ক্লাসিক পাঠ সমাপনী উৎসব- লেকচার নোট

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্লাসিক  পাঠ সমাপনী উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।  সাবিদিন ইব্রাহিমের প্রাণবন্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে শুরু হয় বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ১০৯তম পাবলিক লেকচার। শুরুতেই তিনি মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও সমস্যা সমাধানে ক্লাসিক বুক সিরিজের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন অনেক বই পড়েও আপনার বা সমাজের জন্য কাজে আসবেনা যদি না তা আপনার চিন্তার জগতকে নাড়া দেয়।  আর ক্লাসিক বুক সিরিজের এমন দশটি বইয়ের প্রয়োজনীয়তা আগেও ছিল, এখনো আছে আবার আগামীতেও থাকবে।

প্রথমেই প্লেটোর সক্রেটিসের জবানবন্দি নিয়ে আলোচনা করেন সাগর বড়ুয়া। জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাড়িয়ে, সত্য মিথ্যার মাঝখানে দাড়িয়ে এথেন্সের আদালতে সক্রেটিস যে জবানবন্দি দেন তা উঠে এসেছে প্লেটোর লেখায় আর ১০৯ তম লেকচারে সাগর বড়ুয়া সক্রেটিসের জবানবন্দির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ উপস্থাপন করেন। শত শত বছর ধরে সক্রেটিস যেভাবে তার অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করে আসছে তেমনি সাগর বড়ুয়ার লেকচার থেকেও আমরা অনুপ্রেরণার মশলা সংগ্রহ করেছি।

কাহলিন জিবরানের দ্য প্রফেট নিয়ে আলোচনা করেন মেহেদী আরিফ। বিংশ শতাব্দীর সেরা লেখা দ্য প্রফেট ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়  মূলত জীবন কি? এবং জীবনকে জানার জন্য বইটি বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দেয় যার শুরু ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় অনেকখানি আশা জাগিয়ে। ভালবাসা যখন হাতছানি দেয় তখন তার পিছনে ছোটা উচিত সেটা  যত কঠিনই হক না কেন। তাছাড়া আরো  বিভিন্ন বিষয়ে বলা হয়েছে তার মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো  #সন্তানদেরকে ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে দেয়া আর  তাদের ভালবাসা দিতে পারার কথা বলা হয়েছে কিন্তু তাদের উপর চিন্তা চাপিয়ে দেওয়া যাবেনা এরপর জিবরান দান সম্পকে কাউকে না জানানো ও যারা সাহায্যের কথা বলতে পারেনা তাদেরকেও সাহায্য দিতে বলেছেন  এছাড়াও তিনি আপরাধ হলে তার প্রতিবাদ করা, মনের কলুষতা দূর করতে ও স্বল্প ভাষী হতে বলেছেন।

রালফ ওয়াল্ডো এমারসন এর সেলফ রিলায়েন্স এর ১০ টি আইডিয়া  নিয়ে আলোচনা  করেন সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ। আমরা অনেক সময় আইডিয়া কে বাস্তবায়ন করতে পারিনা কিন্তু সেসব আইডিয়া নিয়েও অন্যরা ভাল কিছু করতে পারে তাই আইডিয়া বাস্তবায়নটা জরুরী। নিজের  Strength ও Weakness জানলে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে সাথে সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তারপর পাছে লোকে কিছু বলে এটা থাকা যাবেনা আর যারা নতুন কিছু করতে হলে ইতিবাচক চিন্তা করার পাশাপাশি হতাশ হওয়া যাবেনা পাশাপাশি শিক্ষা নিতে হবে  Nature এর কাছ থেকে কারণে ইউনিকদের কোন শিক্ষক থাকেনা।

মাহফুজ আব্দুল্লাহ আলোচনা করেন নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স নিয়ে যেখানে লেখক রাজপুত্র লরেনজো কে তার জ্ঞান উপহার হিসেবে পাঠান । বইটি মুলত রাষ্ট্র দর্শন নিয়ে লেখা  যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান কেমন হবে এসব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন নতুন কোন রাষ্ট্র জয় করলে সেখানে গিয়ে রাজাকে বসবাস করতে বলা হয়েছে এবং সেখানকার জনগণকে খুশি রাখতে হবে সেইসাথে হয় কাউকে আদর করতে হবে না হয় সর্বনাশা আঘাত হেনে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে তা না হলে সে প্রতিশোধ নেবার জন্য বদ্ধ পরিকর হয়ে উঠবে। কোন কোন গুণ থাকলে একজন শাসক সফল হবেন আবার কোন কোন গুণের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তাকে ব্যর্থ করে দেবে তার কথা পাবো ম্যাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্সে।

প্লেটোর দ্য রিপাবলিক নিয়ে আলোচনা করেন সবিদিন ইব্রাহিম যেখানে রিপাবলিকের প্রধান চরিত্র প্লেটো তার গুরু সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড হয় মেজরিটির রায়ে  তাই তিনি গনতন্ত্রকে নিচুদের শাসন বলেছেন।  তিনি আইডিয়াল স্টেট এর ধারণা দেন যেখানে শুধু ফিলোসোফার কিং রা থাকবে এবং কবিদের বিরোধিতা করেছেন কারণ তারা তারা রাষ্ট্রের জন্য খারাপ হতে পারে।

ইয়স্তন গার্ডারের সোফির জগৎ নিয়ে আলোচনা করেন সানজিদা বারী। আমরা কে কিংবা কোথা থেকে এসেছি এসব বিষয়ের উত্তর খুঁজতে ও নিজের দর্শন জানতে একই সাথে দার্শনিকদের মত চিন্তা করতে হলে এই বইটি আপনাকে অনেক বিষয়ের চিন্তার জগৎ প্রসারিত করতে পারে এসব ব্যাপারেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সান জুর দ্য আর্ট অব ওয়ার নিয়ে আলোচনা করেন সাইদুর রহমান শ্রাবণ। সান জু বলেছেন যে তার নীতি পুরোপুরি অনুসরণ সে অবশ্যই যুদ্ধে বিজয়ী হবে। সানজু নিজেকে জানা একই সাথে শত্রুকে জানার কথাও বলেছেন এবং শত্রুকে পরিকল্পনা না জানানো পাশাপাশি তার দূর্বল জায়গায় আঘাত করার কথা বলেছেন  এক্ষেত্রে পানির নীতি অনুসরণ করার যেতে পারে ,পানি যেমন উচু জায়গায় বাধার সম্মুখীন হয়ে থেমে গিয়ে আরও অধিক শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যায়। এছাড়াও যুদ্ধের ক্ষেত্রে Battle Field ঠিক করা ও লিডারশীপ এর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এছাড়াও চানক্য নীতিশাস্ত্র নিয়ে কথা বলেন মাহফুজা মাহদি। চাণক্যের নীতি কীভাবে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে তা উঠে েএসেছে মাহফুজা মাহদির আলোচনায়। এছাড়া চাণক্য নীতি যে এখনো খুবই কার্যকর তার ইশারা আমরা পাই লেকচারে।

পুরো লেকচারের উপর সাইমুম রেজা পিয়াস মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে , চানক্য বন্ধু গঠন করার ক্ষেত্রে প্রতিবেশি কে বাছাই না করার কথা বলেছেন কারণ তার সাথে সবসময় কোন না কোন বিষয় নিয়ে ঝামেলা থাকবেই কিন্তু তিনি প্রতিবেশির বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব করার কথা বলেছেন যেমন এখন বাংলাদেশ মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে  পারে। কূটনীতিতে চিরন্তন বন্ধু রাষ্ট্র বা শত্রু রাষ্ট্র বলে কোন প্রপঞ্চ আসলে নেই। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বার্থের সম্পর্ক, পারস্পরিক লেনাদেনার সম্পর্ক।

১০৯ তম লেকচারের সমাপনী বক্তব্য দেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শিমুল চন্দ্র সরকার। সবশেষে গত অক্টোবর মাসের সেরা তিন লেখককে বিডিএসএফ এর পক্ষ থেকে সম্মানীত করা হয়। বিডিএসএফ ওয়েবে প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে সেরা তিনটি লেখার লেখক এই সম্মানে ভূষিত হন। তারা ছিলেন সানজিদা বারী, সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ ও আহমেদ দীন রুমি।

সব মিলিয়ে একটি অসাধারণ সেশনের ভাগিদার হতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। আশা করি ভবিষ্যতে এরকম চিন্তায় উসকানি দেওয়া, স্বপ্ন জাগানিয়া অসংখ্য সেশন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ১০৯ তম লেকচারে অংশগ্রহণকারী সকলকে আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা!

 

লিখেছেন :

সাব্বির আহমেদ

শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment