কনফুসিয়াসের শিক্ষা, শিক্ষাগুরুর মর্যাদা ও বিবিধ প্রসঙ্গ

wisdom-confucius-quotes

কনফুসিয়াস নামটি বিশ্বজুড়েই অনেক পরিচিত। চীনে কয়েক হাজার বছর ধরে অনেক সম্মানিত এবং আদৃত মহামানব হিসেবে স্বীকৃত হয়ে এসেছেন। এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোণেই কনফুসিয়াসের চিন্তার প্রসার ঘটেছে। তাকে একটু-আধটু জানে, তাকে মন থেকে সম্মান করে। পাশ্চাত্যও চীনের তিন মহারথী লাও জু, সান জু আর কনফুসিয়াস থেকে দীক্ষা নিচ্ছে কয়েক শতক হলো। তারা তিনজনই আজকের জমানাতে বেশ প্রাসঙ্গিক। এখানে শুধু কনফুসিয়াস নিয়েই থাকবো।

কনফুসিয়াস ছিলেন একই সাথে একজন রাজনীতিবিদ, একজন কবি, একজন ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং সাধু। একই সাথে অনেক কিছুর মিশেল।

৫০১ খ্রি.পূ. এ ছোট্ট একটি শহরের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে কনফুসিয়াসের রাজনীতিতে প্রবেশ। তখন বয়স ছিল প্রায় পঞ্চাশ। তার জ্ঞান এবং শিক্ষার খ্যাতি নিশ্চয়ই এর আগে থেকেই ছড়াচ্ছিল। সেই ধারাবাহিকতাতেই রাজনীতির দুনিয়াতে আরোহণ শুরু হয়েছিল। রাজনীতিতে খুব দ্রতই তার মেধার পরিচয় রেখেছিলেন। এজন্য একেবারে রাজ্যের বিচারমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। নিজের বৃদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্রাটকে কয়েকবার রক্ষা করেছিলেন। আবার তার এই দ্রুত উত্থান সমকালীন অনেক ক্ষমতাসীনদের চোখের পীড়ার কারণ হয়েছিল। এজন্য তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই শুরু হয়েছিল। সম্রাট থেকে তাকে দূরে সড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

Confucius-quote-1024x576

রাজ দরবারে অনেক সম্মানিত আসন থেকে বের হয়ে তিনি নেমে পড়েন রাস্তায়। প্রাসাদ থেকে একেবারে ধূলিতে! তার সঙ্গ নিয়েছিল তার একদল প্রিয় শিষ্য। তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেই প্রিয় শিষ্যরা ছিলেন পাশে। আজকের বাংলাদেশে যখন সবজায়গাতেই শিক্ষকদের নিয়ে জঘন্য সব কথা শুনি তখন বিশ্বের একজন সেরা শিক্ষক কনফুসিয়াস আমাদের জন্য অনেক প্রাসঙ্গিক। আজকে আমরা দেখি কিভাবে একজন শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন দিক দিয়ে শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্রেফ অর্থের বিনিময়ে সার্টিফিকেট কেনার মহরা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। ভালো শিক্ষক আছেন কিন্তু তাদের সংখ্যা এতই কম যে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করার মতো জটিল কাজ সেটা।

আবার শিক্ষকদের উপর  অবমাননার চিত্র প্রতিনিয়ত দেখা যায়। কয়েকমাস আগে শিক্ষকদের মান উপরে নয় কয়েক ধাপ নিচে নামিয়ে বেশ খোশ মেজাজে আছে দেশের কর্তাব্যক্তিরা। নারায়ণগঞ্জের একজন প্রধান শিক্ষককে কানে ধরে উঠবস করিয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে দিলেন এমপি সাহেব। আর তার আগে-পিছে শেয়ালের মতো হুক্কা হুয়া ডাক তুলেছে দলের চামচা বা একগাদা আম পাবলিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ক্যাডার ছাত্রদের হাতে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অহরহ।

ব্যাপারগুলো এক পাক্ষিক নয়। বর্তমানে শিক্ষার এই দুরবস্থার জন্য শিক্ষক সমাজ বড় দায়ী। আবার শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের অমনোযোগও সমভাবে দায়ী। এই দ্বিমুখী দায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বেশ হুমকিজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে।  এখন পাশের হার, জিপিএ ফাইভের হার যে গতিতে বাড়ছে অশিক্ষিতের হার বা অপশিক্ষিতের হার একই গতিতে বাড়ছে। সার্টিফিকেট অর্জন জীবনের চরম মুখ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আসছে, সুশিক্ষা নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র, মা-বাবা, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী সবাই মিলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক হাত দেখিয়ে দেওয়ার আত্মঘাতী খেলায় মগ্ন।

শিক্ষার এই নিত্য নিম্নমুখী যাত্রার প্রাক্কালে দাড়িয়ে অতীতে ফিরে দেখতে চাচ্ছিলাম এমন শিক্ষক কি ছিলেন যাদেরকে ছাত্ররা মন থেকে সম্মান করতো, যাদের জ্ঞান সমকাল থেকে শুরু করে এখনো মানুষকে দিশা দিচ্ছে? মানবজাতির ইতিহাসে সেরা কয়েকজন শিক্ষকের তালিকাতে বেশ সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় কনফুসিয়াসের নাম। উইজডম অব দ্য ইস্ট-দ্য সেয়িংস অব কনফুসিয়াস বইটির ভূমিকাতে লিওনেল জাইলস বলেন-

“Is it at all conceivable that a man of cold and unlovable temper should have attracted round him hundreds of disciples, with many of whom he was on terms of most intimate intercourse, meeting them not only in the lectureroom, as modern professors meet their classes, but living with them, eating, drinking, sleeping and conversing with them, until all their idiosyncrasies, good or bad, were better known to him than to their own parents ? Is it explicable, except on the ground of deep personal affection, that he should have been followed into exile by a faithful band of disciples, not one of whom is known ever to have deserted or turned against him ? Is coldness to be predicated of the man who in his old age, for once losing something of his habitual self-control, wept passionately for the death of his dearly loved disciple Yen Hui, and would not be comforted ?”

(p23, The Sayings of Confucius, Introduction and Notes by Lionel Giles, E. P. BUTTON AND COMPANY, NEW YORK, 1910)

একজন শিক্ষক ও তার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেমন সম্পর্ক হবে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ উপরের অনুচ্ছেদটি। কনফুসিয়াসের সাথে তার শিষ্যদের কেমন সম্পর্ক ছিল, কিভাবে তারা অনুসরণ করেছে ভালো-মন্দ সব সময়ে, কিভাবে একেবারে চরম দুঃসময়েও তার শিষ্যরা তাকে ছেড়ে যায়নি আবার কনফুসিয়াসও তার একজন প্রিয় শিষ্য ইয়েন হুই এর মৃত্যুতে হাউমাউ করে কেঁদেছেন তার বর্ণনা।

বর্তমান বাংলাদেশে নানা দুরবস্থার জন্য অনেকে অনেক কিছুর দরকার বলে দাবি করেন। আমার কাছে মনে হয় এখন সমাজে সুশিক্ষার সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। চতুর্দিকে অপশিক্ষা, অশিক্ষা আর কুশিক্ষারই ছড়াছড়ি দেখি। এটা একেবারে রাষ্ট্রের ছোট্ট প্রতিষ্ঠান পরিবার থেকে শুরু করে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রেই ছড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় দেশ ও জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন শুরু করার জন্য একদল শিক্ষকের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। কনফুসিয়াসদের মতো শিক্ষকরা হতে পারে আমাদের আদর্শ।

কনফুসিয়াসের শিক্ষার একটা বড় দিক ছিল এটা একেবারে পরিবার থেকে শুরু। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসংহত ও সুন্দর সম্পর্ক থাকলে সবচেয়ে বড় পরিবার যে রাষ্ট্র সেখানেও সে বৃহৎ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সাথে মিলে মিশে থাকতে পারবে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র পরিবারের শিক্ষা বৃহৎ পরিবারে অনেক কাজে লাগে।

how we learn

কনফুসিয়াসের মতে-

‘আমরা তিনটি উপায়ে প্রজ্ঞা লাভ করি: প্রথমত, গভীর চিন্তা বা অনুধ্যানের মাধ্যমে যেটা মহত্তম উপায়; দ্বিতীয় যে উপায়ে প্রজ্ঞা লাভ করি সেটা হলো অনুকরণ, যেটা সহজতম; আর তৃতীয় উপায় হচ্ছে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, যেটা সবচেয়ে তেতোময়।’

এজন্য একটা শিশু প্রথম বড় শিক্ষাটা পায় তার পরিবার থেকে। সেখানে বাবা-মার আচার আচরণ শিশুর জীবনে প্রভাববিস্তারী ভূমিকা রাখে। পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর মন-মগজ-মনন ও চরিত্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকদেরকে অনুকরণ করে শিক্ষার্থীরা। এজন্য শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে খুব সতর্কভাবে নিজেদেরকে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। কনফুসিয়াস বলেন ‘পচা কাঠে নকশাঁ করা যায় না’। এজন্য নষ্ট শিক্ষক, নষ্ট শিক্ষা কাঠামো থেকে বড় মানুষ, ভালো মানুষ বের হওয়া অনেক কঠিন।

নিজ জন্মভূমি থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়ে চীনের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ফিরে খুঁজছিলেন সেই দার্শনিক সম্রাটকে। এ যেন প্লাতোর ‘ফিলসফার কিং’ খোঁজার প্রচেষ্টার সাথে তুল্য, বা চানক্যর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মধ্যে অখন্ড ভারতের অধিপতি পাওয়ার আকাঙ্খার সাথে।

এক শাসক কনফুসিয়াসের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন: কি কাজ করলে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখা যায়? কনফুসিয়াসের উত্তর ছিল:

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো এবং সকল অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনো। তাহলে জনগণ সন্তুষ্ট হবে। আর অপরাধীদেরকে লালন করো এবং ভালো মানুষদেরকে বিতাড়িত করো তাহলে অসন্তুষ্ট হবে’।

(p39-40, The Sayings of Confucius, Introduction and Notes by Lionel Giles, E. P. BUTTON AND COMPANY, NEW YORK, 1910)

Sayings-of-Confucius

একটা দেশের রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থার সাথে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সে দেশের কৃষ্টি কালচার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ভালো সরকার ব্যবস্থার জন্য এ সবকটি উপাদান একসাথে কাজ করতে হবে। জু কুং নামে এক শিষ্য কনফুসিয়াসকে জিজ্ঞেস করেছিল- ‘ভালো সরকার কেমন?’ এর উত্তরে কনফুসিয়াস বলেন: ‘জনগণকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া, দেশের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য সামন্ত রাখা এবং দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করলেই তাকে ভালো সরকার বলা যাবে। এখন এ তিনটি জিনিসের মধ্যে যদি একটিকে ত্যাগ করতে হয় তাহলে প্রথমে সৈন্য-সামন্তকে ত্যাগ করতে হবে। তারপর বাকি দুটোর মধ্যেও যদি একটিকে ত্যাগ করতে বলা হয় তাহলে সেটা হবে খাবার। কারণ শুরু থেকেই মানুষকে তো মরতে হবেই। কিন্তু জনগণের আস্থা ছাড়া কোন সরকারই টিকে থাকতে পারে না।’

কি অসাধারণ এবং প্রাসঙ্গিক শিক্ষা কনফুসিয়াসের। তার কথাগুলো আমাদের জন্য কতই না প্রাসঙ্গিক।

Confucius-Quotes-quotes-20151206047762

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

১৮ মে, ২০১৬

১৭৬ ফকিরের পুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

Related Posts

About The Author

Add Comment