উত্তরঔপনিবেশিকতা ও চিনুয়া আচেবে’র পথ

আফ্রিকার উত্তরউপনিবেশিক ধারার সাহিত্যের জনক চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে দু’য়েক কথা লিখার পূর্বে উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় উপনিবেশ ভারতবর্ষের এক মনীষীর তাঁর জাতি নিয়ে চিন্তার ধরণ দিয়েই শুরু করতে চাই।

“উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক হইতেই বাঙালীর জীবনে একটা পরিবর্তন আরম্ভ হয়। উহা ইংরেজের সহিত সংশ্রব ও আংশিকভাবে ইংরজি ভাষা জানার ফল। ১৮৫৭ সনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইবার পর বাঙালী মনের নতুন রূপ সম্পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করিল। ইহাকে বাঙালী জীবনের “রিনেসেন্স” বলা যাইতে পারে।” উদ্ধৃত করেছি শ্রীনীরদচন্দ্র চৌধুরীর ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ থেকে। ‘বাঙালীর অকালমৃত্যু তার আত্মহত্যারই নামান্তর’ বলে চৌধুরী সাহেব বুঝাতে চাচ্ছেন যে, ইংরেজরা এখানে আসার আগে যে বাঙালি ছিল সে বাঙালি ‘সভ্যতা’র আস্বাদ পায়নি। আর ইংরেজদের এই আগমণকে তিনি দেখেছিলেন আশীর্বাদ হিসেবে যারা এখানে এসেছিলেন ভারতবর্ষের অধিবাসীদের মুক্ত করার জন্য। উপনিবেশবাদ চলে যায় কিন্তু এ নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকে। স্বয়ং কার্ল মার্ক্স ইংরেজদের ভারতবর্ষে আগমন নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “British has a mission in India to be done.” পরবর্তীতে অবশ্য মার্ক্সের বেশ কয়েকজন অনুসারী এটাকে মার্ক্সের ইংল্যান্ডের লাইব্রেরির তথ্যসূত্রগত ভ্রান্তিজনিত বলে উল্লেখ করেছেন।

ভারতবর্ষের উপনিবেশবাদ দিয়ে শুরু করার কারণ হল, ভারতবর্ষ আর ‘অন্ধকার মহাদেশ’ আফ্রিকার চিত্র কাছাকাছি মানের না হলেও উপনিবেশিক যাঁতায় এই দুই অংশই তাদের দিক থেকে সমানভাবেই শোসিত হয়েছে। আর যখন উপনিবেশ উঠে গেছে তখনো তারা প্রতিষ্ঠা করেছে ‘অরাজনৈতিক’ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তাদের প্রভাব বিদ্যমান রেখেছে। সাম্রাজ্যবাদী মনস্তত্বে যেভাবে পরাধীন করে রেখেছে তার মুল মাধ্যমই হল সাহিত্য। আর এই সাহিত্যের মাধ্যমে উপনিবেশপূর্ব বিশ্বের ‘অসভ্যতা’ আর পশ্চিমের সভ্য দুনিয়ার ছোঁয়ায় তারা কিভাবে ধীরে ধীরে সভ্যতার আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে তাই প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সাহিত্য ধ্যান ধারণা যে কেবল সাদা মানুষদের দ্বারাই হয়েছে তা নয় তারা উপনিবেশিক সমাজের অভ্যন্তরেই তৈরি করেছে সুবিধাভোগী শ্রেণী যারা উপনিবেশের স্বার্থ দেখেছে। ভারতবর্ষে যেমন ছিল ‘ইয়াং বেঙ্গল’। আর শ্রীযুক্ত চৌধুরীর মত বুদ্ধিজীবীরা সংশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন আমাদের চিন্তা-চেতনা কতটা সেকেলে-অনাধুনিক ও বর্বর ছিল।

আর উপনিবেশিক সাহিত্যের শক্ত শেকল থেকে বের হয়ে আসা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে একটা সময়ে এসে। কারণ আধুনিকতা ও প্রগতি বলতে উপনিবেশিক সমাজে যা বুঝায় তা তো মূলত পাশ্চাত্যবাদই। আর এই আধুনিকতা কিংবা প্রগতির বাইরে গিয়ে চিন্তা করাটা রক্ষনশীল কিংবা গ্রাম্যই বটে। তাই উপনিবেশ সমাপ্তির পরেও তার অধিবাসীদের চিন্তা ধাবিত হয় উপনিবেশিক জ্ঞানতত্বের পশ্চাতেই।

চিনুয়া আচেবে নিয়ে কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবেই চলে আসে এ বিষয়গুলো। জোসেফ কনরাড কিংবা মিস্টার জনসনের যে আফ্রিকা বিশ্বের কাছে চিত্রায়িত হয়েছে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’ হিসেবে এবং যাকে কিনা আবিস্কার করতে হয়েছে সাহিত্যে সে আফ্রিকার ইতিহাস বিনির্মাণ করা আচেবে’র পক্ষেই সম্ভব ছিল। যে লিখা দিয়ে আচেবে আচেবে হয়ে উঠেছিলেন তা হল ‘Things Fall Apart’ যেখানে তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশের পত্তনের সাথে সাথে আফ্রিকার নিজস্ব জীবনপ্রণালি ও ইতিহাস ঐতিহ্য একের পর এক হারিয়ে যেতে শুরু করে তা-ই তুলে ধরেছেন। উপনিবেশপূর্ব নাইজেরিয়ার সমাজের একটি গ্রামের চিত্র তুলে ধরে তিনি গোটা আফ্রিকার সমাজের নিজস্ব গতিধারার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন।

গল্পের নায়ক ওকোনকো সমাজের একজন পরাক্রমশালী ব্যক্তি যে কিনা ভূলবশত একটি খুনের ঘটনায় সম্প্রদায়ের বিচার অনুযায়ী নির্বাসিত হয় এবং নির্বাসিত জীবনে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে লড়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে আবার হাজির হয় সমাজে। কিন্তু এরই মধ্যে সমাজে ঘটে যায় ব্যাপক পরিবর্তন, তার সন্তান ও আত্মীয়-স্বজন খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে এবং অতীত মূল্যবোধ বর্জিত এই সমাজে জীবনব্যাপী সাধনায় প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব আর আত্মসম্মান নিয়ে সে আর টিকে উঠতে পারে না যার ফলশ্রুতিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় যেটাই রূপক অর্থে একটি সম্রৃদ্ধ সমাজের ভেঙ্গে পড়া এবং এর অস্তিত্বকে ধারণ করা এক ব্যক্তির আত্মদানের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠে।

দেরিতে হলেও ২০০৭ সালে আচেবে’কে এই উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি কেন নোবেল পুরস্কার পাননি সেটাও তাঁকে চেনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যারা এ যাবৎকাল পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন তাদের সাহিত্যে প্রতিফলিত দৃষ্টিভঙ্গি বা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এইসব লেখক পশ্চিমের মূল কাঠামো ও উপরি কাঠামো বা সামগ্রিক ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যশীল বা মুগ্ধ বা আস্থাশীল, অন্তত বিরোধী নয়; ইউরোপ-আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী অপতৎপরতা, অন্যায় ও দখলদারিত্ব সম্পর্কে উদাসীন বা নীরব; পুঁজিবাদী জীবন-সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি গৌরবান্বিত বা গুণকীর্তনকারী; পশ্চিমা সভ্যতা, কাঠামো, মিডিয়া বা ব্যবস্থার সমালোচনাকারীদের ব্যাপারে সমালোচক; উপনিবেশ স্থাপন এবং এর যাবতীয় কুপ্রথা, কুকর্ম, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি দ্বিধাহীন সমর্থক; সমাজবাদী আদর্শ ও ব্যবস্থার প্রতি বিমুখ, সমালোচক এবং এ-ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সাথে সম্পর্কহীন ইত্যাদি।

আর আচেবে আঙুল দিয়ে দেখান পশ্চিমের আফ্রিকা দেখার চোখকে। তাঁর ভাষায় ‘মানুষ আফ্রিকা যায়। সেখানে তাদের চোখ তা-ই দেখে, যা তাদের মন ইতোমধ্যেই বিশ্বাস করে বসে আছে। ফলে প্রকৃতই চোখের সামনে যা আছে, ব্যর্থ হয় তা দেখতে। পশ্চিমারা আফ্রিকাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশ হিসেবে গণ্য করে না। তাদের কাছে, আফ্রিকা দুনিয়ার যত আজগুবি, অবিশ্বাস্য আর অযৌক্তিক বস্তুতে ভরপুর।’ নতুনরূপে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশের প্রধান লক্ষ্যই হল আফ্রিকানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে হীনমন্যতার বীজ বুনে দিয়ে আবহমান সংস্কৃতির ধ্বংস সাধন করে রাজনৈতিক আগ্রাসন ত্বরান্বিত করা। পরবর্তী উপন্যাসগুলো ‘No Longer At Ease’ এবং ‘Arrow of God’-এও লেখক উপনিবেশবাদী প্রকল্পের জঘন্য কর্মকান্ড দেখিয়েছেন শৈল্পিক দক্ষতায়, গভীর জীবনবোধও মানবিক ব্যঞ্জনায়।

১৯৫৮ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর থেকে বিশ্বব্যাপী এক নতুন চিন্তার জগত উম্মোচিত হয় যে জানালা খুলে দিয়েছিলেন আচেবে। তার পথ ধরে আফ্রিকার অনেক লেখকই ইংরেজিতে সফল হওয়া স্বত্ত্বেও আফ্রিকার অখ্যাত ভাষায় লিখালেখি শুর করেন। এবং এটি উপনিবেশিক ভাষা ও ইউরোপিয় আদর্শের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

আর এ সংগ্রাম আফ্রিকাকে নিজস্বতার চাদড়ে ঢাকতে শুরু করে। তারা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে নিজেদের জীবন-যাপনের সময়ে ফিরে যাওয়ার প্রেরণা পায়। আত্মপরিচয় কিভাবে একটি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তা আজকের আফ্রিকার মানুষদের নিজেদের কালচারের প্রতি দরদ থেকে বুঝা যায়। আর চিনুয়া আচেবে আফ্রিকান ‘রেনেসাঁ’র প্রবাদপুরুষ হয়ে রইবেন।

Related Posts

About The Author

Add Comment