কালচক্র: আবদুল্লাহ আল ইমরানের ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপন্যাস

বিষখালী নদীর তীরে গড়ে ওঠা নয়নতারা পাটকলকে ঘিরে পুরো উপন্যাসে লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরান মানুষের জীবনকে অংকিত করেছেন বাস্তবতার নিরিখে।সমাজের মাধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্তদের জীবন নানান দিক দিয়ে তুলে ধরেছেন।

লেখক একদম শুরুটাই করেছেন নায়ক পালাশের মহুয়া পিসির লিচু গাছের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা দিয়ে। তিনি প্রকিৃতিকে বর্ননা করেছেন সাহিত্যের রসে পরিপূর্ন করে। পলাশ মৃত্যু দেহ দেখে অনেক্ষন বুঝে উঠতে পারেনি; তারপর বুঝতে পেরে এক দৌড়ে ঠাকুরবাড়ীর উঠানে পৌছান, খবরটি ঠাকুরবাড়ী তে দেন। মহুয়া পিসি ঠাকুরবাড়ীতে কেমন ছিলো, কেমন ছিলো তার ব্যক্তিত্ব সব কিছু লেখক তুলে ধরেন এবং তার আত্মহত্যার অনুসন্ধানে নেমেও লেখক গোপন রেখেছেন আত্মহত্যার কারণ। মহুয়া পিসির আত্মহত্যার খবর এক দু্ই কানে পুরো গ্রামের হট টপিকে পরিনত হয়। গ্রামের চিরচারিত নিয়ম হলো কোন একটি খবরকে হাত পা বানিয়ে তারা হাটাতেও শেখায়; মহুয়া পিসিরি বেলায়ও তার ভিন্নটা হয়নি। তার পেটে বাচ্চা ছিলো, নরেশের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো আরো কত কি।

পাটকল শ্রমিকদের নিত্যনৈমত্তিক জীবনাচরণ, তাদের সামাজিক বন্ধন, খুব স্পষ্টতই লেখক তুলে ধরেন। সমাজের কিশোর-কিশোরীদের ভালো লাগা তারপর ভালোবাসায় পরিণত হওয়া পলাশ আর চন্দ্রলেখার সম্পর্ক দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন। ভালোবাসার মানুষকে যে সকল প্রতিশ্রুতি মধ্যবিত্ত কিশোর কিশোরীরা দিয়ে থাকেন তিনি সেগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

পাটকল শ্রমিকরা কত স্বল্প ব্যয়ে জীবনকে স্বছন্দ করে তুলতে পারে কালচক্র না পড়লে আপনি বুঝবেন না যদি আপনি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান না হয়ে থাকেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত আর সহায় সম্বললহীন মানুষের সামাজিক চিন্তা ভাবনা, জীবনধারণ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
সমাজে সব সময়ে ভালো মন্দের একটা মিশ্রণ থাকে এবং দ্বন্দও বিদ্যমান কালচক্রে সেটাকে সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষ সচারাচার ভালো খুব কম হয়ে থাকে তারও কিছু বর্ননা দিয়েছেন লেখক।

মিষ্টি বউদির সাথে ৫ বছরের ছোট হারুনের যে রসায়ন লেখক দেখিয়েছেন তা বাস্তবিক ই গ্রাম্য সমাজে পরিলক্ষিত হয়; আরো যা বেশি পরিলক্ষিত হয় সেটা হলো অভাবের তাড়নায় মানুষ নিজের বউকে অন্যের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেনা। বিষ্ণুর মিষ্টিকে চেয়ারম্যান সিরাজ মোল্লার কাছে যৎসামান্য টাকার জন্য তুলে দিয়েছিলেন। আবার নিজের ঘরে দেবী সমান বউকে রেখে পরনারীতে লিপ্ত হওয়া যেন সচারাচার ঘটনা এই সমাজের। রইজুদ্দীন ধর্মের পথে সময় দিচ্ছে অথচ তার বউ যে অন্যকে সময় দিচ্ছে অন্য পথে এটাও এ সমাজের চেনা পরিচিত ঘটনার অন্যতম।

যোগ্যতার নিরীখে নেতৃত্ব নয়, নেতৃত্ব পেতে হলে কূটচালের আশ্রয় নিতে হয় মেকি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখাতে হয়। বিষখালী নদীতে জাহাজডুবীর পর ভাসমান তেলের যথাযথ প্রয়োগ জানতে হয়, লেখক সমসাময়িক প্রসঙ্গকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন রাজু এবং আমজাদ প্রেসিডেন্টের ইউনিয়নের সভাপতি নিয়ে যে সমস্যা সংকট তৈরি হয়েছে তার মধ্য দিয়ে। রাজুর শ্রমিক আর পাটকলের প্রতি ভালোবাসা ছিলো অপরিসীম। রাজু জানত পাটকল না থাকলে পাটশ্রমিকদের না খেয়ে মরতে হবে অপরদিকে আমজাদ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার লোভ আর মেকি ভালোবাসায় ভরপুর, তাতে পাটকল লাটে উঠলে তার কিছু যায় আসে না তার ক্ষমতা আর অর্থ চাই। জয়টা আমজাদেরই হয়েছিলো। রাজুকে হাসপাতালের বেডে যন্ত্রনায় কাতরাতে হয়েছে। আমজাদ হয়েছে প্রেসিডেন্ট।

সমাজে ভালো মানুষরা সবসময় নিরীহ থাকে, যেমন পরেশ ঠাকুর। তবে সমাজে যেমন ভালোমানুষ খারাপ মানুষ থাকে তেমনি হুজুগে নাজিমুদ্দীন ও থাকে । আবার সোলায়মানের মতো উদাসীন মানুষও বসবাস করে। অজ্ঞ হুজুর থাকেন।

এদেশ থেকে থেকে অন্য ধর্মালম্বীদের যতটা না সাম্প্রদায়িক কারণে তাড়ানো হয়েছে তারচে চেয়ে বেশি ধন সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য তাড়ানো হয়েছে। আর এসব করেছে সমাজের ভালো মানুষ সাজা কিছু অসভ্য। যারা নানান অপবাদ দিয়ে সুযোগ লুটেছেন।

মধ্যবিত্ত সহজ সরল মানুষদের যেকোন কিছু সহজে বশে আনা যায় তাইতো পাটকল বন্ধের পর আমজাদ প্রেসিডেন্ট আন্দোলনের নামে সাধারন শ্রমিকদরে বিনিময়ে তার নিজের ক্ষমতা বাড়াতে বেশি সচেষ্ট ছিলো।আমজাদ নাটকে ছিলো পটু। তিনি কান্নাকাটি করে শ্রমিকদের মন গলাতে সক্ষম হন। তিনি শেষ পর্যন্ত সোলায়মানের মত অতি ভালো মানুষটাকে পুড়িয়ে মরতে উৎসাহিত করে। নিজেকে ভালো প্রমান করতে আমজাদ মাঝে মাঝে শ্রমিকদের টাকা পয়সা দিত। মধ্যবিত্ত মানুষজন নগদ টাকায় অনেক কিছু করতে পারে। কারন তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা ছিলো প্রকট। আমজাম সেই সুযোগটা নিতো।

পলাশ পরিবারের অভাবের তাড়নায় তার স্বপ্নকে দূরে ঠেলে দিয়ে নয়নতারা মিলে যোগ দেন। চন্দ্রলেখার বাবা ভিটেবাড়ী বিক্রি করে পরিবারসহ কোলকাতায় চলে যান।পরিসমাপ্তি ঘটে প্রকৃতির অপর একটি অপরুপ প্রেমের সম্পর্কের।

আন্দেলনে সোলায়মান মিয়া নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন আবেগের বশে। তাতে সরকার নড়ে চড়ে বসে কিন্ত সোলায়মান মিয়া চিরতরে পঙ্গু হন। আমজাদের ভাগ্য খুলে যায়। ভাগ্যের রাজনীতিতে আমজাদ প্রেসিডেন্ট সফল হয়।

মানুষের জীবনে অনেক ধরনের সমস্যা আসে মাঝে মাঝে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে কিন্তু তা ফিরে পেতে অপেক্ষা করে আশাহীনভাবে জানে পাবেনা তারপর ও। যেমন লেখক বলেছেন ক্যান্সানে মরতে বসা রোগীটাও আশায় থাকে হয়তো কোনো এক অলৌকিক ঘটনা সে বেঁচে ফিরবে। মানুষ আশায় বাঁচে, কারো বেঁচে থাকা সার্থক হয় কারো হয়না। কিন্তু আশারা বেঁচে থাকে অনন্তকাল। কোনো সম্ভাবনা না দেখেও হারুন আশায় আছে হয়ত কোনো একদিন মিষ্টি তাকে কাছে টেনে নিবে । হয়তো ভালোবাসবে। মিষ্টিও বেঁচে আছে বিষ্ণুর আশায়। মিষ্টির আশা শেষ হয়না । দীর্ঘ হতেই থাকে।

শেষ করব লেখকের মুখবন্ধ দিয়ে ‘‘জীবনে সব চাওয়া- পাওয়ার হিসাব কী মেলে? কিছু হিসাব বাকি থেকে যায়! কোনো কোনো নির্ঘুম রাতে খুলে গেলে হৃদয়ের দখিন দুয়ার, সেইসব অনির্ণিত হিসাবেরা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের দাবী থাকে, অভিমান থাকে, প্রত্যাশা থাকে। কিছুতেই তাদের আমরা এড়াতে পারিনা। এড়াতে পারিনা বলেই বিপুল কৌতুহলে ফের জোড়া দিতে বসি হারানো বাঁশির সুর, ঘাসফুল ছুঁয়ে দেখা গোধুলি লগন। রাতভর চেষ্টায় যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, যখন মনে হয় আর মিলছে না , তখন ভাবনাগুলো তুলে দেই অন্য কোনো রাতের কাছে, প্রতীক্ষায় থাকি অন্য কোনো সময়ের । মত প্রতিকূলতা সত্ত্বে তাই আমাদের স্বপ্নেরা বেঁচে থাকে। ওদিকে কালের চক্রে ঘুরপাক খেয়ে বয়ে চলে বেহিসাবি সময়, এগিয়ে চলে বহুরাঙা আনন্দ-বেদনার এক বৈচিত্রময় জীবন।”
কালচক্র উপন্যাসটি একটি ঐতিহাসিক সামাজিক উপন্যাস হিসেবে পাঠক সমাজের কাছে সমাদৃত হবে বলে আশা করছি।

লেখক: মাহমুদুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment