গোপাল চন্দ্র সরদারের “সমাজদর্পণ”: একজন শিকড়সন্ধানী সমাজবিজ্ঞানীর ক্যানভাস

গোপাল চন্দ্র সরদার একজন শিকড়সন্ধানী চিন্তাশীল সমাজবিজ্ঞানী, আদর্শবান ব্যক্তিত্ব, সেরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী প্রেমী, পরার্থপরতার এক মূর্ত প্রতীক, বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ণকারী একজন পাঠক, চালচলনে, কথাবার্তায় এক সাদামাটা বন্ধু সূলভ প্রতিমূর্তি। গোপাল ভাঁড়ের মত sense of humor তাঁর কথাবার্তা, বক্তৃতা কিংবা ক্লাস রুমে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার মধ্যে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তিনি এ যুগের গোপাল ভাঁড়। খুব সাদামাটাভাবে বিশাল এক ঘটনাকে তিনি অল্প কথায় বিস্তার ঘটান। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে পাঁচমিশালি মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে তিনি রচনা করেছেন “সমাজদর্পণ” বইটি। সমাজের মানুষের সাথে তাঁর মিশে যাওয়ার ক্ষমতা অপূর্ব রকমের সুষমা সৃষ্টি করেছে তাঁর ব্যক্তিত্বে। একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে খুটে খুটে বের করেছেন সমাজের ত্রুটি, অধঃপতন, স্খলন, বিড়ম্বনা, অবক্ষয়, বৈষম্য, উপলব্ধি করেছেন সংস্কৃতি,সামাজিক কর্মকান্ড, প্রথা, আচার,শিক্ষা,সংগ্রাম আর রূপায়ণ ঘটিয়েছেন ব্যক্তিসত্তার।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ২৩টি প্রবন্ধের এক নীড় হল তাঁর “সমাজদর্পণ” বইটি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেশের মানুষেরা এখনও উন্নয়নের মূল শিকড়কে স্পর্শ করতে পারেনি যা লেখককে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে। একজন শিকড় সন্ধানী লেখকের বেশে তিনি সমাজের কোলে ডুব দিয়ে দেখেছেন সমাজর বাস্তব রূপ।সমাজে উঠতে, বসতে, চলতে, ফিরতে আমরা এক শ্রেণির গম্ভীর চরিত্রের মানুষের দেখা পাই। এই শ্রেণির মানুষকে অন্যরা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মূল্য দেয়। লেখকের মতে,”একজন মানুষ সমাজে তার সার্বিক কর্মকান্ডে যে অবস্থান দখল করে মূলত ওটাই তার ব্যক্তিত্ব”। কথা কম বলা ভাবগাম্ভীর্যে টইটম্বুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে ব্যক্তিত্ববান বলতে তিনি নারাজ।বিএ,এম এ পাশ করে গাঁয়ের কোন ব্যক্তি মাঠে কাজ করলে সমাজের নাক লম্বা মানুষগুলো তাদেরকে ব্যক্তিত্বহীন বলে তাদের কপালে সীলমোহর মেরে দেয়। আসলে কোন কাজ যে ছোট নয় এটা আমরা মানুষ হিসেবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি যার ফলশ্রুতিতে উন্নতির শিকড়েই আমরা অবস্থান করেছি, শিখরে ওঠা আমাদের জন্য স্বপ্নের মত। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা ভালভাবে না জেনে তাদের চরিত্রের সার্টিফিকেট প্রদান করি যা সমাজে শুধু কোন্দলই সৃষ্টি করে, সমাধান দিতে পারে না। সমাজে নারী নির্যাতনে সমাজের নারীরাও কম দায়ী নয় লেখক এমনটিই মনে করেন। আর পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের একক আধিপত্যকে তিনি নিন্দা জানিয়েছেন, ধিক্বার জানিয়েছেন নারীদের প্রতি পুরুষের গোড়ামী মনোভাবকে।

সমাজে ন্যায়পরায়ণ লোকের ঘাটতি উপলব্ধি করে লেখক আক্ষেপের সুরে বলেছেন,” বর্তমান সমাজে ন্যায়ের কথা বলার লোকের অভাব নেই, অভাব আছে ন্যায়পরায়ণ লোকের”। সক্রেটিস কিংবা নজরুলের সাহসী মনোভাবকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন। নেতা-নেত্রীদের মৌসুমী প্রতিশ্রুতি ও তা রক্ষায় গড়িমসি যে সমাজের জন্য খুব নেতিবাচক তা তিনি উপলব্ধি করেছেন।সমাজবিজ্ঞানের জনক অগাস্ট কোঁতকে তিনি মানবতাবাদী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অগাস্ট কোঁত ছিলেন গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পূজারী, যিনি সমাজের উন্নয়নের জন্য সমাজের সকল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির উপর ফোকাস করেছেন। লেখক গোপাল চন্দ্র সরদার মনে করেন যে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ছাড়া সমাজ প্রগতি অসম্ভব। তিনি বলেন” মুক্তভাবে যখন মানুষ চিন্তা করতে ব্যর্থ হয় অথবা কোন একটি আদর্শকে সর্বাপেক্ষা বেশি মূল্যায়ন করে তখন তাকে মৌলবাদী বলা যেতে পারে। এজন্য আমরা কমিউনিস্টদেরকেও মৌলবাদী বলতে পারি। মৌলবাদী বলতে পারি ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক দলগুলোকে”। আমরা যে সমাজে বসবাস করি সে সমাজকে তিনি প্রতিবন্ধী সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সন্ত্রাস, ঘুষ, ভেজাল,দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রভৃতি ঘাতকরূপী অক্টোপাসের নিগড় থেকে মুক্ত না হতে পেরে সমাজ আজ রীতিমতো ব্যাধিগ্রস্ত। কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বের শিক্ষার সাথে সাথে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় সমাজের মানুষকে খাঁটি মানুষে পরিণত করতে পারে বলে লেখক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। এর মধ্য দিয়ে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য্য মানুষের মন থেকে বিতাড়িত করা সহজ হবে।লেখক বিশ্বাস করেন যে মনে প্রাণে যারা প্রগতিশীল তাদের কোন ধর্ম কিংবা জাত নেই, মানব ধর্মই তাদের কাছে আসল। সুখ ও সমৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক হিসেবে তিনি সুন্দর পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেছেন। গণতন্ত্রের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশে। যদিও কিছুদিন আগেকার চলমান সামরিক শাসনের কচকচানি দেশের পঙ্গু অবস্থার জন্য দায়ী। লেখক বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে। আবার দেশের ঘরোয়া সমস্যা সমাধানে বিদেশী হস্তক্ষেপকে দারুণভাবে নিন্দা করেছেন তিনি। বাংলাদেশে রাজনীতি কিংবা সন্ত্রাস উত্তরাধিকার সূত্রে হাতে হাত ধরে চলছে। তাই এই বিষবৃক্ষের ফসল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

সমাজের ক্ষত সৃষ্টিতে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে মাদকাসক্তি। বিড়ি সিগারেটের রমরমা উপস্থিতি আমাদেরকে জানান দেয় জাতি হিসেবে আমাদের দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার ফরমান। সংযমকে সুখ ও সমৃদ্ধির পরশপাথর হিসেবে তিনি বিবেচনা করেছেন। একই ধরনের মন মানসিকতার লোক ছাড়া আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব কোনটিই সম্ভব নয়। মন মানসিকতার অসম বিন্যাস অশান্তির খনি। ব্যক্তিমালিকানার একক আধিপত্য পৃথিবীতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার পিছনে সবচেয়ে বড় কাঁটা তারের বেড়া। মানস জগতের ভিত্তি মূল নির্মাণ করে সমাজ। আর এই সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষ আদর্শে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও যদি আন্তরিকতায় অভিন্ন হয়। লেখক মনে করেন,” গণতন্ত্র নবজাতক শিশুর মত। তাকে লালন পালনে ত্রুটি ঘটালে সে লক্ষ্যচ্যুত হয়”।

Related Posts

About The Author

Add Comment