গুরু সক্রেতিসের স্মরণ!

সক্রেতিস কিছু লিখেন নাই এটাই জেনেছি। এখন জানলাম জীবনের শেষ দিকে কিছু কবিতা লিখেছিলেন। তবে এর কোনটারই আর অস্তিত্ব নেই। সক্রেটিসের ভালো ছবি ফুটে উঠে প্লাতো এবং জেনোফোন এর লেখাপত্রে। সমসাময়িক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস সক্রেতিসকে নিয়ে অনেক উপহাস করতেন এবং তার নাটকে সেটা উপস্থাপনও করেছেন।

সক্রেতিসের বাবা ভাস্কর আর মা ধাত্রী। সক্রেতিস পরবর্তী জীবনে মা-বাবার পেশাকে ধরে রেখেছেন বলে মনে করতেন। ধাত্রী যেমন কোন মানবশিশুকে পৃথিবীতে আসতে, জন্ম নিতে সহায়তা করতেন সক্রেতিসও তেমনি একজন জ্ঞানপিপাসুর জন্মের ক্ষেত্রে ধাত্রীর মতো ভূমিকা পালন করতেন। আবার একজন ভাস্কর যেমন কঠিন পাথরকে কেটেকুটে সুন্দর মূর্তির রূপ দেন তেমনি দার্শনিক ও মানবতার শিক্ষক সক্রেতিস ও একজন মানবশিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে নিপুণ ভাস্করের ভূমিকা পালন করেছেন। বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে তার পরিচয়। এখন সক্রেতিস কেমন শিক্ষক ছিলেন তার প্রমাণ প্লাতো, অ্যারিস্তোতলদের মতো ওস্তাদদের পরম্পরা তৈরি করার মধ্যেই রয়েছে। তার প্রিয় এবং যোগ্যতম শিষ্য প্লাতোকে নিয়ে বলা হয়-‘পুরো পাশ্চাত্য দর্শন প্লাতোর ফুটনোট মাত্র’। প্লাতোর প্রত্যেকটি লেখাতে প্রধান চরিত্র হিসেবে থেকেছেন সক্রেতিস। মনে হচ্ছে যেন সক্রেতিস কথা বলছেন আর প্লাতো নোট লিখছেন। ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। বয়স ত্রিশের দিকে গুরু সক্রেতিসের করুণ বিয়োগের ঘটনাটি এমনভাবেই তাড়িত করেছিল তরুণ প্লাতোকে যে সে তার পুরো জ্ঞানচর্চাকেই সক্রেতিসের পদতলে বিছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারটা অনেক পরিষ্কার প্লাতো প্রথমদিকে হয়তো সক্রেতিসের দর্শনই সক্রেতিসের মুখ দিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার সেরা লেখাগুলোতে বা শেষদিকের লেখাগুলোতে নিজের দর্শন সক্রেতিসের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন। সক্রেতিসের প্রতি তার একাত্ম আনুগত্য ও ভালোবাসার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহের লেষমাত্র নেই।

সক্রেতিসের জমানায় সফিস্ট নামে একদল পণ্ডিত ছিলেন যারা আধুনিক জমানার শিক্ষকদের পূর্বসুরী। যারা টাকা-পয়সার বিনিময়ে বিভিন্ন জিনিস শিখিয়ে যেতো যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লজিক, পলিটিক্স, রেটরিক, ম্যাথমেটিকস্ ইত্যাদি। রেটরিক বা তর্কশাস্ত্র শেখানোর ক্ষেত্রে তাদের ফর্মূলা ছিল ভালো যুক্তি-কুযুক্তি বলে কোন কথা নেই জিততে পারলেই হলো। এজন্য এখন যেকোন উপায়ে তর্কে জেতার চেষ্টাকে ইংরেজিতে সফিস্ট্রি (Sophistry) বলে। প্রোতাগোরাস, জর্জিয়াস, এন্টিফোনের মতো বিশিষ্ট দার্শনিকগণ সফিস্টদের দলভুক্ত ছিলেন। আবার বেশিরভাগ সফিস্ট অর্থের বিনিময়ে কিছু জিনিসপত্র শিখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েই আত্মতৃপ্ত ছিলেন যাদের লক্ষ্য ছিল ভালো মানুষ, মহৎ মানুষ তৈরি করা নয় কেবল ‘কামিয়াব মানুষ’, পেশাতে সফল ব্যক্তি তৈরি করা। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের বর্তমানের অবস্থানের জন্য কোন না কোনভাবে ওই ট্রাডিশনের কাছে ঋণী!

সক্রেতিসের বড় কৃতিত্ব ছিল তিনি সফিস্টদের মতো জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে টাকা পয়সা নিতেন না। প্লাতোর ‘ক্রিতো’ (Crito) লেখাতে আমরা দেখবো হেমলক পান করে যখন বিষের বেদনায় মুখ ঢেকে রাখছিলেন তখন মুখ খুলে কাছের প্রিয় এক শিষ্যকে যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো ‘কেউ একজন একটা মুরগী পাওনা আছে তাকে সেটা যেন ফেরত দেওয়া হয়’। ভালো সংসারী ছিলেন এ বিষয়ে সক্রেতিসের খ্যাতি নাই তারপরও কোন একসময় হয়তো পরিবারের প্রয়োজনে কারো কাছ থেকে একটি মুরগী দাড় করেছিলেন। মৃত্যুযন্ত্রণার কঠিন মুহূর্তেও সেটার কথা ভুলেননি! এ গল্পটার মাধ্যমে সক্রেতিসের সাথে সফিস্টদের পার্থক্য বেশ স্পষ্ট হয়ে যায়।

সক্রেতিস পূর্ব দার্শনিকগণ নিয়ে একটি কথা বলা হয় সেটা হলো তারা দূর মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রক্রিয়া নিয়ে মাথা ঘামাতো। আর গ্রিসে সক্রেতিসই প্রথম যিনি দর্শনকে আসমান থেকে মাটিতে নামান। অর্থাৎ দর্শনের কেন্দ্রে স্থান প্রায় মানুষ। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ছিল মানুষকে নিয়ে দর্শনের কায়কারবার।

সক্রেতিসকে খুব কাছ থেকে বুজতে হলে তার জবানবন্দি পড়তে পারেন। এর একাধিক বাংলা তর্জমা আছে। ইংরেজিতেও অনেকগুলো সংস্করণ আছে। যেকোন একটা পড়ে ফেলতে পারেন।   

 

Source:

Plato: The Apology of Socrates
H. N. Fowler Translation, Loeb (1913) Edited with introduction and notes by E. E. Garvin (2013)

Related Posts

About The Author

Add Comment