ক্ষীরু নদীর গল্প (২য় পর্ব)

রাকিবের স্বপ্নের কাহিনী শুনে উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল তিনজনই। এদিকে রাত গভীর হয়ে গেছে, সেদিকে কারও খেয়াল নেই। ঝোঁপের একদম কাছে একটা শিয়াল বিকট শব্দে ডেকে ওঠল, নকিব লাফ দিয়ে ওঠলো! ওদের মধ্যে নকিব সবচেয়ে ভীতু। ওর পীড়াপিড়িতে আলোচনা ঐদিনের জন্য শেষ হলো। তিনজনই উঠে যার যার বাড়িতে ফিরে গেল।

পরদিন ভোরেই রাকিবের ঘুম ভাঙলো, সে চলে গেল ক্ষীরু নদীর কাছে। শীতের সকালে খুব কুয়াশা পড়ছে। নদীর উপরিভাগ ধোঁয়ার মত কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছে। নদীর তীরবর্তী দুর্বাঘাস, সবজিগুলো, গাছগাছালিতে শিশির জমেছে। নিঃস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে চারপাশটা।

এমন মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে রাকিবের খুব ভাল লাগছিলো। পরক্ষণেই আগেরদিনের ঘটনাগুলো মনে পড়ল তার। ক্ষীরু নদীর শেষ কথাটা তার মাথা থেকে সরছেই না। “আচ্ছা, কেমন হয়, যদি আমরা ক্ষীরু নদীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি?”- আনমনে ভাবে রাকিব। কিন্তু, কিইবা করা যায়? নাহ্! রাকিবের মাথায় কিছু আসে না। বুকের বামপাশে চিনচিন ব্যথা অনুভব করে সে।

বাড়িতে ফিরে গিয়ে হালকা নাশতা খেয়ে সে সাকিবের কাছে গেল। সাকিবও গতরাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি। ক্ষীরু নদী রক্ষায় কিছু একটা করতেই হবে, এমনটা ভেবেছে সেও। পথে নকিবকে পেয়ে গেল ওরা। তারপর তিনজনের জরুরি বৈঠক শুরু হলো।

নকিব অবশ্য একটা বুদ্ধি ঠিক করেই রেখেছিলো গতরাতে। আজকের বৈঠকে সে তাই উৎসাহ নিয়ে বললো – “চল, আমরা সবাই মিলে নাজমুল ভাইয়ের কাছে যাই, ওনি নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবেন!”

সাকিব ও রাকিব দুজনই সমস্বরে বলে ওঠলো, হুররে! নাজমুল ভাইকে ওরা ভাল করেই চিনে। হ্যাংলা-পাতলা শরীরের অধিকারী চমৎকার চরিত্রের একজন লোক। কি একটা প্রেমঘটিত কারণে ওনি আজকাল খুব একা একা থাকেন। হাসিখুশি নাজমুল ভাই আজ লোকচক্ষুর আড়ালে গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে তার বেশী একটা ঝোঁক নেই। তবে, ওদেরকে খুব আদর করেন নাজমুল ভাই।

মিনিট পাঁচেকের পথ হেঁটে তারা তিনজনই নাজমুল ভাইয়ের বাড়িতে গেলেন। দশটা বেজে গিয়েছে, ওনার ঘুম ভাঙেনি। নাজমুল ভাইয়ের ঘরে তাদের ভিসাহীন প্রবেশাধিকার রয়েছে। নকিব গিয়েই মোটামুটি মাইকের আওয়াজে তাঁকে ডাকতে লাগলো। এমন জোর চিৎকারে মৃত মানুষ জ্যান্ত হয়ে যাবে, ফলে নাজমুল ভাইয়ের ঘুম ভাঙতে দেরি হলো না।

ওদেরকে দেখে আশ্চর্য হলেন না তিনি, কারণ এটা ওদের নিয়মিত কাজ! হাতমুখ ধুয়ে ওনি তাদেরকে নিয়ে নিজের ঘরে বসলেন। নাজমুল ভাইয়ের মা গরম গরম ভাঁপা পিঠা দিয়ে গেলেন। সাকিব আনন্দে একটা আস্ত পিঠা মুখে পুরে নিল আর গরমে লাফিয়ে ওঠলো! এই দেখে বাকিরা হাসতে লাগলো।

রাকিব ঠান্ডা মাথায় নাজমুল ভাইকে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করলো। তিনি সব কথা শুনে বললেন, “তোদের প্রস্তাবনা খুব ভাল। আসলেই ক্ষীরু নদীর জন্য আমাদের কিছু করা দরকার। কিন্তু, আমি তো এসব ব্যপারে অনভিজ্ঞ। তবে, তোরা কিছু করলে অবশ্যই আমার শতভাগ সমর্থন এবং সাধ্যমত সহযোগিতা পাবি, ইনশাআল্লাহ!”

এ কথা শুনে রাকিব ও সাকিব খুব খুশি হলো। নকিব বলল, “নাজমুল ভাই, আমাদের কাজ শুরু করার আগে একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। আর, অভিজ্ঞ কারোর নেতৃত্ব প্রয়োজন।” নাজমুল ভাই জবাব দিলেন, “ঠিক আছে, তোরা আজ যা। আমি একটু ভেবে দেখি কি করা যায়।”

পরদিন আবার আসবে বলে তিনজনই খুশি মনে বিদায় নিল।…..চলবে…

 

-লেখক:

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

Related Posts

About The Author

Add Comment