ছিটমহলের ইতিহাস (২য় পর্ব)

উপমহাদেশের স্বাধীনতা লগ্নে ব্রিটিশ সরকার এসব রাজ্যের জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন করে। ওই আইনে বলা হয়, দেশিয় রাজন্যবর্গ তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন। অথবা তারা স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে থাকতে পারবেন। সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত লাগোয়া ছিল পাঁচটি ক্ষুদ্র দেশিয় রাজ্য। ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী উপজাতি অধ্যুষিত রাঙ্গামাটি, রামগড় ও বান্দরবান যোগ দেয় পূর্ব পাকিস্তানে। আর পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য ত্রিপুরা ও উত্তরের কুচবিহার যোগ দেয় ভারতে। দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্তের দেশিয় রাজ্যগুলো নিয়ে কোনো সমস্যা না হলেও সমস্যা হয় উত্তরের কুচবিহার নিয়ে। কারণ সে সময়ে কুবিহারের রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ন ভোপ বাহাদুরের কিছু জমিদারী সত্ত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার মধ্যে। অপর দিকে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারদের কিছু তালুক বা মহাল ছিল কুচবিহার সীমানার মধ্যে। ফলে ভারতের অভ্যন্তরে পড়ে যায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কিছু ভূখণ্ড এবং পূর্ব পাকিস্তানে পড়ে ভারতের কিছু ভূখণ্ড। এগুলোকেই পরবর্তী সময়ে নাম দেয়া হয় ছিটমহল। ভারত-পাকিস্তান আমলে এ সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হলেও ভারতের সঙ্গে ওই ছিটমহল সমস্যা থেকে যায়। এরপর প্রায় ৪১ বছর কেটে গেছে তবু দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ওই জনপদগুলোর বিষয়ে দু’ দেশের মধ্যে কোনো মীমাংসা হয়নি। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোর সঠিক ভাগাভাগির জন্য গঠন করা হয়েছিল রেডকিফ মিশন। এই মিশন এমনভাবে সীমানা চিহ্নিত‎ করে গেছে তাতেও দেশিয় রাজ্যের ওই স্বতন্ত্র এলাকাগুলো নিয়ে বিদ্যমান সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
এক রাষ্ট্রের ভেতর অন্য রাষ্ট্রের কোনো ছোটো ভূখণ্ডের নাম ছিট বা ছিটমহল। অনেক দেশেই নানা ভাঙ্গনে তৈরি হয়েছে এরকম অবস্থা। যেমন সুইজারল্যাণ্ডে রয়েছে জামানির, ফ্রান্সে স্পেনের, নেদারল্যান্ডে বেলজিয়ামের ছিট। পূর্ব ইউরোপের ৭ দেশে ছড়িয়ে আছে ৩২টি ছিট। আফ্রিকার মোজাম্বিক এঙ্গোলা, নমিবিয়ায় বতসোয়ানা, এশিয়ার ওমানে আবুধাবীসহ বিভিন্ন দেশে ছিটমহলের সংখ্যা ২২৩টি।

ছিটমহলের জনবসতি
বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ছিটমহলসমূহে জনবসতির ইতিহাস বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে আলাদা নয়। বাংলাদেশে যেভারে জনবসতি গড়ে উঠেছে তেমনিভারে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলে জনবসতি গড়ে উঠেছে। পক্ষান্তরে ভারতে যেভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছে তেমনিভাবে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলে জনবসতি গড়ে উঠেছে। জনবসতির দিক থেকে তিন ধরনের মানুষ ছিটমহলে বসবাস করে। প্রথমত; যারা পূর্ব থেকে ছিটমহলে বসবাস করছে। এর সংখ্যা ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলে শতকরা ৬০ ভাগ পক্ষান্তরে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলের শতকরা ২০ ভাগ আদিবাসিন্দা। দ্বিতীয়ত; ছিটমহলে বাহির থেকে এসে যারা বসতি স্থাপন করেছে তাদের স্থানীয়ভাবে ‘ভাটিয়া’ বলে থাকে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিং, কুমিল্লা, গাইবান্ধা, ময়মনসিং, নরসিংদী ও রংপুর অঞ্চল থেকে এসে বসতি স্থাপন করে। তবে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলে ভারতের অন্যান্য জেলার লোকজনের বসতি নেই। তৃতীয়ত; একশ্রেণীর মানুষ জমি বদল করে ছিটমহলে বসবাস করছে। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলে বসবাসকারি শতকরা ২০ ভাগ মুসলমান ১৯৫৬ সালের হিন্দু মুসলমান রাইটের সময় জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভারতের পশ্চিমরঙ্গের কুচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গা, মেকলিগঞ্জ, দিনহাটা, শিতলকুচি, হলদিবাড়ি এবং কুচলিবাড়ি থানা থেকে এসে জমি বদল করে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলে বসবাস শুরু করে। একইভাবে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলের শতকরা ৩০ ভাগ হিন্দু ধর্মালম্বী ১৯৫৬ সালের হিন্দু মুসলমান রাইটের সময় জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাংলাদেশের লালমনির হাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারি, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা প্রভৃতি জেলার হিন্দু ধর্মালম্বী লোকজন ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলে বসতি স্থাপন করে। পাশাপাশি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে জমি বদল করে আসেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দাদের “ভাটিয়া” পক্ষান্তরে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের ছিটমহলের মানুষদের “রিপোজি” বলা হয়ে থাকে।

ছিটমহলের ইতিহাস (প্রথম পর্ব)

-এ এস এম ইউনুছ

প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সমন্বয়ক, ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় ছাত্র আন্দোলন

Related Posts

About The Author

Add Comment