ক্যাম্পাস আড্ডা: বই পড়তে হবে কেন?

গত ২২ এপ্রিল, ২০১৫ আমাদের বৈকালিক আড্ডায় তারাদের হাঁট বসেছিল যেন। তরুণ সব পণ্ডিতজন একত্রিত হয়ে মজমার রওশন বাড়িয়ে দিয়েছিল। আড্ডায় যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন আনোয়ার হোসেন ফরহাদ, জুনায়েদ ইকবাল, মাহমুদুল হাসান, সালেহ খান, কেয়া, ঈপ্সিতা, আমাতুন নূর, আবদুল্লাহহিল মুহাইমিন, সাইফুল, আইমান, রাকিব, সাজ্জাদ, রানা, সাফা, মুহাইমিন (২) সহ প্রায় ১৪/১৫ জন বন্ধু।

আমি একটু দেরিতেই গিয়েছিলাম এবং সবাইকে এমন একসাথে পাবো ভাবি নাই। তাই আস্তে করে আড্ডার ভেতরে ঢুকে গেলাম। বুঝতে পারলাম আড্ডা আসলে শুরু হয় নাই, এখনো খোশগল্প স্টেজে আছে। যাক প্রস্তুতি চলছে বুঝা গেল। চট্টগ্রাম শহর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন জ্ঞানচর্চা হচ্ছে, ওখানকার সাংস্কৃতিক ও সমাজিক কর্মকাণ্ড কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এটা জানার আগ্রহে চবির সবচেয়ে মেধাবী দুজন ছাত্র জুনায়েদ ভাই ও ফরহাদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম। অবশ্য তারা এখন চবির সাবেক ছাত্র, বর্তমানে তারা ঢাবির ছাত্র, আমাদের অংশ।

তাদের দীর্ঘ আলোচনায় এটাই উঠে আসলো যাতায়তের সুবিধা অসুবিধা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।দুপুর দেড়টা নাগাদ নাকি ক্যাম্পাস খালি হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ ছাত্র শহরে চলে যায়, ক্যাম্পাসে যারা থাকে তাদেরও বেশি অংশ টিউশনি বা পার্ট টাইম কাজ করতে শহরে বা ক্যাম্পাস থেকে দূরে সড়ে যায়।তাদের কর্মকাণ্ডে অন্য অনেক কিছুর সাথে শাটল ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শাটল ট্রেন যেমন চবির গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য তেমনি এটা নাকি ক্যাম্পাসে কর্মকাণ্ডকেও নিয়ন্ত্রণ করে। ফরহাদ ভাই খুব আক্ষেপ করে বললো তারা যখন ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন তাদের একটা টার্গেট সবসময় থাকতো যেন সেটা দেড়টার আগেই আয়োজন করা যায়, শেষ করা যায়।কারণ এরপর বেশি উপস্থিতি আসা করা যেতো না।

cu

আমার কাছে মনে হচ্ছিল এগুলো আসলে কোন ধরণের চর্চার জন্য প্রধান বাঁধা হতে পারে না। অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ, এমআইটিসহ পৃথিবীর বিখ্যাত ও বিশিষ্ট ইউনিভার্সিটিগুলোর বেশিরভাগই মেইন সিটি থেকে খানিকটা দূরে।এজন্য আমি শাটল ট্রেন বা শহর থেকে দূরে উপস্থিতি ইত্যাদি সমস্যাগুলোকে এত বেশি গুরুত্ব দিতে পারছিলাম না। ধরেন চবিতে ২০ হাজার ছাত্র আছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে। কিন্তু বাকি অর্ধেক তো ক্যাম্পাসে থাকে। এই অর্ধেকের মধ্যে ৫ বা ২ এমনকি ১ শতাংশ সেই চর্চার মধ্যে থাকলেও তো অনেক। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ বা ১০০ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের জ্ঞানচর্চা করবে না এর জন্য আমার কাছে শাটল ট্রেন, শহরে গমন, ভৌগোলিক অবস্থান এই যুক্তিগুলো যথেষ্ঠ শক্ত মনে হয়নি। অবশ্য আমি ভুলও হতে পারি। হয়তো সেখানে ভালো চর্চা হচ্ছে আমি জানি না।

এবার চলে যাই আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আড্ডাটা যেহেতু বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ছায়াতলে অনুষ্ঠিত হয়েছে এজন্য স্টাডি ফোরামের দৈনিক আড্ডার আদলে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে দেখতে পেরেছি আড্ডাকে একটু মডারেট না করলে এটা দলছুট হয়ে যায়, এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে গন্তব্য হারিয়ে ফেলে। আমরা মনে করি আমাদের আড্ডার কিছু পারপাজ আছে

যেমন-

১. সত্যে না পৌছতে পারলেও এর দিক অণ্বেষণের প্রয়াস আছে।

২. এ আড্ডার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে গুছিয়ে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করা এবং সেটা ডেলিভারি দেয়ার পারঙ্গমতা অর্জন।

৩. আর ইন্টারডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ অর্জন করা এবং একটি ফেনোমেনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা অর্জন।

৪. আমাদের নিয়মিত পড়াশুনাগুলো শেয়ার করার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রাথমিক ধারণা অর্জন করতে পারি যেটা আমাদের পছন্দের ডিসিপ্লিনকে হেল্প করে।

৫. আমরা আমাদের পড়ার পদ্ধতিগুলোও শেয়ার করি আমাদের এই দৈনিক আড্ডায়। এতে করে নবীন পাঠকদের কাজে আসতে পারে।

৬. তাছাড়া আমরা সারাদিন লাইব্রেরিতে পড়ে যে ইনফর্মেশন গেদার করি সেটা নলেজ হবে যখন আমরা সেটা শেয়ার করবো।

এমনতর বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আমরা প্রতিদিন বিকালে আড্ডায় প্রবৃত্ত হই।

গতকালের আড্ডাকে আরেকটু লাইনে নিয়ে আসার জন্য আমরা স্টাডি ফোরামের একটি নিয়মিত ফিচার ‘এ বুক ইন এ উইক’ বা সপ্তাহে অন্তত একটি বই নিয়ে প্রসঙ্গ টানি। উদ্দেশ্য ছিল সবার কাছ থেকে এই সপ্তাহে পড়া বই নিয়ে কথা শুনবো। কিন্তু কেন বই পড়তে হবে, বই পড়া কি জরুরী, কেন ই বা শুধু বই-ই পড়তে হবে, বই কি ইত্যকার বিভিন্ন তর্কে, বিতর্কে, প্রতর্কে আলোচনা বেশ দূর গড়ায়। তবে এই তর্ক, বিতর্ক ও প্রতর্কে অনেক কথা উঠে এসেছে এবং পড়ার দর্শনটা অনেক পরিষ্কার হয়েছে বলে মনে করি।তাছাড়া পড়া বিষয়ে চিন্তা করার অনেক মসলা পাওয়া গেছে এটা বলা যায় নির্দ্বিধায়।

book row

পড়া প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে।

যতদূর মনে আছে সেগুলো আগে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি:

১. কেন বই-ই পড়তে হবে?

২. জগতে এত বই আছে! আমাদের কোন বইগুলো পড়তে হবে? সব বই কি এক জীবনে পড়া সম্ভব?

৩. কোন প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য আমি বইটি পড়বো?

৪. বই পড়তে আমার ভালো লাগে না। আমি মুভি দেখবো, ডকু দেখবো, নেটে আর্টিকেল পড়বো, পত্রিকা পড়বো মাগার বই পড়বো কেন?

৫. ভালো বই, দরকারি বই চিনবো কেমনে?

এমনতর বিভিন্ন প্রশ্ন এসেছে আর বাকিগুলো মনে করতে পারছিনা। মনে আসলে লিখে দেবো, আপনারাও মনে করে প্রশ্নগুলো তুলে দিতে পারেন, তাহলে খুব কাজে দেবে।

এসব প্রশ্নের একেবারে খাটি বা নির্ভেজাল উত্তর নয়, সমাধান নয়-বরং এগুলো নিয়ে আমাদের ভাবনার কথাই বলি। তাছাড়া প্রশ্নের ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরী সব প্রশ্নের সরল সমাধান কি আছে? তবে বই পড়া এবং বিভিন্ন বিষয়ে এক্সটেনসিভ পড়ার বিষয়ে চলেন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা তুলে ধরার প্রয়াস চালাই:

  • প্রথমত, যে কোন সিরিয়াস পাঠকই তার পাঠ অভিরুচি তৈরি করার আগে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন এবং এক্ষেত্রে নিয়ম শৃঙ্খলা বা সিলেবাসে সীমাবদ্ধ থাকেন নি।বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেই কেবল প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় বই পড়ার রুচি বা বাছাই করা দক্ষতা অর্জন হয়।
  • দ্বিতীয়ত, নিজের পছন্দ বা প্রয়োজনকে খুঁজে পেতেও বিভিন্ন ধরণের বই পড়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
  • তৃতীয়ত, বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে পড়ার রুচি ডেভলপ না করলে ওই ব্যক্তি শুধু এক বিষয়েই বিশেষজ্ঞ হবেন এবং এটা বেশিরভাগ সময়ই অপূর্ণ থেকে যাবে।

ছবি: আর্কিমিদিস জ্যামিতিতে মগ্ন

ছবি: আর্কিমিদিস জ্যামিতিতে মগ্ন

ধরেন একজন ডাক্তার যদি পুরো মানব শরীর সম্পর্কে না জানে প্রথম থেকেই শুধু নাক নিয়েই পড়ে থাকে সে কি নাক বিশেষজ্ঞ হতে পারবেন? নাকের সাথে যে কান, গলা, মস্তিষ্ক এবং সর্বোপরি পুরো শরীরটা জড়িত এটা তো আগে জানতে হবে! এবং ডাক্তারি বিদ্যাটা তো এমনিই পরিচালিত হয়। প্রথমে মানব শরীরে পুরো অংশটি নিয়ে পড়াশুনা, কাটাকাটি হয় এবং সর্বশেষে একেকজন শরীরের একেকটি অংশ নিয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে এবং বিশেষজ্ঞ খেতাব অর্জন করে। কেউ চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়, কেউ চর্ম, কেউ নাক, কান ও গলা, কেউ বক্ষবিশারদ, কেউ বা পাকস্থলি আবার কেউ বা কিডনি ইত্যাদি। তেমনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে ওস্তাদি ফলাতে হলে বিভিন্ন ডিসিপ্লিন সম্পর্কে প্রাথমিক জানাশুনো থাকতে হবে এখন সে জানাশুনার লেবেল পার্সন টু পার্সন ভ্যারি করতে পারে কিন্তু প্রয়োজনটা অস্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। তো এই বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাসিক প্রস্তুতির পরই একজন রিডার কোন একটি বিশেষ বিষয়ে এক্সপারটাইজ অর্জন করেন। কেউ অর্থনীতিবিদ হয়, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ গবেষক, কেউ সমাজতাত্ত্বিক, কেউ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কেউ বা কূটনীতিক হয় আবার কেউ বা কবি-সাহিত্যিক হয়। এখন যে অর্থনীতিবিদ তার দেশের নৃতত্ব জানে না, সে দেশের কবিতা-সাহিত্য-উপন্যাস-সিনেমা সম্পর্কে ব্যাসিক জানে না তাহলে সে পরিপূর্ণ অর্থনীতিবিদ হতে পারবে না। আবার যে কবি সাহিত্যিক সে দেশের বাজার ব্যবস্থা, রান্নাবান্না সে দেশের সংস্কৃতি, নৃতত্ব, রাজনীতি ও রাষ্ট্র কাঠামো এবং দেশটির ইতিহাস জানে না সে কি করে তার সাহিত্যে তার দেশ বা সময়কে বা তার মানুষকে ধারণ করবে? এমনতর বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধানকল্পে আমরা এক্সটেনসিভ এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ার কথা বলি।

  • চতুর্থত, ধরেন একজন পাঠক রাজনীতি, অর্থনীতি বা দর্শনের জটিল ধাঁধাঁ নিয়ে পড়াশুনা করতে চায়। এখন কি প্রথম থেকেই এসব বিষয়ে অরিজিনাল টেক্সট পড়া শুরু করবে? এবং সে কি সেগুলো ধরতে পারবে বা হজম করতে পারবে? ধরেন আমরা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু টেক্সটের একটা সিলেবাস করলাম। কমিউনিজম, স্যোসালিজম বুঝার জন্য ‘দাস ক্যাপিটাল’; রাষ্ট্রনীতি বুঝার জন্য ‘দ্য রিপাবলিক’, ‘লেভিয়াথন’, ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’, ‘দ্য স্যোসাল কনট্রাক্ট’; বিজ্ঞান বুঝার জন্য নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা ফিলোসফিয়া’, হকিংয়ের ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’, প্রাণিবিদ্যা বুঝার জন্য ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রথমেই ধরিয়ে দিলাম।এখন একজন নতুন পাঠক কি প্রথমেই এই বইগুলো পড়ে ধরতে পারবে এবং বিশেষজ্ঞ হয়ে যাবে?

আমি মনে করি একটা শিশুর খাওয়া দাওয়ার রুচির সাথে একজন পাঠকের রুচি গড়ে উঠার সাদৃশ্য আছে। একটি শিশু প্রথমে অতি তরল ছাড়া কিছু খেতে পারে না। তার পছন্দ বা সক্ষমতা থাকে সীমাবদ্ধ। সে যত বড় হতে থাকে তার খাওয়ার ক্ষমতা তত বাড়ে এবং বিচিত্র হয়। তেমনি আমরা যদি একজন দক্ষ বা ওস্তাদ পাঠকের অতীতের দিকে নজর দেই আমরা কি দেখতে পাবো?

সে প্রথম দিকে বিভিন্ন সহজ সহজ বই পড়ে পাঠের রুচি ডেভলপ করেছে এবং নিজের প্রয়োজনটা আবিষ্কার করেছে। এখন সে নিজের প্রয়োজন অনুসারে প্রয়োজনীয় বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে।

07_reading

তাই বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম মনে করে আমাদের কোন নতুন সভ্য বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত পড়াশুনা করুক, এজন্য সপ্তাহে কমপক্ষে একটা বই শেষ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে দেই যাতে তার চর্চাটা অব্যাহত থাকে। অবশ্য আমরা এক বছরের স্টাডি প্লান তৈরি করছি যেটাতে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা থাকবে কোন কোন বইগুলো পড়লে আমরা কোন ডিসিপ্লিনের উপর প্রাথমিক প্রস্তুতি অর্জন করবো এবং পরবর্তীতে আমরা নিজেরাই সেই ডিসিপ্লিনের উপর পারঙ্গমতা অর্জন করার জন্য পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবো।

  • পঞ্চমত, ধরেন আমাদের আড্ডার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য থাকে শুধু বিভিন্ন বই নিয়ে গল্প। প্রথমে বইটার নাম বলা, লেখকের নাম এবং বইটা নিয়ে দু’চার কথা বলা। এটা করলে হবে কি উপস্থিত কোন একজন এটা নিয়ে পড়ার আগ্রহ পাবে এবং হয়তো যে বইটার গল্প বলছে তার চেয়ে ভালো হজম করতে পারবে ওই নতুন পাঠক।

যেমন গতকাল মাহমুদুল হাছান জেন অস্টিনের প্রাইড এন্ড প্রিজুডিস নিয়ে গল্প পারলো। এটা নাকি তার অনেক ভালো লেগেছে, জেন অস্টিন নাকি তার কাছে অনেক বড় ঔপন্যাসিক, এটাতে নেপোলিয়নিক টাইমের কথা উঠে এসেছে এবং সে সময়কার কনফ্লিক্ট ও ক্রাইসিস গুলো উঠে এসেছে। এ বইয়ের সূত্র ধরেই আসলো ভার্জিনিয়া ওল্ফ এর ‘ওমেন এন্ড ফিকশন’ ও ‘ও রুম অফ ওয়ানস্ ওন’ এর কথা। ওল্ফ তার ওমেন এন্ড ফিকশনে বলতে চাইলেন কিভাবে জেন অস্টিন বা ব্রন্টি বোনত্রয়ীর পক্ষে তলস্তয়ের মত ‘ওয়ার এন্ড পিস’ লেখা সম্ভব নয়। কারণ তাদের তো তলস্তয়ের মতো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই বা তলস্তয়ের মতো আউটডোর লাইফের অভিজ্ঞতা নেই। তাদের লেখাপত্রে বড়জোড় একটি মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে বা বিভিন্ন পার্টিতে যে আড্ডা হয় সে অভিজ্ঞতাই আছে। এজন্য জেন অস্টিন তলস্তয়ের মতো যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি আঁকতে পারবেন না! প্রাইড এন্ড প্রিজুডিসে কিছু সেনা এবং সেনাসমাবেশের কথা এসেছে। এবং সেটা কিন্তু অতি দূর থেকে একজন দর্শকের দেখার মত। সেনাদের মনস্তত্ত্ব বা সেনাদের পার্সপেক্টিভে লেখা অস্টিনের পক্ষে সম্ভব ছিল না এমনটাই বলতে চাচ্ছেন ভার্জিনিয়া ওল্ফ। এ বছর প্রাইড এন্ড প্রিজুডিস তার প্রকাশের ২০০ বছর পূর্তি করবে এজন্য মাহমুদ ভাই কিছু করতে চান। সেখানে কেয়া একটা পার্টির প্রস্তাব দেন এবং এতে সবাই বেশ মজা পায়।

pridenPrejudice

তখন আমি বললাম যে বই নিয়ে পার্টি নতুন নয়।

এরই ধারাবাহিকতায় আমি তুললাম ইউলিসিস এর কথা। জেমস জয়েসের এই উপন্যাসটি কিভাবে পৃথিবীর জটিলতম উপন্যাসের একটি। এবং মাত্র একদিনের কাহিনী নিয়ে সাজানো এই উপন্যাসটি প্রায় আটশো পৃষ্ঠার। উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান চরিত্র ব্লুম এর জুনের একটি দিন নিয়েই এ উপন্যাস। পাশ্চাত্যে ইউলিসিস ভক্তরা ৪ জুনকে ব্লুমস ডে হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশে কবি কায়সার হক নাকি প্রতিবছর ঘটা করে ব্লুমস্ ডে পালন করে। এ গল্প তুললাম।

এ উপন্যাসটি কেন পৃথিবীর জটিলতম উপন্যাস এ প্রশ্ন আসলো।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললাম-এটা দুর্ভেদ্য এবং জটিল, দীর্ঘ সময় ধরে কনসেন্ট্রেশান ধরে রাখা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বইটি সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলাম যে এ বইটিতেই শুধু প্রায় ৩৫ হাজার শব্দ (ভোকাবুলারি) ব্যবহার করেছেন। আই মিন একটা শব্দ একবার করে গুণলে ৩৫ হাজার ইউনিক শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে মাস্টার রাইটাররা সারাজীবন ধরে সর্বোচ্চ ২০/২২ হাজার শব্দ দিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে দিয়েছেন এবং ২০ হাজার কিন্তু একটি অবিশ্বাস্য সংখ্যা! রবীন্দ্রনাথ, ভলতেয়ার ও শেইক্সপীয়রের ভোকাবুলারি ২০ থেকে ২২ হাজার। এক্ষেত্রে মনে রাখার বিষয় একজন সাধারণ মানুষ ৫০০ এর মত শব্দ দিয়ে সারাজীবন আরামছে যোগাযোগ ও কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। মাঝারি মানের গবেষক-লেখকরা ৫ হাজার শব্দ দিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ১০ হাজারের সীমা যারা অতিক্রম করে তারা অসাধারণ বলা যায়। সেই প্যারামিটারে একটি উপন্যাসে ৩৫ হাজার শব্দ ব্যবহার আমার কাছে ভীতি জাগানিয়া মনে হয়েছে। এজন্য দেখা গেছে ইউলিসিস পড়ার জন্য ৫/৬ বার অ্যাটেমপ্ট নিয়েও মাত্র ১০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আগাইতে পেরেছি।তবে ইচ্ছা আছে একবার হলেও সম্পূর্ণ পড়া শেষ করবো।

ulysses-corrected-text

এরকম যখন গল্প হচ্ছিল তখন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র আব্দুল্লাহিল মুহাইমিন বললো কি আছে ইউলিসিসে সেটা দেখার জন্যে হলেও এটা পড়বো। আমি তাকে স্বাগত জানালাম। আমি পড়তে পারি নাই বলে কি আমার কোন বন্ধু পড়তে পারবে না?

এই যে বইয়ের গল্প করে বিভিন্ন বই নিয়ে আগ্রহ জাগিয়ে তোলা তার জন্যে হলেও আমাদের নিয়মিত আড্ডায় বিভিন্ন বই নিয়ে গল্প করতে হবে।

  • ষষ্ঠত, পড়াশুনাকে আমরা একটি সিরিয়াস বিষয় হিসেবেই মনে করি। এবং আমাদের কাজ হচ্ছে নিজেদেরকে সিরিয়াস পাঠক হিসেবে তৈরি করে এবং সিরিয়াস পাঠক তৈরি করা। সে চর্চার অংশ হিসেবে নিজেদেরকে সবসময় একটা বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখতে চাই যেন আমরা নিয়মিত আমাদের পড়াশুনা চালিয়ে যাই। যে সিরিয়াস রিডার না তার ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে দীর্ঘ সময় ধরে তার বই পড়া হচ্ছে না অথচ-বই পড়া কি দরকার, পড়ে কি হবে-এমন দার্শনিক প্রশ্ন করে। আমরা মনে করি এ প্রশ্ন করার জন্য স্ব-স্ব ডিসিপ্লিনে অথরিটিভ টেক্সটগুলো আগে পড়ে আসতে হবে। এখন এটা কয়টা বই হবে সেটা অন্য আলোচনার বিষয় হতে পারে। আমরা সিরিয়াস রিডার এবং নিয়মিত রিডারদের নিয়ে কাজ করতে চাই এবং নিজেরা হতে চাই। আমরা মনে করি পড়াশুনা শুধু শখের বিষয় নয়, বিনোদনের বিষয় নয়। এটা হচ্ছে নিজেকে জানা, নিজের সময়কে জানা, নিজের জাতির অতীতকে জানা, বর্তমানকে বুঝা এবং ভবিষ্যতকে অনুধাবণ করার একটা পথ। অন্য পথকে আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমাদের কাছে পড়াকে, জানাকে, বুঝাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। এজন্য আমরা সিরিয়াস রিডিং ও রিডারের কথা বলি।

2

সিরিয়াস রিডার চিনবো কিভাবে?

  • যে রিডার সিরিয়াস নয় সে বিভিন্ন কাজে এতই ব্যস্ত থাকে যে পড়ার সময় পায় না। পড়া হচ্ছে তার অবসর সময়ের সঙ্গি, নিত্য সঙ্গি নয়।
  • সর্বশেষ কোন বইটি পড়া সম্পূর্ণ শেষ করেছে এটি বলতে পারবেনা দশ সেকেন্ডের ভেতরে। একমিনিট ভেবে চিন্তে যদি এক বা একাধিক বইয়ের নাম বলে তাহলে মিথ্যা বলবে বা স্ট্যাটাস বাঁচানোর জন্য এক দুটো বা তার অধিক বইয়ের নাম বলবে।
  • সিরিয়াস রিডার নিয়মিত পড়েন। তার কাছে পড়াশুনা আগে তারপর অন্য কিছু। পড়াশুনা তার অবসরের শখ নয় তার জীবনের অংশ, অভ্যাসের অংশ। পড়াশুনা যেন এমন এক বদভ্যাস যেটা সে চেষ্টা করলেও ছাড়তে পারে না।
  • সিরিয়াস রিডার প্রতিদিনই তার পছন্দের বিষয়ে পড়াশুনা করে। তারই সাথে সে মাল্টিডিসিপ্লিনারি পড়াশুনা করে।
  • যে সিরিয়াস রিডার নয় সে তার ডিসিপ্লিন বা বা পেশার বাইরে পড়তে চায়না বা পড়তে আরাম বোধ করেনা। তাদেরকে পড়াশুনার কথা জিজ্ঞেস করলে একগাদা অজুহাত নিয়ে আসে এবং নিজের একাডেমিক ব্যস্ততার কথা পারে।
  • প্রতি মাসে একবার প্রত্যেককে এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিতে হবে যে তারা একমাসে সম্পূর্ণ কোন কোন বইগুলো পড়া শেষ করেছে।
  • কোন বইয়ের রিভিয়্যু লিখেছেন বা ছোট নোট লিখেছেন বা কোন বই পড়ে আপনার মন্তব্য লিখেছেন?
  • একটা ভালো বই মানে হচ্ছে নিজের একটি ভালো ছবির সাথে পরিচিত হওয়া, নিজেকেই আবিস্কার করা। এজন্য ভালো বই বা মনের মত বই পড়ে মনে হয় আরে এটা তো আমিই লিখতে পারতাম!

এখন সিরিয়াস রিডার মাপার আপনার হয়তো আরো প্যারামিটার থাকতে পারে কিন্তু আমাদের পয়েন্টগুলো ফেলনার নয়।

ক্যাম্পাস আড্ডা: ২২ এপ্রিল, ২০১৫

আড্ডাস্থল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির বামপাশ বা হাকিম চত্তর

Related Posts

About The Author

Add Comment