একান্ত আলাপচারিতায় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আলাপচারিতা শব্দটি ব্যাবহার করছি ঠিক, তবে আভিধানিকভাবে আলাপচারিতা অর্থে নয়। তাতে করে একধরণের ধৃষ্টতাই হয়ে যাবে। ভার্সিটির গণ্ডি সদ্য টপকে এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নড়বড়ে প্রভাষক সাজিদ উল হক আবিরকে চায়ের কাঁপে চুমুক দিতে দিতে খোশগল্পের নেমন্তন্ন জানিয়েছেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ – এতো হতে পারে না। তবে বিষয়টা কি?
সম্পর্ক অনেকদিনের পুরনো। সম্পর্ক গ্রহণ করে ঋদ্ধ হবার। আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর এই ভদ্রলোক কাছ থেকে পরোক্ষে নিয়ে চলেছি, নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছি সে আজ বছর পনের হল। দেড় দশক পর আজ বিকেলে প্রায় আধাঘণ্টার মত দীর্ঘ সময় নিয়ে আলাপচারিতা হয়েছে সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে, জীবন ও জীবনের দর্শন নিয়ে। বরং এইবেলা একটু ধৃষ্টতা করে বলা যাক – দর্শন বিনিময়ই হয়েছে একযুগের প্রতিষ্ঠাতার সাথে নবীন যুগের এক প্রতিনিধির, অর্থাৎ স্যারের সাথে আমার। বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত আলোর ইশকুল কার্যক্রমে যে পাঠচক্র অন্তর্গত – তা সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন এবং ক্লাস নেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। সীমিত সদস্যের অন্তর্ভুক্তিতে পরিচালিত কার্যক্রমটিতে কারা কারা অংশ নিতে পারবে – তা নিয়ন্ত্রণও করেন তিনি। তার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের দ্বারা পাঠচক্রের সদস্যপদ নির্ধারিত হয়। তো – সেই সূত্রেই আজ ডাক পেয়েছিলাম সাক্ষাতকারে সায়ীদ স্যারের মুখোমুখি হওয়ায়। প্রাচীনে এবং অর্বাচীনে কি ভাবের বিনিময় হল – সেটাই এ রচনার আলেখ্য।
গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করে একটু ধাতস্থ হয়ে বসবার আগেই স্যারের প্রশ্ন – কে তুমি? কি করা হয়? বললাম – ঢাবির ইংরেজি বিভাগ থেকে এমএ ফাইনাল দিলাম মাত্র। পরে খানিকটা আমতা আমতা করে, (যেহেতু কি করা হয় প্রশ্নটির জবাবও এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, তাই যোগ করে দিলাম) – এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবার দুরূহ কাজটিও সম্পন্ন করতে হচ্ছে। আমতা আমতা করার কারন – আমার কেবলই মনে হয় – এখনও ছাত্র আমি। সদ্যই মায়ের স্তন্যপান শেষে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পর নবজাতক শিশুর যেমন মুখ জুড়ে থাকে মাতৃদুগ্ধের ঘ্রাণ, আমার শরীর জুড়ে তেমনই সদ্য ত্যাগ করে আসা মহীরুহ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্তের ঘ্রাণ। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মত একজন শিক্ষকের সামনে নিজেকে আর একজন শিক্ষক বলে পরিচয় দিতে অস্বস্তি লাগা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়।
যাই হোক, ইউনিভার্সিটিতে পড়াই শুনে সঙ্গেসঙ্গেই জিজ্ঞেস করলেন কোন ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের নাম করতেই চিনলেন তিনি। এরপর ইংরেজিতে যাকে বলে Beating around the bush সেটা না করে সরাসরি প্রশ্ন করলেন আমার সাহিত্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। আমি পুনরায় আমতা আমতা করে বললাম আমার প্রকাশিত তিনটি বইয়ের কথা (আমতা আমতা বারবার এই কারণে করছিলাম, যাতে করে নিজের সম্পর্কে দেয়া তথ্যগুলো শুনে তার কাছে – গুমোর করছি, এমনটা না মনে হয়। আমি তো এই সেদিনের ছেলে, কিন্তু এখনও আমার সামনে কেউ খুব হামবড়া ভাব দেখালে আমার পিত্তি জ্বলে যায়। পারতপক্ষে আমি কারও সাথেই অহম প্রকাশ করে কথা বলি না।) দিনের একটা লম্বা সময় পড়া- পড়ানো আর লেখালিখিতে কাটে এও জানালাম।
স্যার সে সূত্র ধরেই জিজ্ঞেস করলেন – এই বই নিয়ে পড়ে থাকাটা এত বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারন কি? দিনের মধ্যে লম্বা সময় কেন বই নিয়ে কাটানো হয়? খানিক ভেবে উত্তর দিলাম – বই আমার ইউটোপিয়া। এই অর্থে যে – আমার একটা আকাঙ্ক্ষিত জীবন আছে, নিজের জীবন যেরকমভাবে আমি চাই, অথচ সে জীবন আমি যাপন করতে পারছি না। বই আমাকে আমার আইডিয়াল কিন্তু কাল্পনিক পৃথিবীতে লুকিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়।
স্যার প্রশ্ন করলেন – আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড একটা অ্যাবসট্র্যাকট জিনিস। অ্যাবসট্র্যাক্ট একটা বস্তু নিয়ে এত মাতামাতি কেন? আর এই অ্যাবসট্র্যাক্ট পৃথিবীতে লুকোনোর জন্যেই বা বই পড়া কেন? প্রশ্নটি শোনার পরপরই আমি উত্তর দিতে প্রস্তুত ছিলাম। বই কেন পড়ি এটা নিয়ে আমার লম্বা লম্বা পার্সোনাল হাইপোথিসিস রেডি করা আছে বহু আগে থেকে। কিন্তু আমার মত অর্বাচীনের সাথে স্যার বাদানুবাদে আগ্রহী কিনা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। তাই আপাত নীরবতা অবলম্বন করে কথা শুনে যাওয়াই শ্রেয় মনে করলাম।
স্যার তখন বলে চলেছেন – এই তোমাদের হচ্ছে কেবল বই পড়া নিয়ে মাতামাতি। কেবল বই পড়াটাকেই এক বিরাট কর্ম মনে করে নাও। এ পর্যায়ে আমি কাঁচুমাচু করে বললাম – স্যার আমি টুকটাক অ্যাক্টিভিজমের সাথেও জড়িত। স্যার সেখান থেকেই আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন – হ্যাঁ ওটাই! টুকটাক অ্যাক্টিভিজম নয়, বরং অ্যাক্টিভিজমই মূল। বললেন – শুধু বই পড়া, শুধু জ্ঞানের পেছনে ছোটা কারও জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে না, বরং এই জীবনটাই উদ্দেশ্য, জীবনকে সাধনই উদ্দেশ্য। উদাহরণ টানতে গিয়ে বললেন – এই যে শেক্সপিয়র এত এত লিখে গেলেন, তার সব লেখা পড়ে যাওয়াই কারও জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে কিনা? বলাই বাহুল্য, এই সূত্র ধরেই আমার বই পড়া সংক্রান্ত নিজস্ব ফিলসফি শেয়ার করার একটা সুযোগ পেলাম। উত্তরে বললাম – স্যার শেক্সপিয়র পড়াটা হয়তো জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু শেক্সপিয়র পড়ার পর মস্তিষ্কে যে অনুরণন সৃষ্টি হয়, আমার মস্তিস্ক যে ফিডব্যাক দেয় – সেটাই আমার প্রাপ্তি। স্যার বললেন – কিন্তু এটা তো সেকেন্ডারি সোর্স বা প্রতিঘাত মাত্র। আমি বললাম – বরং স্যার আমি শেক্সপিয়রকে পৃথিবী দেখার আর একটি লেন্স হিসেবেই বিবেচনা করি।
স্যার কি মনে করে যেন প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন – তোমাদের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুমে শিক্ষকেরা লেকচার দেন কোন ভাষায়? উত্তরে বললাম – অধিকাংশ সময়েই প্রায় সব শিক্ষক ইংরেজিতে লেকচার দেন, তবে কখনো কখনো যে দু’চার লাইন বাংলা বলেন না – এমনটা না। পরের প্রশ্নও এলো ডিপার্টমেন্ট সম্পর্কিত এবং আমি বুঝলাম – এ দেশে যারাই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিমনা, তারাই ঢাবির ইংরেজি বিভাগের ব্যাপারে উৎসাহী, এ অর্থে যে – অনেক কিংবদন্তীর জন্ম দেয়া প্রায় শতবর্ষী এই বিভাগ এখন আছে কেমন – এ প্রশ্ন বা অনুসন্ধিৎসা সবার মনেই থাকে।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন – বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কি টেক্সট বই সব পড়ে? সাক্ষাৎকারের কক্ষে স্যারের পাশেই তার এক বয়স্ক সহযোগী ছিলেন, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের কোন উরধতন কর্মকর্তা হবেন, তিনি আমি উত্তর দেবার আগেই বলে বসলেন – এখন সব গাইড বই পড়ে পাশ করে! আমি স্যারকে বললাম – স্যার অন্যদের কথা বলতে পারি না, তবে আমি প্রায় সব টেক্সট পড়েছি। স্যার জানতে চাইলেন – প্রায় বলতে কি বুঝাচ্ছি। আমি বললাম যে হাতেগোনা দু’ চারটে টেক্সট ছিল যেগুলো একদমই হজম হচ্ছিল না আবার এদের ডিঙ্গিয়ে গিয়েও বেশ ভালো ভাবে পাশ করে বের হওয়া যায়, সেগুলো কষ্ট করে গিলতে গিয়ে বদহজম করতে চাই নি।
স্যার বললেন – যতগুলো টেক্সট পড়েছ ইংরেজি বিভাগে, তার মধ্য থেকে দুটো টেক্সটের নাম বলো – যেগুলো তোমাকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি একটু ভেবে বললাম – ডঃ ফাউস্টাস এবং হ্যামলেট। স্যার বললেন – প্রথমটার উচ্চারণ ফস্টাস হবে না? আমি বললাম, স্যার অনেক জায়গায়ই আমি ফস্টাস উচ্চারণটা শুনেছি, কিন্তু আমাদের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার ক্লাসে পড়ানোর সময় এই নামটি উচ্চারণ করতেন ফাউস্টাস, স্যারের অনুকরণে আমিও এভাবেই উচ্চারণ করি। পুনরায় সায়ীদ স্যারের পাশে বসা ভদ্রলোক বললেন – মনজুর ভাইয়ের ডিগ্রী ক্যানাডার না? এটা বোধহয় তবে ক্যানাডিয়ান উচ্চারণ।
স্যার বললেন – ব্যাখ্যা করো বলো দেখি , এ দু’টো টেক্সট তোমার পছন্দ কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আসলে কি বলা যায়? কালজয়ী এমন দুটো বই, যার ব্যাপারে আমার পছন্দের দিকগুলো বলতে গেলে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার দু’ দুটো বই লিখে ফেলা সম্ভব, সেটাকে সংক্ষেপে কি বলবো? যাক, ভেবেচিন্তে বললাম যে সমস্ত কারণে ফাউস্টাস ভালো লেগেছে তার মধ্যে আছে ক্রিস্টোফার মারলো’র অসাধারণ শক্তিশালী ভাষার অপরূপ সৌকর্য, যাতে মুগ্ধ হয়ে আরেক এলিজাবেথান নাট্যকার বেন জনসন “Marlowe’s Mighty. Line” নামের একটি ফ্রেইজের প্রচলন করেন। বিশেষ করে নাটকটির একদম শেষে মাত্র ২৩ বছরের আরাম আয়েশ এবং বিত্ত বৈভবের বদলে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করে দেয়া আমাদের ট্র্যাজিক হিরো ডঃ ফাউস্টাস তার শেষ সলিলোকি বা স্বগতোক্তিতে প্রাণে নাড়া দিয়ে যাওয়ার মত আফসোস, কান্না এবং হাহাকারে পরিবেশ ভারী করে তোলেন – তার তুলনা আছে আর কোন ভাষার কোন সাহিত্যে? হ্যামলেটের স্বপক্ষ সাধনে জানালাম যুবরাজ হ্যামলেটের অস্তিত্ববাদী সংকটের সাথে প্রতিনিয়তই নিজের অস্তিত্বের সংকটের মিল খুঁজে পাই বলে হ্যামলেট আমাকে আকৃষ্ট করেছে।
স্যার এরপর বললেন -ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র তুমি, বাংলা সাহিত্য তাহলে সেভাবে পড়া হয় নি তোমার? আমি সহাস্যে উত্তর দিলাম – ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হতে পারি , তবে আমার ভিত্তি বাংলায়। এ কারনেই বাংলা সাহিত্যে লেখালিখি। স্যার জানতে চাইলেন সম্প্রতি কি কি বই পড়েছি। আমি জানালাম, ইউএপিতে প্রভাষকের চাকরীতে যোগ দেবার পরপরই আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সদস্য হই এবং প্রায় প্রতিদিন অফিস শেষে এই লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ি এবং নিজের লেখালিখি করি। বাসায় একাজ হয় না কারন সেখানে মনসংযোগ নষ্ট করার মত জিনিসের আধিক্য। তো এই সূত্রে ব্যাগের ভেতরে তখনই উপস্থিত দুটো বই – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস জননী (হুমায়ুন আহমেদ জননীর মত একটি উপন্যাস লেখার হয়নি বলে সারাজীবন আক্ষেপ করে গেছেন) আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অর্ধেক জীবন, – এ দুটির নাম উল্লেখ করলাম। বললাম, এ দুটির ঠিক আগে পড়েছি সৈয়দ শামসুল হক সাহেবের প্রেমের গল্পের সংকলন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের গল্প সংকলন – সুখদুঃখের গল্প এবং প্রবন্ধ সংকলন – অলস দিনের হাওয়া, সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবে রচিত হিটলার (নিজের অজান্তে সৈয়দ নামধারী তিন সাহিত্যিক একসঙ্গে!) এবং বুদ্ধদেব বসুর ছেলেবেলার আত্মজৈবনিক – আমার ছেলেবেলা। এগুলো ছিল স্যারের লাইব্রেরী থেকে নিয়ে পড়া গত একমাসে পঠিত বই। স্যারকে জানালাম এ বছরের শুরু ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সাহেবের খোয়াবনামা দিয়ে, এরপর খুব ব্যাপকভাবে শহিদুল জহির পাঠ শুরু করে একটানা তার সবগুলি প্রকাশিত- অপ্রকাশিত লেখা পাঠ সম্পন্ন করি। ক্রমাগত অদলবদল করে বর্তমানে পড়ে চলেছি পাঁচটি প্রবন্ধের বই একসঙ্গে – ডঃ আহমেদ শরীফ, আহমদ ছফা, ডঃ হুমায়ুন আজাদ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস – এ চারজনের পৃথক চারটি প্রবন্ধ সংকলন এবং বাঙ্গালীর জয় পরাজয় নামে ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের প্রবন্ধ সংকলন। শাহাদুজ্জামান সাহেবের ক্রাচের কর্নেলও উল্লেখ করা দরকার ছিল – সম্প্রতি পড়ছি এমন বাংলা বইয়ের লিস্টিতে, কিন্তু মনে আসে নি সেই সময়।
স্যার বললেন – আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আগ্রহ তোমার। বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথ কিছু পড়েছ কি? আমি স্বীকার করলাম যে – আমার বঙ্কিম পাঠ কলেজের বাংলা পাঠ্য বইয়ে মুদ্রিত কমলাকান্তের জবানবন্দীতে এসে ঠেকে গেছে, কিন্তু রবীন্দ্র সাহিত্যসম্ভার থেকে প্রায়ই কিছু না কিছু নেয়া হয়। তার সবগুলো ছোটগল্পের সমাহার – গল্পগুচ্ছ, বা ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষে যখন মাত্র ভর্তি হলাম, ক্লাস শুরু হয় নি – সে বিরতিতে আয়েশ করে উপন্যাস গোরায় নিমজ্জিত থাকা – শানিত যুক্তির তরবারিতে ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ব্রাহ্মবাদের বাহাসে অপার বিস্ময়াভিভূত হওয়া, সঙ্গে সঙ্গে এও যুক্ত করে দিলাম যে – গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থটি সর্বদা আমার পড়ার টেবিলে থাকে, মনখারাপের মুহূর্তে তা উল্টে একটি বা দুটি কবিতা পড়া হয় প্রায়ই। স্যারকে এটা বলতে ভুলি নি যে – আমার রবীন্দ্রপঠনের সঙ্গী ছিল এবং আছে অনেকটা উষ্মা, ক্রোধ এবং বিরক্তির সংমিশ্রণ। স্যার জিজ্ঞেস করলেন – কেন? আমি বললাম আমার বাবার কথা। বললাম যে – আমার বাবা তার কর্ম জীবনের শুরুতে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন। আশির দশকের শুরুতে তার রচিত একাধিক টিভি নাটক বিটিভিতে প্রদর্শিত হয়। কিন্তু হঠাৎ তাকে রবীন্দ্রনাথের ভুত পেয়ে বসে। তিনি লেখালিখি থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে হয়ে যান খাঁটি রবীন্দ্র পূজারী। রবীন্দ্রনাথের গানের ইতিহাস, তার সাহিত্য ও জীবন নিয়ে রচিত যতগুলো সমালোচনা গ্রন্থ আছে, তার অধিকাংশই সংগ্রহ করে তিনি তাতে নিমজ্জিত হন। আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর প্রায়ই আমার কাছে এসে বলতেন রবীন্দ্র গবেষক হতে। আমি বুঝতাম বাবার এ আহ্বান আবেগতাড়িত হলেও রবীন্দ্র গবেষকের তকমাটির বেশ প্রায়োগিক তাৎপর্য আছে, একটু বয়স্ক হলেই বেশ হোমরাচোমরা ব্যাক্তিদের মধ্যে বসে রবীন্দ্র সংশ্লিষ্ট সেমিনারের সভাধিপতির আসন অলঙ্কৃত করা যাবে। কিন্তু এ লোভে পড়ে তো আমি সাহিত্যচর্চা করতে আসি নি। স্যারকে এ ঘটনা জানিয়ে বললাম আমার বাবার সৃষ্টিশীল ক্যারিয়ার ধ্বংসের পেছনে, বা ওনার উনি হয়ে ওঠার পেছনে সবচে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, তাই আমার অনেকটা ক্রোধের বশবর্তী হয়েই রবীন্দ্রনাথ পূজা করা হয়ে ওঠে নি।
স্যার তার পাশের সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন – বাঙ্গালীর এই আরেক এক সমস্যা। রবীন্দ্রনাথকে একদম উপাসনার স্থলে নিয়ে বসিয়েছে। এরপর আমার দিকে ফিরে বললেন – ২৫ বছর বয়সেই আমি রবীন্দ্র উপাসকগোষ্ঠীদের তুমুল সমালোচনা করে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, বুঝলে। (স্যারের এ কথায় আমি বেশ আত্মশ্লাঘা বোধ করলাম, কারন যদিও রবীন্দ্র উপাসকদের সমালোচনা করে আমার এখনও তেমন কোন লেখা কোথাও প্রকাশিত হয় নি, তবুও আমার বয়স এখন পঁচিশ এবং স্যারের বয়সও ঠিক যখন পঁচিশ অর্থাৎ ঠিক একই বয়সে এসে আমরা দুজনেই সাহিত্যপ্রেমী বাঙ্গালী মানসের একটি অভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম।)
এমন সময় স্যার খানিকটা নীরব হয়ে যান এবং আমি ভয় পেয়ে যাই, পাছে সাক্ষাৎকার এখনই শেষ না হয়ে যায়। কারন কথা সবেমাত্র জমে উঠছিল। ফলে সাহস করে আমি নিজেই একটি প্রসঙ্গের অবতারণ করলাম। জানালাম যে আলোর ইশকুলের চতুর্থ ব্যাচের সাথে ভর্তি হবার আবেদন ফর্ম জমা দিলেও, আমি আলোর ইশকুলের প্রথম ব্যাচেরই ছাত্র ছিলাম ২০১৩ সালে, কিন্তু ডিপার্টমেন্টের পড়ার চাপে তখন তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙ্গনোর পর এসে মনে হচ্ছে যে আমি আসল জ্ঞান আহরণের জন্যে উপযুক্ত হয়েছি, তাই পুনরায় ভর্তির দরখাস্ত করেছি।
আমার এ কথা শুনে স্যার বিশেষ প্রীত হয়েছেন বলে মনে হল না। বারবার আমাকে প্রশ্ন করতে থাকলেন – কেন ছেড়ে গিয়েছিলাম তিন বছর আগে। বললেন – আঠার বছর বয়সে আমার যে গ্রহণ (পারসিভ) করার ক্ষমতা ছিল (যদিও প্রকৃতপক্ষে তখন আমার বয়স প্রায় তেইশ), তার সাথে আমার পঁচিশ বছর বয়সের গ্রহণ করার ক্ষমতার পার্থক্য আকাশ পাতাল। হায় কপাল! ভেবেছিলাম – ভার্সিটি শেষ করে এখন প্রকৃত অর্থে জ্ঞানের অন্বেষণে বেরিয়েছি শুনে স্যার খুশী হবেন, পীঠ চাপড়েও হয়তো দেবেন মন ভালো থাকলে, কিন্তু খালি কথার বাগাড়ম্বরে গলবার মানুষ যে তিনি নন! এরপর কাঁচুমাচু গলায় ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করলাম যে আমাদের কলা অনুষদে আর ইয়ারলি সিস্টেম নেই। খোদ বারাক ওবামার দেশ হতে আমদানি করে আনা সেমিস্টার সিস্টেমের জাঁতাকলে সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের নাভিশ্বাস ওঠার যোগার। তবুও স্যার আক্ষেপের সুরে বলতে থাকলেন – কি আর অমন হত দৈনিক আধা কিংবা একঘণ্টা সময় ব্যয় করলে? আমি মুখফসকে বলে ফেললাম – আমার আজীবনের সাধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো। রেজাল্ট ধরে রাখার পাকেচক্রে যে আর একটা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাতে সময় দেব, আমার পক্ষে তা আসলেই সম্ভবপর ছিল না। স্যার বললেন – পড়াবে পড়িও, কিন্তু ড্যাম খেয়ে যেয়ো না।
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত স্যার এই উক্তি শোনার পর আমার ঠিক কি বলা উচিৎ তা যখন ঠাহর করে উঠতে পারছি না তখন স্যার আরও বললেন যে তাদের সময়ে কমপক্ষে ১৫ জন শিক্ষক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের একনামে দেশ ও দেশের বাইরে সবাই চিনত। সে সময় এত মিডিয়া কাভারেজ ছিল না, সবাই পরিচিত হয়েছিলেন নিজনিজ কর্মগুণে। আর এখন তো যাকে যত বেশী টিভিতে দেখা যায় সে তত বেশী বিখ্যাত। আমি স্যারকে বললাম যে স্যার ঢাবিতে এখন যে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে-হচ্ছে আমি সে ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন এবং সে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা পুরনের আকাঙ্খা আমার মনে সদা জাগরূক। স্যার বললেন – এই কারনেই তার এই আলোর ইশকুল স্থাপন, যাতে অল্টারনেটিভ স্কুলিং জাতির এ মেধাশুন্যতা পূরণ করতে পারে এমন অনেকগুলি মানুষের জন্ম দেয়। আমি আলপটকা বলে বসলাম – কিন্তু স্যার এই কার্যক্রম থেকে এরকম মেধাবী কারও উত্থানের জন্যে ইনপুট তথা গৃহীত সদস্যদের মেধা একটি বড় ফ্যাক্টর নয় কি? স্যার আমার প্রশ্নটি প্রসন্নভাবে গ্রহণ করলেন না। বললেন – শুধুমাত্র ইনপুটের ওপর নির্ভর হবে কেন? বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে নিজস্ব চিন্তা চেতনা নিয়ে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার জন্যে যে লিবারেল পরিবেশ দেয়া হয় সভ্যদের সেটারও একটি অনস্বীকার্য প্রভাব আছে।
আগের সূত্র ধরেই বললাম – স্যার, ২০১৩ সালে আলোর ইশকুলের ছাত্রত্ত না ধরে রাখতে পারার আর একটি কারন হচ্ছে শিল্প সাহিত্যে আমার অনেক ছড়ানো ছিটানো বিস্তৃত ইন্টারেস্টের জায়গা। আমার সঙ্গীত সংশ্লিষ্টতার কথা স্যারকে জানিয়ে সিনেমা বানানো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে যাবো এমন সময় স্যার আমাকে থামিয়ে দিয়ে উর্দু একটি শে’র পড়লেন, যার বাংলা অর্থ এই দাঁড়ায় – বেরিয়েছিলাম পৃথিবীর সমস্ত বাগান ঘুরে দেখতে, কিন্তু হায়, একটি গোলাপের পাশেই সারাটি জীবন অতিবাহিত হয়ে গেল!
একটু থেমে বললেন – ছড়িয়ে পড়ো না, এক সাথে সব ধরবার চেষ্টা করো না। বরং যা কিছুই করছ অনেক তলিয়ে গিয়ে, ডুবে গিয়ে, গভীরভাবে করবে। তাড়াহুড়ো করার কোন প্রয়োজন নেই। একটা মাধ্যমকে ধরে ক্রমাগত খোঁদাই করতে থাকো, যখন একদম গভীরে পৌঁছে যাবে তখন সেটাকে কেন্দ্রে ধরে রেখে পরবর্তীতে যা কিছু করা যায় – করবে। বললেন – একই সাথে সাহিত্যে ডিগ্রী নেবে আবার ইঞ্জিনিয়ারিং ও পড়বে – সে কি করে সম্ভব? আমি বেফাঁস বলে বসলাম – কিন্তু স্যার সাহিত্য আর ইঞ্জিনিয়ারিং তো ইন্টার রিলেটেড না শিল্পের এ সব শাখাই তো একে অপরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত! স্যার বললেন – আহা! আছে রিলেশন! এরপর স্যার নিজের জীবন থেকে উদাহরণ দিলেন। বললেন – তার বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু তিনি সাহিত্যেও অগাধ জ্ঞান রাখতেন। স্যার সাহিত্যের ছাত্র হয়ে কেন বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি জানবেন না- সেটা নিয়ে স্যারের বাবা অনুযোগ করতেন।
আমি মহাবিপদে! অ্যাকাডেমিয়া, সাহিত্য আর সঙ্গীত – বাহ্যিকভাবে এ তিন নিয়েই আমার অস্তিত্ব। এর একটিও যদি বাদ দেই, তবে আমি তো আর আমি থাকবো না। স্যার তো আমাকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিলেন! আমি মরিয়া হয়ে বললাম – কিন্তু স্যার সত্যজিৎ রায় তো পেরেছেন। স্যার বললেন – সত্যজিৎ রায় একজন অসাধারণ মেধাবী মানুষ ছিলেন। তার বংশ পরম্পরাও তাকে অগাধ সাহায্য করেছে। বললেন – রবীন্দ্রনাথ যদি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে না জন্মে আসামের জঙ্গলে জন্মাতেন, তবে আমরা এ রবীন্দ্রনাথকে পেতাম না।
সত্যি বলতে কি – স্যারের এ কথায় আমি বেশ কষ্ট পেলাম। কারন সারাজীবন আমি যাকেই শিল্প সাহিত্য নিয়ে আমার বহুমুখী স্পৃহার কথা বলেছি এবং প্রত্যুত্তরে শুনেছি – সম্ভব নয়, সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছি সত্যজিৎ রায় বা হুমায়ুন আহমেদের উদাহরণ। তখন সবাই মুখস্ত বুলির মত বলতো এই দুইজনেই ক্ষণজন্মা পুরুষ, তাদের মত আর কারও হওয়া সম্ভব নয়। আমার প্রচণ্ড জেদ হত। আমার প্রতিভা কতটুকু – তার ব্যাপারে তারা কতটুকু জানে? আমি নিজেই কি সম্পূর্ণ জানি? কে ই বা জানতে পারে? যখন হুমায়ুন আহমেদ বা সত্যজিৎ রায় প্রথম প্রথম সৃষ্টিশীলতার পথে পা রাখেন – অজানা আশঙ্কায় তাদের বুকও কি দুরুদুরু কাঁপেনি?
অন্তরের খুব গভীর থেকে প্রতিনিয়ত যে তাড়না আমি অনুভব করে নূতন কিছু সৃষ্টি করবার, তা থেকে বলতে পারি – ভবিষ্যতের কথা জানি না, তবে প্রতিভার বিচারে আমি নিজেকে কখনো হুমায়ুন আহমেদ বা সত্যজিৎ রায়ের চে’ খাটো করে দেখিনি। শুনলে পাগলের প্রলাপ লাগতে পারে – কিন্তু পরিণত বয়সের বা শেষ বয়সের হুমায়ুন- সত্যজিতের সাথে আমাকে তুলনা না করে পঁচিশ বছর বয়সে এই দুই মহান ব্যক্তির সাথে আমার পঁচিশ বছর – অর্থাৎ বর্তমান সময় পর্যন্ত যে সৃষ্টিশীলতার জীবন – সেটা মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে আমার এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়। ভেবেছিলাম – প্রতিটি মানুষের জীবনকে একএকটি অপার সম্ভাবনার আকর বিবেচনা করা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার অন্তত আমার সম্ভাবনাকে এক ফুঁ এ উড়িয়ে দেবেন না। তবুও, আমি দমে পড়ার মানুষ একদমই নই। মনে মনে ভাবলাম – একবার পাঠচক্রের সভ্য হই, ফের দেখা যাক স্যারের মত বদলাতে পারি কিনা।

Related Posts

About The Author

Add Comment