ক্লাসিক পড়া সব যুগেই গুরুত্বপূর্ণ: এখন আরও বেশি

আমাদের এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে প্রায় প্রতি ছয় মাসেই নাকি তথ্য দ্বিগুণ হয়ে যায়। আর প্রকাশনা তো এখন খুবই সহজ হয়ে গিয়েছে। একজন ব্যক্তি ইচ্ছে করলে নিজেই নিজের প্রকাশক হয়ে যেতে পারে, পরিবেশক হয়ে যেতে পারে। আমাদের সামনে প্রচুর অপশন। সেক্ষেত্রে আমাদের বাছাই করার ক্ষমতা তৈরি না হলে আমরা স্রোতে হারিয়ে যেতে পারি।

পৃথিবীতে এমন কিছু বই আছে যার ১০ টা পরে ফেলতে পারলে ১০ হাজার বই পড়া হয়ে যায়। এমন কয়েকজন জ্ঞানগুরু আছেন যাদের কাছ থেকে বিস্তৃত জ্ঞানরাজ্যের সাথে খুব সহজেই পরিচয় হয়ে যায়। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এমনতর কেতাবাদিকে ক্লাসিক অভিধায় ডাকা হয়।

হ্যা, ক্লাসিক বইয়ের নাম জানলেই চলবে না। এর মধ্যে কিছু কিছু পড়ে এগিয়ে থাকতে হবে। ক্লাসিক পড়লে নিজের রুচি ডেভলপ করে এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী বই বাছাই করার সক্ষমতা তৈরি হয়।

যেমন মহাকাব্য পড়া জরুরী। কারণ মহাকাব্যে কোন একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ রয়েছে। হাজার বছর ধরে ওই জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে প্রভাব রেখে আসছে। ইউরোপে ইলিয়াদ, ওডেসি, ইনিদ, ডিভাইন কমেদি, মেটামোরফসিস, প্যারাডাইস লস্ট…অনেক প্রভাববিস্তারী ভূমিকা রেখে আসছে। ‘শাহনামা’র মহাকবি ফেরদৌসি তিনটি দেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে রামায়ণ, মহাভারত কয়েক হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব রেখে আসছে। এখনো এই বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও টিভি সিরিয়াল-ফিল্মের রমরমা যুগেও তার প্রভাব থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না বা সম্ভবও নয়..প্রয়োজন ও নেই।

কয়েকবছর আগে ক্যাটরিনা, রণবীর, অর্জুন রামপাল ও অজয় দেবগণের ‘রাজনীতি’ মুভিটা খুব ভালো লেগেছিল। পরে মহাভারত পড়ার পর মনে হলো সেখানকার ‘কর্ণ’ এপিসোডটাই এ মুভিতে তুলে আনা হয়েছে নতুন মোড়কে। আসলে পৃথিবীতে ইউনিক গল্প খুবই কম। শুধু বর্ণনা ও ভাষার পরিবর্তন বা রূপান্তরটাই হচ্ছে।

এবার বলা যাক জ্ঞানগুরু প্রসঙ্গ। প্রাচীন গ্রীক জমানার দুজনের লেখা সবচেয়ে প্রভাববিস্তার করে আসছে গত আড়াই হাজার বছর ধরেই। তাদের আমরা চিনি, নাম জানি…প্লেটো, অ্যারিস্টোটল…তিনারা অনেকগুলো জ্ঞানকাণ্ডের উদগাতা কিন্তু তাদের থেকে বর্তমান জ্ঞানের দুনিয়া অনেক প্রসারিত হয়েছে। অ্যারিস্টোটলের অনেক বিজ্ঞান ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে তাই বলে তাদের গুরুত্ব কমে যায় নি। দর্শন, জ্ঞানের দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থা কেমন ছিল, পৃথিবীকে কেমন করে তখনকার মানুষ দেখতো সেটা জানার জন্য, দেখার জন্য তাদের কাছে যেতে হয়।

এরই সাথে এটাও আমরা যোগ করতে পারি তাদের অনেক চিন্তা-ই এখনো নির্ভুল বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে।

দুজনের মধ্যে কাকে পড়া খুব সহজ? আমার কাছে প্লেটোকে পড়া সহজ মনে হয়। কারণ তিনি আলোচনার ভঙ্গিতে, কাব্যিক ভাষায় চিন্তাগুলোকে তুলে এনেছেন। তার লেখায় বিভিন্ন চরিত্র একে অন্যের সাথে আলোচনা করে, তর্ক করে, বিতর্ক করে আবার সিদ্ধান্তে পৌছায়। আবার আলোচনার কেন্দ্রে একজন মহান শিক্ষক সক্রেটিস থাকায় মনোযোগ আকর্ষণ করে।

অপরদিকে অ্যারিস্টোটল একেবারে গদ্যাকারে লিখেন, আবার বেশিরভাগ লেখাই লেকচার নোট। লাইসিয়ামে সকালবেলা লেকচার দিতেন ছাত্রদের সামনে রেখে, আবার বিকাল বেলায় সাধারণ জনগণকে। অনেক লেকচার নোট অসম্পূর্ণ, বিভিন্ন রেফারেন্স রয়েছে যেগুলো হয়তো তার সামনে উপস্থিত শিষ্যরা বুঝতে পারতো কিন্তু এখন বুঝা সম্ভবপর নয়।

তবে অ্যারিস্টোটলের সাথে বুঝাপড়া কষ্টকর হলেও অসম্ভবপর নয়। তার ‘পোয়েটিক্স’ এর মতো ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লেখা দিয়ে যাত্রা শুরু করা যায়, তারপর আস্তে আস্তে ‘নিকোমেকিয়ান এথিকস্’, ‘পলিটিক্স’ ইত্যাদিতে দাঁত বসানো যায়। আর অ্যারিস্টোটলের সহজ পাঠ বা পরিচিতি নিয়ে অসংখ্য বই রয়েছে। সেগুলোর সহায়তা নেয়া যেতেই পারে। খানিক পরিচিতি লাভের পর না হয় নিজেই গিয়ে আত্মীয়তা বাধানো যায় মহান শিক্ষকদের সাথে। এরকম একটা বই পেলাম গতকাল।

জোনাথন বার্নস এর ‘Aristotle: A Short Introduction’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে সেটা পড়া যাবে। বইটির কল নাম্বার হলো: 185BAA

Related Posts

About The Author

Add Comment