কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন

সম্প্রতি পড়া ডজনখানেক বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে জাকির তালুকদারের ‘কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন’ এই বইটি। কার্ল মার্কস এর জীবন নিয়ে বাংলায় আমার পড়া সবচেয়ে সুন্দর ও প্রাঞ্জল বই মনে হলো। বইটি নির্মেদ হয়েও সম্পূর্ণ এটা হচ্ছে বইটির বিশেষত্বের একটি। বাংলাদেশে বড় বা ঢাউস আকারের বই লেখার সক্ষমতা খুব কম লেখকেরই আছে। এখানে ৪০-৫০ পৃষ্ঠার পুস্তিকা লেখেই ঔপন্যাসিক বা লেখক খ্যাতি অহরহ। আবার বড় সাইজের যেসব বই লেখা হয় এর বেশিরভাগই মেদবহুল, অতিকথন, পুনরাবৃত্তির দোষে দুষ্ট। জাকির তালুকদারের ‘কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন’ বইটি পড়ে বারবার এটাই মনে হচ্ছিল এত সুন্দর ও প্রাঞ্জল বই যেটা আবার নির্মেদ ও সম্পূর্ণ-ওনি কেমনে লিখলেন! আমাদের সময়ের এই পরিশ্রমী লেখকটির জন্য সবার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়ে রাখি আগেভাগে!বাংলা ভাষায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক-চিন্তকদের জীবন নিয়ে প্রচুর বই লেখা দরকার। কারণ দার্শনিক ও চিন্তকদেরকে খুব কাছ থেকে চিনলেই আমরা তাদের ভাবনা-চিন্তার সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবে।

দর্শন পাঠ করতে গিয়ে নবীন পাঠকেরা প্রথম যে সমস্যায় পড়েন সেটা হলো এটা এত কঠিন ও জটিল কেন? দার্শনিকরা এত কঠিন, জটিল ভাষায় কথা বলেন কেন? তারা আপাত সহজ বিষয়গুলোকে নিয়ে কেন এত ত্যানা প্যাচান এমনতর বিস্তর অভিযোগের কথা আমরা শুনবো।

এ প্রশ্নগুলা যখন তোলা হয় সেগুলো আসলে ভুল নয়, অপ্রাসঙ্গিক নয়।

প্রথমত বলি, আপনি যদি দুজন সাধারণ মানুষের আলাপচারিতার মাঝখানে এসে প্রবেশ করেন এবং কয় মিনিট শুনে বুঝার চেষ্টা করবেন তাহলে কিন্তু আপনি তাদের পুরো আলোচনার মূল সূত্র ধরতে পারবে না, বা তারা কি বিষয় নিয়ে, কোন সুরে কথা বলছে এটা ধরতে পারবেন না। তার কারণ কি? হ্যা আপনি আউট অব কনটেক্সট এ তাদের কথা ধরতে গিয়েছেন এবং তাদের মধ্যেকার আলোচনার পূর্বাপর আপনার কাছে জানা নেই, এজন্য দুজন সাধারণ মানুষের অত্যন্ত সাধারণ আলাপচারিতাও অত্যন্ত কঠিন ও জটিল মনে হবে। আর সেখানে দার্শনিকদের দর্শন আউট অব কনটেক্সটে বুঝা অত্যন্ত দুরূহ কাজ।

দ্বিতীয়ত, একজন দার্শনিক যত চেষ্টাই করুক তার সময়, যুগকে অতিক্রম করতে পারেন না, তার দর্শনের পেছনে তার সময়ের ছাপ, সংকট, প্রয়োজনীয়তার আছড় থাকে। এখন যদি আপনি তাদের সময়, সংকট নিয়ে মোটামুটি জানাশুনা না রাখেন তাহলে দর্শন অনেক কঠিন ঠেকবে।

তৃতীয়ত, একজনের দার্শনিকের চিন্তা কাঠামো, চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যাপিত জীবন, পারিবারিক জীবন, সংকট ও সম্ভাবনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তার চিন্তা কাঠামোর বিকাশে। আসলে যে দার্শনিক তার চিন্তার আলোকে জীবন যাপন করে নাই সে দার্শনিক হতে পারে না, সে বড়জোর একজন প্রিটেন্ডার হতে পারে বা আরেকটু বেশি হলে দর্শনের অধ্যাপক হতে পারে। কোন দর্শন চিন্তা বাজারে বা সমাজে ছাড়ার আগে নিজের জীবনের উপর এর বিচার করে দেখতে হবে।

বিশ্বের সব বড় দার্শনিকই তাদের দর্শন দ্বারা নিজেদের পরিচালনা করেছেন এবং তারপর এটা প্রচার করেছেন, আলাপ করেছেন। এজন্য কোন দর্শন চিন্তা আসলে সেই দার্শনিকের ব্যক্তিগত জীবন, গড়ে উঠা, সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ এর সাথে অনেক সম্পর্কিত বা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই দার্শনিকের চিন্তার উপর ভাল করে দাঁত বসাতে হলে তার জীবন ও সময়কালের প্রতি বিশেষ করে তার জীবনধারা বা জীবন দর্শনের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। সক্রেতিসের জীবন থেকে শুরু করে নিৎসে, ফুকো, গ্রামসি সবাই তাদের দর্শনের আলোকে যাপন করেছেন বা তাদের যাপিত জীবন থেকে তাদের দর্শন উঠে এসেছে।

চতুর্থত, একজন দার্শনিক হঠাৎ করে, শূণ্য থেকে আবির্ভূত হন না। তার আগে পিছে কার্য-কারণ থাকে। তার উপর তার আগের অনেক দার্শনিকের প্রভাব থাকে আবার তিনিও তার পরবর্তী সময়ে প্রভাব রাখেন তার উত্তরসূরীদের উপর। এজন্য কোন দার্শনিকের দর্শনের উপর দখল আনতে গেলে তিনি কাদেরকে পড়তেন, কাদের দ্বারা প্রভাবিত হতেন তা জানা না থাকলে তাদের দর্শন বুঝা অপূর্ণ থাকবে অনেকটা। এজন্য দর্শনের ইতিহাসের একটা থরো রিডিং দরকার। কিভাবে আমরা এই সময়ে এসে পৌছলাম, তার পেছনে কারা কাজ করে গেছেন তার একটা পাঠ দরকার।

এই সব কারণে আমাদের দার্শনিক এবং তার সময়কাল নিয়ে একটু পড়া আবশ্যক। তাছাড়া প্রথম প্রথম আমরা তার চিন্তা বা দর্শনকে ভালোভাবে নাও বুঝতে পারি। কিন্তু আমরা যদি তার জীবন নিয়ে জানার চেষ্টা করি তাহলে হয়তো তার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারি। তখন তার চিন্তার সাথে আত্মীয়তা করা খুব সহজ হতে পারে।

সবার আগে এ কথাটা জেনে রাখা দরকার সেটা হলো বেশিরভাগ দার্শনিকরাই অনেক মজার জীবনের অধিকারী ছিলেন বা অনেক মজার জীবন যাপন করেছেন। তাদের দর্শনকে সম্মান জানানোর আগে তাদেরকে সম্মান জানালে মন্দ হয় না! এমন হতে পারে আপনি দার্শনিকের ব্যক্তিগত জীবন পড়েই তার দর্শনের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

karl marx

‘কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন’ বইটি পড়লে আমরা মার্কসের খুব অন্তরঙ্গ একটা পরিচয় পাবো। ভূমিকাতে জাকির তালুকদার উল্লেখ করেছেন কি কারণে তার অনুসারী এবং বিরোধী পক্ষ উভয়ই তার ব্যক্তিগত জীবনকে গোপন রাখার প্রয়াসে ভূমিকা রেখেছেন। বিরোধিপক্ষ তার তত্ত্বের প্রচণ্ড বিরোধিতা করা সত্ত্বেও কিভাবে মার্কসের ব্যক্তিজীবনের মহত্বকে প্রশংসা না করে পারেন না এ সংকটের কথা বলেছেন। আবার অনুসারীরাও মার্কসের জীবনকে বেশি আলো দিতে চায় নাই যাতে তাকে ঘিরে পূজা-অর্চনা শুরু না হয়ে যায়।

ব্যক্তি মার্কস কেমন ছিলেন সেটা সব মত ও পথের মানুষদেরই জানা দরকার। জাকির তালুকদারের এই বইটি পড়লে কার্ল মার্কসের একটা সুন্দর পরিচয় পাওয়া যাবে। তরুণ বয়সে কেমন উদ্যম নিয়ে কাব্য চর্চা আর হরদম লেখাপড়া করেছেন আবার প্রচুর সিগারেট আর মদ্যপান করে শরীরের উপর দকল নিয়েছেন তার কাব্যিক বর্ণনা রয়েছে। এক্ষেত্রে তার বাবার উপদেশটি স্মরণে রাখার মতো যখন তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন যে শারীরিকভাবে অসুস্থ্য পণ্ডিতের চেয়ে অসুখী মানুষ আর হতে পারে না।

জ্ঞান পিপাসু সেই তরুণ মার্কস কবিদের ক্লাব থেকে শুরু করে দর্শনচক্রের সদস্য হওয়া, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌমাছির মতো উড়ে বেড়ান তার তরুণ বয়সে। প্রেমিকা এবং পরবর্তীতে স্ত্রী জেনির সাথে পরিচয়টাও বই ও জ্ঞানের সাথে সম্পর্কের সূত্র ধরে।

ধীরে ধীরে বিপ্লবী রাজনীতির সাথে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবন যাপনের মাঝে দাড়িয়ে শুধু লেখালেখি করে জীবন চালিয়ে যাওয়ার মতো এক বিশাল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিভাবে তার ব্যক্তিজীবনকে বিভিন্ন কাঁটায় বিদ্ধ করেছে বা সমৃদ্ধ করেছে কাহিনী বিবৃত রয়েছে বইটিতে। কার্ল মার্কস এর আদর্শ আপনি ধারণ করেন বা নাই করেন এই বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের কাছে দাড়িয়ে আপনাকে পরম বিস্ময়ে শ্রদ্ধাবনত হতে হবে আর তার ব্যক্তিগত ত্যাগ-তিতিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেবে সব মহান কর্মের পেছনেই কারো না কারো মহান ত্যাগ রয়েছে।

‘কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন’ বইটি পড়লে মার্কসের সাথে বেশ ভালো একটা পরিচয় হয়ে যাবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পরবর্তীতে সেই পরিচয় থেকে আত্মীয়তায় নিয়ে যাওয়া পাঠকের জন্য অত্যন্ত সহজ হবে বলেই মনে করি।

হ্যা, বইটি ২০১৬ বইমেলাতে প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য থেকে।

সাবিদিন ইব্রাহিম

২৭ মে, ২০১৬

১৭৬ ফকিরের পুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

 

Related Posts

About The Author

Add Comment