কেমন ছিলেন ঢাবির প্রথম ভিসি পি. জে. হার্টগ

তাঁর প্রয়াণের পরের দিন অর্থাৎ ২৮শে জুন, ১৯৪৭ সালে বিখ্যাত দ্য টাইমস পত্রিকা লিখেছিলো- ‘শিক্ষা চিন্তা ও চর্চায় তিনি অসাধারণ সাক্ষর রেখে যান-এটা শুধু ভারতবর্ষেই নয় পুরো বিশ্বেই।’কথা হচ্ছে স্যার পি.জে. হার্টগকে নিয়ে। “টাইমস” এর চেয়েও বঙ্গাল মুল্লুকের মানুষ খুব কাছে থেকে পেয়েছে তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি পূর্ববাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক আঁতুড়ঘর হয়, তবে স্যার হার্টগ প্রথম বাতি দিয়েছিলেন তাতে। কিন্তু ঐ যে, ইতিহাস ভুলে যাওয়া কিংবা ভুলভাবে বোঝা বাঙালির অভ্যাস। তাই হারিয়ে যাই যাই করে একরকম টিকে আছে এই মানুষটার নাম। গোটা বাংলা দূরে থাক, ক্যাম্পাসের একটা লম্বা অংশ “মানুষ হার্টগ” সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না। অথচ তাঁর কথা বলতে স্বীকার করতেই হবে অন্য কথাও। উপমহাদেশে মাদ্রাজ, বোম্বে, এবং কোলকাতার আধিপত্যকেই শুধু চ্যালেঞ্জই ছুড়েন নি তিঁনি, একরকম বদলে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা।

পুরো নাম ফিলিপ যোসেফ হার্টগ। জন্ম ১৮৬৪ সালের ২রা মার্চ। পিতা আলফানসো হার্টগ ছিলেন হল্যান্ডের ইহুদি পরিবারের সন্তান, যিনি পরে ফ্রান্সে আসেন এবং প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষালাভ করেন লণ্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুল, দ্যা ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস, জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ দ্যা ফ্রান্স-এ। ১৮৮৫ সালে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করেন। বেশ ক’বছর রাসায়নিক গবেষণা করলেও ১৮৮৯ সালে ম্যানচেস্টার অয়েন্স কলেজে যোগ দেন “বিশপ বার্কলে স্কলার” হিসেবে।

১৯০৩ সাল থেকে টানা ১৭ বছর লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার পদে দায়িত্বপালন করেন। ১৯১৭ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন হার্টগ; যার চেয়ারম্যান ছিলেন মাইকেল স্যাডলার। ভারতের গভর্নর জেনারেল কর্তৃক ১৯২০ সালের ১লা ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পান। ১০ই ডিসেম্বর যোগদান করেন। বাংলাদেশ আর হার্টগ- উভয়েরই নতুন জীবন শুরু হয় এর মাধ্যমে।

কিংবদন্তী রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন-
“সাধারণত এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দোষত্রুটি দেখা যায়, তার অনেকগুলি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেনি; তার জন্য হার্টগের যথেষ্ট কৃতিত্ব আছে।”

সে যুগে উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষায় দক্ষ শিক্ষাবিদ থাকলেও হার্টগের উচ্চতা ছিলো সবার উপরে। উপাচার্য পদে যোগদানের সাথে সাথেই তিঁনি খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সাথে পরামর্শ করেন। বলা বাহুল্য হবে না, হার্টগ শুধু ব্রিটিশ নয়, জার্মান এবং ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বাধিক অগ্রসর রাখার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা ছিলো ব্যাপক। সে কথা স্মরণ করে আরেক কিংবদন্তী রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন-
“সাধারণত এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দোষত্রুটি দেখা যায়, তার অনেকগুলি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেনি; তার জন্য হার্টগের যথেষ্ট কৃতিত্ব আছে।”

কিছু নিয়ম চালু করেন তিঁনি নিজ নির্দেশনায়। যেমন, পরীক্ষার উত্তরপত্র দু’জন শিক্ষক দেখবেন। অথচ উত্তরপত্রে কোনো নম্বর দেয়া হবে না। দু’জনের দেয়া নম্বরের ফারাক শতকরা দশের বেশি হলে উত্তরপত্র তৃতীয় আরেকজন দেখবেন। মৌখিক পরীক্ষার পর ফলাফল নির্ধারণের সময় বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া সারা বছর “টিউটোরিয়াল ক্লাস” হবে, ইত্যাদি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রচলিত নিয়মের অনেকগুলোই জীবিত।

১৯২৪ সালের দ্বিতীয় সমাবর্তনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জোর গলায় বলেছিলেন-
“I have no desire to over praise our achievements. But I claim that in the two and half years that have passed since we opened our doors, we have laid the foundation of a real university.”

Serve as a model university for the whole India- এই উদ্দেশ্য নিয়েই তিঁনি হাতে নিয়েছিলেন সকল দায়িত্ব। তাঁর প্রমাণ, শিক্ষক নিয়োগে তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। সকল প্রকার পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বোচ্চ যোগ্যকেই বাছাই করতে তৎপর ছিলেন তিঁনি। গঠিত হয়েছিলো সিলেকশন বোর্ড। ভারত এবং ইংল্যাণ্ডেও বিজ্ঞাপন দেয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে অনেক আবেদন আসে। ১৯২০ সালে গভর্নর জেনারেল রোনাল্ডসে একটা লম্বা চিঠিতে তাঁকে পরামর্শ দেন। সুপারিশ করেন কয়েকজন শিক্ষকের নামও। কিন্তু বিচক্ষণ হার্টগ প্রার্থীর একাডেমিক কৃতিত্বের বিকল্প হিশেবে অন্য কোনোকিছুকেই গ্রহণ করেন নি। একারণেই ১৯২৪ সালের দ্বিতীয় সমাবর্তনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জোর গলায় বলতে পেরেছেন-
“I have no desire to over praise our achievements. But I claim that in the two and half years that have passed since we opened our doors, we have laid the foundation of a real university.”

তৎকালীন সেই অবস্থাতে তাঁর সঙ্গিনী মাবেল হেলেনের ভূমিকাও নিতান্ত উপেক্ষা করার মতো নয়। হার্টগের ব্যস্ততায় নিজের নিঃসঙ্গতা পুষিয়ে নেন পিছিয়ে পড়া ছাত্রীদের দিয়ে। রক্ষণশীল বাঙালি ঘরের এইসব মেয়েরা অসংকোচে তাঁর গৃহে আদৃত হতো। অনেক ছাত্রী ক্লাশ শেষে অপেক্ষা করতো তাঁর কাছেই। পরে অভিভাবকরা এসে ঘরে নিয়ে যেতো।

বিশেষভাবে বলতে গেলে, একই শতকের শুরু এবং শেষের মধ্যে যে অভাবিত পরিবর্তন পূর্ববাংলার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, তাঁর প্রথম খসড়া এঁকেছেন স্যার হার্টগ। যেই মিনারে দাঁড়িয়ে বাঙালি নতুনচোখে পৃথিবীকে আবিষ্কার করেছে, তাঁর ভিত্তি রচনা করে গেছেন তিঁনিই। আর যেখানে যাই হোক, বাঙালিরা তাঁর কাছে সীমাহীন ঋণে ঋণী। আরো বেশি ঋণী প্রায় হারিয়ে যাওয়া পূর্ববাংলার মুসলমান সমাজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেবার পর তিঁনি ইণ্ডিয়ান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে যোগ দেন। ১৯২৮-২৯ সালে ভারতীয় শিক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা অনুসন্ধানের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক ইংলিশ কমিটির ডিরেক্টরও ছিলেন তিঁনি। নিজের কমিউনিটি নিয়েও সচেতন ছিলেন। ছিলেন লণ্ডনে বসবাসকারী উদারপন্থী ইহুদীদের ধর্মমন্দির (সিনাগগ) পরিচালনা পর্ষদের সক্রিয় সদস্য। ১৯৩০ সালে তাঁকে কে.বি.ই নিয়োগ দেয়া হয়।

ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, উর্দু, হিন্দি এবং বাংলা ভাষায় পারদর্শী হার্টগের লেখার বিষয়বস্তু দেখলেই ধারণা করা যায় চিন্তার গভীরতা সম্পর্কে। An Examination of Examination (1935), The Purpose of Examination (1938), Some Aspects of Indian Education: Past and Present, Culture: Its History and Meaning, Worlds in Action (1945) প্রভৃতি বেশ কিছু গবেষণাধর্মী বুদ্ধিদীপ্ত বইয়ের লেখক তিঁনি। তাঁকে নিয়ে মিসেস হার্টগের স্মৃতিকথা P.J. Hartog: A Memoir.

১৯৪৭ সালের ২৭ শে জুন প্রয়াত হন এই বরেণ্য শিক্ষাবিদ। একথা স্বীকৃত- ঢাকাকেন্দ্রিক নয়া চিন্তক সমাজ তাঁর সৃষ্ট পাটাতনেই জন্ম ও প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। পরবর্তীতে অনেক নামকরা পণ্ডিত যোগ দিয়েছেন। বের হয়ে গেছেন- তাঁদের লিস্টিও নাতিদীর্ঘ না। অবশ্যই কোনো না কোনোভাবে একটা বড় অংশ বুদ্ধিবৃত্তিক উঠোনে বাতি দিয়ে গেছেন। কিন্তু পি. জে. হার্টগের বিশেষত্ব এখানেই যে,- “তাঁর হাতে জ্বলেছিলো প্রথম প্রদীপ”।

 

রেফারেন্স
The Times, 28th Jun, 1948
জীবনের স্মৃতিদ্বীপে- রমেশচন্দ্র মজুমদার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা- সৈয়দ আবুল মকসুদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ- সরদার ফজলুল করিম
P.J. Hartog’s speech at the second convocation in 1924
বাংলাপিডিয়া
———————–

লেখক-
আহমেদ দীন রুমি,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment