গ্রামদরদি কাঙাল হরিনাথ

গত ১৮ এপ্রিল ছিল কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের মৃত্যুবার্ষিকী। উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে যে জাগরণ ঘটে, বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে, তার অন্যতম প্রধানপুরুষ ছিলেন কাঙাল হরিনাথ(১৮৩৩-৯৬)। কুষ্টিয়াকে আজ যে আমরা সাংস্কৃতিক রাজধানী বলি তার পেছনে বাংলার এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের বিশেষ অবদান রয়েছে। এই আধুনিকতম যুগে এসেও যেখানে কুষ্টিয়াতে ভালো মানের ছাপাখানা নেই, পত্রিকা নেই, সেখানে ১৮৬৩ সালের এই এপ্রিল মাসেই কুমারখালি থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা যাত্রা শুরু হয় তার হাত ধরে। পত্রিকাটি কালক্রমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এখানে সাংবাদিক হিসেবে কিছুকাল কাজ করেন উপন্যাসিক-নাট্যকার মীর মশাররফ হোসেন। এই পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হতো। পাশাপাশি কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কেচ্ছা-কাহিনীও প্রকাশিত হতো। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও দেশী জমিদারদের অব্যাহত হুমকিও কাঙাল হরিনাথকে এ-কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়ার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন।

13062078_10209879130521941_7665983151839477817_n

বড় বিষয় হল, ১৮৭৩ সালে কুমারখালির নিজ গ্রামেই গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটির নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। এটা কিন্তু চারটে খানিক কথা না।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিরিখে প্রায়-অশিক্ষিত এই প্রাজ্ঞজন বন্ধুদের সাহায্যে ১৮৫৫ সালে নিজ গাঁয়ে একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বেশ কিছুদিন ঐ বিদ্যালয়ে বিনাবেতনে পড়ান। পরবর্তীকালে তিনি ১৮৫৬ সালে কুমারখালিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তার এই বহুমুখী কাজের কারণে কুষ্টিয়ার বাউল গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী ‘কাঙাল হরিনাথ বাউলগানের অনুষঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে কাঙাল হরিনাথকে ‘সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, নারীকল্যাণকামী, দেশহিতৈষী, রায়ত-কৃষকপ্রেমী, সাধক ও ধর্মবেত্তা এবং নব্য-সাহিত্যসেবীদের উদার পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

12998705_10209879130801948_4098684611992907671_n
হরিনাথ বাউলগানের একটি ভিন্ন ‘ঘরানা’ সৃষ্টি করেছিলেন। লালন-আবিষ্কারে হরিনাথের ভূমিকা পথিকৃতের মতো। তার অনেক গদ্য-পদ্য রচনা থাকলেও খ্যাতির ভিত্তিভূমি হল বাউলগান, যেটি ভীষণভাবে লালনপ্রভাবিত। হরিনাথের মোট গ্রন্থ ১৮টি।

হরিনাথের দুটি গান:

১.
নদী বল্ রে বল্ আমায় বল্ রে।
কে তোরে ঢালিয়া দিল এমন শীতল জল রে \
পাষাণে জন্ম নিলে, ধরলে নাম হিমশিলে,
কার প্রেমে গ’লে আবার হইলে তরল রে।
(ওরে) যে নামেতে তুমি গ’ল, সেই নাম একবার আমায় বল,
দেখি গ’লে কিনা আমার কঠিন হৃদিস্থল রে \
কার ভাবে ধীরে ধীরে, গান কর গভীর স্বরে,
প্রাণমন হরে কিবা শব্দ কল কল রে;
নদীরে তোর ভাবাবেশে, যখন রে বক্ষঃস্থল ভেসে
তখনই বর্ষা এসে ভাসায় ধরাতল রে \

২.
যারা সব জাতের ছেলে, জাত নিয়ে যাক যমের হাতে।
বুঝেছি জাতের ধর্ম, কর্মভোগ কেবল জেতে \
অজাতে জন্ম হোল
মা বাপের নাই জাতকুল
কুলধ্বজ কুলাচার মতে \

কৃতজ্ঞতায়: আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত ‘কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মারকগ্রন্থ’

অন্যপ্রসঙ্গ:
কুষ্টিয়া, এই একটা শহর বটে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে এখানে ছিলেন কাঙাল হরিনাথ-লালন-রবীন্দ্রনাথ-মীর মশাররফ হোসেন। কাজী মোতাহার হোসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কর্মসূত্রে প্রখ্যাত এবং আমার প্রিয় গল্পকার জগদীশ গুপ্ত কুষ্টিয়া জেলার আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ‘আমি কোথায় পাব তারে ,আমার মনের মানুষ যেরে’ গানের লেখক গগণ হরকরা কুমারখালির শিলাইদহের গোবরখালী কসবা গ্রামে তার জন্ম নেন।

ইতিহাসবিদ,আইনজীবি ও সাহিত্যিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মিরপুর থানার শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আলোচিত দু’টি গ্রন্থ হচ্ছে সিরাজদ্দৌলা ও মীর কাশিম। যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘা যতীন কুমারখালি উপজেলার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাঙ্গালী মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম সনেট ও গদ্য ছন্দে কবিতা লিখে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার পৈতৃকনিবাস কুমারখালি উপজেলার নিয়ামতবাড়ীয়া। একুশে পদক পাওয়া কবি গীতিকার আজিজুর রহমান কুষ্টিয়া থানার হাটশহরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ২০০০।

এছাড়া গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত-র জন্ম কুষ্টিয়ার আমলাবাড়িতে। প্রখ্যাত লোকগবেষক ড. আনোয়ারুল করিম ও ড. আবুল আহসান চৌধুরীর কুষ্টিয়ার মানুষ।

মূলকথায় আসি:
আমার জন্ম পাশের শহরে মেহেরপুরে। ইস! অল্পের জন্য হল না! এখানে জন্ম নিলে নিশ্চয় বিশেষ কিছু হওয়া সহজ হত, গুরুদের স্পর্শ তো আর মিথ্যে হতে পারে না! তবে আশার বিষয় হল, আমার ছেলে গল্পের জন্ম হয়েছে এই শহরে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম….

Mojaffor Hossain

Editor of Shashwatiki

Related Posts

About The Author

Add Comment