গ্রীক মিথ: নার্সিসাস ও ইকোর গল্প

আমরা প্রতিনিয়ত আয়নাতে নিজেদের দেখি কিন্তু একটা সময় ছিল যখন মানুষ আয়নাতে মুখ দেখতে পেতো না। কারণ আয়নাই তো ছিল না। আয়নাতে নিজেকে না দেখে জীবন কাটানোর কথা ভাবুন তো! জানি ভাবতে পারছেন না!

কে প্রথম আয়নাতে নিজের মুখ দেখতে পেয়েছিল? এ নিয়ে রয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। আছে অনেক মিথও। মিথগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় মিথ হচ্ছে নার্সিসাসের মিথ। ধারণা করা হয়, নার্সিসাস-ই প্রথম জলে তার প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়েছিল। জলে নার্সিসাস তার প্রতিবিম্ব দেখে এতোই মুগ্ধ হয়ে পড়ে যে, সে নিজেই তার প্রতিবিম্বের প্রেমে পড়ে যায়। এই নার্সিসাসের নাম থেকেই ইংরেজি শব্দ “Narcissism” এর উদ্ভব যার অর্থ “আত্মমুগ্ধতা”। যে সারাক্ষণ নিজেতেই নিজে বিভোর বা মগ্ন থাকে। নার্সিসাসের বাবা নদীর দেবতা ‘সেফিসাস’ (Cephissus) আর মা জলপরী ‘লিরিপো’ (Liripoe)। নার্সিসাস শিকারি ছিল। একদিন ক্লান্ত হয়ে নদীর ধারে সে থামে জল খাওয়ার জন্য। তখনই সে জলে তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়।

এরকম আত্মমগ্ন মানুষের প্রেমে কি কেউ পড়তে চায়! যে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারে না! দুর্ভাগ্যবশত কেউ একজন তার প্রেমে পড়ে যায়। আর সে হচ্ছে পরী Echo (ইকো বা প্রতিধ্বনি)। আমরা জানি প্রতিধ্বনি হচ্ছে আমাদের কথাই, যা আমাদের কাছে ধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।

ইকো কিন্তু প্রথমে ছিল না, মানে প্রতিধ্বনি ছিল না। সে নিজেই তার নিজের কথা বলতে পারতো। তার কণ্ঠ ছিল চমৎকার। ভালোবাসার দেবি আফ্রোদিতি তার চমৎকার কণ্ঠের জন্য প্রশংসা করতো। ইকো তাহলে কিভাবে ইকো হলো!? আসলে ইকোকে শাস্তি দিয়েছিল জিউস পত্নী হেরা, তার (ইকোর) কঠিন হঠকারিতার জন্য।

দেবতা জিউস মাঝে মাঝে অলিম্পাস এর প্রাসাদে যখন অনেক দিন থাকার পর বিরক্ত হয়ে যেতো, তখন সে পৃথিবীতে নেমে আসতো সুন্দরী জলপরীদের সাথে সময় কাটানোর জন্য। সেই সময় ইকো হেরার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখতো যাতে জিউস জলকেলি করে নিরাপদে প্রাসাদে ফিরে যেতে পারে আর হেরা তা কিছুই টের না পায়। সেইজন্য ইকো অহেতুক কথা বলতো। যাতে হেরার নজর জিউস এর উপর না পড়ে। তবে হেরা একসময় পরী ইকোর ছলনা বুঝে যায়। বুঝতে পেরে রেগে তাকে কঠিন অভিশাপ দেয়। অভিশাপ হচ্ছে ইকো আর নিজ থেকে কিছু বলতে পারবে না। সে যা করবে তা হচ্ছে অন্যদের কথার ধ্বনির প্রতিধ্বনি।

এভাবেই তার দিন চলে যাচ্ছিল। মনের দুঃখে বনে ঘুরে বেড়াতো ইকো। একসময় হঠাৎ একদিন তার সাথে দেখা হয়ে যায় নার্সিসাসের! দেখামাত্র ইকো নার্সিসাসের প্রেমে পড়ে যায়। ঐদিকে নার্সিসাস নিজেতেই মগ্ন। ইকোর দিকে ফিরেও তাকায় না।

ইকো বলতে চায় মনের কথা কিন্তু বলতে পারে না। কিভাবে বলবে? হেরার অভিশাপে আগেই সে প্রতিধ্বনি হয়ে গেছে। নিজের কথা হারিয়ে ফেলেছে। এরকম করে দিন যায়, দিন গড়িয়ে মাস আসে, বছর যায়; আত্মমগ্ন নার্সিসাস জল থেকে মুখ তুলে না আর ইকোও তার নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারে না। ইকো বন বাদাড়ে তার দুঃখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

এভাবেই চলে যায় অনেক দিন। আর আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস আত্মমগ্ন অবস্থাতেই একদিন তার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মারা যায়। সে মারা যাবার পর ফুল হয়ে যায়। সেই ফুল যা নদীর তীরে ফুটে, এই ফুল জলে তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। নার্সিসাস-ই সেই ফুল, যে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পারে। মরবার পরেও সে নিজেই তার প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। নদীর ধারে এই ফুল আজো দেখতে পাওয়া যায় এবং এই নার্সিসাস ফুলই বর্তমানে ডেফিডোল ফুল হিসেবে পরিচিত।

আরও প্রতিধ্বনি তো আজো আছে, আমাদের ধ্বনিকে আমাদের দিকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে।

Related Posts

About The Author

Add Comment