গ্রামবাসীর ডায়রী

পূর্বমুখী বারান্দার সামনে বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো পেরিয়ে দিগন্তজোড়া অন্ধকার। সেই অন্ধকারে ডুবে যাওয়া বাঁশঝাড় থেকে অসংখ্য ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ভেসে আসছে। বারান্দার সামনেই লেজকাটা কুকুরটা আয়েশী ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে।

দশম রমযানের চাঁদ মাথার উপরে। অগোছালো মেঘের কারণে তার রূপালী আলো পৃথিবীকে আলোকিত করছে না। বাড়ির পাশের গোরস্তানে এই বাড়ির শত শত বছরের ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে। এই বংশেরই কত নাম জানা, না জানা সদস্য পৃথিবীর সব হিসেব মিটিয়ে কবরের অন্ধকারে চলে গেছেন!

এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে আমি স্মৃতিকাতরতায় ডুবে আছি। শত বছর পেছনে ফিরে গিয়ে সেই সময়ে এই বাড়ির পরিবেশ, এই গ্রামের অবস্থা কল্পনায় আঁকতে চেষ্টা করছি। ঠিকমতো হচ্ছে না, কেমন যেন হিজিবিজি!

আচ্ছা, গ্রামের প্রায় মাঝখান দিয়ে যে পাকা সড়কটা চলে গেছে, শত বছর আগে সেটা কেমন ছিল? গ্রামের উত্তর সীমানার ক্ষীরু নদীর স্রোতগুলো নিশ্চয়ই প্রবল ছিল সতেরো/আঠারো শতকের গোড়ার দিকে? শাজাহান যখন যমুনার তীরে তাজমহল তৈরী করছিলেন, তখন কি তাজমহলের নুড়ি এই জলে মিশেছিল?

অথবা নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন, তখন এই গ্রামের মানুষগুলো কি করছিলেন? তাঁরা কি খবর পেয়েছিলেন? আরাকান রাজসভায় আলাওল যখন পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা করছিলেন, তখন ক্ষীরু নদীর তীরে এই গ্রামের কোন চাষা কি তাঁর বউকে নিয়ে হাজার বছর বাঁচার স্বপ্ন দেখছিল?

আচ্ছা, হাজার বছর আগের এমনই এক আধো-জ্যোৎস্না রাতে এই গ্রামের কোন যুবতী কি গুনগুনিয়ে গান গেয়েছিল? কেন যেন এমন মনে হচ্ছে! ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সাথে যেন সেই সুর হাজার বছর ধরে বেজে চলেছে ….!

এই পরিবেশ আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমি অন্ধকারের সাথে যেন এই বাড়ির, এই গ্রামের হাজার বছরের ইতিহাসের সাথে মিশিয়ে ফেলেছি নিজেকে! আমার মনে হচ্ছে এই অন্ধকার আমার হাজার বছরের পরিচিত। এই ঝিঁঝিঁ পোকাদের গান যেন আমি যুগ যুগ ধরে শুনে আসছি। এই গ্রামের সহস্র বছরের ইতিহাস যেন আমাতে এসে মিলেছে ………

আমি ভালবাসি এই পরিবেশ। ভালবাসি এই গ্রাম। ভালবাসি জঙ্গলবাড়ী। ভালবাসি ক্ষীরু নদী।

bad-boys

                  

লেখক: Mahedi Kawser Farazi

 

Related Posts

About The Author

Add Comment