এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং বা বিচার বহির্ভূত হত্যার আদিপর্ব

একটা রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থা কেমন তা বুঝতে দেশটির কঠিন অপরাধী এবং তাদের প্রতি আইনী ও বিচারিক দৃষ্টির দিকে খেয়াল করতে পারি। অপরাধীদের শাস্তি বা শোধরানোর আশ্রয় হিসেবে কারাব্যবস্থা কেমন সেখানে চোখ দিতে পারি।

দেশের জঘন্যতম অপরাধীও আইনের আশ্রয় পাবেন এটাই সভ্য রাষ্ট্রের মাপকাঠি।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোন যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আমরা যখন আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবো, সভ্য রাষ্ট্র হয়ে উঠবো তখন এ এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং বা বিচার বহিভূর্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং যে শুধু আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের আবিষ্কৃত ফেনোমেনা নয় তার আদি দুটো নতিজা পেলাম। একটা গ্রীক মিথে আরেকটা এথেন্সে-গ্রীক সভ্যতায়।

 

ছবি: হেরাল্ড

এক. গ্রীক মিথে হারকিউলিসকে হত্যা করতে সাপ পাঠান গ্রীক দেবী হেরা। জিউসের অবৈধ পুত্র ছিলেন মহাবীর হারকিউলিস যার প্রতি ঈর্ষাণ্বিত ছিলেন জিউস পত্নী হেরা। এছাড়া হারকিউলিস ছিলেন কিছুটা বেয়ারা/বেয়াদব। তো, বেয়াদব মানবদের শাস্তি দেয়ার জন্য দেব-দেবীরা নিয়মিতই বিভিন্ন হিংস্র প্রাণী পাঠাতেন।
বাংলা সাহিত্যেও এরকম একটা পর্ব দেখবো। মনসামঙ্গলে চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য তরী ডুবিয়ে দেয়াসহ তার ছেলে লক্ষিন্দরকে সাপের কামড়ে মারার ক্ষেত্রে মনসা দেবীর ক্রোধ কাজ করেছে। আমাদের চাঁদ সওদাগর অনেকটা হারকিউলিসের মতোই বেয়ারা ছিলেন যিনি মনসার পূজা দিয়ে তার মনোরঞ্জন করতে রাজি হননি।

এই যে দেব-দেবীরা বেয়ারা মানব হত্যায় বিভিন্ন হিংস্র প্রাণী পাঠাচ্ছেন তাকে আদি এক্সট্রাজুডিসিয়াল কিলিং এর নতিজা বলা যায়।

দ্বিতীয়. খ্রিস্টপূর্ব ৪০৪-৪০৩ সালে এথেন্সের ‘থার্টি টাইরেন্ট’ (৩০ জন স্বৈরশাসক) মিলে তিন হাজার নাগরিকের (সিটিজেন) তালিকা তৈরি করেছিলেন। তাদেরকে ‘সেইফ’ (নিরাপদ) আখ্যা দেয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তার পরবর্তী ধাপটা ভয়ংকর। সেই নিরাপদ তিন হাজার নাগরিকের বাইরে অন্যদেরকে কোন ধরণের বিচার বাদেই হত্যা করা যাবে বলে বিধান করা হয়। সেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে প্রায় ১৫শত এথেন্সবাসী খুন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

মানবজাতি অনেক দূর এগিয়েছে। অতীতের অনেক কিছু এখন আর মানা হয় না। পুরনো অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। যদিও অনেক নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রাষ্ট্রকে শুধু শাসক ও শোষিতের মধ্যে সম্পর্কের নিয়ামক হলে হয় না। এটাকে নাগরিকদের জন্য, নাগরিকদের দ্বারা এবং নাগরিকদেরই রাষ্ট্র হয়ে উঠতে হয়। আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হওয়ার যে মাপকাঠি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে ক্ষমতার বিভাজন তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমতা পাবে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের দায়িত্বশীলরাও আইনের বাইরে যেতে পারবেন না। রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক আইন লঙ্ঘন করে তাদেরকে সুষ্ঠু বিচারের আওতায় আনতে হবে। এবং কারাগারগুলো যেন পাতি অপরাধীকে জানু অপরাধী বানানোর কেন্দ্র না হয়ে উঠে। কারাগারে যেন সব অপরাধীই সংশোধিত হয়ে দেশ তথা বিশ্বে অবদান রাখার সুযোগ পায়। এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন বৈধতা দিয়ে রাখা যায় না।

ছবি ও তথ্যসূত্র: হেরাল্ড

Related Posts

About The Author

Add Comment