড খসরু

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

Related Posts

About The Author

Add Comment