একটি যাত্রীছাউনী নির্মাণের গল্প

২০০৯ সাল। সেপ্টেম্বর মাস। পাঠাগারের আমরা কয়েকজন অলস সময় কাটাচ্ছিলাম। পাশেই ঢাকা-তারাকান্দি রোড।একজন মহিলা অনেকক্ষণ ধরেই দাড়িয়ে আছে।একটার পর একটা বাস চলে যাচ্ছে । কিন্তু তাকে নিয়ে যাচ্ছে না। মহিলা যে কোথাও বসে বিশ্রাম নিবে সে রকম জায়গাও নেই। দুই ছেলে নিয়ে তাকে দাড়িয়ে থাকতে হচ্ছে রাস্তার পাশে। পরে আমরা কয়েকজন মিলে গাড়ি থামিয়ে তাকে উঠিয়ে দেই। কিন্তু হেলপার ভাইয়ের একটা উক্তি আমাদের মনে খটকা লাগে “মামু এক গায়ে কয় জায়গায় থামামু”।

রুসান বলে উঠে গাড়ি থামানোর জন্য একটা জায়গা ঠিক করা উচিৎ। কথাটা আমাদের সকলের মনে ধরে যায়। আমাদের সাবেক সভাপতি শাহেদ বলে উঠে “আসেন আমরা এখানে একটা ঘড় তুলে ফেলি। তাহলে সকলে এখানে আসবে। বসারও একটা জায়গা হবে। আমরা যারা ভূঞাপুর যাই কলেজ করতে তাদেরও বৃষ্টির দিনে অনেক কষ্ট হয়। আর বড় কথা আড্ডারও একটা জায়গা হবে। আমাদের মধ্যে ছোট খাটো ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে নাম কামাই করেছে হাসান। “সব ঠিক থাকলে ঘরটা আমি বানিয়ে দিতে পারবো। কোন সুতার লাগব না।” বলে হাসান। রাজু চিল্লাইয়া উঠে “আয় চড়ে যাই ছন কাইটা নিয়া আসি । গ্রাম থেকে বাশ উঠাবো। আর আমরা সবাই গায়ে গতরে খাটবো। তাইলেই আর কোন খরচ নাই।”

বর্ষার শেষ। যুনায় তখন তীব্র গ্রোত। এবার কাশের চরও পড়েছে। অনেক দূরে। নৌকা নিয়ে যেতে হবে।বকুল পাটনীকে অনুলোধ করি আমাদের নামিয়ে দিয়ে এসে পড়বেন আবার বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসবেন।রাজি হয় না সে। “কইছে আমনেগোরে ঐ চরে যাইতে আইতেই আমাগো বেলা পড়ইয়া যাবো।ঐ সব অইব না । সারা দিনের নামে ভাড়া করতে হইব। ১০০০ টাকা দিয়ন নাগবো।” আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি। শেষে পথ বাতলাইয়া দেয় শামিম। মধুপরে ছন পাওয়া যায় এবং সস্তাও আছে।

আমরা কিছু কিছু টাকা চাদা দিতে রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের গ্রামের ভ্যানচালক দুলাল ভাই বলল “তোমরা আমারে সুবিধা মতো ১০০ টাকা দিও। আমি তোমাগো ছনডি আইনা দিমু।” আমাদের সাহস এবার বেড়ে গেল।

ঐ দিকে মাসুদ কাক বললেন তোরা এক কাজ কর। আমি তোগোরে কিছু টাকা দেইরো আর আমার জমির পাশে একটা শিশু গাছ আছে এটা দিয়া যদি কিছু করতে পারস কর। আমার কোন আপত্তি নাই। আমাদের খুসি আর দেখে কে। ইঞ্জিনিয়ার হাসান চলে যায় শো মেশিনে। করাত আর মাপ জোকের ফিতা নিয়ে আসে।তার নির্দেশ মতো কাজ করে যাই আমরা।জাহাঙ্গির, রবিন, পাপন, সাগর, সেই কাঠগুলো কাধে করে নিয়ে যায় বাজারে চিরাই করতে। সো মেশিনের মালিককে ১০০ টাকা দিতেই মহা খুশি হয়ে যান।নতুন উদ্যমে এগুতে থাকে আমাদের কাজ। সুতার বাড়ি থেকে সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে হাসেন। আমরা সবাই হলাম ওর জোগালদার। ৩ দিনের মধ্যে ও দাড় করিয়ে ফেলে ৬ চালা ঘড়ের এক ফ্রেম। গ্রামের মুরুব্বিরা মাঝে মাঝে দখেতে আসে আমাদের কাজকর্ম। টুকটাক পরামর্শ দেন। মসজিদের মুসুল্লিদের দিক থেকে মৃদু আপত্তি আসে। মসজিদের পাশে যাত্রী ছাউনী দেয়া যাবে না। তেমারা চিল্লাপাল্লা করবা। নামাজিদের ব্যঘাত ঘটবে। আমরা তাদের বুঝিয়ে ঠান্ডা করি।

ফ্রেম হয়ে গেলে আমি আর শামিম দুলাল ভাইকে নিয়ে রওনা হই মধুপুর। ছন আনতে। কিন্তু সেখানে ঘটে আরেক বিপত্তি। মধুপুর ছন পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় রসুলপুর। দুলাল ভাই এবার বেকে বসলেন। ঐ পথ আমি চিনি না, আমি যাব না।।যাই হোক ২টা ডিম ঘুস দিয়ে তাকে রাজি করালাম।ছন নিয়ে বাড়িতে আসতে আসতে রাত দু’টো বেজে গেল আমাদের।

পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায় আমাদের যাত্রীছাউনী। গ্রাম থেকে বাঁশ তুলে দেয়া হয় এর খুটি। রাস্তার কিছু ইট বৃষ্টির পানিতে ধ্বসে পাগারে পড়ে ছিল। আমরা সেগুলোকে তুলে আনি বসবার জন্য। পরে রানু মামা আমাদের ২ বস্তা সিমেন্ট দিলে আমার বসার পাকা ব্যবস্থা করে দেই।

রোদ বৃষ্টি বর্ষায় গ্রামের মানুষের দারুন উপকারে আসে এই যাত্রীছাউনী।আমাদের সামান্য উদ্যগ আর পরিশ্রমে মানুষের এতো উপকার হচ্ছে। এটা ভাবতে আমদেরও ভালো লাগে। এরই মাঝে কেটে গেছে ৩ বছর। মাঝে একবার খুটি বদলিয়েছিরাম আমরা। ছনগুলো পচে খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। সংস্কার করা জরুরী। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না।পরে পাঠাগারের পক্ষ থেকে আমরাই উদ্যেগ নেই এটি সংস্কারের।

সিধান্ত হয় বছর বছর সংস্কার করা সম্ভব না। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে অনেক বছর এটা টিকে থাকে। আমারা আবার গ্রামের মানুষের কাছে যাই। অনেকেই এগিয়ে আসে এ যাত্রায় মারুফ কাকা, পারভেজ ভাই, জীবন ভাই, টিটু, শিবলী স্বপন রজব ভাইয়ের কথা অবশ্যই স্মরণ করতে হয়। তাছাড়া গ্রামের অনেকেই ৫০, ১০০, ৫০০ টাকা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় আমদের দিকে।সবার সহযোগিতায় দাড়িয়ে যায়েএবারের এই যাত্রীছাউনী।

আমরা ঠিক করেছি আমাদের এই যাত্রীছাউনীর নাম রাখা হবে উপমহাদেশের বিখ্যাত কৃষক নেতা আমাদের এলাকার গর্ব হাতেম খাঁর নামে। রাস্তা দিয়ে মানুষ যাবে। কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিবে বা কেউ তাকিয়ে দেখবে দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপত্যটিকে। জানবে এক মহান কৃষক নেতার কথা যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পার করেছে কৃষকের অধিকারের কথা বলে বলে, বৃটিশ আর পাকিস্তানের জেলে জেলে, কিংবা হুলিয়া মাথায় নিয়ে ফেরারি হয়ে। আর জানবে একদল উদ্যমই তরণের কথা। যারা স্বপ্ন দেখে গ্রামে গ্রামে পাঠাগার দিয়ে, নিজেদের অর্থে, নিজেদের শ্রমে, ঘামে, বুদ্ধিতে দেশটাকে পালটে দিতে, যারা স্বপ্ন দেখে একটা সত্যিকারের, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ বিনির্মাণের।

 

আবদুস ছাত্তার খান

সংগঠক, গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন

Related Posts

About The Author

Add Comment