ক্যাম্পাস ডায়রী: আড্ডা চলছে, চলবে-চিন্তার দুয়ার খুলবে

গত কয়েক সপ্তাহ বিভিন্ন ইভেন্ট বাস্তবায়ন, বিভিন্ন ধরণের মানুষের সাথে মেশা এবং আড্ডা মারার কারণে পড়ার সময় অনেক কেটে দিতে হয়েছে এবং এর ছাপ পড়েছে লেখাতে। লেখার পরিমাণ কমে গেছে অনেক। মানে, অনেক পছন্দের বিষয় নিয়ে, প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে লিখতে পারি নাই। এতে অপরাধবোধে আক্রান্ত নই। মানুষের সাথে মিশতে, কথা বলতে, কাজ করতে অনেক আনন্দ পাই, অনেক শেখার মশলা পাই। তাছাড়া, আমি মনে করি একেকজন মানুষ একেকটা খোলা বই। আমার বইয়ের দুনিয়াকে এই মানুষের সাথে মিলিয়েই পাঠ করতে হবে। শুধু টিপিক্যাল বইপোকা হওয়ার সময় নেই। বই হচ্ছে একটা ট্যুলস, মূল্যবান ট্যুলস। একে ইউজ করতে হবে, ইউজ জানতে হবে।

রাইটারস্ ব্লক নামে একটা জিনিস আছে যখন আসলে ইচ্ছে করলেও লেখক কোন কিছু লিখতে পারেন না, আবার আশপাশের অনেক সমস্যার কারণেও লেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমার মাঝে মাঝে লেখার পরিমাণ কমে যায়। এটাকে উপভোগ করি। তখন সাধারণত বেশি করে পড়ার চেষ্টা করি। এর মাধ্যমে ভালো সময় কাটে, মাথায় প্রশ্ন আসে, চিন্তা খেলা করে, লেখার জন্য মন ও হাত তাগাদা দেয় জোরেসোরে।

এজন্য গত কয়েকদিনে ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা বই পড়ার দিকে মনোযোগ দিলাম ভালো করে। সম্প্রতি পড়া ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে আছে ‘মেমোয়র্স অব হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’। মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ইনডিয়া উইনস ফ্রিডম’ এর কিছু অংশ পুনর্পাঠ করলাম। নেলসন ম্যান্ডেলার ‘কনভারসেশন্স উইদ মাইসেল্ফ’ এর কিছু অংশ পড়ছিলাম। আর হুমায়ুন আজাদ এর গৃহীত সাক্ষাতকার গ্রন্থটি পুনরায় পড়ছিলাম।

আমার বইয়ের সংগ্রহ আসলে খুবই লিমিটেড। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছি এবং নিচ্ছি সেটা আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে। যখন কোন বই পড়বো সেটা বাছাই করতে অসুবিধাতে পড়ে যাই তখন সাধারণত বইয়ের তাকের সামনে দিয়ে হাঁটা দেই। হ্যারল্ড লাস্কি নাকি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে এই উপদেশ দিয়েছিলেন ‘গো এন্ড সোক’(Go and soak)। এটা দেখা গেছে খুবই কাজে দেয়। খুবই অপছন্দের বই বা একই বই অনেকদিন ধরে পড়ার চেয়ে বিভিন্ন বই চেখে দেখার লাভ আছে। পরিচিতির দুনিয়াটা বিস্তৃত হয়।

সপ্তাহে প্রতিদিনই পড়া যেত ছাত্রাবস্থায়। এখন সর্বনিম্ন ৩ দিন যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তো, আজকে বিকেলে পড়তে গিয়েছিলাম। অসাধারণ ২ ঘন্টা লাইব্রেরিতে বিনিয়োগ করে বেশ ভালো লেগেছে। অনেকগুলো বই দেখা হলো, লাইব্রেরির একটি বিশেষ জায়গায় ঘন্টা দুয়েক একেবারে নিরিবিলি পড়ে আসতে পারলাম। এখন পযর্ন্ত যদি বলা হয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ১০০ দিন বাছাই করতে বলা হয় তাহলে বলবো এর মধ্যে কমপক্ষে ৫০ টি দিন বাছাই করবো এই ঢা.বি লাইব্রেরিতে কাটানো দিনগুলো। একটি অসাধারণ বই, একটি অসাধারণ আইডিয়া, একজন অসাধারণ মানুষের গল্প, হাজার বছরের মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং তাদের কথা জানা আসলেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা। লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি বা বিশ্বের অন্যান্য সেরা লাইব্রেরিতে পড়ার সুযোগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতাগুলোই সোনালী অভিজ্ঞতা বলে মনের মধ্যে, জীবনের ডায়রীতে লিখে রাখতে হচ্ছে।

তো আজকে সিন্ধু সেঁচে যে দুটো মুক্তা নিলাম হাতে সেগুলো হলো:

  1. An Introduction to the Ancient World by L. De Blois and R.J. Van Der Spek, Routledge, Call Number: 930 BLI
  2. The Order of Things, An Archaeology of the Human Sciences by Michel Foucault

আর যে টেবিলে পড়ছিলাম সেখানে গত সপ্তাহে জওহারলাল নেহরুর ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ রেখে এসেছিলাম। সেটা আবার হাতে নিলাম এবং কয়েকটা চিঠি পড়লাম। নেহরুর গদ্য আমার কাছে সবসময়ই আকর্ষনীয় এবং এই পণ্ডিতের কাছে অনেকদিন থেকেই দীক্ষা নিচ্ছি। বিশ্ব ইতিহাস নিয়ে এক বইয়ের মাধ্যমে যদি কেউ প্রাথমিক পরিচিতি নিতে চায় তাহলে এ বইটা খুব কাজে দিবে বলে মনে করি।

তো লাইব্রেরি শেষে যথারীতি হাকিমের আড্ডায় যোগ দিলাম। প্রান্তর আর তানিম ভাইয়ের জমজমাট তর্ক, বিতর্কে আমি ও মাসুদ ভাই সহ অন্যদের ভালো এনলাইটেনড করেছে বলে মনে করি। নিয়মিত এমন আড্ডা হউক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এ কারণেই কৃতজ্ঞ এরকম লাইব্রেরি, এরকম আড্ডার স্পেইস রাখার জন্য। কারণ ক্লাসগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি শিখেছি এমনতর আড্ডায়।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

ক্যাম্পাস ডায়রী: ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৫

Related Posts

About The Author

Add Comment