জীবনানন্দ দাশ: মূল্যায়ন ও পাঠোদ্ধার

বইটিতে জীবনানন্দের কবিতাকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উপায়ে ব্যবচ্ছেদ করে তাঁর কবিতার নানাদিক-শব্দের ব্যবহার,কাব্যের বিষয়বস্তু,ছন্দের ব্যবহার,ভাব প্রকাশের ঢং আলোচিত হয়েছে।
বুদ্ধদেব বসু,হুমায়ুন আজাদ,আবদুল মান্নান সৈয়দ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,আবু হাসান শাহরিয়ার,হুমায়ুন কবির,রণেশ দাশগুপ্ত,শঙখ ঘোষ এবং রণজিৎ দাশসহ আরো অনেকেই এই ব্যবচ্ছেদে অংশ নিয়েছেন।

বুদ্ধদেব বসুর মতে,আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দকেই সার্থকভাবে প্রকৃতির কবি বলা যায়।তবে শুরুর দিকে তিনি সত্যেন দত্তের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না,এটা কেবল ছন্দের বিচারে,ভাবের বিচারে নয়।ধ্বনির বৈশিষ্ট্যে,চিত্রকল্প সৃষ্টিতে তিনি নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।যেমন:

‘ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল
ডালিম ফুলের মত ঠোঁট যার,পাকা আপেলের মত লাল যার গাল।’

রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর লেখায় জীবনানন্দকে মার্ক্সবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যদিও মার্কসবাদীরা সেটা মানতে নারাজ।তাদের মতে,জীবনানন্দ বিপ্লবের প্রয়োজনবোধের বিপরীত জগতে বাস করতেন।জীবনানন্দকে আত্মকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন মানব বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে যেটা মার্ক্সবাদীরা কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছে।রণেশ দাশগুপ্ত প্রমাণ তুললেন এর বিপরীতে জীবনানন্দের লেখা থেকে….

‘প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মত,
কি এক বিরাট অবক্ষয়ের মানব সাগরে।
(তোমাকে:বেলা অবেলা কালবেলা)

জীবনানন্দের কবিতায় সময় সচেতনতা বারবার উঠে এসেছে।সময় বা কালের বিস্তার আমাদের জীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করছে তা বারবার জীবনানন্দ তার কাব্যভাষায় প্রকাশ করেছেন..যেমন..

‘আমার আকাশ কালো হতে চায় সময়ের নির্মম আঘাতে।’
শঙখ ঘোষ তাঁর লেখায় জীবনানন্দের সময় সমগ্রতাকে তুলে এনেছেন।তাঁর মতে,ব্যক্তিকাল,মানবকাল,বিশ্বকাল এই তিনকালের মধ্যে জীবনানন্দ একইসাথে বিচরণ করেন।

জীবনানন্দের কবিতায় উপমা উৎপ্রেক্ষা তুলনা বিশেষণ ভৌগোলিক স্থানের অহরহ ব্যবহারের দিকটি তুলে এনেছেন হুমায়ুন আজাদ।তাঁর মতে,জীবনানন্দ শব্দ ব্যবহারে অভিধান নির্ভর হন নি,শব্দ নিয়েছেন রূপসীবাঙলার রূপ থেকে,হৃদয়লোক থেকে,সাম্প্রতিকতা থেকে।বাঙলা উপমা ব্যবহারের সুদূরস্পর্শিতা জীবনানন্দের মাধ্যমেই আসে।যেমন:পাখির নীড়ের মতো,উটের গ্রিবার মতো,বেতের ফলের মতো ইত্যাদি।

আবদুল মান্নান সৈয়দের মতে,জীবনানন্দ ইংরেজি কবিতার প্রতি বিশেষভাবে দায়ী ছিলেন।তাঁর ‘বনলতা সেন’ কবিতায় এডগার এলান পো’র ‘To Helen’ এবং জন কিটসের ‘On first looking into Chapman’s Homer’ কবিতার প্রভাব সুস্পষ্ট।তবুও জীবনানন্দ যেন এগুলোর প্রকাশভঙিগতে অনন্য এবং অসাধারণ।W.B Yeats. এর the scholars,the three beggars,the falling of leaves কবিতার সাথে জীবনানন্দের ‘সমারূঢ়’, ‘লঘু মুহূর্ত’,’মৃত্যুর আগে,’ কবিতার সাথে মিল লক্ষণীয়।তাঁর মতে,জীবনানন্দের কবিতায় ইয়েটসের প্রভাব সবচে বেশি দেখা যায়।

রণজিৎ দাশ কবি বোদলেয়ারের গদ্যাশ্রিত কাব্যভাষার অর্থাৎ the lyrical stirrings of the soul,the wave motions of dreaming,the shocks of consciousness এই তিনটি ভাষাসূত্রের অবতারণা করে জীবনানন্দের কবিতায় সেগুলোর সার্থক প্রয়োগ উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে আবু হাসান শাহরিয়ার জীবনানন্দকে প্রথম উত্তর আধুনিক কবি এবং সুনীল গঙোপাধ্যায় জীবনানন্দের কাব্যভাষাকে ‘সেনসুয়াস’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বইটি পড়লে জীবনানন্দ পড়তে ও বুঝতে অনেক সহজ এবং হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠবে।

 

লেখক : আবদুল্লাহ আল রুমান

Related Posts

About The Author

Add Comment