একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন বাতিঘর

দামী সেল্ফ কিনে বই সাজিয়ে রাখলেই তা গ্রন্থাগার কিংবা কোন জায়গায় বসে কিছু পড়লেই তা পাঠাগার হয় না। যদি তাই হতো তাহলে বাজারে শতশত বইয়ের দোকান কিংবা অলিগলিতে কোটি কোটি স্কুল থাকতেও দেশে “আলোকিত মানুষ” -এর আকাল দেখা দিতো না।

সৈয়দ মুজতবা আলী ফ্রাঁসের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, “যত বেশী নতুন নতুন জ্ঞানের সাথে পরিচিত হবে, মানুষের মনের চোখ তত বেড়ে যাবে।” অর্থাৎ, এই পৃথিবীতে আপনি কতটুকু দৃষ্টিসম্পন্ন বা আলোকিত হবেন, এটা নির্ভর করছে একান্তই আপনার শুভেচ্ছার উপর।

বর্তমানকালের একজন আলোকিত মানুষ সাবিদিন ইব্রাহীমের মতে, “পাঠাগারের জন্য কোন ঘর লাগে না, কোন আসবাবপত্র লাগে না। পাঠাগার হচ্ছে এমন একটা সিস্টেম, যেখানে প্রয়োজন শুধু বই এবং পাঠকের। এ দু’টো থাকলে পৃথিবীর যেকোন স্থানই পাঠাগার হতে পারে।”

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, বাঙালি জাতির বই কেনার অভ্যাস নেই। বই কিনতে বললেই অজুহাত দেখায় অত টাকা কোথায়? এক্ষেত্রে জনাব মুজতবা সাহেবের প্রশ্ন, “টাকা নেই কথাটা যিনি বলছেন, কোথায় দাঁড়িয়ে বলছেন? ফুটবল মাঠ নাকি সিনেমা হলের কিউ থেকে?”

অর্থাৎ, বেঘোরে টাকা খরচের বেলায় বাঙালির হুঁশ থাকে না, যত্ত হিসেব বই কেনার বেলায়! এদেরকে তাচ্ছিল্য করে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, “হিসেব করে বই কেনে সংসারী লোক।” এদিকে বইপোকাদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলছেন, “পাঁড় পাঠক বই কেনে প্রথমটায় দাঁতমুখ খিঁচিয়ে, এরপর চেখে চেখে সুখ করে নেয়, শেষে কেনে ক্ষ্যাঁপার মত এবং তাতে চুর হয়ে থাকে।”

অর্থাৎ, বই কেনা ও পড়া একটা নেশার মতোই, সচেতন পাঠকের নিকটে।

তবে, ব্যাঙের ছাতার মতো অলিগলিতে লাইব্রেরী কিংবা স্কুল খোলার আগে মাতাল পাঠক হতে হবে এবং পকেটের পয়সা খরচা করে বই কেনার অভ্যাস করতে হবে। বই কিনে পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ দেউলিয়া হয়নি এবং বই পড়ে কেউ অমানুষের জিন্দেগী যাপন করে নি।

নিত্যনতুন বই পড়লে নতুন নতুন চোখ গজাবে এবং মন ও মস্তিষ্ক ততবেশী আলোকিত হবে। গ্যারান্টি দিচ্ছি, আলোকিত মনের মানুষ কখনোই পৃথিবীর ক্ষতি করে না।

জ্ঞান অর্জনকে যদি আলোকিত মন গড়ার পন্থা বলা হয়, তাহলে প্রচলিত সংজ্ঞায় যেসব পাঠাগার বা গ্রন্থাগার এদেশে আছে, সেগুলো যদি প্রকৃতপক্ষেই আলো বিতরণ করতে চায়, তাহলে সেগুলোকে একেকটি “বাতিঘর” হিসেবে রূপান্তরিত করা উচিত।

বাংলাদেশ বা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একেকটি বাতিঘর একেকটি মিসাইল স্বরূপ। বাতিঘরের একেকটি বই একেকটি হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও বেশী ক্ষমতা রাখে। মিসাইল বা পারমাণবিক বোমা পৃথিবীর ক্ষতি করে, কিন্তু বাতিঘর পৃথিবীকে স্বপ্নের আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

সমাজের পশ্চাৎপদ অংশ অর্থাৎ শিশু ও নারীদেরকে আলোকিত করার জন্য বাতিঘর একটি আদর্শ স্থান। আলোকিত প্রজন্মই আলোকিত ভবিষ্যৎ উপহার দিবে।

এই পৃথিবীতে এতো এতো তন্ত্র-মন্ত্রের প্রয়োজন নেই। মানবজাতির প্রতি সৃষ্টিকর্তার প্রথম নির্দেশ “পড়”, সুতরাং মানবজাতির এক ও অভিন্ন ধর্ম হচ্ছে পড়া। আপনি সৃষ্টিকর্তার নামে পড়া শুরু করে, নানাবিধ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করে তোলার ফলেই কল্যাণের দিকে অগ্রসর হতে পারেন।

পৃথিবীর কোন সরকার কিংবা রাষ্ট্র আপনাকে পরিপূর্ণ আলোকিত হতে দিবে না, নিজেদের শাসনতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই। যেটুকু শিক্ষা শুধু সরকার বা রাষ্ট্র চালানোর জন্য দরকার, সেই সেন্সর্ড শিক্ষাটুকুই আপনাকে দেয়া হবে। কিন্তু, আপনি যদি নিজেকে “আলোকিত বিশ্বনাগরিক” হিসেবে দেখতে চান, সমাধান একটাই, পড়ুন!

পড়ার ক্ষেত্রে কোন বাছবিচার করতে নেই। একজন আদর্শ পাঠককে সর্বভূক হতে হবে। পৃথিবীর সব ধর্মের, অধর্মের, মতের, অমতের সব লেখা আপনি না পড়ে কিভাবে বুঝবেন যে আপনার মতই সেরা? লবণ যে নোনতা, এটা না চেখে বুঝবেন কি করে? আলোকিত মন গড়ার কাজে নিজেই সেন্সরশিপ আরোপ করে সফল হবেন কি করে?

“জ্ঞানসমুদ্র” তো কারও বাপদাদার সম্পত্তি নয় যে সেখান থেকে আপনাকে তৃষ্ণা নিবারণে কেউ বাঁধা প্রদান করবে! আপনি ক্রস কানেকশন করতে শিখুন। ইতিহাস আবেগ নয়, ইতিহাস হচ্ছে ফ্যাক্ট। সর্বদলীয় ইতিহাস পড়ে ক্রস কানেকশন করে প্রকৃত ইতিহাস বের করে আনা জানতে হবে। সুসাহিত্য, কুসাহিত্য বা অপসাহিত্য নির্ধারণ করার জন্য আপনাকে সবই পড়তে হবে। সর্বদা নিজের আদর্শিক মানদন্ডে শাণ দিতে হবে। হুটহাট ভালমন্দ বিচারের আগে একটু নিরীক্ষণ করতে হবে।

নিজে বেশী বলবেন না, যারা বেশী বলে তাদের থেকে দূরে থাকুন। যা জানতে চান, নিজে পড়ে জানুন। বক্তৃতা শুনে কোনদিন কোন সঠিক জ্ঞান আপনি পাবেন না।

মুক্ত মনা হতে হলে আগে নিজেকে নিজের অধীন থেকে মুক্ত করুন। জ্ঞানসমুদ্র পাড়ি দিয়ে কেবলই কল্যাণের দিকে এগিয়ে যান। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন নিজেকে গড়ে তুলুন।

জ্ঞানসমুদ্রের অপরপ্রান্তে যদি আলোকিত গন্তব্য থাকে, বাতিঘর কেবলই সেই গন্তব্যের প্রারম্ভিক টিকিট কাউন্টার মাত্র। আসুন, নিজের ইচ্ছেমত (বই নিন) টিকিট কাটুন, নির্ধারিত গন্তব্যের পানে আপনার যাত্রা শুভ হোক…

Related Posts

About The Author

Add Comment