খোয়াবনামা: জেগে থাকা ও ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্ন

ঘুমের মধ্যে দেখা বেশিরভাগ স্বপ্নই ভুলে যাই। ঘুম থেকে উঠার পর অনেক স্বপ্নই মনে থাকে না। এর মধ্যে কিছু কিছু স্বপ্ন আবার থেকে যায়। তবে সজাগ থাকা অবস্থায় যেসব স্বপ্ন দেখি তা সহজে ভুলি না! সজাগ স্বপ্ন অনেক শক্তিশালী। আমি সেসব স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক করতে পারি না। আমার কাছে বেশিরভাগ সময়ই মনে হয় আমি আমার স্বপ্নের জগতে বসবাস করছি বা যেসব সজাগ স্বপ্ন দেখি তার মধ্যেই আছি!

সজাগ জগতের অনেক স্বপ্ন ও তার চরিত্র ঘুমের স্বপ্নেও চলে আসে। খুব মজার তথ্য হচ্ছে আমার লেখা অল্প কিছু পদ্যের যেগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয় তার বেশ কয়েকটা স্বপ্নজাত। কয়েকটা কবিতার দৃশ্যকল্প, ছন্দ স্বপ্নে তৈরি! একবার ঘুমের মধ্যে একটা সেরা কবিতা লিখেছিলাম। ঘুমের মধ্যেই আনন্দ পাচ্ছিলাম! ঘুম থেকে উঠেই সেই লাইনগুলো মনে করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটা লাইনও মনে আসছিলো না। আমার কাব্যচর্চার বড় একটা ট্রাজেডিতে জায়গা করে নিয়েছে সে ঘটনাটা।

বাছাই করা স্বপ্নের মধ্যে একটা হচ্ছে বনলতা সেন ও জীবনানন্দ দাশকে দেখা। সে স্বপ্নকে ইংরেজি শব্দবাণে আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম বছর চারেক আগে! এখানে লিংকটা রইলো: (https://www.poemhunter.com/poem/bonolota-sen/) সর্বশেষ, কয়েকদিন আগে রোমান দার্শনিক সেনেকার সাথে দেখা। সেনেকা আমার ঘরে চলে আসলো এবং আমাকে বেশ শাসিয়ে দিয়ে গেল। তবে সেই ভালোবাসামাখা সেই শাসানোগুলো অনেক ভালো লাগছিলো। চাচ্ছিলাম তিনি আরও কিছুক্ষণ থাকুন। কিন্তু তিনি চলে গেলেন!

আমি আমার ঘুমানো অবস্থার স্বপ্ন এবং জাগ্রত অবস্থার স্বপ্ন দুটোকেই সমান ভালোবাসি। কারণ দু জায়গাতে আমিই থাকি। আমার স্বপ্নগুলো আমারই সন্তান। তাদের তৈরিতে আমারই অবদান!

স্বপ্ন নিয়ে ২০১২ সালের ৩০ নভেম্বর একটি ইংরেজি লেখা লিখেছিলাম। স্বপ্ন ব্যাখ্যা করে। এর লিংকটি এখানে: (https://www.facebook.com/notes/sabidin-ibrahim/the-dream-that-i-saw-on-30-november-2012-explanation-with-the-help-of-freud-and-/527800210581428)।

আজকে কয়েকটি স্বপ্ন নিয়েই কথা বলি:

গত দশদিনে আমার দুটি প্রিয় ছোটভাই বেশ আবেগময় স্বপ্ন দেখেছে। তাদের স্বপ্ন বলছে তারা সত্যিই আমাকে কত ভালোবাসে, আমার প্রতি তাদের কি প্রত্যাশা। তাদের খোয়াবনামা আমাকে স্বপ্ন নিয়ে লিখতে উসকানি দিচ্ছে গত চার-পাঁচ দিন ধরেই। না লিখলে শান্তি পাওয়া যাবে না।

গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশে সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র মাসুম বিল্লাহর সাথে দেখা। আমাদের সরাসরি দেখা হচ্ছে না কয়েকমাস হলো। দেখার সাথে সাথেই বলে ‘ভাই, আজকে আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি, আপনি আমেরিকার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছেন বা লেকচার দিতে গেছেন। সকালবেলা আপনাকে ফোন দিয়ে জানাতে চাইছিলাম কিন্তু আপনি কি মনে করেন! এজন্য বলি নাই!’

আমি আশ্বস্থ করে বললাম কাউকে স্বপ্নে দেখা মানে হচ্ছে তাকে ভালোবাসা, তার জন্য বিশেষ জায়গা করে রাখা। ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেওয়া দরকার। আমিও কাউকে স্বপ্নে দেখলে তাকে জানিয়ে দেই। আর মাসুম আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছে সেটা তো অনেক সুন্দর স্বপ্ন! তার স্বপ্নের সাথে যোগ করে দিয়ে জানালাম ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক প্যাড়ায় আর যাওয়ার আগ্রহ নেই, ডিগ্রীর প্রতি আমার মোহ অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। তবে জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা দিন দিন বাড়ছে, শক্তিশালী হচ্ছে। সে তৃষ্ণা প্রয়োজনের তাগিদে বিশ্বের বিভিন্ন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘুরে আসার স্বপ্ন আছে, লাইব্রেরিগুলোতে পড়ার আগ্রহ আছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞানসাধকদের সাথে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা আছে। এর জন্য দেশের বাইরে অদূর ভবিষ্যতে যাওয়ার আগ্রহ আছে। তবে সেখানে থেকে যাওয়ার কোন বাসনা নাই। বাংলাদেশে কাজ করার এত সুযোগ, স্বপ্ন বাস্তবায়নের এত দরজা উন্মুক্ত হয়েছে সেগুলো পরিভ্রমণ করা শেষ হতেই তো এক জীবন চলে যেতে পারে!

মাসুম বিল্লাহ তোমাকে আমি সত্যিই ভালোবাসি! আমাদের চার বছরের পরিচয় ও সম্পর্ক কাজের সম্পর্কের মাধ্যমে দৃঢ় হবে শীঘ্রই এই স্বপ্ন দেখি।

তিনদিন আগে রাত দশটার দিকে ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরছি। ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রহুল আমিনের ফোন। আমার গ্রামের ছোট ভাই এবং ছোটবেলার ক্রিকেট-ফুটবল সঙ্গী রুহুল আমিনকে আমি ভালোবাসি। কারণ সে জেলার সেরা সাতারু, সেরা দৌড়বিদ। সে সামনে থাকলে প্রতিযোগিতা করার মুড চলে আসে। ২০১৪ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্টে আমাদের দশজনের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। যথারীতি রুহুল আমিন অনেক বড় ব্যবধানে প্রথম হয়। অন্যরা মাঝপথে ইস্তফা দেওয়ায়, ভালো প্রতিদ্বন্ধীর অভাবে বেশ দূরত্ব রেখে দ্বিতীয় হয়েছিলাম আমি। তখনই আমাদের মধ্যে একটা স্বপ্ন গেঁথে যায়! আমরা প্রতিবছর একবার করে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে মিনি ম্যারাথনের আয়োজন করবো। দীর্ঘ দুই বছরের প্রতীক্ষা শেষে এবার এই স্বপ্নটা পূরণ করেই ছাড়বো।

ঠান্ডা মাথায় এই সেরা স্পোর্টসম্যান গ্রামে আমাদের সবগুলো ভালো উদ্যোগে সেরা পরিশ্রমটা দেয়। এজন্য তার প্রতি আমার ভালোবাসা স্পষ্ট।

তো রুহুল আমিন গত তিনদিন আগে কোন জরুরী কাজ, এলাকার প্রবলেম, নিজের কোন সমস্যা নিয়ে ফোন দেয়নি। বলে উঠে ‘ভাই, আমি আপনাকে আমি স্বপ্নে দেখেছি!’ ঠান্ডা মাথার কুলবয় হিসেবে পরিচিত রুহুল আমিনের এটাকে পাগলামি বলতে পারছিনা। বয়সে বড় হলেও আমি নিয়মিত এদের সামনে পাগলামি করে বেড়ালেও রুহুল আমিন সবসময় নিজের বয়সের চেয়ে ম্যাচিওরিটির পরিচয় দেয়। আমি অবাক হয়ে বললাম-‘স্বপ্নে কি দেখলা? বলো তো শুনি?’

সে বললো সে নাকি স্বপ্নে দেখেছে আমি কোন এক সুন্দরী মেয়ের সাথে কোন রেস্টুরেন্টে বসে আছি। সে নাকি আমার সাথে সেখানে দেখা করে এবং আমি সেই মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমাকে ও স্বপ্নের সেই মেয়েকে নাকি সে চিতই পিঠা খাওয়ায়।

আমি বললাম, ‘বেশ সুন্দর স্বপ্ন দেখেছো। কিন্তু মেয়েটাকে কেমন দেখলে? মেয়েটার নাম কি?’ কিন্তু আর বলতে পারে নাই। তবে সে কোন একজনকে দেখেছে কিন্তু নাম জানে না!’

আমারও আগ্রহ ছিল কোন মেয়েটাকে সে দেখলো! কিন্তু আমার মতো সেও যে অন্ধকারে!

এবার অন্য একটি গল্প বলি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আবুল কাশেম ফজলুল হক এর সরাসরি সম্পর্ক অর্ধযুগ ছাড়িয়ে গেছে! সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে কয়েকটি অসাধারণ দুপুর কেটেছে স্যারের সাথে। আমার বিভাগের অপর একজন শিক্ষকের মতো তিনিও একগাদা বই দেখিয়ে বলতেন এগুলো পড়তে হবে। তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার কখনো আমাদের জন্য রিক্ত হতে দেখিনি। গত ২০১৫ এর ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আয়োজিত কনফারেন্সে স্যার ছিলেন আমাদের প্রধান অতিথি! সেখানে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা রেখেছিলাম। স্টাডি ফোরাম নিয়ে স্বপ্নের কথা বলেছিলাম সেখানে।

এর দুই-তিন মাস পরে স্টাডি ফোরামের কয়েকজন বন্ধু গিয়েছিল স্যারের পরিবাগের বাসাতে। আমার অনেক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যাওয়া হয়নি। তখন বইমেলার প্রস্তুতি চলছিল। এজন্য যাওয়া হয়নি। স্টাডি ফোরামের সেসব বন্ধুদের কাছে আমার খোঁজ নিতে গিয়ে নাকি বলেছিল-‘ওই স্বপ্ন দেখা ফর্সা ছেলেটা কই?’

আমার নামটা মনে রাখা অনেকের জন্যই কঠিন। স্যারের মতো ব্যস্ত মানুষের পক্ষে এটা মনে রাখা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। কিন্তু আমাকে ‘স্বপ্ন দেখা ফর্সা ছেলে’ হিসেবে যে মনে রেখেছেন সেটাকে অনেক বড় কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিতে পারি।

(মাস চারেক আগে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে স্যারের সাথে দেখা। পাশাপাশি বসে প্রায় ঘন্টাখানেকের অসাধারণ সময় কাটিয়ে ফেললাম। আমার হাতে তখন আমার ‘ইংরেজি  সাহিত্যের ইতিহাস’ বইটি। ফাকেই বেশ খানিকটা পড়ে ফেললেন এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন। এছাড়া সেনেকার অনুবাদটা শেষ করে দেখানোর কথা বললেন। আর থমাস কার্লাইলের ‘হিরো এন্ড হিরো অরশিপ’ অনুবাদ করা যায় কিনা পরামর্শ দিলেন। আর যথারীতি পরিবাগের বাসায় নিয়মিত যাওয়ার জন্য বললেন।)

আমার স্বপ্নই আমার এসেন্স। আমার স্বপ্নই আমার কাজ, আমার নাম। স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি, স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসি। কারণ স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে।

Related Posts

About The Author

Add Comment