তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা: শারমিন আহমদ

প্রথমেই যে কথাটি বলবো তা হলো “একটি জাতির জন্ম ও তার রাজনৈতিক ইতিহাস জানবার জন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত মানসিকতা ও সত্যকে জানবার আগ্রহ ও অঙ্গীকার”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “ইতিহাস দেশের গৌরব ঘোষনার জন্য নহে,সত্য প্রকাশের জন্য”। বর্তমান সময়ে স্বাধীনতার ৪৬ বছর হয়ে গেলেও আমরা যারা নতুন প্রজন্মের তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, আমরা অনেকেই জানিনা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে কারা বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা এনেছিলো। আজকে এমন এক নেতার নাম বলবো যাকে নিয়ে ঘটা করে কোন কথাবার্তা বলা হয়না। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন তাজউদ্দীন আহমদ। শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মুজিব-তাজউদ্দীন শলা-পরামর্শ করতেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তার উদাহরণ আমি কয়েকটি ঘটনার বিবরন দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

অপারেশন সার্চ লাইটের নীল নকশা সম্পন্ন করে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন। সেই রাতে তাজউদ্দীন আহমদ গেলেন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলো আন্ডারগ্রাউন্ডে যেয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা। তবে শেষ সময়ে এসে শেখ মুজিবুর রহমান বেঁকে বসলেন; তিনি কোথাও যাবেন না বলে জানালেন। তাজউদ্দীন আহমেদ বললেন

“মুজিব ভাই, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হলেন আপনি। আপনার নেতৃত্বের ওপরই তারা সম্পূর্ণ ভরসা করে রয়েছে। আপনার অবর্তমানে দ্বিতীয় কে নেতৃত্ব দেবে এমন ঘোষনা তো আপনি দিয়ে যাননি; নেতার অনুপুস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি কে হবে, দলকে তো তা জানানো হয়নি। ফলে ২য় কারো নেতৃত্ব দূরূহ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে এক অনিশ্চিত ও জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে”

তাজউদ্দীন আহমদের সেদিনের উক্তিটি ছিলো এক নির্মম সত্য ভবিষ্যদ্বাণী। তাজউদ্দীন আহমদ আরোও বললেন যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ রূপে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়া। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে আটক হলেন। আর পূর্ব পাকিস্তানে ইতিহাসের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। আপনারা সকলেই সে ঘটনা কম বেশি জানেন। আজকের এই লেখার বিষয়বস্তু হলো তাজউদ্দীন আহমেদ কেন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।

১৯৭১, ৩০ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানীদের বর্বরতা চলছে। আর সেই সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ গ্রহণ করেন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালনা করা । বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার সূর্যোদয় হবে বলেই তাজউদ্দীন আহমেদ এর কাছে ন্যস্ত হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বভার। ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়ে জাতীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। সরকার গঠনের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অকুতোভয় সংগ্রাম এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলা সরকার সরকার গঠনের কথা। তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন- “পলাশীর এক আম্রকাননে বাংলা ও ভারতের স্বাধীনতার সূর্যাস্ত হয় ইংরেজদের হাতে, অপর এক আম্রকাননে উদিত হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য”

তবে সেই সময়েও থেমে থাকেনি স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপ। খন্দকার মোশতাক অস্থায়ী সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কৌশলে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন পাকিস্তান ও মার্কিন সরকারে স্বার্থ রক্ষার কাজে। মুক্তি সংগ্রামকে ধ্বংস করে কনফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত করার জন্য তিনি সু-চতুর চাল চালেন। একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে যুবনেতারা মুজিবনগর/স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে। তারা বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের পক্ষে জোর দেয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (Research & Analytical Wing) এর সহয়তায় শেখ মনির নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। তবে তাজউদ্দীন আহমদ এ সব কিছুই যেন বানচাল করে দেন তার তড়িৎ দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে।

তাজউদ্দীন আহমেদ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন জনের মতামত নেন। আলোচনার মাধ্যমে কোন্দলকারী ও অনাস্থা প্রদর্শনকারী দলটি ব্যতীত অধিকাংশ সকলের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আইনগত সরকার প্রতিষ্ঠা ব্যতীত ভারত সরকারে কাছ থেকে অস্ত্রগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা পরিচিত হবে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে। সমগ্র জাতির মুক্তি ও কল্যাণের লক্ষ্যে তাজউদ্দীনের নিবেদিত কর্মপ্রয়াসের বিপরীতে অনুগত তরুণদের ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলো। তাজউদ্দীন আহমেদের সুদক্ষ নেতৃত্বে একটি বড় অর্জন হলো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভারতের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ কারো ঘাঁটি হবেনা। আর সেইদিন কোন গোপন চুক্তি হয়নি। সেই চুক্তি ছিলো প্রকাশ্য এবং কিছুটা লিখিত, কিছুটা অলিখিত। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ এতে যুক্ত ভাবে স্বাক্ষর করেছিলো। সেখানে লেখা ছিলো, “আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে সাপোর্টিং ফোর্স হিসেবে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করবে ও মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করবে। এবং যেদিন আমরা মনে করবো আমাদের দেশে ভারতীয় বাহিনীর প্রয়োজন নেই সেদিন ভারতীয় বাহিনী চলে যাবে”। আর পরবর্তীতে সেই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতেই স্বাধীনতা উত্তর কালে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে বলেন, ৩০ মার্চ, ১৯৭২ এর মধ্যেই তোমারা তোমাদের বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যাবে, তখনই মিসেস গান্ধী ১৯৭২, ১৫ মার্চ মধ্যে সহায়ক বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে গেলেন 

দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের পদক্ষেপ ছিলো লক্ষণীয়। ১৯৭১, ১০ ডিসেম্বর তাঁর নেতৃত্বে যে সকল সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তারা যুদ্ধাপরাধ করেছেন তাদের বিচারের অধীন আনার বিষয়টি গৃহীত হয়। তিনি জানতেন স্বাধীনতা -উত্তর কালে বাংলাদেশে এই বিষবৃক্ষদের সমূলে উৎপাটিত না করলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যমুক্ত ও সবল সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে সূচিত হলো শতাব্দীর এক ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। তাজউদ্দীন আহমদ দেশে ফিরে যা বলেছিলেন তা বৈপ্লবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ও আহ্বান! তিনি বললেন-

শহীদের রক্তে বাংলাদেশের সবুজ মাটি লাল হয়েছে। শহীদের রক্তে উর্বর মাটিতে উৎপন্ন ফসল ভোগ করবে গরিব চাষি, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কোন শোষক জালেম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে শোষণ করতে পারবেনা। যারা প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তাঁদের প্রত্যেককেই বৈপ্লবিক চেতনা নিয়ে কাজ করে যেতে হবে ও পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে সাম্যবাদী অর্থনীতি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা যখন সম্ভব হবে তখনই বিপ্লব সম্পন্ন হবে।

 

শেহনাজ  আখন্দ নীলা

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment