চাণক্যনীতি পাঠ-পরিচয়

চাণক্যের অনেক কথায় পাঠক অবাক হবেন, বেশ বড়সড়ো ধাক্কা খাবেন। প্রথম ধাক্কাটি হবে তিনি এত আগে মানুষের চরিত্র নিয়ে কত অগ্রসর স্টাডি করেছিলেন। আবার কিছু কিছু জায়গায় তিনি খুবই নির্মম বা ঘৃণ্য কথা বলেছেন। চাণক্যকে পড়ার ক্ষেত্রে অন্ধ হওয়া যাবে না। তার গ্রহণযোগ্য মতগুলো নিয়ে ভাবনার জায়গা রয়েছে আবার বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য মতকে নির্মম হাতে বাতিল করতে হবে।

নারী প্রসঙ্গে চাণক্যের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই নিম্নতর। যদিও ব্যক্তিজীবনে মাকে অনেক সম্মান করতেন এবং তার গড়ে উঠার পেছনে মায়ের অবদান বেশ বলে জানা যায় তারপরও নারীদের নিয়ে তিনি সমকালের সাধারণ সিদ্ধান্ত থেকে বেশিদূর আগাতে পারেননি। মৌমাছি যেমন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে নেয় তেমনি চাণক্যের কাছ থেকে আমরা শুধু মধুগুলোই নেই, গরলগুলো না হয় বাদ গেলো।

চাণক্যে যতসব মধু আছে সেগুলো জীবন সাজাতে অনেক উপকারে লাগবে যেমনটা উপকারে এসেছে গত দুই হাজার বছরে।

‘বোকা শিষ্যদের জ্ঞান বিলিয়ে পণ্ডিত লোকও দুঃখে পতিত হতে পারে, যেমনটা মূর্খরা রমণীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলে, কমবখত লোকের পাশে বেশিদিন থাকলে।’

উপরের কথাটির অর্থ হতে পারে বোকা শিষ্যরা গুরুর জ্ঞান ঠিকমতো নিতে পারে না, যতটুকু নেয় সেটা ভুল করে উপস্থাপন করতে পারে। এ কারণে বোকা শিষ্য গুরুর জন্য হতাশা নিয়ে আসতে পারে। আর ঘরে শান্তি নষ্ট করার জন্য এক মূর্খরা রমণীই যথেষ্ঠ। আর কমবখত লোকের আশেপাশে বেশি সময় অবস্থান করলে তার প্রভাব পড়বে সাধু লোকের উপরও। কারণ মানুষ তার পরিবেশ ও আশেপাশের লোকদের দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়। এজন্য শিষ্য, স্ত্রী বা সঙ্গী বাছাইয়ে খুব সতর্ক হওয়ারই পরামর্শ চাণক্যের।

চাণক্যের আরেকটি নির্দেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তিনি বলেন: ‘ওই দেশে অবস্থান করো না যেখানে তোমার সম্মান নেই, তোমার জীবিকা অর্জনের সুযোগ নেই, তোমার বন্ধু নেই বা তুমি জ্ঞান অর্জন করতে পারো না।’

Do not inhabit a country where you are not respected, cannot earn your livelihood, have no friends, or cannot acquire knowledge.

চাণক্যের এ কথাটি লক্ষণীয়: Test a servant while in the discharge of his duty, a relative in difficulty, a friend in adversity, and a wife in misfortune.

চাণক্যনীতি ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনেক প্রভাবশালী টেক্সট। সহজ ভাষায় অনেক শক্তিশালী কথা বলে দেওয়ার জন্য দুই হাজারেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে টেনেছে চাণক্যের বাণী। এখানে যেমন একটি সুন্দর কথা বলেছেন চাণক্য:

‘Do not put your trust in rivers, men who carry weapons, beasts with claws or horns, women, and members of a royal family. ’

নদীর উপর বিশ্বাস নেই আর বিশ্বাস নেই যে ব্যক্তি অস্ত্র বহন করছে, যে পশুর থাবা ও সিং রয়েছে, নারী এবং রাজ পরিবারের কোন সদস্য।

আপনজন, বন্ধু ও স্ত্রীকে চেনার উপযুক্ত সময় হচ্ছে দুঃসময়!

একজন যোগ্য পণ্ডিতের দিনগুলো কেমন হবে তার কথা বলতে গিয়ে কি সুন্দর কথাটিই না বলেছেন চাণক্য। তিনি বলছেন একটি দিনও যেন শেখা বহির্ভূত না হয়। প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখো, অন্তত একটি বর্ণ হলেও!

Let not a single day pass without your learning a verse, half a verse, or a fourth of it, or even one letter of it; nor without attending to charity, study and other pious activity.

চাণক্যের প্রখর দৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যাবে এ কথাটিতে: Trees on a river bank, a woman in another man’s house, and kings without counsellors go without doubt to swift destruction.

মানে, নদীর তীরে বৃক্ষ, পর পুরুষের ঘরে নারী এবং ভালো উপদেষ্টাবিহীন রাজার দ্রুত পতন অনিবার্য।

আরেকটি প্যারাডক্সিকাল কথা পাবো এখানে: পরিবারকে বাঁচাতে প্রয়োজনে কোন সদস্যকে পরিত্যাগ করো, গ্রামকে বাঁচাতে হলে কোন পরিবারকে, আবার দেশকে বাঁচাতে হলে কোন গ্রামকে। আর নিজেকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজনে দেশ।

Give up a member to save a family, a family to save a village, a village to save a country, and the country to save yourself.

এক জায়গায় চাণক্যকে আমরা বলতে শুনবো জ্ঞানী লোকের সম্মান সর্বদেশে আবার মিষ্টভাষীর কোন শত্রু নেই। জ্ঞান নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন চাণক্য সেটা হলো চর্চার মাধ্যমেই জ্ঞান বিকশিত ও প্রস্ফূটিত হয়।

চাণক্য বলেন: ‘চর্চায় না রাখলে জ্ঞান হারিয়ে যায়; অজ্ঞতায় থাকলে মানুষ হারিয়ে যায়, সেনাপতি না থাকলে সেনাদল হারিয়ে যায় এবং স্বামী না থাকলে হারিয়ে যায় নারী।’

Knowledge is lost without putting it into practice; a man is lost due to ignorance; an army is lost without a commander; and a woman is lost without a husband.

ধন-সম্পদ, আহারাদি, বস্ত্র-শস্ত্র ইত্যাদির বেলায় অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও জ্ঞানের বেলাতে অল্পতে তুষ্ট হতে নিষেধ রয়েছে চাণক্যের।

জ্ঞানহীন মানুষের জীবন খুবই জঘন্য বলে মনে করেন চাণক্য। তিনি বলেন: ‘একজন জ্ঞানহীন মানুষের জীবন কুকুরের লেজের মতো অনর্থক/বেহুদা যেটা তার পশ্চাৎদেশও ঢাকতে পারে না আবার পোকামাকড়ের কামড় থেকেও বাঁচাতে পারে না।’

The life of an uneducated man is as useless as the tail of a dog which neither covers its rear end, nor protects it from the bites of insects.

জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান গুপ্তধন চাণক্যের কাছে। এর উপকার বহুবিধ।

সুগন্ধী বৃক্ষ যেমন পুরো বনকে সুগন্ধে ভরে ফেলে তেমনি পরিবারে একটি পূণ্যবান সন্তান পুরো পরিবারকে মহীয়ান-গরীয়ান করে তোলে। আবার একটি গাছে আগুন লাগলে যেমন পুরো বন পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে তেমনি পরিবারে একটি কুলাঙ্গার সন্তানের কারণে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সন্তানাদি লালন পালন নিয়ে চাণক্যনীতি প্রাণিধানযোগ্য। পাঁচ বছর পর্যন্ত সন্তানকে আদর-যত্ন করতে হবে, এর পরবর্তী দশ বছর বেত রাখতে হবে পাশে। ষোল বছর পর থেকে তার বন্ধু হয়ে উঠতে হবে।

সন্তানাদি নিয়ে চাণক্যের আরেকটি কথা হচ্ছে ‘যে গাভী দুধ দেয়না সে যেমন-সন্তান যে জ্ঞানবান ও পূণ্যবান নয় সে তেমন।’

তিনি আরও বলেন: ‘রূপ, যৌবন থাকলে ও অভিজাত বংশে জন্মালেও সেটা মূল্যহীন যদি তার জ্ঞান না থাকে।’

Those who are endowed with beauty and youth and who are born of noble families are worthless if they have no learning.

কারণ চাণক্য মনে করেন: ‘যার ধন-সম্পদ নেই সে নিঃস্ব নয়, সে তো ধনী যদি তার জ্ঞান থাকে; কিন্তু যার জ্ঞান নেই সে তো সবদিক দিয়েই নিঃস্ব।’

One destitute of wealth is not destitute, he is indeed rich (if he is learned); but the man devoid of learning is destitute in every way.

চাণক্য ঈর্ষা নিয়ে বলেন-‘জ্ঞানী লোককে মূর্খরা ঈর্ষা করে, ধনীকে দরিদ্র, সতী নারীকে অসতী এবং সুন্দরী নারীকে কুৎসিত রমণী।’

The learned are envied by the foolish; rich men by the poor; chaste women by adulteresses; and beautiful ladies by ugly ones.

চাণক্যের কালজয়ী প্রজ্ঞার বিচ্ছুরণ আমরা দেখি যখন খুবই সহজ ভাষায় জ্ঞানগর্ব কথা বলে দেন। চাণক্য বলেন-‘কিপটার দুশমন হচ্ছে ভিক্ষুক, গর্দভের দুশমন জ্ঞানী উপদেষ্টা, অসতী নারীর দুশমন তার স্বামী যেমনটা চাঁদ হচ্ছে চোরের কাছে।’

The beggar is a miser’s enemy; the wise counsellor is the fool’s enemy; her husband is an adulterous wife’s enemy; and the moon is the enemy of the thief.

সুখী মানুষের বৈশিষ্ট্য বলতে গিয়ে চাণক্য বলেন: ‘যে ব্যক্তি আর্থিক লেনদেনে, জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে, খাওয়া ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে লজ্জা ছেড়ে দেয় সে সুখি হয়।’

He who gives up shyness in monetary dealings, in acquiring knowledge, in eating and in business, becomes happy.

ভালো কাজ নিয়ে বলতে গিয়ে চাণক্য বলেন ‘বাছুর যেমন হাজারো গাভীর মধ্য থেকে নিজের মাকে চিনে নেয় তেমনি ভালো কাজ করা বা মন্দ কাজ করা ব্যক্তিকেও চিনে নেয় তার ভালো বা মন্দ কাজগুলো।’

চাণক্যনীতি ও নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স একসাথে পড়া যেতে পারে। রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে দুটি বই খুবই প্রাসঙ্গিক ও বেশ মিল রয়েছে তাদের মধ্যে। এছাড়া মহাভারতের গীতা অংশ ও ভীষ্মের উপদেশগুলো পড়া যেতে পারে। রাষ্ট্রনীতি ও ব্যক্তিগত জীবন ব্যবস্থাপনায় এগুলো খুবই উপকারী বলে মনে হবে। ক্লাসিক বইয়ের উপর নির্দ্বিধায় আস্থা রাখা যায় এ কারণে সেগুলো হাজারো বছর মানুষের কাজে লেগে এসেছে, এগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক।

চাণক্য এমন এক পণ্ডিত, দার্শনিক যে তার জীবদ্দশাতেই তার চিন্তার বাস্তবায়ন দেখে যেতে পেরেছেন। গ্রীসের প্লাতো ‘দার্শনিক রাজা’ বা শক্তিশালী রাজার কল্পনা করতে পারলেও জীবদ্দশায় বাস্তবায়ন দেখতে পারেননি। চাণক্য সেখানে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পত্তনের পেছনে প্রধান দ্রষ্টার ভূমিকা পালন করেন, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন আর তার মৃত্যুর পরও তার চিন্তা মৌর্য্য সাম্রাজ্য ও তৎপরবর্তী সাম্রাজ্যগুলোতে অনেক প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে।

আধুনিক ভারতবর্ষও চাণক্যের প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি।

Related Posts

About The Author

Add Comment