খোয়াবনামা এবং আনন্দমঠ – তুল্যমূল্য পাঠ

খোয়াবনামা পড়া শেষ হল। এত বৃহৎ পটভূমিতে সৃষ্ট এ আখ্যানের ব্যাপারে হুট করে একটা- দু’টো কথা বলা মুশকিল। তবে যেহেতু বইটা পড়ে শেষ করলাম মাত্রই, বইটি থেকে আমার কিছু understandings share করাটা এই মুহূর্তে প্রয়োজন বোধ করছি।
.
খোয়াবনামা উপন্যাসের যে দিকটির ব্যাপারে আমাকে আমার পড়ুয়া কমরেডরা আগে থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তা হল – আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই বইটি ১৯৪৭ এবং তার পূর্ব পরের ইতিহাস – তথা সিপাহি বিপ্লব – ফকির-সন্ন্যাসীদের লড়াই ইত্যাদির “বঙ্গদেশীয়” ন্যারেটিভ। “বঙ্গদেশীয়” – এই sense এ যে, ফকির বিদ্রোহের একটা বর্ণনা আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসে পাই। আবার দেশভাগের ইস্যুতে এপিক উপন্যাস পূর্ব-পশ্চিম লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। বঙ্কিম এবং সুনীল – দু’জনেই পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক। ফলে তাদের সাহিত্যকর্মের একটা রাজনৈতিক অবস্থান আগে থেকেই নির্দিষ্ট থাকে। যখন একটা বিষয় সম্পর্কে আপনাকে একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার মত অবস্থানে আসতে হয়, আপনার দুপক্ষেরই বয়ান শুনতে হবে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা আপনাকে বাংলাদেশি বাঙ্গালীদের, ‘৪৭ এর আগে যাদের মূল পরিচয় ছিল ন্যাড়া ও ম্লেছের জাত – তাদের বক্তব্যটি শোনার ব্যাবস্থা করে দেয়।
.
সরাসরি উপন্যাসে যদি যাই, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বঙ্কিমের আনন্দমঠের বয়ানের প্রতিবাদ করেন খোয়াবনামার ৩৭ নং চ্যাপ্টারে। এক জমিদারের কাছারিঘরে আলাপরত নায়েববাবু ও তার এক হিন্দু প্রজার সংলাপ পড়ে দেখা যাক। নায়েব বাবু বলছেন –
.
“-‘কিন্তু সন্ন্যাসীরা তো ছিল মুসলমানের শত্রু, সে খবর রাখো?’
-‘না বাবু।’
– ‘তুমি বেশী জানো?’ সতীশ মুক্তার কেষ্ট পাল (প্রজা) কে ধমক দেয়, ‘ সন্ন্যাসীরা ম্লেছদের ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিয়েছিল, তা জানো? আনন্দমঠ পড়েছো?’
-‘না বাবু। বলে কেষ্ট পাল তার আনন্দমঠ না পড়ার তথ্য এবং সতীশ মুক্তারের কোথায় অবিশ্বাস প্রকাশ করে এক সঙ্গে, ‘ হামাগরে ভবানী সন্ন্যাসীর সেনাপতি আছিলো এক পাঠান… ফকির মজনু শাহ আছিল ফকির রাজা, আর সন্ন্যাসির দলের রাজা আছিল ভবানী সন্ন্যাসী।’
-‘কোথাকার রাজা হে? নাটক নভেল না পড়লে কি হয়, ইতিহাস বেশ মেলা পড়েছ।”
.
অর্থাৎ আনন্দমঠে যেখানে স্বাধীনতাকামী সন্ন্যাসীরা মুসলিমদের অপছন্দ করতো এবং সুযোগ পেলেই খড়গহস্ত হত বলে যে বক্তব্য বঙ্কিমচন্দ্র রেখেছেন , ওটাকে “নাটক- নভেল” – তথা মনগড়া কাহিনী উল্লেখ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ফকির- সন্ন্যাসী, নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলিমরা একত্রেই জোট বেঁধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে।
.
একই অধ্যায়ে নায়েববাবু আর টাউনের আরেক উচ্চবর্ণের সনাতন ধর্মাবলম্বী অনিল স্যান্যালের কথোপকথনের একটা অংশ উদ্ধৃত করি। নায়েব বাবু বলছেন –
.
“রিলিজিয়ন যে খুব বড় ফ্যাক্টর তা নয়। কিন্তু দে বিলং টু এ ডিফারেন্ট কালচারাল লেভেল। উই ক্যানট লিভ টুগেদার। ইম্পসিবল।”
.
লেখক-পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, উপন্যাসের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। একদিকে সদ্য ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া সমাজের নিচু তোলার মুসলিমরা “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” – এর নাড়া তুলছে, আর সমাজের উঁচু জাতের ক্ষমতাশীল, শিক্ষিত সনাতন ধর্মাবলম্বী নায়েব বলছেন – ধর্মীয় নয় বরং সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারনে হিন্দু- মুসলিম এক সাথে বসবাস সম্ভব নয়।
.
এই জায়গাটি নিয়ে একটা বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা আমার আছে। নিদেন পক্ষে একটা উপন্যাস এ নিয়ে লেখাই যায় যে সংস্কৃতিগত পার্থক্য অবিভক্ত ভারতের হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিদ্যমান থাকার কারণে শত শত বছরের একত্রে এক ঠাই এ থাকার পাঠ চুকল আমাদের, সেটা ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে আসলে কতটুকু বিদ্যমান, ভারতে এবং বাংলাদেশে।
download

Related Posts

About The Author

Add Comment