কেন লিখি?

কেন লিখি? – ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে একজন লেখক হিসেবে আমার কাছে প্রশ্নটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
.
মানুষ জীবনে কি চায়? অথবা, আরও একটু নির্দিষ্ট করে বললে, একজন পুরুষ মানুষের জীবন থেকে কি চাওয়া পাওয়া থাকে? অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, সম্মান, নারী সংসর্গ – এইতো? ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে একজন লেখক হিসেবে আমি যখন আমার চারপাশে তাকাই, আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীদের দিকে দেখি, আমি ঠিক কি দেখতে পাই? কে ধনী? কে ক্ষমতাওয়ালা? কে সম্মান বেশী পাচ্ছে?
.
২০১৬ সালের সমাজে শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতা, মর্যাদা সহ বাদবাকি সবকিছু নির্ধারিত হয় আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে, সমাজের কোন সার্কেলে আপনার ওঠাবসা, আপনি কোন গাড়িটা চালান, ঢাকা শহরে আপনার বাড়ি আছে কিনা, থাকলে কোন জায়গায়, আপনি কোন ব্র্যান্ডের পোশাকআশাক পরেন, আপনার ব্যাবহৃত একসেসরিজ কোন দেশ থেকে ইমপোর্ট করা- ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে। যখন আমার ৯৯ শতাংশ ক্লাসমেট, বন্ধুবান্ধবের জীবনের লক্ষ্য বিসিএস- ব্যাংকে বা মাল্টি ন্যাশনালে চাকরি করে কাড়ি কাড়ি টাকা কামানো, তা দিয়ে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাটবাড়ি, প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক গাড়ি এবং গাড়ি বাড়ির সাথে সাথে আনুসাঙ্গিক সম্মান ও ক্ষমতা খরিদ করা, বিয়ে করে বউ ঘরে তোলা – তখন আমি কেন চাই লেখক হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে?
.
আমি কেন লেখক হতে চাই, যখন আমার নির্দিষ্ট কোন দলের কোন মতাদর্শের প্রতি দাসত্ব বা দায়বদ্ধতা – কোনটাই নাই? আমি কেন লেখক হতে চাই যখন বাংলাদেশের সিকিভাগ লেখকেরা গুটি কয়েক ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের নামে বিষোদাগার করে সাহিত্যচর্চা করার বদলে সাহিত্যকে করে দেয়? কেন আমি লেখক হতে চাই যখন কে কতবড় সাহিত্যিক তার মাপকাঠি হয়ে যায় ফেসবুকে তার লাইক-শেয়ার আর ফলোয়ারের সংখ্যার সমানুপাতিক? আমি কেন লেখক হতে চাই যখন অনলাইন লেখা পড়তে পড়তে মানুষের এমন একটা মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে যে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মেজাজি সাহিত্য লেখে এমন ব্যাক্তির মরণোত্তর গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উপাধি পাওয়া ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ থাকে না? আমি কেন লেখক হতে চাই যখন বাংলাদেশের শতকরা ৯৯ শতাংশ বই প্রকাশকেরা খালি ব্যাবসা, ধান্দাবাজি আর লেখক ঠকানো, লেখকের পাওনা পয়সা মেরে দেয়া ছাড়া আর কিছু বোঝে না? আমি কেন লেখক হতে চাই যখন নূতন বইয়ের ঘ্রাণ শোঁকার মধ্যে মানুষ আর সুখ খুঁজে পায় না? গড়ে প্রতিমাসে রেস্টুরেন্টে আর সিনেমাহলগুলোতে হাজার পাঁচেক আর বছরে অর্ধলক্ষের মত টাকা খরচ করলেও দেড়শো টাকার একটা বই কিনে পড়তে সমাজের সিকিভাগ মানুষের মনে চায় না, নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে বই বের করল যে লেখক তার কাছে ফ্রি কপি চায় এমনভাবে, যেন লেখা পড়ে লেখকের প্রতি দয়া করছে? আমি কেন লেখক হতে চাই যখন সমাজের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকাগুলি সাহিত্যিকদের পরিচর্যা করার বদলে তাবেদার পোষে? আমি কেন সাহিত্যিক হতে চাই যখন একজন আহমদ ছফা বেঁচে নাই, যে কিনা একজন তরুণ লেখককে হাতে ধরে সাহিত্যিক সমাজের অগ্রগণ্য ব্যাক্তিবর্গের চক্রের মাঝে নিয়ে গিয়ে বলতেন – এ ছেলেটার মধ্যে জিনিস আছে, এর লেখা আপনারা পড়ুন? আমি কেন সাহিত্যিক হতে চাই যখন আমাদের সমাজের অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক তরুণ সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে দুটি লাইন লিখতেও কার্পণ্য করেন?
.
সময়টা হতাশাজনক। কিছু হতাশার কথা বললাম। হতাশার আনুপুঙ্খিক বিবরণ দিতে গেলে একটা গবেষণা নিবন্ধ লিখে ফেলা সম্ভব। কিন্তু, তবুও তো লিখছি। তবুও চোখের সামনে যা ঘটছে তা মনে আলোড়ন তুলছে, মাথায় নূতন লেখার প্লট আসছে, আঙ্গুল-কলম-কাগজে-কিবোর্ডে ঝড় উঠছে। নূতন সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হচ্ছে। মেলায় বই আসছে প্রতিবছর।
.
কেন লিখি আমি?
.
লেখা যখন শুরু করেছি মাত্র, তখন লেখালিখি নিয়ে অনেক রোম্যান্টিক আইডিয়া মাথায় ছিল। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম- একজন লেখক হচ্ছেন সৃষ্টির শুরু থেকে বংশ পরম্পরায় চলে আসা আলোকিত এবং ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সম্মানিত একজন মানুষ। হয়তো বলতাম – লিখি, কারন আমি অমর হতে চাই। লিখি, কারন আমি চাই আমার সাহিত্যকর্মের দ্বারা নিজের নাম মহাকালের খাতায় নিবন্ধিত করতে। লিখি, কারন আমার সমাজের প্রতি, আমার দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। লিখি, কারন লিখে আমার সমাজে পরিবর্তন আনতে হবে। মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক।
.
এখন আমি জানি, একজন লেখকের ক্ষমতা কতটুকু। আমি জানি আমার মত একজন তরুণ লেখকের লেখা কতটুকু পৌঁছাতে পারে। আমি জানি আমার লেখাকে মানুষ কোন চোখে দেখে। আমি জানি, লিখে সমাজের মধ্যে ম্যাসিভ পরিবর্তন আনাটা ২০১৬ সালে শুধুই একটা রোম্যান্টিক চিন্তা।
.
২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘কেন লিখি?’ – আমার উত্তর হবে, আমি লিখি, কারণ আমার একটা গল্প বলার আছে।
.
কার গল্প? কোন সে গল্প?
.
গল্পটা হতে পারে আপনার প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিয়ে, যে অত্যন্ত নির্মম ভাবে আপনার হৃদয় মাড়িয়ে চলে গেছে, আর কখনো ফিরে তাকায় নি আপনার দিকে। গল্পটা হতে পারে আপনি আপনার প্রেমিকা বা বউয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিভাবে ক্রমাগত চিট করেছেন সেটারও। গল্প হতে পারে একজন দরিদ্র্য রিকশাচালকের মলিন মুখ নিয়ে, গল্প হতে পারে সমাজের নিম্নশ্রেণীর এক ছিঁচকে চোরের সুখ দুঃখ নিয়ে, গল্প হতে পারে এক নিষ্পাপ শিশুর মনে প্রথমবারের মত সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবলের প্রভাব নিয়ে, গল্প হতে পারে মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখের কতকথা নিয়ে। গল্প হতে পারে ব্যক্ত ও অব্যক্ত আরও অসংখ্য অগণিত বিষয় নিয়ে।
.
বিগত দু’ বছরে যে সমস্ত ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়ে গেছে সাংঘাতিকভাবে, তার থেকে ছেঁকে বেছে দশটি ঘটনা নিয়ে লেখা দশটি গল্পের সমাহার আমার বই আয়াজ আলীর ডানা। গল্পগুলো আপনাদের বলার জন্যে এক দুর্দমনীয় তাড়না আমায় লেখক বানিয়েছে, দিন-রাত্রি নির্বিশেষে পড়ার টেবিলে, লাইব্রেরীতে, ফুটপাথে, বাসে কাগজ কলম নিয়ে বসিয়ে দিয়েছে আমাকে।
.
কেন লিখি? ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে এই তার ফিরিস্তি।
.
-সাজিদ উল হক আবির
২৭ জানুয়ারি ২০১৬,
রাত ৯টা ৫০,
উত্তর কমলাপুর, বাজার রোড, ঢাকা।

Related Posts

About The Author

Add Comment