ঢাকা লিট ফেস্ট এবং/কিংবা একটা ফুসমন্তর

সবিতা শারমিন

ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজনকারীরা বাংলা সাহিত্য নিয়ে আসলেই আন্তরিক কিনা তা বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না যদি আপনি তাদের প্রোগ্রাম তালিকা দেখেন। গত ছয় বছর ধরে আমি ওদের ফেস্টে যাচ্ছি। প্রত্যেকবার তারা এই ভুলখানা করে আসছে।

প্রোগ্রামের ভেন্যুগুলোর নাম দেখেনঃ Main Stage, KK Tea, Stage Lawn, BRAC Stage, Cosmic Tent। খেয়াল করেন, ওনারা আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটোরিয়ামকে বানিয়ে ফেলেছে মেইন স্টেজ। ব্যাপারটা হল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে ফেস্ট করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম সম্মেলন কেন্দ্রের নাম থেকে মুছে দেয়ার মতো। আর যারা এইরকম নিজের আদি পুরুষ বা পিতাকে চেনে না তারা হল সাংস্কৃতিক বেজন্মা। এই রকম হাজারটা উদাহরণ দেয়া যায়।

ঢাকা লিট ফেস্ট-এর আগের নাম ছিল হে ফেস্টিভ্যাল; হে হইল যুক্তরাজ্যের ছোট এক শহরের নাম। ঢাকার বুকে বিদেশী শহরের নামে সাহিত্য সম্মেলন করার বায়নাক্কা আসলেই বোধগম্য না হলেও বিবেচনার বিষয়ই বটে, কারণ এরাই দেশে অর্থবলে, ক্ষমতাবলে সাংস্কৃতিক অভিজাত (কাজী নজরুল যাদের ইংরেজি শব্দ অ্যারিস্টক্র্যাটের আদলে ব্যঙ্গ করে বলেছিল “আড়ষ্টকাক”)। দেশ ও জাতির কাছের তাদের অঙ্গীকারে তারা আন্তরিক কিনা তা বুঝতে হে ফেস্টিভ্যাল কিংবা লিট ফেস্ট নিয়ে ভাবতে হবে।

অতীতে শ্বেতাঙ্গ মরদরা তথাকথিত হোয়াইট মান’স বার্ডেন বা বোঝা (“The White Man’s Burden”) ঘাড়ে চেপে বাকি দুনিয়াকে সবলে বলৎকার ও লুণ্ঠনপূর্বক তাদের মর্দামি আর ফর্সা রঙ ও সংস্কৃতির আধিপত্য প্রসারে সদর্পে বেড়িয়ে পড়তো; আর এখন যুগ এমনই বদলেছে যে আমাদেরই একাংশ (তাত্ত্বিকরা যাদের বলে কমপ্রাডর বুর্জোয়া, খাসবাংলায় বলা যায় নব্যরাজাকার) স্বেচ্ছায় শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে আমাদের উপর পুরনো সেই উপনিবেশি আধিপত্য বহাল ও পুনঃস্থাপন করতে চায়। হেন হীন উদ্দেশ্যে তারা ঢাকার বুকে যুক্তরাজ্যের কোন এক অখ্যাত শহরের নামে উৎসব আয়োজন করে। ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে জাতীয়স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশের বুকে তারা উপনিবেশি লেগ্যাসি বইতে চায়। অধুনা এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নব্য উপনিবেশবাদ কিংবা নব্যসাম্রাজ্যবাদ। যদিও তারা মুখে সাহিত্যসেবা ও সাহিত্যপ্রেমের ফুসমন্তর আওড়িয়ে জনতা ও লেখককুলকে ফুসলাতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা যে মীরজাফরের উত্তরসূরি দেশপ্রেমী জনগণ তাদের কাজেই তার প্রমাণ পেয়েছে। প্রেম যদি অন্তরের অন্তস্থল থেকে উঠে না আসে কর্মে তা প্রকাশ পাবেই। তাই তারা বছরের পর বছর আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটোরিয়ামকে বলে যায় মেইন স্টেজ। তারা তাদের দেশপ্রেমে সৎ কিনা তা বুঝতে তাদের নিজেদের লেখনীর ভাষা দেখেন না, ওরা নিজেরা কেউ বাংলা লেখে না, কেউ বাংলা পড়তে পারে না বলে গর্ববোধও করে; আর তাই প্রতি বছর তারা নানান উত্তর-উপনিবেশি দেশসমূহ থেকে তাদের মত সাংস্কৃতিক বেজন্মাদের দাওয়াত দিয়ে (যারা সবাই স্বদেশী ভাষা ছেড়ে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য করে) কিংবা পশ্চিমাবিশ্বের নানান মেট্রোপলিটন শহরে বসবাসরত আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা ড্যায়াসপরাদের ডেকে নিয়ে এসে জনতাকে বুঝ দিতে চায় যে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য করাই এখন বাকি বিশ্বের ট্রেন্ড (আর বাংলাদেশে আমরাই এই ট্রেন্ডের অনুসারী, আমরাই সেলিব্রেটি, বাংলাভাষী লেখকেরা না — লেজকাটা শেয়াল লেজকর্তনকেই ট্রেন্ড হিসেবে তুলে ধরবে এই স্বাভাবিক)। আর যেহেতু এই কমপ্রাডর বুর্জোয়াদের মালিকানায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বেশুমার সংবাদপত্র তথা সাহিত্যপত্র আছে, সেখানে কর্মরত বেচারা কর্মীরা মালিকের স্লোগানে তাল মেলাতে (স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়) বাধ্য হয়। যাইহোক তারা পরবর্তীতে জনমতের ফাঁপরে পরে বা অন্তর্গত কোন্দলে পরে নাম বদলিয়ে ফেললেও উপনিবেশী ছকের বাইরে যেতে পারেনি।

এই লিট ফেস্ট-এ এরা সর্বক্ষেত্রে বাংলার উপস্থিতি প্রান্তিক করে তুলতে বদ্ধপরিকর। তাও যদিবা বাংলাভাষী দুয়েকজনকে দাওয়াত দেয়া হয় তা হয় চক্ষুলজ্জার খাতিরে। পাঁচ বিদেশীর বিপরীতে একজন অল্পপরিচিত স্বদেশী হাজির করে বিদেশী বা ইংরেজির আধিপত্য জাহির করতে। এর চেয়ে সম্পূর্ণরূপে বিদেশী সাহিত্যের উৎসব বা ইংরেজিভাষায় রচিত সাহিত্যোৎসব হলেও ভালো হত। কিংবা আয়োজনকারীরা যদি বাংলাভাষী সাহিত্যিক হত তাহলে হয়তো বলা যেত তারা সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে উপনিবেশি লেগ্যাসি বইছে। এখানে ওরা ইংরেজিভাষী সাহিত্যিক হওয়ায় উপনিবেশি লেগ্যাসি বহনের সচেতন প্রয়াস যে রয়েছে তা তাদের হাবেভাবে কাজেকর্মে সুস্পষ্ট।

আর ঢাকা লিট ফেস্টে বিদেশী সাহিত্যের উপস্থিতিও একদমই নাই। এখানে বিদেশী সাহিত্য বলতে শুধু ইংরেজি ভাষার সাহিত্য বোঝানো হয়। জাপানি কিংবা স্প্যানিশ কিংবা চিনা কিংবা ফরাসি কিংবা ফারসি সাহিত্যের উপস্থিতি কোনদিন দেখি নাই।

নানান দেশী সাহিত্য না থাকুক, নানান দেশী সাহিত্যিক কিন্তু আছে; যারা কমবেশি সবাই ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য কিংবা লন্ডন কিংবা নিউইয়র্ক কিংবা লস এঞ্জেলস কিংবা টরেন্টো এমন বিবিধ পশ্চিমা মেট্রোপলিটন শহরে বাস করে মানে হোমলেস ড্যায়াসপরা আর কি। এই ড্যায়াসপরাদের নিয়ে আমার মায়া হয়। এরা সবখানেই গৃহহীন। এদের অনেকে ভালো সাহিত্যও করে (এরা ইংরেজিতে সাহিত্য করবে এই স্বাভাবিক কারণ তারা স্বদেশী ভাষা জানেনা, কিন্তু স্বদেশে অবস্থান করে বিদেশীভাষায় সাহিত্যচর্চা তো বিশ্বাসঘাতকতা)। এই ড্যায়াসপরা মাঝে মধ্যে স্বদেশে বা অন্যান্য উত্তর-উপনিবেশী দেশগুলোতে গিয়ে ভাব এবং ভড়ংও ফলায়। জানি তাদেরও পেটের ও চেটের দায় আছে। এসব নানাবিধ কারণে তারা তাদের সাংস্কৃতিক বেজন্মাপনা ছাড়তে পারে না। তাদের প্রতি আমাদের অনুকম্পা; কিন্তু তাই বলে তাদের অনুজ্ঞা অনুসরণে আমাদের দায় নাই। বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সবচে’ বিখ্যাত ড্যায়াসপরা ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান সেই শৈশব থেকে ব্রিটেন অধিবাসী; উনি বাংলা জানেন না, ইংরেজিতে লিখে বিখ্যাত; উনি নিজেকে বাংলাদেশী ভাবেন না ব্রিটিশ ভাবেন কিন্তু ব্রিটিশরা তাকে ব্রিটিশ মনে করে না; এই বিষয়ে আক্ষেপ করে উনি দ্য নিউ ইয়র্কার-এ একটি নিবন্ধও লিখেছিলেন

এও জানি ফেস্টের হোস্ট কাজী আনিস আহমেদ ইউলাব, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, বেঙ্গল লাইটস, এমন বিবিধ প্রতিষ্ঠানের প্রভু। তাই পেটের দায়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের চাকুরেরা যে এমন ফেস্ট নিয়ে মাতামাতি করবে, তাতে আর এমন কি? ফেস্টে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট একজন বুদ্ধিজীবী নিজ জবানিতে বলেছিলেন নিতান্ত দায়ে ঠেকে ফেস্টে যান তিনি কারণ কাজী সাহেবের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের চাকুরে তিনি। আহারে!

ফেসবুকে একজন মত দিয়েছেন আমরা তো সবকিছুই ইংরেজিতে করছি, বিদেশী পণ্যকে অগ্রাধিকার দেই সবকিছুতেই, তাহলে এই লিট ফেস্ট-এ অ্যালার্জি কেন? আমারও তো এই একই কথা বাপু। এই যুক্তিতেই আমি লিট ফেস্ট না ফিস্ট-কে বর্জনের কথা বলি।

যতদিন বাংলাদেশের মাটিতে বাংলার মর্যাদা মজবুত হয় নাই, যতদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় সকল কার্যকলাপে বাংলা ভাষার পরিপূর্ণ ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয় নাই এবং অন্য যেকোন ভাষার চেয়ে অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, যতদিন স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সকলক্ষেত্রে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নাই, যতদিন জাতীয় সংস্কৃতির ও অর্থনীতির সকল পর্যায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ (তথা একাত্তরের ও বর্তমান সংবিধানের চার মূলনীতির একটি) জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, যতদিন বিদেশী পণ্যের আগে দেশি পণ্যের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, এমন লিট ফেস্টে জনতার উপস্থিতি কোনমতেই কাম্য নয়।

সবিতা শারমিন,

নারীবাদী সাহিত্যিক,  সমাজ-রাজনীতি-ও-জনসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক।

যোগাযোগে [email protected]

Related Posts

About The Author

2 Comments

Add Comment

Leave a Reply to সবিতা শারমিন Cancel reply