জাতীয়তাবাদ, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক সাফল্য-প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে জেসন ফারমানের নিবন্ধ

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিক দেশেগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্থর প্রবৃদ্ধি। শেষ দশকে এসব উন্নত দেশে গড় প্রবৃদ্ধি ১.২% এ এসে নেমেছে যেটা তার পুর্ববর্তী ২৫ বছরে ছিল ৩.১%। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই যে, এই ধীর গতির প্রবৃদ্ধি সমাজকে অনেকটা কম উদার ও অসহনশীল করে তোলে। গত দশকে এই ধীর গতির প্রবৃদ্ধি লোকরঞ্জনবাদী জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়েছে যেটা এখন অনেক দেশে আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিংশ শতাব্দীর অন্ধকার দশকের মতো, আজকের জাতীয়তাবাদ ভয়াবহ মাত্রায় আভিবাসনের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে এবং কিছুটা কম মাত্রায় মুক্ত বাজারের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে আজকের বিষাক্ত জাতীয়তাবাদ অর্থনৈতিক দূরাবস্থাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে যার প্রভাব ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু দেখা যায় যে,অভিবাসন প্রক্রিয়াটি জাতীয়াতাবাদের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ করলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বাড়ায় কারণ বাজার যত মুক্ত হবে প্রবৃদ্ধি তত গতি পাবে।

এই বিষয়ে অর্থনৈতিক প্রমাণটি সূস্পষ্ট যে আভিবাসন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে থাকে। উপরন্তু, অভিবাসন এখন আগের তুলনায় আরো বেশি প্রয়োজন কারণ উন্নত অর্থনীতির দেশে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিম্ন জন্মহারের কারণে কাজের জন্য তাদের দেশীয় লোকের যোগান ক্রমশই কমছে।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৫ সাল থেকে জাপানের কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আভিবাসীরা ৭০% শ্রম-শক্তি বৃদ্ধির জন্য অবদান রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম-শক্তি বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে অভিবাসন কিন্তু এখন তারা যদি কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে তবে তাদের শ্রম-শক্তি হ্রাস পাবে ।

উচ্চগতির প্রবৃদ্ধি ভাল এমনকি এটি যদি একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করে এর কারণ সেদেশে কর্মরত অভিবাসীরা ট্যাক্স পরিশোধ করে। আর এর ফলে সেদেশের পেনশনভোগীদের এবং অবসরপ্রাপ্তদের তা সাহায্য করবে । সাধারণত, দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া একটি প্রাণবন্ত ও বিস্তৃত জনসংখ্যা জাপানের মত একটি জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া দেশের থেকে ভালো ।
এছাড়া শ্রমশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিবাসীরা প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মাথাপিছু জিডিপি বাড়ায় । কারণ অভিবাসীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়া ও নতুন ব্যবসা শুরু করার অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে ২০১৫ সালে বিদেশি পাসপোর্টধারীরা ৪৪% নতুন ব্যবসা শুরু করে ।ফ্রান্সে, ওইসিডি অনুমান করেছে যে, অভিবাসীরা দেশীয়দের তুলনায় ২৯% বেশি উদ্যোক্তা কার্যকলাপে অংশ নিচ্ছে যা সামগ্র ওইসিডির গড় কার্যক্রমের সমান। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীরা সেদেশে জন্মগ্রহণ করা নাগরিকদের থেকে ২-৩ গুণ বেশি উদ্ভাবনী কাজের সাথে জড়িত এবং তাদের উদ্ভাবনগুলি দেশীয়দেরও নানাভাবে সুবিধা দেয়।

তাছাড়াও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে দেখা যায় যে অভিবাসীরা সে দেশে জন্মগ্রহণ করা শ্রমিক দের বেতন কমায় না বরং তারা সামগ্রিকভাবে সবার বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে ।
উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি ফ্রান্সের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি ডিপার্টমেন্টের মধ্যে অভিবাসীদের কর্মসংস্থান ১% বৃদ্ধি পেলে সেক্ষত্রে তা দেশীয় শ্রমিকদের বেতন ০.৫% বৃদ্ধি পায়। এটা মনে করা হয় যে শ্রমশক্তির আকার এবং উত্পাদ বাড়াতে অবদান রাখা ছাড়াও অভিবাসীরা স্থানীয় জন্মগ্রহণকারী কর্মীদের আরো দক্ষতা সম্পন্ন করতে এবং তাদের আরো বেশি উপার্জন করতে সাহায্য করে।
আমার পেশাদার ফোকাস অর্থনীতিতে, তাই আমি প্রবৃদ্ধির ভূমিকার উপর জোর দিয়েছি । কিন্তু এটিই মূলত লোকরঞ্জনণবাদী জাতীয়তাবাদের উত্থানের পিছনে একমাত্র কারণ নয়। এই যে উন্নত দেশগুলি সাংস্কৃতিকভাবেও পরিবর্তন হচ্ছে সেই সাথে আরো অন্য দিকেও । উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের জনসংখ্যার মধ্যে বিদেশে জন্মগ্রহণ করাদের সংখ্যা ১৯৬০ সালের পর থেকে বেড়ে প্রায় ১৪% হয়েছে ।
অভিবাসনের ব্যাপারটি যখন আসে, তখন প্রায় সব দেশ একটি পছন্দের সম্মূখীন হয়। একদিকে তারা অভিবাসীদের থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলির দিক থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না।

এদিকে আমাদের এমন একটি সাংস্কৃতিক জায়গা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে অভিবাসীরা কেবল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আসবে না, বরং তারা নতুন নাগরিক হিসাবে যোগদান করবেন। এর অর্থ হচ্ছে ভাষা ধারণ করা ও জাতীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করা । আর ফ্রান্সের এক্স-এ-প্রোভেন্সে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনার সময় আমি প্রথমে দেখেছি তাদেরকে জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে উল্লাস করতে ।
সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রে এটা আমাদের অভিবাসনের ভিশন এবং সমন্বিত জাতীয়তাবাদের দিকে আমাদের কাজ করা উচিত সেই সাথে ভাল ফুটবল দল গঠন সহ।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে নেয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সাব্বির হাসান
জেসন ফারমান, প্রফেসর অব দ্য প্র্যাকটিস অব ইকোনোমিক পলিসি এট হার্ভাড কেনেডি স্কুল ।

ইংরেজিতে মূল আর্টিকেলটি পড়তে ক্লিক করুন: https://www.project-syndicate.org/commentary/nationalism-immigration-economic-growth-by-jason-furman-2018-07

ফটো ক্রেডিট: গেটি ইমেজেস

Related Posts

About The Author

Add Comment