এবাদুর রহমান প্রণীত ‘গুলমোহর রিপাবলিক’: প্রথম পাঠের অভিজ্ঞতা

১.

কিছু কিছু বই আছে যেগুলো আপনি প্রথম পড়াতেই পুরো আত্মস্থ করতে পারবেন না। অনেক সময় ৪/৫ বার পাঠ শেষ করলে সেটা নিয়ে কয়েকটা মন্তব্য করতে পারবেন। আমার কাছে এবাদুর রহমান প্রণীত ‘গুলমোহর রিপাবলিক’ অনেকটা এমনই মনে হয়েছে। গত চার ঘন্টা একটানা পড়ে বইটি শেষ করলাম। যখন পড়ছিলাম উপভোগ করছিলাম গদ্য,গল্প, ভাষা আর শিল্পের উপকরণ। কিন্তু এটার উপর তাত্ত্বিক রিভিয়্যু লিখার সাহস করে উঠতে পারছিনা। মনে হচ্ছে এটা নিয়ে কথা বলার জন্য আরো কয়েকবার পড়বো।

২.

লেখক এবাদুর রহমানের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় বছরপাঁচেক হবে। তার ছোটখাট প্রবন্ধ পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও সম্পূর্ণ বই পড়ার অভিজ্ঞতা নিলাম আজ। এবাদ ভাইয়ের সাথে ডজনেরও বেশি দীর্ঘ আলাপচারিতায় তার চিন্তার রূপ, সাহিত্যভাবনার সাথে পরিচিত হতে পারলেও বইয়ের স্বাদ এই প্রথম। আজ তাই এই প্রথম অভিজ্ঞতাটা রেকর্ড করে রাখার জন্য এ লেখাটির শুরু! এটার রিভিয়্যু মান, সাহিত্য মান নিয়ে আমিই সন্দিহান। তাছাড়া এটা কোন মতেই রিভিয়্যু নয়। ভবিষ্যতে আবার সময় করে কয়েকবার পড়তে পারলে ভালো কোন রিভিয়্যু লেখার চেষ্টা থাকবে। তাই আমার এ লেখাটিতে বেশি কিছু খুঁজতে আইসেন না।

৩.

শুধু বইটি নিয়ে একটু পরিচিতিমূলক কথাবার্তাই বলি:

বইটা দেখতে দু’মুখো সাপের মত। বইটার প্রথম বা শেষ দু’খান থেকেই শুরু করলে আপনার তেমন অসুবিধা হবে না। দুপাশেই শতাধিক পৃষ্ঠা রয়েছে। কিছুটা আত্মচরিত আবার সমষ্টির চিত্রায়নও রয়েছে পুরো বইয়ে। বাংলা ও ইংরেজি বিভিন্ন অ্যালিউসান রয়েছে কিছুক্ষণ পরপর।

প্রথমে ভূমিকা নামের একটি হিজিবিজি লেখা- তার উপরে বাচ্চা মানুষের কাটাছেড়ার মত কিছু লেখা, কিছুটা আত্মচরিত তারপর উৎপল বসুর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা। আলপচারিতায় উঠে এসেছে সাহিত্য এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের কথাবার্তা। রবীন্দ্রনাথ, এজরা পাউন্ড, গিন্সবার্গ, মিলার থেকে শুরু করে জীবনান্দ, শক্তি অনেকেরই গল্প এসেছে উৎপল বসুর সাথে আলাপে।

৪.

জীবনান্দ নিয়ে অনেকগুলো মজার গল্প আছে বিশেষ করে। হুমায়ুন কবিরের কাছে বিভিন্ন সময় চাকুরির আবেদন করা থেকে শুরু করে কলকাতায় একটি বরিশাল পাওয়ার আকাঙ্খার প্রসঙ্গ এসেছে। তার অসামাজিকতা, নির্জনতা প্রবাদতুল্য। এরকম একটি প্রসঙ্গ:

“এবাদ: আমি শুনেছিলাম, একবার বুদ্ধদেব ওনাকে (জীবনান্দ দাস) কবিতা পড়তে অনুরোধ করেছিলেন, উনি বলেছিলেন, ওনার দাঁতে ব্যাথা পড়তে পারবেন না।

উৎপল: খুব বিচিত্র চরিত্রের লোক ছিলেন… এমনও অনেক সময় দেখা গেছে, উনি চেনা কোন লোককে দেখে এই ফুটপাত থেকে ওই ফুটপাথে চলে গেছেন।”

(পৃষ্ঠা:৪৪, এবাদুর রহমান প্রণীত ‘গুলমোহর রিপাবলিক’)

৫.

এবাদুর রহমান প্রণীত ‘গুলমোহর রিপাবলিক’-এ এবাদুর রহমান ও উৎপলকুমার বসুর আলাপচারিতায় উৎপলবসুর জীবনের ব্যক্তিগত অনেক অধ্যায়ই আলোচনায় এসেছে। শৈশব, পড়াশুনা, প্যারিস গমন, সাহিত্য সাধনা সব প্রসঙ্গেরই আলোকপাত করা হয়েছে। এবাদুর রহমান একবার প্রশ্ন ছুড়েন-

“এবাদ: আপনার মধ্যে আমি কোন গ্রাম্যতা দেখি না; গ্রাম্যতার অনেক মিষ্টি/সুন্দর দিক আছে..আপনার মধ্যে ভালো বা খারাপ কোন অর্থেই গ্রাম্যতা দেখি না।

উৎপল: আমি সবসময় দোলাচলে থাকি গ্রাম/সহর নিয়ে…না আরেকটা জিনিস হচ্ছে যে, যেহেতু আমি কিছুটাতো, একটা কি বলবো, আমার মনের ভেতর, মানসিকভাবে, একটা রিফ্যিউজি টেন্ডেন্সি আছে; রিফ্যিউজি টেন্ডেন্সি মানে, আজকের চালু ভাষায় “আদার” বলা হয়ে থাকে, আদারের সাথে আমি নিজেকে খুব আইডেন্টিফাই করি…”

(পৃষ্ঠা:৭৩)

উৎপল বসু কিভাবে লেখালেখির জগতে আসলেন তা নিয়ে প্রশ্ন করলে বেশ মজার উত্তর দেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। আসেন দেখি..

এবাদ: উৎপলদা, আপনি তো বিজ্ঞানের ছাত্র; হঠাৎ করে তো লেখক হওয়া যায় না, একটা প্রস্তুতি তো ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে। ভাষা শেখা তো একটা দীর্ঘ প্রসেস…

উৎপল: দীর্ঘ প্রসেস মানে…এটা আমি অনেক জায়গায় বলেছি যে, আমি গ্রামে থাকতাম আর গ্রামের মহিলাদের চিঠি লিখে দিতাম, এভাবেই…

৬.

এই দ্বিমুখী বইটিতে(!) অনেকগুলো ন্যারেটিভ রয়েছে। বইটিতে অনেক পণ্ডিত, দার্শনিক, সাহিত্যিকের উক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। অনুবাদকের ভূমিকা কি হতে পারে তা নিয়ে একটি যথোপযুক্ত সাজেশন টেনেছেন বাল্টার বেঞ্জামিন থেকে। বাল্টার বেঞ্জামিন এর মতে- একজন Translator এর কাজ হচ্ছে:

A real translation is transparent; it does not cover the original, does not block its light, but allows the pure language, as though reinforced by its own medium, to shine upon the original all the more fully.

Task of the Translator: An Introduction to the Translation of Baudlaire’s ‘Tableaux Parisiens’, Walter Benjamin

(p95)

এমন আরো কিছু সুবচন আমরা পাবো বইটিতে। যেমন-

I was not looking for my dreams to interpret my life, but rather my life to interpret my dreams. Susan Sontag (p99)

 

‘শত ব্রক্ষ্মা গুরুপদ নিলেও মূর্খের হৃদয়ে চেতনা হয় না।’

রামচরিতামানস, তুলসীদাস (পৃ.১০৮)

 

৭.

আহমদ ছফা নিয়ে একটি অসাধারণ বিচার রয়েছে লেখকের। সলিমুল্লাহ খানের একটি প্রবন্ধের জবাবে লেখক অবতারণা করেন:

“এ প্রসঙ্গে ছফা ভাই বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। ছফা ভাইয়ের সঙ্গে ফরহাদ মজহার বা সলিমুল্লাহ খানের একটি রহস্যময় আত্মীয়তা আছে; সম্ভবত, আমি অনুমান করে বলছি, প্রণোদনা ও সংগ্রামের একমুখিতার কারণে। কিন্তু আহমদ ছফার অভিভাব, স্ট্রাটেজি, চিন্তার গঠন ও সর্বোপরি বীক্ষণ স্বতন্ত্র। বস্তুত, আমি সন্দেহ করি, পণ্ডিতি প্রবণতা বা মেজাজ আদৌ তাঁর ছিল না। তাঁর শক্তির জায়গা ছিল তাঁর একিউট ইতিহাসবোধ, তাঁর ভাব ও কার্য। তাঁর শিল্পবীক্ষা ও সংস্কারবৃত্তির সামঞ্জস্য এসেছে বাঙালির প্রতি, বাঙালি মুসলমানের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও অধিকারবোধ থেকে। আমাদের সময়ের প্রতিটি আবেগ ছফার হৃদয়ে স্পন্দিত হয়েছে। বোধ করি তার কারণ, শেষ বিচারে আহমদ ছফা ছিলেন জনগণের শিল্পী, তিনি তাদের শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেন নি। (পৃষ্ঠা: ১০৯-১১০)”

৮.

আলোচিত, সমালোচিত ‘মেহেরজান’ এর চিত্রনাট্যও রয়েছে বইটিতে। এবাদুর রহমানের ভাষা, বুনন ও কথাশৈলী অনেক ভিন্ন, কারো সাথে মিলে না। ইংরেজি ভাষায় এমন সাহিত্যকর্মের দেখা মেললেও বাংলা ভাষায় এবাদুর রহমানের হাতেই প্রথম দেখলাম।

৯.

বেশি কিছু বললাম না। শুধু বইটার নাম নিলাম আর তার থেকে কিছু রেফারেন্স নিলাম। উত্তরাধুনিক বই কেমন হতে পারে তার স্বাদ নেওয়ার জন্য বইটি ধরা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হলো বইটা হাতে নিয়ে সব ধরণেই পাঠকই প্রথমে বিস্মিত হবেন। দু’মুখো সাপের মত বই! এদিক দিয়েও শুরু করা যায় আবার ওদিক দিয়েও! মলাটটি কাপড়ের, আবার সেলাই করে লেখা বইয়ের নাম, লেখকের নাম। ধাক্কা খাওয়ার অনেক উপকরণ রয়েছে বইটিতে।

Related Posts

About The Author

Add Comment