‘ঘুঘুদের গ্রাম’ অর্জুনাকে নিয়ে কিছু কথা

ভয়ানক নির্জন একটা ঘরে খুব সুন্দরভাবে একা হয়ে গেলাম। এরকম একটা একাকীত্ম ও নির্জনতাকে অনেক দিন ধরে মিস করতেছিলাম। যে গ্রামের আলো-বাতাস এতদিন ভোগ করলাম, যে গ্রামের মানুষদের অন্ননাশ করেছি সে গ্রামকে নিয়ে, গ্রামের মানুষদেরকে নিয়ে লেখা দরকার।

আমি এখন যে নির্জন কক্ষটিতে আছি সেটা একেবারে জমির মাঝখানে। পূর্বপাশে বিস্তৃত তিরাল্লা বিল (এখন অবশ্য শুকনো মৌসুম চলছে। পূর্ব-উত্তর পাশে, কলেজ থেকে মাত্র এক-দেড়শো ফুট দূরেই গ্রামের গোরস্তানটি যেটি বারবার থমাস গ্রের ‘এলিজি রিটেন ইন কান্ট্রি চার্চইয়ার্ড’ এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এর কয়েকটা লাইন সবসময় মুখে চলে আসে-

“Full many a gem of purest ray serene

The dark unfathomed caves of ocean bear

Full many a flower is born to blush unseen

And losts its sweetness on the desert air.”

আমি যে কক্ষটিতে আছি সেটা দুটো কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে; অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার ও গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের সদরদপ্তর হিসেবে এবং গ্রামের একমাত্র কলেজ হাজী ইসমাইল খাঁ কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের অফিসঘর হিসেবে।

কলেজের টিনের চালে একটা ঘুঘুকে বসতে থাকতে দেখেছি বিকালবেলা। এর দিকে প্রায় মিনিটখানেক তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি বিনিময় করেছি।আমার তাকিয়ে থাকাতে সেটা বিরক্ত হয়নি তার প্রমাণ ছিল সে ওখান থেকে সড়ে যায়নি। আর একটা নাদুস-নুদোস বেঁজি কিছুক্ষণ পরপর কলেজের আঙ্গিনায় বেড়িয়ে যায়। কলেজের আঙ্গিনাতে বিশটির মতো তুলসি গাছ আছে। আমি নিয়মিত বিরতিতে তুলসি পাতা খেয়ে যাচ্ছি।প্রতিদিন দীর্ঘ সময় হাঁটার পর তুলসি পাতা আমাকে বেশ ফুরফুরে করে রাখছে। তুলসি ছাড়াও প্রায় ৬০-৭০ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। সেগুলো খুব দ্রুতই বড় হচ্ছে। গাছের চারা, বিভিন্ন প্রাণীর বাচ্চার বড় হতে দেখা পৃথিবীর সেরা সৌন্দর্যগুলোর একটি!

অর্জুনা গ্রামটি আমার সবচেয়ে পছন্দের গ্রামের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এর মধ্যেই। গত দেড় বছরে প্রায় তিনবার এসেছি। সামনে থেকে সেটা আরও বাড়বে ও দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে মনে করছি! এ গ্রামটি কেন ভালো লাগে তার কয়েকটি কারণ হচ্ছে:

১. গ্রামটি আসলেই দেখতে অনেক সুন্দর, আদিকালের গল্পের গ্রামের মতো। মাত্র তিনমিনিট পশ্চিমে হাঁটলেই চলে আসা যায় যমুনা নদীতে। এত ঘুঘু পাখি একসাথে আমি আর কোথাও দেখিনি। অর্জুনাকে আমার অভিধানে ‘ঘুঘুদের গ্রাম’ নাম দিয়ে রেখেছি। প্র্রতিবেলা ঘর থেকে বের হলেই এক জোড়া বা কয়েক জোড়া ঘুঘু দেখেছি। ঘুঘু আমার প্রিয় একটি পাখি, তার ডাকটা বিভিন্ন কারণে আমার ভালো লাগে। তার ডাকটাকে বাংলাদেশের গ্রামগুলোর আবহমানতার প্রতীক হিসেবে মনে হয়। কোকিলের গান যেমন প্রেমের এবং মধুময় তেমনি ঘুঘুদের ডাক আমার কাছে বিষাদের মনে হয়। পি.বি. শ্যালীর ‘ওড টু স্কাইলার্ক’ কবিতার বিখ্যাত লাইনটি মনে আসছে-

‘মধুর গান সেগুলোই যা আমাদের বিষাদের বিত্তান্ত গায়’ (Our sweetest songs are those tell our saddest thoughts)   

ঘুঘুদের সাথে সাথে কোকিলের আধিক্যও রয়েছে। কোকিলের প্রজননকাল চলাতে কোকিল কয়েকটি বিশেষ ধরণে গান গাচ্ছে সেই গান কান পেতে শুনতে বেশ ভালোই লাগে।

দোয়েল, শালিক ও দেখা যাবে বেশ। আরেকটা পাখির ডাক বেশ ভালো লাগবে সেটা হলো হরটিটি। অনেক সুন্দর সে পাখিটা। দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি গায়ও চমৎকার। এই অর্জুনা গ্রামটির একটি বর্ধিত অংশ হচ্ছে চর অর্জুনা। যমুনার এই গজিয়ে উঠা চরটিতে গত পড়শু প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা কাটিয়েছি তাও আবার বিকাল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত। যারা তারা দেখতে ভুলে গেছেন তাদের জন্য খুবই বিস্ময় নিয়ে আসবে এমন চরগুলো। পরিষ্কার আকাশে তারাদেরকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে মনে হবে। আর সাত্তার ভাইয়ের মতো লোক যদি পাশে থাকে তাহলে কথাই নেই; পথের পাশে অজ্ঞাতে জন্মানো সুন্দর ভাঁটফুল থেকে শুরু করে তারকালোকের সপ্তর্ষীমণ্ডলের সাথেও পরিচিত করিয়ে দেবেন।

চর অর্জুনাতে যদি বিশ-ত্রিশ মিনিট নিরব বসে থাক যায়, আশেপাশের শব্দগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া যায় তাহলে এক অলৌকিক ও আধিভৌতিক অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। আমি যতবারই এসেছি সেটা নিতে ভুল করিনি।

গ্রামটি নিয়ে বিস্তৃত লেখার প্রয়োজন আছে, সেটা আস্তে আস্তে লেখা শুরু করবো।

দ্বিতীয়ত যে কারণে এ গ্রামটি আমার তীর্থস্থানের মতো সেটা হলো এ গ্রাম থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছে ‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’। গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের আওতায় আজ রয়েছে ত্রিশ-চল্লিশটির মতো পাঠাগার। এ সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। এর আগে আমাদের পরিচিত সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শহর থেকে শুরু হতে দেখেছি। এখন সময় এসেছে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পরিবর্তনের ডাক আসার। গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন একটি প্রয়োজনীয়, সময়োপযোগী ও সফল আহ্বান। এর সফলতার আরেকটি দিক হচ্ছে এটি স্বপ্নের একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। অর্জুনার হাজী ইসমাইল খাঁ কলেজে এবছর থেকে ভর্তি শুরু হয়েছে। প্রথম বছর নয়জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে যেটাকে আমি অনেক বড় সংখ্যাই মনে করি। আগামী বছর থেকে এ কলেজটিতে ৫০ বা ১০০ জন ভর্তি হবেন বলে জানা গেছে। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দিয়ে এ কলেজটির স্বপ্নের ব্যাপকতা অনুধাবন করা যাবে না। এটা আগামী এক দশকের মধ্যেই দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় কলেজে পরিণত হবে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন যেমন একটি সফল আহ্বান তেমনি সে আন্দোলনের সন্তান এ কলেজটি একটি ব্যতিক্রমী ও সার্থক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার স্বতন্ত্র অবস্থান জানান দেবে।

কলেজের জন্য জায়গা-জমিন দিয়ে এগিয়ে এসেছেন গ্রামবাসী। কলেজের দুটি টিনের ঘর বানাতে সাহায্য পাঠিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের শুভাকাঙ্খীরা। একটি কম্পিউটার ল্যাব ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার চলে এসেছে যেখানে কলেজের শিক্ষার্থী এবং গ্রামের তরুণরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আছে কয়েকটি সেলাই মেশিন যার মাধ্যমে গ্রামের নারীরা সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

এমন একটি স্বপ্নের হাটে আমার দেওয়ার মতো অর্থ সম্পদ নেই। আমি যেটা দিতে সক্ষম সেটা হলো কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কিছু সময়। গত কয়েকদিন ধরে কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এক ঘন্টা করে ইংরেজি নামক জটিল ও কঠিন বিষয়টি পড়িয়ে আসছি আর তাদের মনে স্বপ্নের বীজ বপন করার চেষ্টা করছি। জানিনা কতটুকু সফল হবো।

এ লেখাটা শেষ পর্যন্ত যারা পড়বেন তাদের কাছে অনুরোধ তারাও যেন কোন না কোনভাবে এ স্বপ্নের কলেজটি গড়তে নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে এগিয়ে আসেন। কোন কিছু সফল হওয়ার মাঝখানে অনেকেই যুক্ত হতে পারেন কিন্তু কোন একটা বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রথমদিকে যারা ক্ষুদ্র প্রয়াসের হাত বাড়িয়ে দেন তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন? হ্যা! প্রশ্নটা আপনাকেই করেছি!

 

 

লেখার স্থান: অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার, অর্জুনা, টাঙ্গাইল

(মুসাফিরের ডায়রী, মার্চ ৯, ২০১৬

লেখার সময়: রাত ৯ টা থেকে ১০.২০)

Related Posts

About The Author

Add Comment